তাকদা – কিছু পাওয়া না পাওয়ার গল্প

যুক্ত করা হয়েছে

দার্জিলিং এর পালা মিটিয়ে আমরা চলেছি তাকদার দিকে। সকাল থেকেই আকাশ মুখ ভার করে বসে আছে। কিসের অভিমান, জানি না। তাতে আমাদেরও মুখ কালো আর দু-ভুরুর মাঝের অংশ কুঁচকে উঠছে। প্রধান বাবু নিজেই গাড়ি ঠিক করে পাঠিয়েছেন। তাই হোম-স্টে চিনতে অন্তত অসুবিধা হবে না। ড্রাইভারের কাছে ওদিককার যা খবর পেলাম তাতেও হতাশা ছাড়া আর কিছুই নেই।

গত কয়েক দিন ধরেই নাকি তাকদাতে মাঝে মঝেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামছে। কি করতে যে তাকদাতে ঘোরার প্ল্যান করেছিলাম, সবাইকে তার জবাবদিহি করতে হচ্ছে আমাকেই। তবে তিন চার মাস আগের থেকে আবহাওয়ার হাল-হকিকত কি বুঝে ওঠা যায়, সেটা কে বোঝাবে। যাই হোক মুখগোমড়া করেই গাড়িতে বসে আছি আমরা সবাই।

ম্যালের কাছের হোটেল থেকে বেরিয়ে হিল কার্ট রোড ধরে আমরা একে একে পার করে চলেছি বাতাসিয়া লুপ, ঘুম স্টেশন। দার্জিলিং থেকে তাকদা (Tukdah) এর দূরত্ব পঁচিশ কিলোমিটারের কাছাকাছি। দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম ঋষি রোড। এপথে প্রায় কিলোমিটার দশেক আসার পর ডানদিকে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলেন ড্রাইভার-দা। এতোক্ষন রাস্তা বেশ ভালোই ছিলো। এবার এবড়ো-খেবড়ো রাস্তার শুরু।

জঙ্গলের শুরু হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। যতোই সামনে এগাচ্ছি রাস্তা যেমন খারাপ হচ্ছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জঙ্গলের ঘনত্ব। রাস্তার দুপাশে আকাশ চুম্বি ঘন পাইন বন। আর নানা প্রজাতির ফার্নের যেন মেলা বসেছে। সকাল থেকেই মেঘ আর কুয়াশা হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সূর্যি মামার দেখা নেই। তবে তিনি উদয় হলেও এ জঙ্গলে তার দেখা মেলা ভার হতো বলেই মনে হয়।

মাঝে দুচারটে লোকের দেখা পাওয়া গেছে যারা রাস্তা মেরামতির কাজে লেগে আছে। তা বাদে এ রাস্তা জনমানব শূন্য। রাস্তার হালে দুলকি নাচনের ঠেলায় সবারই অবস্থা ঢিলে হওয়ার যোগাড়। জিটিএ অর্ন্তগত সব রাস্তার হালই নাকি এমন। কেন যে মাত্র পঁচিশ কিলোমিটার যেতে দেড় ঘন্টা সময় লাগবে বলে গুগুল মামা জানান দিচ্ছিলো তা বোঝাই যাচ্ছে।

আমাদের অসন্তুষ্ট মুখগুলো দেখে ড্রাইভারদা বললো “আপনারা যাচ্ছেন কুয়াশা দেখতে আর কুয়াশা হচ্ছে বলে রেগে যাচ্ছেন”। তার মানে? জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, “লেপচা ভাষায় কুয়াশাকে আমরা বলি তাকদা”। এটাতো জানা ছিলো না। তবে তো আমাদের রাগ অমূলক। রাস্তার দুই পাশে সাদা, গোলাপি, নীল, হলুদ রঙের ধুতরো ফুলের সারির মাঝ দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। আর সাদা সাদা তুলোর মতো মেঘ আর কুয়াশা উড়ে এসে আমাদেরকে জড়িয়ে ধরছে।

প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ দুলকি নাচন শেষে আমরা তাকদা ঢুকলাম। এক একটা ব্রিটিশ আমলের বাংলোকে পিছনে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। হাতের ডানদিকে তাকদা অর্কিড সেন্টারটাও চলে গেলো। আশেপাশে নানা রঙের টিনের চালের বাড়ি মাঝ দিয়ে আমরা তাকদা বাজারে এসে পড়লাম। রাস্তা এখানে খুবই সরু। তার উপর সেদিন আবার হাট বার। তার মধ্যদিয়ে ড্রাইভারদা খুব দক্ষ হাতে বাজারটাকে পার করালেন।

