দার্জিলিং এবং সান্দাকফু ভ্রমণ

যুক্ত করা হয়েছে

অনেকদিনের ই পরিকল্পনা ছিল সান্দাকফু ফালুট যাওয়ার। বন্ধুদের ভিসা আর পাসপোর্টের ঝামেলার জন্য কিছুটা দেরি হয়েছে।

বাংলাবান্ধা রুটটি তুলনামূলক নতুন এবং শিলিগুড়ির কাছে হওয়ায় সেটাকেই আমরা বেছে নিয়েছিলাম। পোর্টে কিছু টাকা নিলেও দুই পাশের লোকজনই ভালো ব্যবহার করেছে। ভারতে প্রবেশ করে মজুমদার মানি এক্সচেঞ্জ থেকে টাকা নিয়ে ৩৫০ রুপিতে একটা অটো নিয়ে আমরা ৬ জন শিলিগুড়ির পথে রওয়ানা করি। শিলিগুড়ি শহর থেকে ১৮০০ টাকায় একটা জিপ ভাড়া করে দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করি। উল্লেখ্য এখানে দালাল কে ৫০০ রুপি দিতে হয়েছে। এই স্থানটিতে দালাল এড়ানো গেলে ১৩০০-১৪০০ টাকায় জিপ ভাড়া নেওয়া সম্ভব।

দার্জিলিয়েংর পথে নয়নাভিরাম পাহাড়ি উঁচু নিচু পথ ধরে আমাদের জিপ ছুটে চলেছিল শহরের পথে। শেষ বিকেলে শহরে পৌঁছার আগেই পরিষ্কার আকাশে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ধরা পরে চিরযৌবনা কাঞ্চনজঙ্ঘা। আমরা কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পরেছিলাম। যার সৌন্দর্য দেখতে মানুষ ২-৩ দিন অপেক্ষা করে আর আমরা শহরে না পৌঁছতেই তার সৌন্দর্য আমাদের সামনে উন্মোচিত। একেই বলে ভাগ্য। সন্ধ্যায় দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি শীতে কাঁপতে কাঁপতে ওয়াচ টাওয়ারের একটু আগে ১৫০০ রুপি নিয়ে ৬ জনের থাকার জন্য একটা রুম ভাড়া করি। যদিও অনলাইন ও রুম হিটারের জন্য আরো ৩০০ রুপি দিতে হয়েছে। রুমটিতে ৬ জনের জন্য ভাড়া করলেও এতে আরো ২ জন অনায়াসেই থাকতে পারতো। এভাবেই আমাদের দার্জিলিংয়ের প্রথম দিননটি অতিবাহিত হয়।

কাঞ্চনজংঘা, টাইগার হিল, দার্জিলিং
টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয়

দ্বিতীয় দিন খুব ভোরে অর্থাৎ ৪ টার সময় ঘুম থেকে উঠে রওয়ানা করি টাইগার হিলের উদ্দেশ্যে। গতরাতেই আমরা ২৫০০ টাকায় জিপ ভাড়া করে রেখেছিলাম। আমরা সারা শরীরে শীতের কাপড়ে মুড়িয়ে রওয়ানা করলাম টাইগার হিলের পথে। অন্ধকার রাস্তায় চালককে বেশ সাবলীল ই মনে হলো। টাইগার হিলের বেশ ক্ষানিকটা আগেই আমাদের গাড়ি থেকে নেমে যেতে হলো কারন আমাদেরও আগে অনেক গাড়ি চলে এসেছে, সাড়ি সাড়ি গাড়ি রাখাতে রাস্তা বন্ধ। আর সবার মতন আমরাও হেঁটে উঠলাম উপরে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরেই টাইগার হিলের ঐতিহাসিক শুদ্র সফেদ কাঞ্চনজঙ্ঘা আমাদের সামনে উন্মোচিত হতে লাগলো। শত শত দর্শনার্থীর মধ্যে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।সবাই যেন তখন কাঞ্চনের সৌন্দর্যে বিমোহিত, বাকরুদ্ধ। কি ভারতীয়, কি চাইনিজ, কি বাঙালি, কি বাংলাদেশী, সবাই কাঞ্চনের সৌন্দর্যে একাকার। কাঞ্চন শুভ্র সফেদের পর লাল বর্ণ ধারণ করতে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কেউ যেন পাহাড়ের উপরে আগুন জ্বালিয়েছে। আসলে সূর্যদয়ের লাল টুকটুকে আলোর প্রতিফলনেই সাদা বরফ লাল বর্ণ ধারন করে। এই দৃশ্যের কত গল্প, কত কবিতা, কত আবেগ পড়েছি আজ সেটা চাক্ষুস করলাম। আসলে এই সৌন্দর্যের প্রকাশ কোন লেখাতেই সম্ভব নয়। আমরা একদৃষ্টিতে এই নয়নাভিরাম দৃশ্যটি দেখছিলাম। ধীরে ধীরে সূর্য উঠলো আর সব দর্শনার্থীর মতন আমরাও টাইগার হিল ছাড়লাম। সেখান থেকে নীচে নেমে বাতাসিয়া লুপ গেলাম। এখান থেকেও সে কাঞ্চনের রূপ দেখলাম। এই স্থানে কিছুক্ষন থেকে আমরা গেলাম রক গার্ডেনে। সেখানকার ঝর্ণার চেয়ে আমাদের খৈয়াছড়া ঝর্ণাটাকে আরো বেশি সুন্দর লেগেছে। রক গার্ডেন থেকে আমরা দার্জিলিং শহরের একটা চিড়িয়াখানা ও এভারেস্ট আরোহীদের স্মৃতিবিজড়িত একটা জাদুঘরে যাই। সেখান থেকে চা বাগানে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে সেদিনের মতন গাড়ি ছেড়ে দেই আর এভাবেই দার্জিলিং এর শেষ দিন আর আমাদের ভ্রমনের দ্বিতীয় দিন।

