বাংলাদেশ থেকে নর্থ সিকিম ভ্রমণ – ৫ রাত ৪ দিন

যুক্ত করা হয়েছে

প্রথমেই বলে রাখি সিকিম খুবই পরিচ্ছন রাজ্য আর নর্থ সিকিমে প্লাস্টিকের বোতল নেয়া নিষিদ্ধ। যেখানেই যাবেন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখবেন। দরকার পড়লে খাবারের খোসা সাময়িক সময়ের জন্য ব্যাগে রেখে দিয়ে পরে ডাস্টবিনে ফেলবেন। সিকিমে বিভিন্ন ভাষাভাষী/ধর্ম/জাতের মানুষ বসবাস করে, কারো অনুভুতিতে আঘাত আনতে পারে এমন ইঙ্গিত/মন্তব্য করবেন না। সিকিমে যত্রতত্র মলত্যাগ করলে জরিমানা গুনতে হবে।

সিকিম ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

শুরুতেই বলি, সিকিম ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় মার্চ-এপ্রিল/সেপ্টেম্বর-অক্টোবর। অন্য সময়ে সিকিমের নয়নাভিরাম নীল পানির লেক গুলো বরফ জমে সাদা হয়ে থাকে, অনিন্দ্যসুন্দর ফুলে আবৃত উপত্যকা গুলো হয়ে থাকে একদম নির্জীব আর রাস্তায় শক্ত বরফ জমার দরুণ প্রায়ই মূল গন্তব্যস্থল গুলোতে পৌঁছানো কঠিন/অসম্ভব হয়ে পরে। তবে এসময় খুবি কম খরচে সহজেই বরফ/তুষারপাত উপভোগ করতে পারবেন এবং প্রচন্ড শীত মোকাবেলার একটা অভিজ্ঞতাও হয়ে যাবে।

খরচ

মাথাপিছু মাত্র ১১,৫০০ টাকা বাজেটে আমরা ৭ বন্ধু সিক্কিম ঘুরে এলাম গত ১৩-১৮ জানুয়ারি, ২০১৯। এমনিতে সাধারণত এজেন্সি ছাড়াই ভ্রমণ করলেও প্রথমবার সিকিম ভ্রমন বলে আমরা এজেন্সির সহায়তা নিয়েছিলাম শুধু North Sikkim এর ২ রাত/৩ দিনের প্যকেজ (পারমিশন/গাড়ি/দুবেলা খাবার আর হোমস্টেতে থাকা) ও Tsomgo Lake/Changu Lake ভ্রমণের প্যাকেজ (পারমিশন/গাড়ি) নিতে। বাকি ব্যাপারগুলো নিজেরাই ম্যানেজ করেছি।

চুমথাং, সিকিম
চুমথাং, সিকিম

সিকিম ভ্রমণ

দিন ০ – সাতদিন আগে কাটা হানিফ নন-এসি (Hino 1J) বাসে করে বিকাল ৫.৩০ এ কল্যাণপুর/গাবতলী থেকে চলে যাই বাংলাবান্ধা/ফুলবাড়িয়া বর্ডার; মাথাপিছু ৭০০ টাকা (রাতে ফুড ভিলেজ থেকে ডিনার করে নিয়েছিলাম)। বাংলাবান্ধা বর্ডার পর্যন্ত শ্যামলির এসি বাসও যায়; সেক্ষেত্রে ভাড়া মাথাপিছু ১৫০০ টাকা।