ইতিমধ্যে আমরা এসে পৌছালাম সরন প্রধানের “প্রধান হোমস্টে”-র সামনে। এতোক্ষনের কুয়াশা এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টির রূপ নিয়েছে। পাথুরে রাস্তা ভিজে বেশ পিচ্ছিল। গাড়ির আওয়াজ পেতেই একটা বড় ছাতা হাতে ছুঁটে এলেন প্রধান সাহেব। মুখে অমায়িক হাসি। বাচ্চা আর মহিলাদের তাড়াতাড়ি নিয়ে গেলেন বাড়ির ভিতর। তার পর একে একে লাগেজ আর আমাকে ও কাকুকে।

তাকদা হোমস্টে
তাকদা হোমস্টে

রাস্তা থেকে প্রায় খান তিরিশেক পাথুরে সিঁড়ি নেমে পৌছালাম তার ঘরে। বসার ঘরটি সুন্দর করে সাজানো। মেয়েতো এসেই পেল্লায় সাইজের একটা টেডিকে নিজের কব্জায় নিয়ে নিয়েছে। একে একে পরিচয় পর্বের পালা মিটলো। ভাবীজী, মানে মিসেস তিলোত্তমা প্রধানও অমায়িক। ভদ্রমহিলার মুখে সব সময় একটা মিষ্টি হাসি লেগেই আছে। ওনাদের দুই স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া মেয়ে মাহেশ্বরী ও মাহিমাও মায়ের মতোই হাসিখুসি ও মিশুকে।

মিসেস প্রধান আমাদের মেয়ের জন্য স্পেশাল খাবার দাবারের রেসিপি জেনে নিলেন। চা পর্বের পর আমাদেরকে নিয়ে প্রধান মশাই গেলেন পাশের কটেজে। ছবির মতো সুন্দর কটেজ। দুটো রুমে আমাদের একদিনের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামনে বারান্দা আর রুম সংলগ্ন বাথরুমও আছে। সামনে আছে নান রঙের ফুলের বাহার। আহা! আর কি চাই। যদিও দেখতে পাওয়া যাচ্ছেনা, তবু পাশেই একটা ঝরণার জল পড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে।

গরম জলে সবার স্নান সারা শেষ। এর মধ্যেই দু-তিন বার লাঞ্চের জন্য ডেকে গেছেন প্রধান সাহেব। আমরা তাই আর দেরী না করে চলে এলাম মেন বিল্ডিং-এ। এখানে বসার ঘর, খাবার জায়গা, রান্না ঘর, আর নিজেদের থাকার দুটি ঘর আছে। তার মধ্যে একটি বড় সাইজের ঘর তিনি বয়স্ক গেস্টদের তিনি দিয়ে থাকেন বলে জানালেন।

দুপুরের খাদ্য তালিকায় আজ আছে ভাত, রাজমা ডাল, ঝিরিঝিরি আলুভাজা, সব্জি, মাছের ঝোল, চাটনি, পাঁপড় আর মিষ্টি। আর আমার মেয়ের জন্য ঝাল ছাড়া খিচুড়ি। ওহো.. একটা আইটেম বলতেই ভুলে গেছি। করলা ফ্রাই। আমার অভক্তির একটা পদকে ভাবীজী তার হাতের গুনে অসামান্য করে তুলেছেন। ব্যাসন, তিল সহযোগে মুচমুচে কুড়মুড়ে তেতো বিহীন করলা ভাজাই আমার পেটের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জায়গা দখল করে নিলো।

রান্নার উপকরণের বেশীর ভাগই নিজস্ব বাগান থেকে সরাসরি রান্নাঘরে তুলে এনেছেন ভাবীজী। বলা বাহুল্য তা ভেজাল ও সার বিহীন। ধোঁওয়া ওঠা খাবার সব পেট-পুরে খেলাম আমরা। বোধহয় অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশীই। কিন্তু আমাদের খাইয়ে প্রধান দম্পতি ঠিক আনন্দ পেলেন না। বারবার বললেন, এই সব খাবার আপনাদের জন্যই বানানো। আপনারাতো কিছুই খেলেন না।

