পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন মির্জাপুর ইমামবাড়া। ছবি: Najmul Huda, উইকিমিডিয়া কমন্স, CC BY-SA 4.0।
উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদে মুঘল-পরবর্তী ইসলামি স্থাপত্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পঞ্চগড়ের ‘মির্জাপুর ইমামবাড়া’—যা স্থানীয়দের কাছে আটোয়ারী ইমামবাড়া বা হোসেনী দালান নামেও পরিচিত। লাল পোড়ামাটির ইটের তৈরি এক গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন স্থাপনাটির খিলান, নিচু বেষ্টনী প্রাচীর আর প্রবেশপথের পুরনো কবরগুলো দেখলে কয়েক শতাব্দী আগের ইতিহাসের আবহ টের পাওয়া যায়।
ইমামবাড়াটি পঞ্চগড় জেলার আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত। ঐতিহাসিক মির্জাপুর শাহী মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে মাত্র ২০০ গজ দক্ষিণ-পূর্বে গেলেই এই প্রত্নস্থলটির দেখা মেলে। একই ইউনিয়নে খুব কাছেই রয়েছে বিখ্যাত বার আউলিয়া মাজার—তাই আটোয়ারী ভ্রমণে গেলে একই সঙ্গে এই তিনটি ঐতিহাসিক নিদর্শন ঘুরে দেখা যায়।
| অবস্থান | মির্জাপুর গ্রাম, মির্জাপুর ইউনিয়ন, আটোয়ারী উপজেলা, পঞ্চগড় |
| পরিচিত নাম | মির্জাপুর ইমামবাড়া, আটোয়ারী ইমামবাড়া বা হোসেনী দালান |
| স্থাপত্যের ধরন | লাল পোড়ামাটির ইটের নির্মিত এক গম্বুজবিশিষ্ট ও খিলানযুক্ত প্রাচীন মিলনায়তন |
| আনুমানিক সময়কাল | প্রাক-আধুনিক বা মুঘল-পরবর্তী আমল (১৯৯৬ সালে আংশিক সংস্কারকৃত) |
| পাশের দর্শনীয় স্থান | ১৬৫৬ সালে নির্মিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট মির্জাপুর শাহী মসজিদ ও প্রাচীন দিঘী |
| পরিদর্শনের সময় | দিনের আলোতে যেকোনো সময় (ঘুরতে ৩০–৪৫ মিনিট যথেষ্ট) |
| প্রবেশমূল্য | কোনো টিকিট বা ফি লাগে না |
মির্জাপুর ইমামবাড়াটি পাতলা লাল পোড়ামাটির ইট ও চুন-সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি। বাইরে থেকে আয়তাকার কাঠামোর ভেতরে রয়েছে গোলাকার ধাঁচের একটি মূল কক্ষ এবং চারপাশে খিলানযুক্ত স্তম্ভের খোলা বারান্দা। পুরো চত্বরটি নিচু ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং পূর্ব দিকে একটি প্রাচীন প্রবেশ তোরণ রয়েছে। তোরণের ঠিক সামনেই সারিবদ্ধভাবে পাঁচটিসহ বেশ কয়েকটি পুরনো ইট-বাঁধানো কবর চোখে পড়ে—যদিও শিলালিপি না থাকায় কবরগুলো কাদের, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
ইমামবাড়া দেখার মূল আনন্দ পূর্ণ হয় ঠিক পাশের মির্জাপুর শাহী মসজিদ ঘুরে দেখলে। ৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৫ ফুট প্রস্থের তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মুঘল মসজিদটির দেয়ালে খোদাই করা পোড়ামাটির ফুল ও লতাপাতার নকশাগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো মিল নেই। মধ্যবর্তী দরজার ওপরের ফারসি ফলক অনুযায়ী ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মসজিদের চার কোণে রয়েছে চারটি সুচিকন মিনার এবং সামনেই রয়েছে শান্ত একটি প্রাচীন দিঘী।
স্থাপত্যকলায় ‘ইমামবাড়া’ (অর্থ ইমামের বাড়ি) মূলত কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) ও আহলে বাইতের শাহাদাতের স্মরণে নির্মিত শোকসভা ও ধর্মীয় মিলনায়তন—যা ইরান-ইরাকে ‘হোসেনিয়া’ এবং বাংলায় ‘ইমামবাড়া’ বা ‘হোসেনী দালান’ নামে পরিচিত। ১৬৪২ সালে নির্মিত ঢাকার হোসেনী দালানের পর উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদে মির্জাপুরের এই ইমামবাড়াটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।
