অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি
হেমন্ত ও শীতের মৌসুম
- আবহাওয়া শুকনো ও ভ্রমণবান্ধব থাকে
- শালডাঙ্গার গ্রামীণ পথে যাতায়াত সহজ
- ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে কড়া শীতের প্রস্তুতি লাগবে
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ঐতিহাসিক গোলকধাম মন্দির। ছবি: Najmul Huda, উইকিমিডিয়া কমন্স, CC BY-SA 4.0।
উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ নিস্তব্ধতার মাঝে প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্যরীতির ছাপ দেখতে চাইলে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে গোলকধাম মন্দির (Golokdham Temple) ঘুরে আসুন। উনবিংশ শতকে নির্মিত ছয়কোণাকার এই মন্দিরের করিন্থিয়ান কলাম, খিলান আর পাঁচ চূড়ার গাঁথুনি দেখলে প্রথম দেখায় যে কারও চোখ আটকে যাবে।
মন্দিরটি পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার শালডাঙ্গা ইউনিয়নের শালডাঙ্গা (ছত্রশিকারপুর) গ্রামে, উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। এটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। পাশাপাশি স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখনও এখানে পূজা-অর্চনা করেন—তাই ঘোরার সময় ধর্মীয় পবিত্রতা ও প্রত্নস্থলের নিয়ম মেনে চলুন।
| অবস্থান | শালডাঙ্গা গ্রাম, শালডাঙ্গা ইউনিয়ন, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড় (উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিমি উত্তর-পশ্চিমে) |
| জায়গার ধরন | প্রাচীন মন্দির ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন |
| নির্মাণকাল | ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দ (গোলককৃষ্ণ গোস্বামীর স্মৃতিতে নির্মিত) |
| স্থাপত্য রীতি | গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর আদলে ছয়কোণাকার পাঁচ চূড়াবিশিষ্ট মন্দির |
| বর্তমান অবস্থা | প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি; স্থানীয়ভাবে পূজা চালু আছে |
| যাওয়ার উপযুক্ত সময় | দিনের আলোতে, সকাল থেকে বিকেল |
| ঘুরতে সময় রাখুন | প্রায় ৩০ মিনিট–১ ঘণ্টা |
| প্রবেশমূল্য | কোনো টিকিট লাগে না |
দক্ষিণমুখী মন্দিরটি মাটি থেকে বেশ উঁচু তিন স্তরের বৃত্তাকার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রধান প্রবেশদ্বারের সিঁড়ির দুই পাশে রয়েছে দুটি তুলসী মঞ্চ। পুরো ভবনটি ছয়কোণাকার, আর ছয়টি কোণে রয়েছে খিলানাকৃতির ছয়টি প্রবেশদ্বার। প্রতিটি দরজার দুই পাশে দুটি করে গ্রিক ধাঁচের করিন্থিয়ান কলাম এবং প্রতি দুই দরজার মাঝখানে খাঁজকাটা স্তম্ভ দেখা যায়। খিলান ও কলামের ওপরের অংশে ফুল, লতাপাতা, পাখি ও দেবমুখের অলংকরণ রয়েছে, যদিও সময়ের ছাপে অনেক জায়গায় পলেস্তারা খসে ইট বেরিয়ে এসেছে।
প্রধান তলার ওপরে আরও দুটি ধাপের মতো গঠন পেরিয়ে সবচেয়ে ওপরে রয়েছে পাঁচটি চূড়া—মাঝের চূড়াটি সবচেয়ে বড়, চারপাশের চারটি ছোট। প্রতিটি চূড়ার নিচে চারটি করে সরু দরজার নকশা এবং ওপরে কলসাকৃতির গম্বুজ আছে। চূড়ার শীর্ষে ত্রিশূল, সুদর্শন চক্রের মতো গোলাকার পাত এবং শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির প্রতীকী আড়াআড়ি দণ্ড চোখে পড়ে। মূল দরজার ওপরের নামফলকের দুই পাশে রয়েছে হাতির মুখাবয়ব এবং সেখানেই ১৮৪৬ সালের নির্মাণতথ্য উৎকীর্ণ। ভেতরের চারকোণা কক্ষটির ছাদ কাঠের তীর (বীম) দিয়ে তৈরি। গাছপালাঘেরা মন্দিরের সামনের রাস্তার পাশে একটি পুরনো পাতকুয়াও দেখা যায়, যা এখন অব্যবহৃত।
