অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি
হেমন্ত ও শীতের শুষ্ক মৌসুম
- দীঘির পানি থাকে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও শান্ত
- উঁচু পাড় ও ঘাটগুলো শুকনো থাকায় হাঁটাচলা সহজ
- একই ট্রিপে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও টিউলিপ বাগান দেখার সুযোগ
পঞ্চগড়ের ভিতরগড়ে প্রায় ৫৪ একর আয়তনের ঐতিহাসিক মহারাজার দীঘি। ছবি: Najmul Huda, উইকিমিডিয়া কমন্স, CC BY-SA 4.0।
সমতলের সবুজ চা-বাগান আর সীমান্তঘেঁষা গ্রামীণ নিস্তব্ধতার মাঝখানে হঠাৎ প্রায় ৫৪ একরের এক বিশাল জলরাশির দেখা মেলে—পঞ্চগড়ের মানুষ যাকে চেনে ‘মহারাজার দীঘি’ নামে। চারপাশের ২০ ফুট উঁচু পাড়ে ঘন গাছের ছায়া, নিচে কাঁচের মতো স্বচ্ছ জল আর ইট-বাঁধানো প্রাচীন দশটি ঘাট মিলিয়ে দেড় হাজার বছরের পুরনো এই জলাশয়টি উত্তরের জনপদের এক নীরব ঐতিহাসিক সাক্ষী।
পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫–১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের সোনারবান ও ভিতরগড় মৌজায় দীঘিটির অবস্থান। প্রাচীন ভিতরগড় দুর্গ নগরীর দ্বিতীয় আবেষ্টনীর উত্তর-পূর্বাংশে গড়ে ওঠা এই দীঘিটিই দুর্গনগরীর সবচেয়ে বড় ও অক্ষত নিদর্শন। পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা কিংবা বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট যাওয়ার পথে সামান্য ভেতরে ঢুকলেই এই বিশাল দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আসা যায়।
| অবস্থান | অমরখানা ইউনিয়ন, পঞ্চগড় সদর (জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫–১৬ কিমি উত্তর-পূর্বে) |
| ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | প্রাচীন ভিতরগড় দুর্গনগরীর দ্বিতীয় আবেষ্টনীর প্রধান জলাশয় (আনুমানিক ৬ষ্ঠ–৭ম শতক) |
| পাড়সহ মোট আয়তন | প্রায় ৫৩.৭৯ একর (উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৮০০ গজ, পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৪০০ গজ) |
| পাড়ের উচ্চতা ও গভীরতা | ইট ও মাটির পাড় প্রায় ২০ ফুট উঁচু; পানির গড় গভীরতা প্রায় ৩০–৪০ ফুট |
| ঘাটের সংখ্যা | মোট ১০টি প্রাচীন ইট-বাঁধানো ঘাট (পূর্ব ও পশ্চিমে ৩টি করে, উত্তর ও দক্ষিণে ২টি করে) |
| বিশেষ আয়োজন | প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে দীঘির পাড়ে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা বসে |
| প্রবেশ ও টিকেট | উন্মুক্ত এলাকা, সাধারণ দর্শনার্থীদের কোনো প্রবেশমূল্য লাগে না (মাছ ধরার জন্য আলাদা ইজারা/টিকিট প্রযোজ্য) |