দিন ১ – নাস্তা করে নিয়ে প্রথমেই বর্ডার থেকে হানিফের ফিরতি বাসের টিকিট (মাথাপিছু ৬০০ টাকা) করে নেই। দুই বর্ডারে কিছু টাকা ঘুষ/উন্নয়ন ফি প্রদান করে ফুলবাড়িয়া থেকে ডলার/টাকা-রুপি ভাঙিয়ে উঠে পড়ি শিলিগুড়ি গামী অটোতে। অটো ভাড়া মাথাপিছু ৫০ রুপি। অটোকে বলি সিলিগুড়ি SNT (Sikkim National Transport) তে নিতে, অটো খুবই ধীরে চলে তাই চেষ্টা করবেন সময় কম নষ্ট করতে। অটো থেকে নেমে লাঞ্চ করেই উঠে পড়ি যেকোনো গ্যাংটক গামী বোলেরো/সুমোতে। রিজার্ভ ম্যাক্সিমাম ৩০০০/২৫০০ রুপি। পথে Rangpoo চেকপোস্ট থেকে পাসপোর্টে সিল এবং Inner Line Permit করিয়ে নেই (চেকপোস্টের সামনে থেকে ILP এর ২০ কপি ফটোকপিও করিয়ে নিই তখনই)। কোথাও অতিরিক্ত বিলম্ব না হলে ৬/৭ টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক। হোটেল ঠিক করে ফ্রেশ হয়ে তারাতারি ডিনার করে নেই কারন মোটামুটি ৮/৯ টার মধ্যেই খাবার দোকান বন্ধ হয়ে যায়। সেই রাতেই এজেন্সিকে আমরা আমাদের পাসপোর্ট, ভিসা ফটোকপি, ILP ফটোকপি ও ছবি জমা দিয়ে দেই। এখানে জেনে রাখুন যে অবশ্যই ঢাকা থেকে ১০ কপি পাসপোর্ট, ভিসার ফটোকপি ও ১০ কপি ছবি নিয়ে নিবেন।

লাচেন, নর্থ সিকিম
লাচেন, নর্থ সিকিম

দিন ২ – দ্বিতীয় দিন নিজেরা নাস্তা করেই ১০ টার মধ্যে প্যাকেজের সুমো গোল্ড এ করে রওনা দেই লাচেন এর উদ্দেশে । যাত্রা পথে দেখা পাই কিছু ঝর্নার আর দুপুরে একটা দোকান থেকে লাঞ্চ সেরে নেই। রাতে পৌছাই লাচেন শহরে। রাতের ডিনার প্যাকেজেই থাকে। লাচেন থেকে ড্রাইভার এর সাথে ডিল করি ৩০০০ রুপি অতিরিক্ত দিবো আপনি লাচেনের চোপতা ভ্যালী এবং কালা পাত্থার আর লাচুং এর জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনবেন। জেনে রাখুন এ যায়গাগুলো সবসময়ই প্যাকেজের বাইরে থাকে। প্যাকেজে থাকবে লাচেন-থাঙ্গু ভ্যালি ও লাচুং-ইয়মথাং ভ্যালি। থাঙ্গু/ইউম্থাং এর অনুমতিও সাধারণত সরকার দেয়না, ওটা ড্রাইভার/গাইড ম্যানেজ করবে প্যাকেজ অনুযায়ী। এখানে এটাও বলে রাখি অনেকেই গাইড ছাড়া সিকিম ঘুরলেও আমাদের এজেন্সি এটাতে একদমই রাজি হয়নি। এ রাতে প্রচুর তুষারপাত হয় ফলে প্রচন্ড শীতে কাপতে কাপতে আমরা শুয়ে পরি।