মন্দিরের গায়ে উৎকীর্ণ শিলালিপি অনুযায়ী ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে (উনবিংশ শতকে) এটি নির্মিত হয়। বৈষ্ণব সাধক গোলককৃষ্ণ গোস্বামীর স্মৃতি রক্ষার্থে মন্দিরটি গড়ে তোলা হয়েছিল এবং তাঁর নাম অনুসারেই এর নামকরণ করা হয় ‘গোলকধাম মন্দির’। অনেকের লেখায় ভুলবশত একে অষ্টাদশ শতকের স্থাপনা বলা হলেও ১৮৪৬ সাল মূলত উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়।
এ অঞ্চলের প্রচলিত টেরাকোটা বা চালা-রীতির মন্দিরের চেয়ে গোলকধামের গঠন আলাদা। ইউরোপীয়-গ্রিক করিন্থিয়ান স্তম্ভের সঙ্গে বাংলার পঞ্চরত্ন চূড়ার মেলবন্ধন একে অনন্য করেছে। অতীতে এখানে রাধাকৃষ্ণের পূজা হতো; এখনও স্থানীয় ভক্তদের উদ্যোগে শ্রীকৃষ্ণের পূজা হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকার পর ২০০০ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মন্দিরটিকে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং ভাঙা তুলসী মঞ্চসহ কিছু অংশ মেরামত করে। করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরের কাছে এই শালডাঙ্গা অঞ্চল একসময় বৈষ্ণব ভক্তদের পদচারণায় মুখর ছিল।
মন্দিরটি গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত; আশেপাশে বড় রেস্তোরাঁ বা পর্যটন-সুবিধা নেই, তাই পানির বোতল ও হালকা খাবার সঙ্গে রাখুন। ভেতরে বা চত্বরে ছবি তোলার সময় স্থানীয় পূজারীদের অসুবিধা করবেন না এবং জুতা খুলে মন্দিরের মূল বেদিতে উঠুন। ক্ষয়ে যাওয়া দেয়াল বা কলামে হাত দিয়ে চাপ দেবেন না কিংবা কিছু লিখবেন না। শালডাঙ্গা থেকে ফেরার ভ্যান বা অটো বিকেলের পর কমে যায়, তাই দিনের আলো থাকতেই দেবীগঞ্জ বা বোদায় ফিরে আসার হিসাব রাখুন।
বাসে যাওয়ার উপায়
সড়কপথে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের দূরত্ব যমুনা সেতু হয়ে প্রায় ৪১২–৪৩৮ কিলোমিটার। ঢাকার গাবতলী, মাজার রোড, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও আব্দুল্লাহপুর থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, নাবিল পরিবহন ও শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের এসি ও নন-এসি বাস নিয়মিত পঞ্চগড় যায়; সময় লাগে সাড়ে ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা। বিআরটিএর সেপ্টেম্বর ২০২৬ তালিকায় গাবতলী–পঞ্চগড় রুটে নন-এসি বাসের সরকারি ভাড়া ৫১ আসনে ১,০৭৯ টাকা ও ৪০ আসনে ১,৩৭৬ টাকা; কাউন্টারে সাধারণত নন-এসি ১,১০০–১,২০০ টাকা এবং এসি ১,৫০০–২,২০০ টাকা নেওয়া হয়। কিছু বাস সরাসরি দেবীগঞ্জ হয়ে চলাচল করে; নইলে পঞ্চগড়গামী বাসে ঠাকুরগাঁও পেরিয়ে বোদা বাজারে নেমে যাওয়া সবচেয়ে সহজ।
ট্রেনে যাওয়ার উপায়
ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে পঞ্চগড়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশন পর্যন্ত প্রতিদিন তিনটি আন্তঃনগর ট্রেন চলে—একতা এক্সপ্রেস (৭০৫) সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে রাত ৯টায় পৌঁছায়, দ্রুতযান এক্সপ্রেস (৭৫৭) রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে পৌঁছায় এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেস (৭৯৩) রাত ১১টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে পৌঁছায়। তিনটি ট্রেনই প্রতিদিন চলে, সময় লাগে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা। গোলকধাম মন্দিরের জন্য কিসমত বা ঠাকুরগাঁও রোড স্টেশনে নামলে বোদা হয়ে যাওয়া আরও কাছে পড়ে। ফেরার জন্য পঞ্চগড় থেকে দ্রুতযান সকাল ৭টা ২০ মিনিটে, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে এবং একতা রাত ৯টা ১০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ে। যাত্রার আগে ‘রেল সেবা’ অ্যাপে সময় মিলিয়ে টিকিট কেটে নিন।