ওনাকে আশ্বস্ত করা হলো যে আমাদের খাবার পরিমান এমনই। সঞ্চারী ও কাকীমা বসে গেলো করলার রেসিপি জানার জন্য। বাচ্চারা টিভি দেখতে ব্যস্ত। আর আমি আর কাকু প্রধান সাহেবের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে লাগলাম। তিনি জানালেন, তার এই বাংলোটিও আগে ব্রিটিশের ছিলো। পরে অনেকগুলো হাত ঘুরে তার কাছে এসেছে। নতুন কটেজটি বছর কয়েক আগে তিনি বানিয়েছেন হোমস্টে বানাবেন বলে।

This slideshow requires JavaScript.

আড্ডাতে এসে বাকীরাও যোগ দিলো। বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। আশেপাশের দর্শনীয় স্থান নিয়ে আলোচনা চলছে। চা বাগান, অর্কিড সেন্টার, তাকদা ক্লাব, ব্রিটিশ বাংলো, বাঙ্কার, মন্সস্ট্রি দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করলাম আমরা। প্রধান সাহেব গাড়ি বললে রাখলেন। সব ঠিক করা আছে, শুধু বৃষ্টি থামার অপেক্ষা। তবে বাইরে যা অবস্থা দেখলাম তা খুব একটা সুবিধার মনে হলো না। ঘরে বসেই থাকতে হবে মনে হচ্ছে।

ঘন্টা তিনেক এক নাগাড়ে পড়ার পরে বৃষ্টি একটু ধরেছে। এদিকে ঘড়ি দেখাচ্ছে প্রায় পাঁচটা বাজে। অতএব এখন আর কোথাও যাওয়া যাবে না। কিন্তু এভাবে কিছুতেই বসে থাকবো না ঠিক করলাম। বেশীর ভাগ সদস্যই ভাত ঘুমে ঢুলছে। তাই আমি আর সঞ্চারী মেয়েকে নিয়ে ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়লাম তাকদা গ্রামটাকে ঘুরে দেখতে। গাইড হলেন প্রধান বাবু নিজেই। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয় মোটেই। কিছুদূর যেতে না যেতেই আবার বৃষ্টি শুরু।

পাথুরে পিচ্ছিল পথ, অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ, আর মাথার উপর অবিরাম বারিধারা আমাদের পদব্রজে ভ্রমণেও বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। বাধ্য হয়েই তাকদা স্কুল চত্বরে কিছুক্ষন কাটিয়ে ঘরে ফিরে এলাম আমরা। আগেই ভিজে জামাকাপড়ে লাগেজ ভর্তি ছিল। তার উপর এখন আবার ভিজেছি। সুতরাং শুকনো জামাকাপড়ে টান পড়েছে। বিশেষ করে পুঁচকেটার। ইস্ত্রি করার জন্য আয়রন চাইতে প্রধান সাহেব ছুঁটলেন তার গ্রামের বাড়ি। বৃষ্টি মাথায় প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকে এনে দিলেন হাসিমুখে।

এই আবহাওয়ায় এক দল শুধু ঘুমিয়েই যাচ্ছে। সন্ধ্যে নেমেছে তাকদাতে। দূরের পাহাড় গুলোতে আলোগুলো তারার মতো জ্বলছে। যেন আকাশটাই মাটিতে নেমে এসেছে। এর মধ্যেই চা আর চিকেন পকোড়া সহ হাজির প্রধান দম্পতি। “আরে, এগুলো আবার বয়ে আনলেন কেন? আমরাই যেতাম ওখানে”। তার উত্তরে স্মিত হাসি হেসে বললেন “আপনারা আমাদের গেষ্ট। বৃষ্টিতে কোথায় দৌড়াবেন”।

আমাদের সাথে ওনারাও বসলেন চা খেতে। গল্প জমলো বেশ। রাতের খাবার তৈরি করতে ওনাদের উঠতে হলো। সেই সুযোগে আমি আর সঞ্চারী পিছু নিলাম ওনাদের। পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে ওনাদের দুই মেয়ে মাকে রান্নায় সাহায্য করছে। আর আমরা প্রধান বাবুর সাথে ড্রইং রুমে গল্প জমালাম। গল্পের ছলেই ওনার এক অদ্ভুত সখের কথা জানলাম।

