সান্দাকফু – ফালুট – গোরখে ♥

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

ভ্রমণের সময়কালঃ ০১.০৫.১৮ ~ ০৬.০৫.১৮

৬ মাস হয়ে গেছে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। ঘুরতে যেতে কারই বা না ভালো লাগে? যদিও আমার মধ্যে বরাবর এই ব্যাপারটা একটু বেশি। তাই আর ভালো লাগছিল না একঘেয়ে কাজ আর অফিস নিয়ে। কয়েকজন বন্ধু আর ভাই মিলে প্ল্যান বানিয়ে ফেললাম ট্রেকের আর রুট হলো সান্দাকফু ফালুট গোরখে। ২ মাস পর যাত্রা শুরু হবে, এরমধ্যে যা হয় আর কি। প্ল্যান বানানোর টাইম অনেকে থাকে যাত্রার দিন গুটি কয়েকে দাঁড়ায়। শেষ মুহুর্তে ৫ জন এসে দাড়ালো। এই ব্যাপারটা সব গ্রুপেই হয়ে থাকে তাই আমরাও স্বাভাবিক ভেবে বেরিয়ে পরলাম। উদ্দেশ্য কাঞ্চনজঙ্ঘা আর রডোডেন্ড্রন ফুল। শুনেছি গোটা পাহাড় এই সময় লাল হলুদ আর নীল হয়ে থাকে।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে টুমলিং এর জন্য বেরিয়ে পরলাম। মানেভঞ্জন থেকে গাড়ি বদল করতে হয়ে সিংগালিলা বা সৃঞালিলা ন্যাশনাল পার্ক ঢোকার জন্য। ৩.১৫ বাজে তখন আর মুসল ধারে বৃষ্টি পড়ছে। চেক পয়েন্টে আটকে দিল, উপরে যাওয়ার শেষ টাইম ৩ টে। তাও যদি বুকিং আর সঙ্গে গাইড থাকে তো। নইলে বেলা ২ টো। ৩ বছর আগেও এসেছি এখানে কিন্তু তখন এই সব নিয়ম ছিল না। তাই আকাশ থেকে পড়লাম আমরা। পুরো ট্রেক প্ল্যানটা বাঞ্চাল হতে চলেছে প্রথম দিনই কারন খুব টাইট সিডিউল। হাতে মাত্র ৬ দিন। ডিউটি অফিসারকে অনেক কাকুতি মিনতি করার পর তার মন একটু নরম হলো। এবার সে বলে বুকিং দেখান, গাইড কোথায়? আবার পরলাম ফ্যাসাদে। কিছুই নেই সংগে। আমাদের যাবতীয় সব প্ল্যান টুমলিং থেকে। আর যেখানে রাতে থাকবো সেই কটেজের দিদিই সব ঠিক করে রেখেছে। দিদিটি নিজেও একজন ট্রেকার। ডিউটি অফিসার আবার বেকে বসেছে। শেষে কেসরি দিদির সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দিই অফিসারের। নেপালি ভাষাই তারা যে কি বললো কিছুই বুঝলাম না। এটুকু বুঝলাম যে কথা কাটাকাটি চলছে। শেষে ছাড়তে রাজি হলো ডিউটী অফিসার। পাস বানিয়ে ওই বৃষ্টির মধ্যেই গাড়িতে এসে বসলাম তৎক্ষণাৎ। বলা তো যায় না আবার যদি আটকে দেয় কোনো কারনে তাই যত তাড়াতাড়ি চেক পোস্টটাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া যায় ততই ভালো।

গাড়ি চলতে থাকলো পাহাড়ি রাস্তায়। আগেকার মত এখন আর বোল্ডার ফেলা রাস্তা না, পিচ আর ঢালাই হয়ে গেছে রাস্তা। প্রতিটি বাঁকে যেন ৩০ মিটার উপরে উঠে যাচ্ছে গাড়ি। ঘন্টাখানেকের মধ্যে পৌছে গেলাম টুমলিং। পর দিন থেকে ট্রেক শুরু হবে সান্দাকাফুর উদ্দেশ্যে কিন্তু মেঘের অবস্থা খুব খারাপ। দিদিও ভয় দেখালো যে ফালুটে লাইটনিং হচ্ছে না যাওয়া টাই বেটার। তার উপর এত বৃষ্টি। রক্ত গরম, যা হয় হবে। এসেছি যখন তখন তো যাবো নিশ্চয়। তবুও একটু আন্ডারস্ট্যান্ডিং করে সবার মত নিয়ে ডিসিসন হলো ট্রেকটা ফালুট থেকেই শুরু করা হবে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি চোখের সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এত ভালোভাবে এখান থেকেই দেখতে পাব আশা করিনি। যা ছিল কাল রাতের মেঘের অবস্থা তার পর তো ভাবাই যাই না। এ অপূব সৌন্দর্য, চোখের পাতা যেন ফেলতেই ইচ্ছে করছে না। কিছুক্ষনের মধ্যে আবার মিলিয়ে গেল সব কিছু মেঘের মাঝে।

