অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি
শীতকাল
- পরিষ্কার আকাশে তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সম্ভাবনা বেশি
- নদীর পাড়ে হাঁটা ও ছবি তোলার আরামদায়ক আবহাওয়া
- ডিসেম্বর–জানুয়ারিতে কুয়াশা ও তীব্র শীত, গরম কাপড় নিন
ছবি: পঞ্চগড়.ইনফো
পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে তেঁতুলিয়া যাওয়ার পথে পঞ্চগড়–বাংলাবান্ধা মহাসড়কের পাশে, সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে চাওয়াই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে পঞ্চগড় মুক্তাঞ্চল পার্ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পুরো নয় মাস শত্রুমুক্ত থাকা তেঁতুলিয়া “মুক্তাঞ্চল”-এর স্মৃতি এবং পঞ্চগড়ের পাঁচটি ঐতিহাসিক গড়ের ইতিহাসকে ধারণ করে তৈরি এই পার্কটি এখন উত্তরের পর্যটকদের পথের ধারে থামার জনপ্রিয় জায়গা।
চাওয়াই ব্রিজ সংলগ্ন, দশমাইল বাজারের পূর্বে—ঠিক যেখান থেকে একাত্তরের মুক্তাঞ্চল এলাকা শুরু হয়েছিল, সেখানেই পার্কটির অবস্থান। নদীর পাড়ের বাঁধ, বসার জায়গা আর রঙিন “I ♥ PANCHAGARH” স্থাপনা মিলিয়ে তেঁতুলিয়া, কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন বা বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট যাওয়ার পথে আধা ঘণ্টা কাটানোর জন্য জায়গাটি চমৎকার।
| অবস্থান | চাওয়াই ব্রিজ সংলগ্ন, দশমাইল বাজারের পূর্বে, অমরখানা ইউনিয়ন, পঞ্চগড় সদর |
| জায়গার ধরন | মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভিত্তিক নদীতীরের উন্মুক্ত পার্ক |
| উদ্বোধন | ১৩ জুলাই ২০২৩ |
| নির্মাণ | পঞ্চগড় সদর উপজেলা প্রশাসন (জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায়, অমরখানা ও সাতমেরা ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায়) |
| মূল আকর্ষণ | মুক্তাঞ্চল ও পাঁচ গড়ের মানচিত্র, পাঁচ গড়ের নামে পাঁচটি গোলঘর, “I ♥ PANCHAGARH” স্থাপনা, চাওয়াই নদীর বাঁধ |
| পাশের স্থাপনা | চাওয়াই ব্রিজের অপর পাশে “১৯৭১ মুক্তাঞ্চল ফলক” |
| পঞ্চগড় শহর থেকে দূরত্ব | প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে |
| প্রবেশমূল্য ও সময় | নির্ভরযোগ্য সূত্রে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি; দিনের আলোয় ঘোরাই উত্তম |
পার্কের একটি বড় মানচিত্রে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তাঞ্চল এলাকা এবং পঞ্চগড়ের নামের উৎস পাঁচটি গড়—ভিতরগড়, মিরগড়, রাজনগড়, হোসেনগড় ও দেবনগড়—এর অবস্থান চিত্রায়িত করা আছে। পঞ্চগড়ের ইতিহাস এক নজরে বুঝতে এটি দারুণ সহায়ক।
পাঁচটি গড়ের ইতিহাসকে ধারণ করে পার্কে পাঁচটি দৃষ্টিনন্দন গোলঘর বানানো হয়েছে, প্রতিটির নাম একেকটি গড়ের নামে। রোদ বা হালকা বৃষ্টিতে এগুলোতে বসে বিশ্রামও নেওয়া যায়।
পার্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা নুড়িপাথরের বেদির ওপর বসানো বড় অক্ষরের “I ♥ PANCHAGARH” স্থাপনা। পঞ্চগড় ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে প্রায় সব পর্যটকই এখানে ছবি তোলেন।
ভারত থেকে বয়ে আসা আন্তঃসীমান্ত নদী চাওয়াইয়ের কোল ঘেঁষে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত বাঁধ পার্কের সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। বাঁধের পাকা পথে বেঞ্চে বসে নদী আর দুই পাড়ের সবুজ দেখা যায়।
চাওয়াই ব্রিজের অপর পাশে রয়েছে স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ “১৯৭১ মুক্তাঞ্চল ফলক”। পার্ক দেখার সময় হেঁটেই এটি দেখে আসতে পারেন।