এটি প্রথাগত জুমা বা পাঞ্জেগানা মসজিদ না হলেও, অতীতে মহররম মাসের প্রথম দশ দিন এবং আশুরার সময় এখানে কোরআন তেলাওয়াত, মিলাদ মাহফিল, ধর্মীয় আলোচনা ও তবারক বিতরণের আয়োজন হতো। মির্জাপুর গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা বংশের পূর্বপুরুষ ফুল মোহাম্মদ ও দোস্ত মোহাম্মদের সময়েই এ এলাকায় ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর গোড়াপত্তন হয় বলে ধারণা করা হয়। কালের বিবর্তনে ও ভূমিকম্পে ইমামবাড়াটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৯৯৬ সালে একবার সংস্কার করা হয়েছিল; বর্তমানে স্থাপনাটি অব্যবহৃত ও কিছুটা জরাজীর্ণ অবস্থায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
ইমামবাড়াটির মূল ভবন অনেক পুরনো এবং ভেতরের পলেস্তারা ও ছাদের কিছু অংশ দুর্বল হওয়ায় ভেতরে ঢোকার সময় সাবধানে পা ফেলুন এবং দেয়াল বা খিলানে ভর দেবেন না। পাশের শাহী মসজিদে নামাজের সময় নীরবতা বজায় রাখুন এবং প্রাচীন কবরগুলোর ওপর দিয়ে হাঁটাচলা করবেন না। বছরের যেকোনো সময় এখানে যাওয়া গেলেও অক্টোবর থেকে মার্চের শুকনো মৌসুমে আবহাওয়া আরামদায়ক থাকে এবং একই যাত্রায় পঞ্চগড়ের অন্যান্য জায়গাও স্বচ্ছন্দে ঘুরে দেখা যায়।
যমুনা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৪১২–৪৩৮ কিলোমিটার। ঢাকার গাবতলী, মাজার রোড, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও আব্দুল্লাহপুর থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, নাবিল পরিবহন ও শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের এসি ও নন-এসি বাস প্রতিদিন চলাচল করে; সময় লাগে সাড়ে ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা। বিআরটিএর সেপ্টেম্বর ২০২৬ তালিকা অনুযায়ী গাবতলী–পঞ্চগড় রুটে নন-এসি বাসের সরকারি ভাড়া ৫১ আসনে ১,০৭৯ টাকা ও ৪০ আসনে ১,৩৭৬ টাকা (কাউন্টারে সাধারণত নন-এসি ১,১০০–১,২০০ টাকা এবং এসি ১,৫০০–২,২০০ টাকা নেওয়া হয়)।
ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে সরাসরি পঞ্চগড় (বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশন) কিংবা আটোয়ারীর কাছাকাছি কিসমত রেলওয়ে স্টেশনে নামতে পারেন। ঢাকা থেকে প্রতিদিন তিনটি আন্তঃনগর ট্রেন চলে—একতা এক্সপ্রেস (৭০৫) সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে রাত ৯টায় পঞ্চগড় পৌঁছায়, দ্রুতযান এক্সপ্রেস (৭৫৭) রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে পৌঁছায় (কিসমত স্টেশনে থামে সকাল ৬টা ৪৯ মিনিটে) এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেস (৭৯৩) রাত ১১টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে পৌঁছায়। ফেরার পথে পঞ্চগড় থেকে দ্রুতযান সকাল ৭টা ২০ মিনিটে, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে এবং একতা রাত ৯টা ১০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ে।
| আসনের শ্রেণি | ঢাকা–পঞ্চগড় আন্তঃনগর ট্রেনের ভাড়া (ভ্যাটসহ) |
| শোভন চেয়ার | ৭৪০ টাকা |
| স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) | ১,৪২১ টাকা |
| এসি সিট | ১,৭০২ টাকা |
| এসি বার্থ | ২,৫৪৮ টাকা |
পঞ্চগড় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল বা ধাক্কামারা মোড় থেকে লোকাল বাস, সিএনজি বা অটোরিকশায় আটোয়ারী উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ১৮–২০ কিলোমিটার। আটোয়ারী বাসস্ট্যান্ড থেকে মির্জাপুর বাজারের দূরত্ব আরও ৬ কিলোমিটার এবং মির্জাপুর বাজার থেকে পূর্ব দিকে ভ্যান বা ইজিবাইকে মাত্র ১ কিলোমিটার এগোলেই মির্জাপুর শাহী মসজিদ ও ইমামবাড়া। এছাড়া পঞ্চগড় শহর থেকে ইজিবাইক বা সিএনজি রিজার্ভ করে সরাসরি এক টানে মির্জাপুর ইমামবাড়া ও বার আউলিয়ার মাজার ঘুরে আসা সবচেয়ে সুবিধাজনক।