| আসনের শ্রেণি | ঢাকা–পঞ্চগড় ট্রেনের ভাড়া (ভ্যাটসহ) |
| শোভন চেয়ার | ৭৪০ টাকা |
| স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) | ১,৪২১ টাকা |
| এসি সিট | ১,৭০২ টাকা |
| এসি বার্থ | ২,৫৪৮ টাকা |
সবচেয়ে সুবিধাজনক পথ হলো বোদা হয়ে যাওয়া। পঞ্চগড় বা ঠাকুরগাঁও থেকে বাসে বোদা বাজারে নেমে লক্ষ্মীরহাট চৌরাস্তায় যান; সেখান থেকে অটোরিকশা বা ভ্যানে উত্তর দিকে শালডাঙ্গা বাজার হয়ে সরাসরি গোলকধাম মন্দিরে যাওয়া যায়। অন্যদিকে দেবীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে যেতে চাইলে আগে বাস বা অটোতে লক্ষ্মীরহাট চৌরাস্তা এবং সেখান থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার উত্তরে শালডাঙ্গা গ্রামে পৌঁছাতে হবে (উপজেলা সদর থেকে মোট দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার)। পঞ্চগড় শহরের ধাক্কামারা বাসস্ট্যান্ড থেকেও বোদা–দেবীগঞ্জগামী বাস ও অটো মেলে।
গ্রামীণ পথে অটো বা ভ্যান রিজার্ভ করলে যাওয়া-আসা ও অপেক্ষার ভাড়া আগেই কথা বলে ঠিক করে নিন। শালডাঙ্গা বাজার থেকে মন্দিরটি একদম কাছে, হেঁটে বা ভ্যানে কয়েক মিনিটেই পৌঁছানো যায়।
রাতের ট্রেন দ্রুতযান বা বাসে এসে সকালে পঞ্চগড় কিংবা বোদা নামুন। সকালের নাস্তা সেরে অটো বা ভ্যানে লক্ষ্মীরহাট হয়ে শালডাঙ্গা গ্রামের পথ ধরুন।
মন্দিরের ছয়কোণাকার গঠন, করিন্থিয়ান কলাম, পাঁচ চূড়া, তুলসী মঞ্চ ও ১৮৪৬ সালের ফলকটি ভালোভাবে দেখুন। ছবি তোলা ও চারপাশ ঘুরে দেখতে ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা রাখুন।
শালডাঙ্গা থেকে ফিরে দেবীগঞ্জের করতোয়া সেতু ও নদীর পাড় ঘুরে দেখুন। হাতে সময় থাকলে পার্শ্ববর্তী বোদা উপজেলার ঐতিহাসিক বদেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির বা মির্জাপুর শাহী মসজিদ একই দিনে দেখে নিতে পারেন।
দেবীগঞ্জ বা বোদা বাজারে দুপুরের খাবার সেরে বিকেলের মধ্যে পঞ্চগড় শহরে ফিরে আসুন। রাত ৯টা ১০ মিনিটের একতা এক্সপ্রেস বা রাতের বাসে ঢাকা ফিরতে পারবেন।
দেবীগঞ্জ ভ্রমণ
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড় ও দেবীগঞ্জ ঘোরার সবচেয়ে ভালো সময়—আকাশ পরিষ্কার থাকে, গ্রামীণ পথও শুকনো থাকে। বর্ষায় চারপাশ সবুজ হলেও কাঁচা ও নিচু রাস্তায় কাদা হতে পারে।
অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি
মার্চ–মে
জুন–সেপ্টেম্বর
শুধু গোলকধাম মন্দির দেখার জন্য ঢাকা থেকে এতটা পথ না এসে পঞ্চগড়ের অন্য প্রত্নস্থলগুলো—যেমন ভিতরগড় দুর্গনগরী, মহারাজার দিঘী, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, বারো আউলিয়ার মাজার ও বদেশ্বরী মন্দির—মিলিয়ে দুই দিনের একটি হেরিটেজ ট্রিপ সাজালে ভ্রমণটা অনেক বেশি সার্থক হবে।
শালডাঙ্গা গ্রামে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং দেবীগঞ্জেও বিকল্প সীমিত। তাই রাতে থাকার জন্য পঞ্চগড় জেলা শহরের আবাসিক হোটেল বা সরকারি রেস্ট হাউসই সবচেয়ে ভালো। নিচে পরিচিত কয়েকটি আবাসনের ধরন ও যোগাযোগের নম্বর দেওয়া হলো (ভাড়া সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, যাওয়ার আগে ফোনে নিশ্চিত হয়ে নিন):
খাওয়া-দাওয়ার জন্য দেবীগঞ্জ বা বোদা বাজারের স্থানীয় হোটেলগুলোতে ভাত, করতোয়া নদীর তাজা মাছ ও দেশি মুরগির ঝোল পাবেন। আর পঞ্চগড় শহরে ফিরে খেলে নিচের জায়গা ও আঞ্চলিক খাবারগুলো চেখে দেখতে পারেন:
মন্দির চত্বরে কোনো ডাস্টবিন না থাকলে খাবারের প্যাকেট বা প্লাস্টিকের বোতল নিজের ব্যাগে ফিরিয়ে আনুন। প্রায় পৌনে দুইশ বছরের পুরনো এই স্থাপত্যটি যেন আমাদের অসচেতনতায় আরও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
Leave a Comment