dzongu-sikkim-01
dzongu-sikkim-03
০
জন
ধরন বিদেশী দর্শনীয় স্থান
অবস্থান সিকিম
পড়ার সময় ৬ মিনিটস

সিকিম এর রাজধানী গ্যাংটক থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে নর্থ সিকিম (North Sikkim) এ অবস্থিত জোংগু (Dzongu) নামের লেপচা অধ্যুষিত একটি গ্রাম যেখানে আজও বজায় রয়েছে লেপচা-সংস্কৃতির মূল নির্যাস। যাঁরা আসল সিকিমকে চিনতে চান, তাঁরাই খুঁজে পেতে কড়া নাড়েন জোংগুর লেপচা-বাড়ির দরজায়। নিজের মতো করে খুঁজে নেন কুমারী প্রকৃতিকে। সঙ্গে আপসে এসে ধরা দেয় সিকিমের মূল সংস্কৃতি।

আসলে, গ্যাংটক এ সিকিমকে খুঁজে পাওয়া দায়! সেখানে না আছে তেমন ঠান্ডা যা পাহাড়ে যাওয়ার আনন্দ দেয়! না আছে বিশুদ্ধ পাহাড়ি মানুষের সঙ্গ। নানা ভাষাভাষীর ভিড় মিলিয়ে গ্যাংটক আদতে সিকিম এর নানা দিকে ঢোকার দরজা। তারই একটা দিক চলে গিয়েছে জংগুর পথে। যেখানে রয়েছে সিকিমের আসল মজা!

সেই জন্যই জোংগু গ্রামে পৌঁছতে গেলে বিশেষ পারমিট লাগে। কেননা, লেপচারা আজও এই গ্রামে বাঁচিয়ে রেখেছেন নিজেদের সংস্কৃতিকে। সব কিছুর থেকে আলাদা হয়ে রক্ষা করে চলেছেন সিকিম এর আসল চেহারাকে। লেপচারাই তো সিকিম এর মূল অধিবাসী। সেইজন্যই আপনি সিকিম এর যেখানেই যান না কেন, জোংগু না ঘুরলে আসল সিকিম আপনার অধরাই থেকে যাবে।

উদার প্রকৃতি, সাতটি ঝরনা, পবিত্র এক হ্রদ, কাঞ্চনজঙ্ঘার আকাশছোঁওয়া রূপ, অরণ্যের মর্মরগাথা, লেপচাদের হাসিমুখ আর বিশুদ্ধ লেপচা কুইজিন- এই নিয়েই জোংগু। তাই গ্যাংটক পৌঁছে একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন জোংগুর পথে। এসে ডেরা করুন কোনও এক হোম-স্টে। তার পর ঘুরে নিন লিংথেম। লিংথেমের খাড়া পাহাড়ি পথে অনেকটা উঁচুতে উঠে নতুন করে আবিষ্কার করুন কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। সেই সঙ্গে পাখির চোখে দেখে নিন গাছের সবুজ আর জলের নীলে ঘেরা জোংগুকে। ফিরে এসে ধোঁয়া-ওঠা লেপচা খাবারের স্বাদে ডুব দিন! তৃপ্ত হোক শরীর আর মন- দুটোই!

দ্বিতীয় দিনে একটু হাঁটাহাঁটি হলে মন্দ কী! ঢেউয়ে গান গেয়ে চলা দুরন্ত থোলুং চু নদীর উপরে ঝুলন্ত বাঁশের সাঁকো বেয়ে ঘুরে নিন থোলুং মনাস্ট্রি। স্নান সারুন উষ্ণ প্রস্রবণে। পথেই পড়বে লিংজ্যা ঝরনা। তাকেও একটু সময় দিয়ে এগিয়ে চলুন গন্তব্যের দিকে। একদিনে এটুকুই যথেষ্ট- কেন না জোংগু থেকে লিংজ্যা ঝরনা হয়ে থোলুং মঠে পৌঁছতে সময় লাগবে ঘণ্টা পাঁচেক! গাড়ি যাবে না, তাই পা দু’খানিই ভরসা!