দিন ৩ – ভোর ৪ টায় ঘুম থেকে উঠে রওনা দেই থাঙ্গু ভ্যালি-কালা পাত্থার এর উদ্যেশে। লাচেন পুলিশ তুষারপাত এর কারণে অনুমতি নিয়ে ঘাপলা করে পরে সকাল ৭ টায় অনুমতি পাই আমরা কিছুদুর যাবার। ড্রাইভার সাহস করে Yumthang Valley -> Chopta Valley পর্যন্ত নিয়ে যায় কিন্তু চোপটা ভ্যালিতে দুরভাজ্ঞবশত একটা খারাপ ব্রিজে আমাদের গাড়ির টায়ার একদম চিড়ে যায়! 🙁 ফলে স্পেয়ার টারায় ঝুঁকিতে ফেলে Kala Patthar আর যাওয়া হয়না। তবে ওইদিন শুধু আমাদের গাড়িই লাচেন থেকে বেরিয়ে ছিল আর কোন গাড়ি সাহস করেনাই তাই ড্রাইভারকে কিছু টাকা দিয়ে বলি বাকিটা পরদিন জিরো পয়েন্ট নিয়ে গেলে দিবো। চোপটা ভ্যালি থেকে নিজেরাই হাল্কা নাস্তা করে ফিরে আসি হোটেলে বিকাল ৩টায়। দুপুরের খাবার প্যাকেজেই ছিল। খেয়েদেয়ে রওনা দেই লাচুং এর উদ্দেশে। লাচুং এসে হোমস্টে তে চেক-ইন করে প্যাকেজের ডিনার করে নেই। লাচেন এর তুলনায় লাচুং শহরটা বেশ ছিমছাম আর কিছুটা জনবহুল। পরদিনের গন্তব্য ইউম্থাং ভ্যালি-জিরো পয়েন্ট।

চোপতা ভ্যালী, লাচেন, সিকিম
চোপতা ভ্যালী, লাচেন

দিন ৪ – সকালে নাস্তা না করেই বেরিয়ে যাই ইউম্থাং/জিরো পয়েন্ট এর উদ্দেশে। খুবি দুর্ভাগ্যবশত ইউম্থাং এর কিছু আগে গিয়ে দেখি সামনের রাস্তা পুরোটা শক্ত আর পিচ্ছিল বরফে বন্ধ হয়ে আছে। তাই ওইদিন আর আগানো সম্ভব হয়না আমাদের। ড্রাইভার কেও অতিরিক্ত টাকা দেওয়া লাগেনাই। অগ্যতা ওখান থেকেই ফিরে আসি হোমস্টেতে আর প্যাকেজের লাঞ্চ করে ১২ টার মধ্যে বেরিয়ে যাই গ্যাংটক এর উদ্যেশে। বিকালে গ্যাংটক পৌঁছিয়ে কিছু কেনাকাটা/ঘুরাঘুরি/ডিনার সেরে হোটেলে এসে ঘুম দেই।

দিন ৫ – সকালে নিজেরাই নাস্তা করে প্যাকেজের গাড়িতে করে চলে যাই গ্যাংটক শহর থেকে ছাঙ্গু লেক। পথে এক যায়গায় ৫০ রুপি দিয়ে গামবুট ভাড়া করি। গামবুট আমরা লাচুং এও ভাড়া করেছিলাম। তবে গামবুট জিনিসটা সব ক্ষেত্রে সুবিধা দেয় না। বরফ জমে শক্ত হয়ে গেলে এটা গ্রিপ দিবেনা আর তাই নিজেরাই গ্রিপওয়ালা বুট কিনে নর্থ সিকিমে যাবেন। ছাংগু লেক ঘুরে সেখানে Ropeway তে চড়ে চলে যাই একদম ১৫,০০০ ফিট উচ্চতায়। চাঙ্গু লেক এন্ট্রি মাথা পিছু ১০ রুপি আর রোপওয়ে রেট মাথাপিছু ৩২৫ রুপি। চাঙ্গুলেক ঘুরে লাঞ্চ করে বিকাল নাগাদ হোটেলে ফিরি। সন্ধ্যায় গ্যাংটকে ঘুরে কিছু কেনাকাটা করে ডিনার করে হোটেলে এসে ঘুমিয়ে পরি।