মুক্তিযুদ্ধে পঞ্চগড় ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী পঞ্চগড় দখল করলে মুক্তিযোদ্ধারা উত্তরে সরে যান এবং পঞ্চগড়–তেঁতুলিয়া সড়কে চাওয়াই নদীর ওপর অমরখানা সেতু ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেন। ফলে হানাদার বাহিনী পঞ্চগড় সদরের কিছু অংশ ও পুরো তেঁতুলিয়ায় ঢুকতে পারেনি, আর যুদ্ধের পুরো নয় মাস এলাকাটি “মুক্তাঞ্চল” হিসেবে পরিচিত ছিল। সে সময় তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ছিল ৬/ক সাব-সেক্টরের কার্যক্রমের কেন্দ্র; এখানে গড়ে উঠেছিল শরণার্থী অভ্যর্থনা ও মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
সেই স্মৃতি ধরে রাখতে তৎকালীন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসুদুল হকের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে পার্কটি নির্মিত হয় এবং ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আমিরুল ইসলাম এটি উদ্বোধন করেন।
ঢাকা থেকে সড়কপথে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সরাসরি পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া যায়। রেলপথে কমলাপুর থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস পঞ্চগড় পর্যন্ত চলাচল করে। সর্বশেষ সময়সূচী ও ভাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের ই-টিকেটিং সাইট বা বাস কাউন্টার থেকে জেনে নিন।
পঞ্চগড় শহর থেকে তেঁতুলিয়াগামী বাস, সিএনজি বা ইজিবাইকে উঠে অমরখানার চাওয়াই ব্রিজে নামলেই পার্কটি পাবেন; দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। চালককে “চাওয়াই ব্রিজ, মুক্তাঞ্চল পার্ক” বললেই চিনবে।
তেঁতুলিয়া থেকে পঞ্চগড়ের দিকে আসার পথে একই মহাসড়কে চাওয়াই ব্রিজের পাশে পার্কটি পড়ে। রিজার্ভ গাড়ি নিলে চালককে আগেই বলে রাখুন যেন এখানে থামে।
সময় দরকার: 2 days
দুই দিনে পঞ্চগড় মুক্তাঞ্চল পার্কসহ পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়ার প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখতে এই রুট প্ল্যানটি অনুসরণ করতে পারেন।
মির্জাপুর শাহী মসজিদ ও ইমামবাড়া:
ভোরে পঞ্চগড় পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুরে মুঘল আমলের মির্জাপুর শাহী মসজিদ ও ঐতিহাসিক ইমামবাড়া ঘুরে দেখুন।
রকস মিউজিয়াম:
শহরে ফিরে দুপুরের খাবার সেরে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসের রকস মিউজিয়াম (পাথরের জাদুঘর) দেখুন।
ভিতরগড় ও মহারাজার দীঘি:
বিকেলে প্রাচীন ভিতরগড় দুর্গনগরী ও বিশাল মহারাজার দীঘি দেখে রাতে তেঁতুলিয়ায় চলে যান, যাতে ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।
তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ও কাঞ্চনজঙ্ঘা:
ভোরে মহানন্দা নদীর পাড়ে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো চত্বরে যান; আকাশ পরিষ্কার থাকলে উত্তরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।
পঞ্চগড় মুক্তাঞ্চল পার্ক:
নাস্তা সেরে মহাসড়ক ধরে অমরখানার চাওয়াই ব্রিজে এসে মুক্তাঞ্চল পার্ক, পাঁচ গড়ের মানচিত্র, “I ♥ PANCHAGARH” স্থাপনা ও ১৯৭১ মুক্তাঞ্চল ফলক ঘুরে দেখুন।
কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট:
তেঁতুলিয়ার রওশনপুরে সমতলের বিস্তৃত অর্গানিক চা বাগান ঘুরে দেখুন এবং দুপুরের খাবার সেরে নিন।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট:
দেশের সর্বউত্তরের বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট ও স্থলবন্দর এলাকা দেখে সন্ধ্যায় পঞ্চগড় ফিরে রাতের বাস বা ট্রেনে ঢাকায় রওনা দিন।
পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া ভ্রমণ
মুক্তাঞ্চল পার্ক সারা বছরই ঘোরা যায়। তবে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির শুকনো ও পরিষ্কার আবহাওয়ায় একই ট্রিপে তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সম্ভাবনাও থাকে, তাই এ সময়টাই পঞ্চগড় ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি
মার্চ–জুন
জুলাই–সেপ্টেম্বর
নিচের হিসাবটি নির্দেশনামূলক; ভাড়া ও খরচ মৌসুম ও সময়ভেদে পরিবর্তন হয়, তাই যাত্রার আগে বর্তমান দর জেনে নিন:
| খরচের খাত | বিবরণ | আনুমানিক খরচ |
|---|---|---|
| ঢাকা–পঞ্চগড় যাতায়াত | বাস বা ট্রেন (যাওয়া-আসা) | বর্তমান ভাড়া কাউন্টার/রেলওয়ে সাইটে জেনে নিন |
| স্থানীয় যাতায়াত | সিএনজি/ইজিবাইক রিজার্ভ বা লোকাল বাস | দরদাম ও দূরত্ব অনুযায়ী |
| মুক্তাঞ্চল পার্ক | প্রবেশ | নির্দিষ্ট ফির তথ্য পাওয়া যায়নি |
| থাকা | পঞ্চগড় শহর বা তেঁতুলিয়ার হোটেল/রিসোর্ট | মান অনুযায়ী |
| খাওয়া | স্থানীয় হোটেল | খাবারের ধরন অনুযায়ী |
পার্কে বা চাওয়াই ব্রিজ এলাকায় থাকার ব্যবস্থা নেই।
পার্কের পাশে দশমাইল বাজার ও আশপাশে ছোট দোকানে হালকা নাস্তা মেলে; ভারী খাবার পঞ্চগড় শহর বা তেঁতুলিয়া বাজারে সেরে নিন।
মুক্তাঞ্চল পার্ক দেখার পাশাপাশি পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়ার এই দর্শনীয় স্থানগুলো একই ট্রিপে ঘুরে আসতে পারেন।
মহানন্দার পাড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ডাকবাংলো; পরিষ্কার আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়
দূরত্ব প্রায় ২১ কিমি
(মুক্তাঞ্চল পার্ক থেকে আনুমানিক)
তেঁতুলিয়ার রওশনপুরে সমতলের বিস্তৃত অর্গানিক চা বাগান
দূরত্ব প্রায় ১৫–২০ কিমি
(মুক্তাঞ্চল পার্ক থেকে আনুমানিক)
দেশের সর্বউত্তরের সীমান্ত বিন্দু ও স্থলবন্দর
দূরত্ব প্রায় ২৪ কিমি
(মুক্তাঞ্চল পার্ক থেকে আনুমানিক)
পঞ্চগড়ের পাঁচ গড়ের অন্যতম প্রাচীন দুর্গনগরী ও বিশাল দীঘি
দূরত্ব প্রায় ১০ কিমি
(মুক্তাঞ্চল পার্ক থেকে আনুমানিক)
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসে দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর
দূরত্ব প্রায় ১৫ কিমি
(মুক্তাঞ্চল পার্ক থেকে আনুমানিক)
আটোয়ারী উপজেলায় মুঘল আমলের ঐতিহাসিক মসজিদ
দূরত্ব প্রায় ২৫ কিমি
(মুক্তাঞ্চল পার্ক থেকে আনুমানিক)
পঞ্চগড় শহরের কাছে করতোয়ার তীরে জেলা প্রশাসনের ইকোপার্ক
দূরত্ব প্রায় ১৫ কিমি
(মুক্তাঞ্চল পার্ক থেকে আনুমানিক)
পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে, পঞ্চগড়–তেঁতুলিয়া (বাংলাবান্ধা) মহাসড়কের পাশে চাওয়াই নদীর তীরে চাওয়াই ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় পার্কটি অবস্থিত।
২০২৩ সালের ১৩ জুলাই পঞ্চগড় সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আমিরুল ইসলাম পার্কটি উদ্বোধন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অমরখানা সেতু উড়িয়ে দেওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী তেঁতুলিয়া ও সদরের কিছু অংশে ঢুকতে পারেনি; পুরো নয় মাস এলাকাটি মুক্তাঞ্চল ছিল। পার্কটি সেই মুক্তাঞ্চলের সূচনাবিন্দুতে নির্মিত।
মুক্তাঞ্চল ও পাঁচ গড়ের মানচিত্র, পাঁচ গড়ের নামে পাঁচটি গোলঘর, “I ♥ PANCHAGARH” স্থাপনা, চাওয়াই নদীর বাঁধ ও বসার জায়গা এবং পাশেই ১৯৭১ মুক্তাঞ্চল ফলক।
নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পার্কের প্রবেশমূল্যের তথ্য পাওয়া যায়নি। এটি মহাসড়কের পাশের উন্মুক্ত পার্ক; স্থানীয়ভাবে ফি নির্ধারিত হলে সেখানে গিয়ে জেনে নিন।
শহর থেকে তেঁতুলিয়াগামী বাস, সিএনজি বা ইজিবাইকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার গিয়ে অমরখানার চাওয়াই ব্রিজে নামলেই পার্কটি পাবেন।
ইতিহাস আর প্রকৃতিকে এক জায়গায় পেতে চাইলে তেঁতুলিয়ার পথে পঞ্চগড় মুক্তাঞ্চল পার্ক-এ একটু থেমে যান। পঞ্চগড় জেলা সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন পঞ্চগড় জেলা (উইকিপিডিয়া)।
Leave a Comment