তৃতীয় দিনে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে রওনা দিন কেশুয়াংয়ের পথে। ভাবছেন, বড্ড হাঁটাহাঁটি হচ্ছে পাহাড়ি পথে? হলে আপনার লাভই! কেন না, এই পথে আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে এক মনোরম হ্রদ। এতটাই স্বচ্ছ সেই হ্রদের জল যে তলা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। সেই স্বচ্ছতা চোখে ভরে নিয়ে যদি চার দিকে তাকান, দেখবেন ফুলে ফুলে ছাওয়া অরণ্য স্বাগত জানাচ্ছে আপনাকে। একটুও ভয় না পেয়ে চার দিকে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রজাপতি। পায়ের তলাতেও বিছিয়ে রয়েছে ফুলের নরম গালিচা। এরকম অনাবিল সৌন্দর্য সিকিমের ভিড়ে ঠাসা ট্যুরিস্ট স্পটে কোথায়?

চতুর্থ দিনটিতে একটু মনখারাপ হবে বইকি! তখন যে আপনাকে ডাক দিচ্ছে ঘরে ফেরার গান। কম খরচের ঘোরাঘুরিতে বেশি দিন কি আর পাওয়া যায়? তাও কি প্রত্যাশার চেয়ে মাত্র এই কয়েকদিনে প্রাপ্তির ভাঁড়ারটাই বেশি নয় জোংগু সফরে? অতএব, আবার সেই পুরনো পথ- জোংগু থেকে গ্যাংটক, গ্যাংটক থেকে নিউ জলপাইগুড়ি, সেখান থেকে নিজের বাড়ি! সব মিলিয়ে হাজার ছয়েকেই সারা বছরের ক্লান্তি থেকে মুক্তি!

দর্শনীয় স্থান ও এক্টিভিটি

  • কাঞ্চেনজঙ্গার দৃশ্য: জংগু থেকে কাঞ্চেনজঙ্গার অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়, যা আপনার সফরকে আরো বিশেষ করে তুলবে।
  • তিস্তা নদী ও ঝুলন্ত সেতু: তিস্তা নদীর উপর তৈরি ঝুলন্ত সেতু পার করে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়া একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা।
  • হটস্প্রিং: লিংডেম গ্রামের হটস্প্রিং-এ স্নান করে শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে পারেন।
  • গ্রাম পরিদর্শন: পাসিংডং থেকে লিংথেম এবং টিংভং থেকে কুসং গ্রামের মাঝে হাঁটা পথে গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
  • লিংথেম মনাস্ট্রি: লিংথেম গ্রামে অবস্থিত এই মনাস্ট্রিটি প্রাচীন এবং এর স্থাপত্য ও ধর্মীয় গুরুত্ব অসাধারণ। এখানে গিয়ে আপনি শান্ত পরিবেশে প্রার্থনা করতে পারেন এবং বুদ্ধমূর্তির সামনে সময় কাটাতে পারেন। মনাস্ট্রির ভেতরের দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে প্রাকৃতিক রং, যা স্থানীয় ভাবে তৈরি করা হয়।
  • ম্যানটাম লেক: ২০১৬ সালের ভূমিধসের ফলে তৈরি এই লেকটি প্রকৃতির এক অপূর্ব নিদর্শন। শীতে লেকটি শুকিয়ে যায়, কিন্তু গ্রীষ্মকালে এটি পূর্ণ জলাধারে পরিণত হয়। এখানে আপনি নৌকা ভ্রমণ করতে পারেন অথবা শীতল জলে ডুব দিতে পারেন।

জোংগু যেতে পারমিট লাগে?