লাচুং, নর্থ সিকিম
লাচুং, নর্থ সিকিম

দিন ৬ – সকাল ৮ টায় নাস্তা সেরে ম্যাক্সিমাম ৩০০০ টাকায় গাড়ি রিজার্ভ করে চলে আসি শিলিগুড়ি Cosmos Plaza এর বিগ বাজারে। এখানে কেনাকাটা/লাঞ্চ সেরে দুপুর ২ টায় অটোতে মাথাপিছু ৫০ রুপি দিয়ে পৌঁছাই ফুলবাড়িয়া-বাংলাবান্ধা বর্ডার। রুপি টাকা করে দুই বর্ডারে কিছু টাকা ঘুষ দিয়ে সন্ধ্যা ৫.৩০ টায় উঠে পরি হানিফে। ঢাকা পৌঁছাই পরদিন সকাল ৭টায়।

নোট

সাতজন ভ্রমণ করেছি বলে মাথাপিছু ১১,৫০০ টাকার মতন খরচ হয়েছে এবং মোটামুটি আরামেই Sumo/Bolero তে গাইড সহ বসতে পেরেছি। প্যাকেজের বাইরে গ্যাংটকের M.G. Marg এর Hotel DZhong এ তিন রাত ছিলাম মোট ৯,০০০ রুপিতে। এখানে টাকা আরো বাঁচানো সম্ভব। আলাদা করে North Sikkim (2n/3d) + Tsomgo Lake এর প্যাকেজ নিয়েছিলাম মোট ২৯,০০০ (২৪,৫০০+৪,৫০০) রুপিতে High Hill Tours and Travels নামক রেজিস্টার্ড এজেন্সি থেকে (এটার কর্নধার মিস্টার সুরাজ +91 99333 10111)। ৫ রাত ৪ দিন এর জন্য ট্যুরে মোট ১৮ বেলা খাবার খরচের ৪ বেলা বহন করেছিল এজেন্সি। বাকি ১৪ বেলায় মাথাপিছু ১০০ রুপি ধরে বাজেট করেছি। এতে অনায়াসেই রাস্তাপথের জন্য খাবার/চা খরচের যোগানও হয়ে যাবে। লাচেন থেকে কালা পাত্থার আর লাচুং থেকে জিরো পয়েন্ট যেতে অতিরিক্ত ৩০০০ রুপি দিতে হবে ড্রাইভারকে। এই টাকা কোনভাবেই আগে দিবেন না। যেহেতু আমরা এজেন্সি থেকে পুরো সিকিমের প্যাকেজ নেইনি সেহেতু লোকাল ট্যাক্সি বাবদ মোট ৪০০ রুপি খরচ হয়েছে আমাদের যেটা মোটামুটি অবধারিতই ছিল।

সাংগু লেক, গ্যাংটক, সিকিম
সাংগু লেক, গ্যাংটক

কিছু পরামর্শ

  • আবহাওয়া/রাস্তা খারাপ থাকায় গন্তব্যে পৌঁছানো না গেলে সিকিমের এজেন্সি সাধারণত টাকা ফেরত দেয়না। পারলে Weather Forecast দেখে সিকিম ট্যুর প্ল্যান করুন।
  • তীব্র শীতে কোথাও ঘুরতে গেলে অবশ্যই পর্যাপ্ত ভারি জ্যাকেট, উলের কানমোজা/হাতমুজা/পা মোজা আর থারমাল ইনার নিয়ে যাবেন।
  • তীব্র শীতে কোথাও ঘুরতে গেলে অবশ্যই সাথে পর্যাপ্ত ঔষধ, লিপবাম, লোশন, শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, টয়লেট পেপার এবং পর্যাপ্ত কফির স্যাশে সাথে রাখবেন।
  • তীব্র শীতে কোথাও ঘুরতে গেলে অবশ্যই সাথে করে ফ্লাস্ক নিয়ে যাবেন। এগুলো শেয়ার করতে গেলে বিপত্তি বাধবেই।
  • পারলে বর্ডার ক্রস করেই ওপার থেকে ইন্ডিয়ান সিমকার্ড কিনে নিন। শহরের ভিতরে সিমকার্ড পাওয়া ভারি মুশকিল।

আপনার ভ্রমণ হোক নিরাপদ এবং আনন্দময়!

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।