প্রধান সাহেব নিজের হাতে খুব ভালো ফ্রুটজুস বানান। লোকাল মার্কেটে ভালো ফল পাওয়া না গেলে তিনি শিলিগুড়ি পর্যন্ত ছোটেন প্রয়োজনীয় উপাদান জোগাড়ের জন্য। তার পর তা ঝাড়াই বাছাই করে হাওয়াতে শুকিয়ে নানা জিনিসের সহযোগে তিনি সেটা বানান এবং জমিয়ে রাখেন। মাঝে মাঝে নিজেরা পান করেন আর গেষ্টদের অফার করেন। বলাবাহুল্য আমারাও তার রসাস্বাদনে বঞ্চিত হলাম না। আহা.. অপূর্ব কি অপূর্ব স্বাদ।

ইতিমধ্যে রাতের খাবার রেডি। দুপুরে আমাদের খাওয়ার দৌড় দেখে ওনারা নিজে থেকেই দুজনের খাবার কম বানিয়েছেন। তাতেও খাবার অতিরিক্ত। রাতের মেনু ভাত, ডাল, সব্জি, পটল ভাজা, বেগুন ভাজা, চিকেন কারি, পাঁপড় আর চাটনি। প্রতিটি রান্নাই এক কথায় অসাধারণ। মিসেস প্রধানের হাতে জাদু আছে। আবারো তুলনামূলক ভাবে বেশী খেয়ে ফেললাম সবাই। তবুও খাইয়ে ওনাদের মন ভরলো না।

আরো কিছুক্ষন গল্পশেষে শুভরাত্রি জানিয়ে যে যার নিজের ঘরে শুতে চলে গেলো। মেয়েটা সারাদিনের লাফালাফি শেষে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাইরে হালকা বৃষ্টি, পাশে ঝরনার শব্দ আর দূরের পাহাড়ে আলোর চকমকি একটা রোমান্টিক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। বারান্দায় দুটো চেয়ারে যে কতোক্ষন বসে ছিলাম তা ঠিক মনে নেই। সম্বিত ফিরতে দেখি ঠান্ডায় গায়ে বেশ কাঁটা দিচ্ছে। তাই আর দেরী না করে কম্বলের নীচে আশ্রয় নিতে হলো।

এক কাতেই সকাল। গতকাল রাতেই ঠিক ছিলো সকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে না-দেখা স্থান গুলো ঘুরে দেখবো। সেইমতো গাড়িও বলা। কিন্তু আবহাওয়ার অবস্থা তথৈবচ। তাই আর কিছু দেখার অবকাশ নেই। সকাল বেলাতেই চা-বিস্কুট নিয়ে হাজির প্রধান বাবু। আবহাওয়া খারাপ হওয়াতে ওনার আমদের যেমন মন খারাপ তেমনি আমাদের কিছু নাদেখাতে পেরে উনিও সমান ভাবে হতাশ। বারবার বলছিলেন দুদিন আগেও কতো ভালো ছিলো আবহাওয়া।

বারান্দায় রোদ্দুর নেই, আছে শুধুই কুয়াশা..

গরম গরম ভেজ মোমো সহযোগে প্রাতরাশ সারা শেষ। আজকের শেফ ভাবীজী নন ওনাদের বড় মেয়ে। মায়ের মতো মেয়ের হাতেও সেই একই জাদু। আর এবারও সেই একই ব্যাপার। প্রচুর মোমো বেশী। তবে এবার ভাবীজী নাছোড়, সব খেতেই হবে। খাওয়ার আর জায়গা নেই বলাতে প্যাক করে দিলেন রাস্তায় খাওয়ার জন্য। আজ যে আমাদের চলে যাওয়ার পালা।

লাগেজ গোছানো আগেই হয়ে গেছিলো। যথা সময়ে গাড়ীও এসে হাজির। প্রধান মশাই সবাইকে ডাকলেন ড্রইং রুমে আসার জন্য। বললেন একটা ছোট্ট সন্মাণ সূচক অনুষ্ঠান আছে। যদিও এটা মূলত তিব্বতিরা করে থাকেন। গোর্খা হওয়া সত্ত্বেও তারাও এটা করেন যেসব গেষ্টদের তাদের পছন্দ হয় তাদের জন্য। “খাদা” অনুষ্ঠানে একটা রেশমি উত্তরীয় সবার গলায় পরিয়ে দেন তারা। ভাবতে ভালো লাগছে তিনি আমাদেরকেও সেই সন্মান পাওয়ার যোগ্য ভেবেছেন বলে।

“খাদা”.. সন্মান জানানোর অনুষ্ঠান..