মহারাজার দীঘির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর বিশালত্ব ও সুপরিকল্পিত গঠন। পাড়সহ উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৩৭৬ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৬৯১ মিটার বিস্তৃত এই দীঘির চারপাশ ঘিরে রয়েছে ইট ও মাটির তৈরি প্রায় ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু পাড়। প্রাচীনকালে রাজপ্রাসাদ ও নগরবাসীর ব্যবহারের জন্য এর পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে তিনটি করে এবং উত্তর ও দক্ষিণ পাড়ে দুটি করে মোট ১০টি প্রশস্ত ইটের ঘাট নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে প্রধান প্রবেশপথের দুই পাড়ের সিঁড়ি ও গাছগাছালির নিবিড় ছায়া দীঘির পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে।
এত পুরনো ও বিশাল জলাশয় হওয়া সত্ত্বেও মহারাজার দীঘির পানি আশ্চর্যজনকভাবে স্বচ্ছ এবং এর ভেতরে কচুরিপানা বা সাধারণ জলজ আগাছা দেখা যায় না। শীতে ও হেমন্তে উত্তরের মৃদু বাতাসে যখন পুরো দীঘিজুড়ে ছোট ছোট ঢেউ ওঠে এবং পাড়ের গাছে পাখির ডাক শোনা যায়, তখন সেখানে বসেই ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দেওয়া যায়। এছাড়া প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন (পহেলা বৈশাখ) দীঘির সুউচ্চ পাড়জুড়ে বসে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা, যেখানে পঞ্চগড় ও আশপাশের উপজেলার হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে।
১৮০৯ সালে ব্রিটিশ জরিপবিদ ফ্রান্সিস বুকানন ভিতরগড় ও এই দীঘি জরিপ করেন। স্থানীয় জনশ্রুতি ও ‘কামরূপ বুরুঞ্জি’র বিবরণ অনুযায়ী, প্রাচীন কামরূপের রাজা জল্পেশ্বর বা ‘পৃথু রাজা’ তাঁর রাজধানী ভিতরগড়ে এই বিশাল দীঘি খনন করিয়েছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘মহারাজা’ নামেই পরিচিত ছিলেন এবং দীঘি থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরেই তাঁর রাজপ্রাসাদ ছিল বলে ধারণা করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় আবেষ্টনীর ভেতরে মহারাজার দীঘি ছাওড়াও ফুলপুকুরী, কোদালধোয়া, মলানী ও সিঙ্গারী নামে আরও কয়েকটি প্রাচীন জলাশয় রয়েছে।
জনশ্রুতি আছে, তৎকালীন সময়ে ‘কীচক’ নামের এক বহিরাগত দুর্ধর্ষ জনগোষ্ঠী ভিতরগড় আক্রমণ করলে পৃথু রাজা নিজের ধর্ম ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় পরিবার-পরিজন, ধনরত্ন ও বিশ্বস্ত রক্ষীবাহিনীসহ এই দীঘির গভীর জলে আত্মাহুতি দেন। সেই ঘটনা থেকেই পৃথু রাজার শাসনের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে ২০০৮ সাল থেকে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে দীঘির আশপাশের গড়ের ভেতর থেকে প্রাচীন মন্দির ও স্তূপের ভিত্তি, পোড়ামাটির পাত্র ও পাথরের মূর্তির অংশ উদ্ধার করা হয়, যার নিদর্শন শহরের রকস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
খরা মৌসুমেও মহারাজার দীঘির পানির গভীরতা থাকে ৩০ থেকে ৪০ ফুটের বেশি এবং বর্ষায় তা আরও বাড়ে; তাই সাঁতার না জানলে বা একা ঘাটের পিচ্ছিল সিঁড়ি দিয়ে গভীর পানিতে নামবেন না। দীঘির পাড় প্রায় ২০ ফুট উঁচু ও খাড়া হওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের হাত ধরে ওঠানামা করানো ভালো। অমরখানা ইউনিয়নের এই এলাকাটি ভারতীয় সীমান্তের খুব কাছে—দীঘির উত্তর-পূর্ব দিকের সীমান্ত পিলার বা নো-ম্যানস ল্যান্ডের দিকে যাবেন না এবং বিকেলের আলো থাকতেই অমরখানা বোর্ড বাজারের মূল সড়কে ফিরে আসুন।