সময় লাগবে: 2 days
আটোয়ারীর মির্জাপুর ইমামবাড়া, শাহী মসজিদ ও বার আউলিয়া মাজার:
রাতের দ্রুতযান এক্সপ্রেস বা বাসে ভোরে পঞ্চগড় পৌঁছে নাস্তা সেরে নিন। এরপর সিএনজি বা অটো রিজার্ভ করে আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে গিয়ে এক গম্বুজবিশিষ্ট মির্জাপুর ইমামবাড়া, পাশের ১৬৫৬ সালের মির্জাপুর শাহী মসজিদ এবং কাছের বার আউলিয়ার মাজার ঘুরে দেখুন।
রকস মিউজিয়াম, ভিতরগড় দুর্গনগরী ও মহারাজার দীঘি:
দুপুরে পঞ্চগড় শহরে ফিরে খাবার সেরে সরকারি মহিলা কলেজ চত্বরের রকস মিউজিয়াম দেখুন। বিকেলের আলোতে অমরখানা ইউনিয়নে গিয়ে দেড় হাজার বছরের প্রাচীন ভিতরগড় দুর্গ নগরী এবং ৫৪ একরের বিশাল মহারাজার দীঘির দশটি বাঁধানো ঘাট ঘুরে দেখুন।
তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও সমতলের চা-বাগান:
দ্বিতীয় দিন খুব ভোরে তেঁতুলিয়ায় মহানন্দা নদীর পাড়ে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো চত্বরে যান—অক্টোবর থেকে জানুয়ারির মেঘমুক্ত সকালে এখান থেকে খালি চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। নাস্তার পর রওশনপুরের কাজী এন্ড কাজী টি স্টেট, তেঁতুলিয়ার চা-বাগান ও শীতকালে টিউলিপ বাগান ঘুরে দেখুন।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট দেখে ঢাকায় প্রস্থান:
দুপুরের পর দেশের সর্বউত্তরের শেষ বিন্দু বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট ও চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর ঘুরে বিকেলের মধ্যে পঞ্চগড় শহরে ফিরুন। রাত ৯টা ১০ মিনিটের একতা এক্সপ্রেস ট্রেন বা রাতের বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিন।
আটোয়ারী থেকে ফেরার পথে কিংবা পরদিন সময় থাকলে বোদা উপজেলার ঐতিহাসিক বোদেশ্বরী মন্দির এবং দেবীগঞ্জের গ্রিক স্থাপত্যরীতির গোলকধাম মন্দির দেখে নিতে পারেন। আর পঞ্চগড় সদরে রকস মিউজিয়াম, অমরখানার ভিতরগড় দুর্গ নগরী ও মহা রাজার দীঘি শেষ করে তেঁতুলিয়ায় গেলে পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা, তেতুলিয়া চা বাগান, কাজী এন্ড কাজী টি স্টেট, শীতের টিউলিপ বাগান, তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো এবং বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট সহজেই এক সূত্রে গাঁথা হয়ে যাবে।
মির্জাপুর গ্রাম বা আটোয়ারী উপজেলায় পর্যটকদের রাত থাকার মতো মানসম্মত হোটেল নেই। তাই পঞ্চগড় জেলা শহরে অবস্থান করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক; আর চা-বাগানের পরিবেশে থাকতে চাইলে তেঁতুলিয়ার ডাহুক টি রিসোর্ট বেছে নিতে পারেন। পঞ্চগড়ের পরিচিত কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও সরকারি রেস্ট হাউসের নম্বর নিচে দেওয়া হলো (ভাড়া পরিবর্তনশীল, যাওয়ার আগে ফোনে জেনে নিন):
মির্জাপুর বা আটোয়ারী বাজারে সাধারণ মানের হোটেলে ভাত-মাছ ও চা-নাস্তা পাওয়া যায়। তবে ভালো মানের দুপুর বা রাতের খাবারের জন্য পঞ্চগড় শহরের রেস্তোরাঁগুলো বেছে নিতে পারেন:
মির্জাপুর ইমামবাড়া ও শাহী মসজিদ চত্বর দুটিই শতবর্ষী ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। স্থাপনার দেয়ালে কিছু লেখা, ইট খোলা বা চত্বরে খাবারের উচ্ছিষ্ট ও প্লাস্টিক ফেলা থেকে বিরত থাকুন।
Leave a Comment