হ্যাঁ, জোংগু যেতে চাইলে আলাদা পারমিট লাগে যা আপনি গ্যাংটক অথবা মাঙ্গান থেকে কালেক্ট করতে পারতে পারবেন। এই পারমিটের জন্যে আপনার পাসপোর্ট ও ভিসার ফটোকপি এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগবে। আপনি চাইলে এই অনুমতি আপনার হোম স্টে এর মালিকও ম্যানেজ করে দিতে পারবেন।

জোংগু কিভাবে যাবেন

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে একটা গাড়ি রিজার্ভ করে সরাসরি চলে যেতে পারেন জোংগু। সময় লাগবে প্রায় ৬ ঘন্টার মত এবং ভাড়া পড়বে প্রায়৬০০০ রুপীর মত। এছাড়া শিলিগুড়ি থেকে জীপে গ্যাংটক। এরপর গ্যাংটকের বজ্র স্ট্যান্ড থেকেও শেয়ারের গাড়িতে যেতে পারেন জোংগু।

এছাড়া শেয়ারড জীপে বা বাসে Singtam. এখান থেকে মাঙ্গান বাজার এর শেয়ারড জীপ পাবেন, তবে অবশ্যই দুপুর ২টার আগে মাঙ্গান বাজার পৌঁছাতে হবে। আপনার হোম স্টের লোককে বলে দিবেন তাঁরা যেন পারমিট ম্যানেজ করে মাঙ্গান বাজারে আপনার জন্যে অপেক্ষা করে। মাঙ্গান বাজার থেকে শেয়ারড জীপে অথবা হোম স্টের গাড়িতে জোংগু যেতে পারবেন। এভাবে গেলে সব মিলিয়ে আপনার খরচ পড়বে ৩৫০-৪০০ রুপীর মত কিন্তু সময় এক্ষেত্রে একটু বেশী লাগবে। প্রায় ৮ ঘন্টার মত সময় লাগবে জোংগু পৌঁছাতে।

কোথায় থাকবেন

জোংগু এর লেপচা গ্রামে থাকার ব্যবস্থা বলতে হোম স্টে। মায়াল ল্যাং, Dzongu Lee, Lingthem Lyang, Rumlyang, Royal Dzongu হোম স্টে। যেটা পছন্দ, সেটা বেছে নিন।

কি খাবেন

আমাদের মতোই ভাত লেপচাদেরও প্রধান খাবার। সঙ্গে থাকবে জোংগু গ্রামের টাটকা সবজি। শুধু একটা ব্যাপার খেয়াল না রাখলেই নয়। লেপচারা খাবারে খুব কম তেল দেয়। তাই লেপচাদের বেশির ভাগ রান্নাই হয় সেদ্ধ, নয় তো ঝলসানো! কিন্তু, অতীব সুস্বাদুও! তাছাড়া, জোংগুতে যাওয়াই তো মূল সিকিমকে চিনে নেওয়ার জন্য! খাবারে তার ছোঁওয়া থাকলে তাই চিন্তা কী!

কেন জংগুতে যাবেন?

জংগুর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, পাহাড়, জঙ্গল, এবং নদীর ধারে থাকা হটস্প্রিং সবই মিলে এক অদ্ভুত শান্তির অনুভূতি প্রদান করে। এখানে থাকার সময়, আপনি দেখতে পাবেন টিংভং, লিংথেম, হি গ্যাথাং-এর মতো ঐতিহ্যবাহী গ্রামগুলো। এছাড়াও, আপনি উপভোগ করতে পারবেন স্থানীয় খানা-পিনার স্বাদ এবং লেপচাদের সংস্কৃতি।

ভ্রমণ পরিকল্পনা

জংগুতে ৩-৭ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যেতে পারে। প্রথম দিন গ্রামে পৌঁছে লিংথেম মনাস্ট্রি পরিদর্শন করতে পারেন। দ্বিতীয় দিনে লিংডেম হটস্প্রিং ও ম্যানটাম লেক দেখতে যান। তৃতীয় দিনে টিংভং গ্রামে ঘুরে আসুন। আর দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য কুশং ভ্যালি ও লেকের ট্রেকিং উপভোগ করুন।

গন্তব্য

Upper Dzongu Forest Block, Sikkim, India

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন

ADAR BEPARI / TRAVEL WEAR

ভ্রমণের গল্প থাকুক পোশাকেও।

সব টি-শার্ট দেখুন