ওনাদের জন্য আমার শাশুড়ি মা (যিনি গত বছর ওনাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন) পাঠিয়েছিলেন নিজের হাতে তৈরি নারকেল নাড়ু। সেটা পেয়ে বারবার ধন্যবাদ জানালেন। আর রিটার্ন গিফট হিসাবে দিলেন তাকদার স্পেশাল চা এর প্যাকেট। তার সাথে ভাবীজীর হাতে বানানো স্পেশাল আচারের ডিব্বা।

বেরাবার আগে ওনাদের “গেষ্ট জবানবন্দির খাতায়” একপ্রস্থ ভালোলাগার কথা লিখে বিদায় নিলাম। সকলকে প্রণাম, ভালোবাসা জানিয়ে আমরা এগালাম গাড়ির দিকে। প্রধান মশাই আর ভাবীজী গাড়িতে তুলে দিয়ে গেলেন। সবাই খুব ভালো থাকবেন। সকলকে টাটা। এবার আমাদের গন্তব্য কালিম্পং। কবির কাছ থেকে ধার করে বলতে ইচ্ছে করছিলো..

আবার আসিবো ফিরে,
প্রধান মশাই-এর নীড়ে,
এই তাকদায়..
হয়তো মে-জুনে নয়
হয়তো এপ্রিল বা ডিসেম্বরের শেষে..

প্রথমেই বলেছিলাম এ গল্প পাওয়া না পাওয়ার। কি ঠিক বলিনি? কিছুই তো দেখতে পাইনি বৃষ্টিতে। তবে পেয়েছি তার থেকে অনেক বেশী। কি কি পেয়েছি? পেয়েছি কিছু অসম্ভব ভালো মানুষের সান্নিধ্য। পেয়েছি ছবির মতো কটেজে রাত্রিযাপনের সু্যোগ। পেয়েছি জিভে জল আনা নানা স্বাদের খাবার। পেয়েছি নানা রঙিন জলের স্বাদ। পেয়েছি একজন অসমবয়সী ভালো বন্ধু। পেয়েছি প্রাণখুলে গল্প করার সাথী। পেয়েছি এমন আরো অনেক কিছুই যা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

ফেরার সময়ও নিস্তার নেই বৃষ্টির থেকে

বৃটিশ কলোনীর ইতিহাসের সাক্ষী হতে আসতেই পারেন তাকদাতে। তাকদা মন্সট্রি, অর্কিড সেন্টার, আর সুন্দর কয়েকটি চা বাগানও ঘুরে দেখতে পারেন পায়ে পায়ে। আর তাকদাকে কেন্দ্র করে ঘুরে দেখতে পারেন মংপু, তিনচুলে, লামাহাটা, রিশপ, লাভা, পেডং, সিলারিগাঁও, কালিম্পং, ত্রিবেনী ও ছোট মঙয়ার মতো জায়গাগুলো। রোজকার শহুরে ব্যস্ত জীবনের থেকে দু-দিন যারা একটু শান্তিতে, নিরিবিলিতে কাটাতে চান তাদের জন্য অন্যতম সেরা ঠিকানা হতেই পারে তাকদা।

কিভাবে যাবেন

এবার আসার রাস্তা বাতলানোর পালা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে তাকদার দূরত্ব মোটামুটি নব্বুই কিমি। কালিম্পং থেকে তেত্রিশ কিমি এবং দার্জিলিং থেকে তিরিশ কিমির কাছাকাছি। সব জায়গা থেকেই গাড়ি ভাড়া করে সহজেই আসা যায়। এক ত্রিশ নং জাতীয় সড়ক ধরে আসলে, রম্ভি হয়ে তিস্তা ভ্যালি এবং রংলি রংলিওট চা-বাগান পার করে তাকদায় ঢোকা যায়। কার্শিয়াং হতে জোড়বাংলো হয়েও তাকদা পৌঁছনো যায় খুব সহজেই।

থাকবার ঠিকানা

প্রধান হোমস্টে
শরণ প্রধান – 9593640577
থাকার খরচঃ ১৫০০/- প্রতিদিন (২+১)
খাওয়ার খরচঃ ৬০০/- প্রতিদিন জনপ্রতি

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।