রিশপ

জন
৬ মিনিটস
জন

প্রায় সাড়ে আট হাজার ফুট উচ্চতায় লেপচা অধ্যুষিত গ্রাম রিশপ (Rishyap) যা লাভা থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত৷ পাহাড়ের ধাপে ধাপে নানা রকমের ফুলে ঢাকা ছোট্ট সাজানো গ্রাম রিশপ। রিশপ নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ১১০ কিলোমিটার এবং কালিম্পং থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে ৮২৫০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। রিশপ শব্দের অর্থ ‘পাহাড়ের মাথায় একলা গাছে’। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চাষের জমি দেখতে অপূর্ব লাগে। রিশপকে ঘিরে রয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাব্রু, সিনিয়ালচু, পান্ডিম—সহ নানান শৃঙ্গ। সারা রিশপে সবসময় অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। জঙ্গলের মধ্যে ট্রেক করে যেতে পারেন দেড় কিলোমিটার দূরের টিফিনদাঁড়া ভিউপয়েন্ট। সান্দাকফুর পর রিশপের টিফিনদাঁড়া হল পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে সূর্যোদয়, সূর্যান্ত দেখার অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। পাখি দেখা-পাখির ছবি তোলার জন্য অন্যতম সেরা গন্তব্য হল রিশপ। গোটা গ্রাম ঘুড়ে বেরালেই চোখে পড়বে জার্ক সাইডেড ফ্ল্যাই ক্যাচার, ভার্ডিটার ফ্ল্যাইক্যাচার, গ্রিন ব্যাকেট টিট, রুফাস সিবিয়া প্রভৃতি নানা চেনা-অচেনা পাখি। নেওড়াভ্যালি জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন এই গ্রামের চারিদিকে জঙ্গল। মাঝেমধ্যেই সবুজ উপত্যকায় এসে আটকে পড়ে মেঘ৷ তখন গোটা উপত্যকা জুড়ে চলে মেঘ-রোদ্দুরের খেলা।

রিশপ এর রাস্তা এখনও কাঁচা। এখানে থাকার মধ্যে একটা মধ্যযুগীয় অনুভূতির মজা আছে। রিশপ যেহেতু ছোট একটা গ্রাম, তাই লাভার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল জায়গাটা। বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহও এখানকার অন্যতম প্রধান সমস্যা। জলের সঙ্কটেও ভোগেন স্থানীয়েরা। কাজেই পর্যটকদের বার বার করে বলে দেওয়া হয়, এখানে গিয়ে জলের অপচয় না করতে।

জায়গাটার মজা হল, কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়াও ভারত আর নেপাল মিলিয়ে আরও প্রায় গোটা দশেক পর্বতচূড়া দেখা যায় এখান থেকে। টিফিনদাড়া ভিউ পয়েন্ট থেকে পাহাড়ের প্যানোরমা ক্যামেরাবন্দি করার সুযোগ মিস করবেন না। যার নীচের অংশ থেকেই আবার শুরু হয়ে যাচ্ছে পাইনের বন। এই ভিউ পয়েন্ট থেকে প্রায় ৩৬০ ডিগ্রির ভিউ পাওয়া যায়। কিলোমিটার দুয়েক হেঁটে উঠতে হয়।

নাথুলা আর জেলেপলা পাসের কিছুটা অংশও চোখে পড়ে রিশপ থেকে। কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার অন্যতম সেরা জায়গা রিশপ। যদি প্ল্যান করে পূর্ণিমার সময় যেতে পারেন, আরও ভাল। পাহাড়ি জায়গায় যে কোনও সময়েই আকাশের মুখ ভার হয়ে যেতে পারে। তবে বর্ষার সময়টা বাদ দিয়ে যাওয়াই ভাল। সূর্যাস্তের পর আশপাশের পাহাড়ে জোনাকির মতো আলো জ্বলে ওঠার দৃশ্যও দারুণ! যাঁরা রিশপে যান, তাঁরা সাধারণত প্যাকেজে লাভা-লোলেগাঁও কিংবা পেডংকে রাখেন। কয়েক কিলোমিটারের রাস্তা। রিশপ থেকে লাভা ট্রেক করেও যান অনেকে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঘণ্টাখানেকের ডাউনহিল ট্রেক। রাস্তা বড্ড এবড়োখেবড়ো, তাই ভাল জুতো নিয়ে যাওয়া দরকার অবশ্যই। রিশপ থেকে নেওড়া ভ্যালি রিসর্ট বেশি দূর নয়। চাইলে সেখানেও একদিন থেকে যেতে পারেন।

রিশপ ভ্রমণের সেরা সময় কোনটি?