যমুনা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৪১২–৪৩৮ কিলোমিটার। ঢাকার গাবতলী, মাজার রোড, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও আব্দুল্লাহপুর থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, নাবিল পরিবহন ও শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের এসি ও নন-এসি বাস নিয়মিত চলাচল করে; পৌঁছাতে সময় লাগে সাড়ে ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা। বিআরটিএর সেপ্টেম্বর ২০২৬ তালিকায় গাবতলী–পঞ্চগড় রুটে নন-এসি বাসের নির্ধারিত ভাড়া ৫১ আসনে ১,০৭৯ টাকা ও ৪০ আসনে ১,৩৭৬ টাকা (কাউন্টারে সাধারণত নন-এসি ১,১০০–১,২০০ টাকা এবং এসি ১,৫০০–২,২০০ টাকা নেওয়া হয়)।
ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে পঞ্চগড়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম স্টেশন পর্যন্ত প্রতিদিন তিনটি আন্তঃনগর ট্রেন চলে—একতা এক্সপ্রেস (৭০৫) সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে রাত ৯টায় পৌঁছায়, দ্রুতযান এক্সপ্রেস (৭৫৭) রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে পৌঁছায় এবং পঞ্চগড় এক্সপ্রেস (৭৯৩) রাত ১১টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে পৌঁছায়। ঢাকায় ফেরার জন্য পঞ্চগড় থেকে দ্রুতযান সকাল ৭টা ২০ মিনিটে, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে এবং একতা রাত ৯টা ১০ মিনিটে ছাড়ে। যাত্রার আগে ‘রেল সেবা’ অ্যাপে সময় ও আসন দেখে টিকিট কেটে নিন।
| আসনের শ্রেণি | ঢাকা–পঞ্চগড় আন্তঃনগর ট্রেনের ভাড়া (ভ্যাটসহ) |
| শোভন চেয়ার | ৭৪০ টাকা |
| স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) | ১,৪২১ টাকা |
| এসি সিট | ১,৭০২ টাকা |
| এসি বার্থ | ২,৫৪৮ টাকা |
পঞ্চগড় শহরের চৌরঙ্গী মোড় বা বাসস্ট্যান্ড থেকে তেঁতুলিয়া–বাংলাবান্ধা মহাসড়ক ধরে উত্তর দিকে প্রায় ১১ কিলোমিটার গেলে অমরখানা ইউনিয়নের বোর্ড বাজার (জগদল বাজারের পর) পড়বে। বোর্ড বাজার থেকে ডান হাতের (পূর্ব দিকের) গ্রামীণ সড়ক ধরে চা-বাগান ও গ্রামের ভেতর দিয়ে আরও প্রায় ৪–৫ কিলোমিটার এগোলেই মহারাজার দীঘি। পঞ্চগড় শহর থেকে অটোরিকশা বা ইজিবাইক রিজার্ভ করে সরাসরি দীঘির পাড়ে যাওয়া সবচেয়ে সহজ; আবার লোকাল বাসে বোর্ড বাজার নেমে সেখান থেকে ভ্যান বা অটোতেও যেতে পারেন।
যাঁরা তেতুলিয়া চা বাগান কিংবা তেঁতুলিয়া ডাক বাংলোর দিকে যাচ্ছেন, তাঁরা অমরখানা বোর্ড বাজারে নেমে ঘণ্টাখানেকের জন্য মহারাজার দীঘি ও ভিতরগড় দেখে আবার একই মহাসড়কে ফিরে তেঁতুলিয়ার পথ ধরতে পারেন।
সময় লাগবে: 2 days
মহারাজার দীঘি ও ভিতরগড় দুর্গনগরী:
সকালে পঞ্চগড় শহরে নেমে নাস্তা সেরে অটোরিকশা নিয়ে অমরখানা হয়ে মহারাজার দীঘিতে যান। দশটি বাঁধানো ঘাট ও ২০ ফুট উঁচু পাড় ধরে হাঁটার পর পাশের ভিতরগড় দুর্গের চার স্তরের প্রাচীর, প্রাচীন মন্দিরের ভিত্তি ও পাথরঘাটার বাঁধ দেখে নিন।