তৃতীয় দিন ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম বৃষ্টি পড়ছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম সান্দাকফুতে প্রচুর তুষারপাত হচ্ছে। মনের একটা অংশ পুলকিত হলেও অপর অংশে শংকা কাজ করছিলো। যদি সান্দাকফু পর্যন্ত আবহাওয়ার বৈরিতার জন্য না যেতে পারি? স্বপ্নের এতো কাছে এসেও কি ফেরত যাবো? আশা আর শংকার দোলাচলে দুলতে দুলতে নির্ধারিত জিপে রওয়ানা করলাম মানেভঞ্জন এর উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে প্রধান হোটেলে বসে ল্যান্ড লোভার ভাড়া করা, কটেজ ভাড়া করা সহ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে অগ্রীম ভাড়া মিটিয়ে রওয়ানা করলাম সান্দাকফু এর উদ্দেশ্যে। প্রচন্ড কুয়াশা, প্রচুর তুষারপাতে সামনের পথ কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না কিন্তু অল্প বয়সী ড্রাইভার মং বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই ল্যান্ডলোভারটি পাহাড়ের উঁচু আর এবড়োথেবড়ো রাস্তায় তুলছিলো। অস্বীকার করবো না আমরা একটু ভয়ই পাচ্ছিলাম। মানেভঞ্জন থেকে ৭০ ভাগ পর্যটক হেঁটেই সান্দাকফু যায়।এমন বৈরি আবহাওয়া সত্ত্বেও আমরা প্রচুর ট্র্যাকার দেখেছি যারা ৩৬ কিমি এই রাস্তাটি ৩ দিনে পারি দেন। একেতো আমরা এমন পরিস্থিতির সাথে অভ্যস্থ নই দ্বিতীয়ত আমরা সবাই-ই এই পথে নতুন একেবারে অনভিজ্ঞ তাই হাঁটার ভাবনাটি ভাবিনি। একপাশে ভারত আর অপরপাশে নেপাল মাঝখানের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি। রাস্তার অর্ধেক পথ মোটামুটি ভালো আর বাকি অর্ধেক সামান্য মন্দ। যাওয়ার পথে ঢাকা মিরপুরের একটা টুরিস্ট গ্রুপের সাথে দেখা হয়েছে, যারা সান্দাকফু থেকে ফিরছেন তারা আমাদেরকে সান্দাকফুর বর্তমান অবস্থা জানিয়ে বললেন যে, ঘরের ভিতরে মাইনাস ১০ আর বাহিরে মাইনাস ১২ ডিগ্রি। সত্যি কথা বলতে কি আমরা একটু ভয়ই পেলাম। যাই হোক সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম রাস্তার পাশে প্রচুর ট্যুরিস্টের হেঁটে যেতে দেখলাম। সান্দাকফুর ৬ কিমি আগে কালিপোখরিতে আমরা সেদিনের মতন যাত্রা বিরতি দিলাম। আমরা যখন কালাপোখরাতে নামি তখন বিকেল ৪ টা হলেও প্রচন্ড কুয়াশা আর তুষারপাতে চারদিকে সন্ধ্যা নেমে এসছিলো। আগ থেকেই ভাড়া করা নেপালি এক কটেজে দ্রুত প্রবেশ করলাম আর তীরের মতন বিঁধতে থাকা ঠান্ডা বাতাস থেকে পরিত্রাণ পেলাম।

কালাপোখরি লেক
কালাপোখরি লেক

কালাপোখরিতে আমরা যে কটেজটিতে ছিলাম সেটার নাম হল কে বি হোটেল। তীব্র তুষারপাত আর প্রচন্ড বাতাসের মধ্যে আমরা কে বি হোটেলের দেয়াল ঘেরা রুমে গিয়ে খাবারের অর্ডার করলাম। এমন হাড় কাঁপানো শীতে ধুয়া উড়া গরম ভাত, ডিমের কারি,সবজি আর গরম ডাল কে মনে হচ্ছিল অমৃত। খাবার খেয়ে এই সন্ধ্যাতেই তিনটি প্যান্ট পাঁচটি সোয়েটার হাত মোজা আর পা মোজা কান টুপি আর মাফলার সমেত ৬টি কম্বলের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করি।