ঘোর বর্ষার সময়টা এড়িয়ে যেকোন সময় আপনি রিশপ ভ্রমন করতে পারবেন। শীতের সময় আকাশ পরিস্কার থাকে বিধায় প্রায় সবটা সময় জুড়েই কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলে। অন্যসময় মেঘের আনাগোনা থাকায় এই সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।

রিশপে কি স্নোফল হয়?

ডিসেম্বর জানুয়ারি মাসে এখানে স্নোফল হওয়ার সম্ভাবনা ৫% এর মতো দেখা দেয়।

রিশপের আবহাওয়া কেমন?

গ্রীষ্ম (এপ্রিল থেকে জুন) — তাপমাত্রা মৃদু এবং (6°C) থেকে (24°C)
বর্ষা (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) – নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়। পর্যটকদের জন্য এই মৌসুমটা ভালো নয়।
শীতকাল (অক্টোবর থেকে মার্চ) — তাপমাত্রা কম এবং (0°C) থেকে (18°C) এর মধ্যে

কেন রিশপ বিখ্যাত?

রিশপের অনন্য বৈশিষ্ট্য হল – এই গ্রামের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা জায়গা থাকার কারনে এই গ্রামের সকল জায়গা থেকে কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।

রিশপ যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে বাসে শিলিগুড়ি। কলকাতা থেকে বাসে কিংবা ট্রেনে এনজেপি অথবা বিমানে বাগডোগরা পৌঁছে গাড়ি নিয়ে লাভা। শিলিগুড়ি এর জনসন টার্মিনাল থেকে জিপে করে যেতে হবে কালিম্পঙ। ভাড়া একশ বিশ রুপি। রিজার্ভ  জিপ ২৫০০ রুপিতে পাওয়া যাবে। কালিম্পং থেকে রিশপ জীপে কিংবা বাসে যেতে পারবেন। অথবা শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি জীপে করে লাভা হয়ে রিশপ যেতে পারেন।

এছাড়া বুড়িমারী বর্ডার থেকে সরাসরি জীপ নিয়ে চলে যেতে পারেন লাভা কিংবা নিউ মাল জাংশন। নিউ মাল জাংশন কিংবা মালবাজার থেকে জীপ নিয়ে লাভা হয়ে রিশপ যেতে পারেন।

কলকাতা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে করে নিউ মাল জাংশন নেমে ওখান থেকে জীপে করে লাভা হয়ে রিশপ যেতে পারেন। এ ছাড়া লাভা থেকে ট্রেকিং করেও পৌছানো যায়।

রিশপে থাকার হোটেল

হোটেল রয়েছে হাতে গোনা। হোম স্টে’র সংখ্যাই বেশি। সব ক্ষেত্রেই খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করে হোটেল বা হোম স্টে। তবে যেহেতু শহর থেকে দূরে, তাই খাওয়া দাওয়ার খরচ একটু বেশি। বেড়ানোর সিজনে কলকাতা থেকে বুকিং করে যাওয়াই ভাল।

পর্যটকদের থাকার জন্যে স্থানীয় শেরপা ও লেপচারা কটেজের মতো বেশ কিছু থাকার জায়গা বানিয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –

গোল্ডেন কটেজ (Golden Cottage, Rishyap)
যোগাযোগঃ +৯১ ৯৮৩০১০৭৭৮০, ৯৪৩২৯৬৪২৪২, ৯১৪৩০৫৮৬৮৯, ৮৯০২৪৯৭৮৮৫, ৯৮৩০১৪৭৭১৮, ৯৪৭৭২১৬১৬১)

Yankee Village Retreat, Rishyap
যোগাযোগঃ 9477222884, 8017461795
ভাড়াঃ ১২০০ রুপীর কাছাকাছি, অফসিজনে ৬০০-৮০০ রুপীর মতো।

লাভলী রিসোর্ট (Lovely Resort, Rishyap)
যোগাযোগঃ +919733061489 কলকাতা অফিস (+919830252843 / +919434503416)

নিওরা ভ্যালী রিসোর্ট (Neora Valley Resort)
যোগাযোগঃ +91 90079 95888

সানটেক ইকো রিসোর্ট (Suntec Eco Resort)
যোগাযোগঃ +91 98360 87652

খরচ

দিন দু’য়েকের জন্য রিশপে থাকতে দু’জনের খরচ পরবে ৪০০০-৪৫০০ টাকা। ডাবল সিটের হোটেল ভাড়া কমপক্ষে ১২০০ টাকা। দৈনিক খাওয়া দাওয়ার খরচ পড়বে জনপ্রতি অন্তত তিন’শো টাকা করে।

দিক নির্দেশনা