রকস মিউজিয়াম ও আটোয়ারী-বোদা-দেবীগঞ্জের ঐতিহ্য:
দুপুরে শহরে ফিরে সরকারি মহিলা কলেজের রকস মিউজিয়ামে প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহ দেখুন। বিকেলে আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর শাহী মসজিদ ও বার আউলিয়া মাজার ঘুরে আসুন; হাতে সময় থাকলে বোদার বোদেশ্বরী মন্দির বা দেবীগঞ্জের গোলকধাম মন্দিরও যুক্ত করতে পারেন।
তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো, কাঞ্চনজঙ্ঘা ও চা-বাগান:
দ্বিতীয় দিন ভোরে তেঁতুলিয়ায় গিয়ে মহানন্দা নদীর পাড় ও ডাকবাংলো পিকনিক কর্নার থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য উপভোগ করুন (হেমন্ত-শীতে মেঘমুক্ত আকাশে)। এরপর কাজী এন্ড কাজী টি স্টেট, সমতলের চা-বাগান এবং জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে গেলে টিউলিপ বাগান ঘুরে দেখুন।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট ছুঁয়ে ফিরতি যাত্রা:
দুপুরের পর দেশের সর্বউত্তরের সীমান্ত বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট ও স্থলবন্দর ঘুরে বিকেলের মধ্যে পঞ্চগড় শহরে ফিরে আসুন। রাতের একতা এক্সপ্রেস ট্রেন বা দূরপাল্লার বাসে ঢাকার পথ ধরুন।
ঋতুভেদে মহারাজার দীঘি
হেমন্ত ও শীতকালে (অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি) মহারাজার দীঘির শান্ত স্বচ্ছ জল আর শুকনো পাড় ধরে হাঁটা সবচেয়ে আনন্দদায়ক। তবে পহেলা বৈশাখের মেলা দেখতে চাইলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় বেছে নিতে পারেন।
অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি
মার্চ–মে
জুন–সেপ্টেম্বর
পঞ্চগড়ের প্রাচীন ঐতিহ্যের পুরো ছাপ পেতে মহারাজার দীঘির পর আটোয়ারীর মির্জাপুর শাহী মসজিদ ও বার আউলিয়া মাজার, বোদার বোদেশ্বরী মন্দির এবং দেবীগঞ্জের গ্রিক স্থাপত্যরীতির গোলকধাম মন্দির ঘুরে দেখতে পারেন। আর সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্য চাইলে তেঁতুলিয়ার অর্গানিক কাজী এন্ড কাজী টি স্টেট ও শীতের রঙিন টিউলিপ বাগান হাতছাড়া করবেন না।
অমরখানা ইউনিয়ন বা মহারাজার দীঘির আশপাশে রাত কাটানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই ভ্রমণকারীদের পঞ্চগড় জেলা শহরের আবাসিক হোটেলে অথবা তেঁতুলিয়ার ডাহুক টি রিসোর্ট ও ডাকবাংলোয় থাকা সবচেয়ে সুবিধাজনক। নিচে পঞ্চগড়ের পরিচিত কয়েকটি হোটেল ও রেস্ট হাউসের তথ্য দেওয়া হলো (ভাড়া পরিবর্তনশীল, যাওয়ার আগে ফোনে কথা বলে নিন):
দীঘির প্রবেশপথের কাছে ছোট টঙ দোকানে কেবল চা, বিস্কুট ও হালকা নাস্তা মেলে। দুপুর বা রাতের খাবারের জন্য অমরখানা বোর্ড বাজার পেরিয়ে পঞ্চগড় শহরে ফিরে আসাই ভালো:
মহারাজার দীঘির স্বচ্ছ জল ও ছায়াঘেরা পাড়ই এর প্রাণ। ভ্রমণের সময় পাড়ে বা পানিতে পলিথিন, খাবারের মোড়ক ও প্লাস্টিকের বোতল ফেলবেন না—দেড় হাজার বছরের ঐতিহাসিক এই জলাশয়টি যেন পরিচ্ছন্ন থাকে, সেদিকে সচেতন দৃষ্টি রাখুন।
Leave a Comment