তবুও যেন আমরা শীতে কাঁপছিলাম। আমি জানি অনেকের কাছে শীতের এই বর্ননাটা অতিরিক্ত মনে হতে পারে কিন্তু তখনকার বাস্তবতাটা আসলেই একটু ভিন্ন ছিল। ঘন্টা দুয়েক বিশ্রাম নেওয়ার পর আমরা বের হওয়ে এলাকাটা একটু ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম।রুম থেকে বের হয়ে দেখি বাতাসের তীব্রতা অনেকটাই কমেছে। তুষারপাত বন্ধ হয়েছে, পরিষ্কার আকাশে রূপোর থালার মতন এতটা চাঁদ উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। এ যেন পাহাড়ের নতুন এক সৌন্দর্য আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হল। কী অপরূপ! কী অপূর্ব!

সান্দাকফু
সান্দাকফু যাওয়ার পথে বরফ

তখনই মনে পরলো গর্ভধারীনির আনন্দের কথা, ঠিক এমনই জোসনার দিনে কল্যাণ এই কালাপোখরিতেই কোন এক পাহাড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল। আমি তখন কল্পনা আর বাস্তবতার মাঝামাঝি অদ্ভূত এক ঘোর লাগা জগতে বিচরণ করছিলাম। ভাবছিলাম, ইশ, দেশ ভাগের সময় যদি পশ্চিম বাংলার নেতৃবৃন্দ যদি সম্পূর্ন বাংলাকে এক রাখার চেষ্টা করতেন, যদি তাদের মধ্যে সেই ১৯০৬ সালের চেতনাটা কাজ করতো তাহলে হয়তো এই অনিন্দ্য সুন্দরের লীলাভূমি আমাদেরই থাকতো। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড় এগুলোর তুলনায় নিতান্তই শিশু। আসলে রাজনীতিকে আমরা যতই অপছন্দ করি না কেন শেষ পর্যন্ত রাজনীতিই আমাদের সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক। বন্ধুদের ডাকে ঘোর লাগা থেকে বাস্তবে ফেরত আসলাম। ততক্ষণে ঠান্ডাটা অনেকটাই সহ্য করার মতন অবস্থায় পৌঁছেছে। রুমে এসে সেদিনের মতন ঘুমিয়ে পরলাম।

পায়ে হেঁটে সান্দাকফু
পায়ে হেঁটে সান্দাকফু এর পথে

পরদিন সকালে গাড়ি নিয়ে সান্দাকফুর দিকে রওয়ানা করলাম। খুব বেশি দূরে যেতে পারি নি রাস্তায় বরফ জমে থাকার কারণে। আগ্যতা আমরা হেঁটেই রওয়ানা করলাম। নাতিশীতোষ্ণ দেশের মানুষ আমরা, এমন বরফ আর তুষারপাত শুধু নাটক সিনেমা আর বইতেই পড়েছি। যা দেখি সবই নতুন লাগে, যা দেখছি সবই ভালো লাগে। হাঁটতে কষ্ট যে লাগছিলো না সেটা বলবো না কিন্তু এমন নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ক্লান্তি আমাদেরকে কাবু করতে পারেনি। একটা সময় আমরা স্বপ্নের সান্দাকফু এসে পৌঁছলাম। আমি জানি এর সৌন্দর্যের বর্ণনা আমার পক্ষে করা অসম্ভব। শুধু এতোটুকুই বলতে পারি এ চোখ এ যাবত কালে যা কিছু সুন্দর আর সৌন্দর্য অবলোকন করেছে সেসব কিছু এর কাছে নস্যি কেবলই নস্যি। গত দু’ দিনের তুলনায় আজকে সান্দাকফুর আবহাওয়াটা একটু ভালো আর এ কারনেই আমরা একটা দিন সান্দাকফুতে থাকতে পেরেছিলাম। তাছাড়া গত দুইদিনের পাহাড়ি ঠাণ্ডা ও আমাদেরকে এর সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছে। রাতে তারাভরা সান্দাকফুর আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম নেহেরু সাহেব যদি প্লান A B C টা মেনে নিতেন কিংবা যদি এই বিভাজন টাই না হতো তাহলে হয়তো ভালোই হতো। আমি জানি আজ এতোগুলো বছর পরে এসে তখনকার বাস্তবতা বুঝা বা পুরোপুরি অনুধাবন করা আমার পক্ষে সম্ভব না কিন্তু রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে এসব ইতিহাস বারবারই আমাকে দোলা দিচ্ছিলো। সান্দাকফুতে ভারত আর নেপালের বর্ডার একেবারেই নিরীহ গোছের মনে হলো।

কাঞ্চনজংঘা, সান্দাকফু
সান্দাকফু থেকে কাঞ্চনজংঘা

যাই হোক ফালুটে যেতে না পারার বেদনা আর সান্দকফু ছাড়ার কষ্ট নিয়ে পরেরদিন আমরা শিলিগুড়ি পৌঁছে একরাত থেকে বাংলাবান্ধা দিয়ে প্রিয় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলাম।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।