ব্রেকফাস্ট সেরে একটা ল্যান্ডরোভার নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ৫ জন মিলে সান্দাকাফু (Sandakphu) হয়ে ফালুট (Phalut) এর উদ্দেশ্যে, সঙ্গে আমাদের গাইড মাইলা। রাস্তা ভালো বলবো না খারাপ সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না কারন চারিপাশের ফুটে থাকা লাল রডোডেনড্রন আর মেঘের মেলা রাস্তার কষ্টটা যেন বুঝতেই দিচ্ছে না। পাহাড়কে পাহাড় লাল হয়ে আছে। এ এক অপরুপ সৌন্দর্যময় দৃশ্য। কিছুক্ষন গাড়ি চলার পর পৌছালাম কালাপোখরি। জায়গাটা বেশ সুন্দর, একটা ছোট্ট লেক আর মনিস্ট্রি আছে। এখানকার লোকেদের কাছে লেকটা পবিত্র লেক। চারিপাশে মেঘে ভরতি, বেশ কয়েকটা ছবি তুলে আবার বেরিয়ে পরলাম।

আবার কিচ্ছুক্ষন গাড়ি চলার পর পৌছালাম সান্দাকাফু। পশ্চিমবঞের সব থেকে ঊচু পিক, ৩৬৩৬ মিটার। এখানে বেশ কয়েকটি কটেজ আছে, থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থাও যথেষ্ট ভালো। এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা খুব ভালোই দেখা যায় কিন্তু আমাদের চোখে ধরা পড়লনা। চারিদিকে মেঘে ঢাকা। কিছুক্ষনের মধ্যে আবার নেমে এলো বৃষ্টি। আমাদের ট্রিপের এটা ২ দিন। সব যেন বাঞ্চাল হয়ে যাচ্ছে।

আবার বেশ কিছু ছবি আর মেমরি পকেটস্থ করে বেড়িয়ে পরলাম ফালুটের উদ্দেশ্যে। রাস্তা এবার এতটাই খারাপ আর ভয়াবহ যে ভালোই ভাবাচ্ছে, সঙ্গে বৃষ্টি। কিছুদুর যাওয়ার পর থেকে রাস্তায় বরফ পড়ে থাকা শুরু হলো। এতদিন দেখে এসেছি একপাশে পাহাড় আর এক পাশে খাদ কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর থেকে এখানে দেখতে পেলাম দুই পাশেই খাদ। মানে আমাদের গাড়িটা চলেছে পাহাড়ের পিক বরাবর। একটু বেসামাল হলেই সব শেষ। রাস্তাটা কোনোভাবেই গাড়ি করে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত না। ট্রেক রুট এটা। এক সময় তো বলেই ফেললাম আমরা গাড়ি থেকে নেমে ট্রেক শুরু করি। ড্রাইভার বলে ওঠে কোনো দরকার নাই সে ঠিক পৌছে দেবে আমাদের। অবশেষে দুপুর নাগাদ পৌছালাম ফালুটে। লাকিলি জায়গা পেয়ে গেলাম জিটিএ তে। লাঞ্চ সেরে চারিপাশটা ঘুরে দেখলাম।

কলকাতায় এখন প্রায় ৩৫ ডিগ্রি টেম্পারেচার আর এখানে মাত্র ২ বা ৩ ডিগ্রি। কনকনে ঠান্ডা, আঙ্গুল, কান, নাক যেন কেটে যাচ্ছে একটু হাওয়া লাগলে কিন্তু জায়গাটা খুব সুন্দর, শান্ত ৩৬০ ডিগ্রি খোলা। খুব স্লো জীবনযাত্রা এখানে, কোনো কাজ নাই, প্রকৃতি উপভোগ করো, খাও দাও আর ঘুমাও। ৮ টা বাজলেই শুয়ে পড়তে হয়, কারেন্ট ও নাই, মোবাইলের চার্জও প্রায় শেষের দিকে। মাইলা মানে আমাদের গাইড বলে গেলো কাল ভোরে ফালুট টপ যাব ট্রেক করে। ওখান থেকে নাকি এক সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা, থ্রি সিস্টার, এভারেস্ট দেখা যায়। তাই সবাই গুটিসুটি হয়ে কম্বলের মধ্যে ঢুকে গেলাম, রাত ৩ টে না বাজলে ঘুম আসেনা এত তাড়াতাড়ি কি করে ঘুম আসবে কিন্তু ওই যে সূয্যের প্রথম কিরণটা কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর পড়ার দৃশ্যটা মিস করতে চাই না তার জন্যই ঘুমাবার চেষ্টা করলাম।

সবাই সকাল ৪ টে নাগাদ ঘুম থেকে উঠে পড়েছি কারন ট্রেক করে ফালুট টপে উঠতে ১ ঘন্টা সময় লাগবে। হায় রে… এ কি কপাল.. বাইরে বৃষ্টি পড়ছে.. মেঘ ডাকছে.. মাইলার ও দেখা নাই.. তার ঘরে গিয়ে দেখি সে বেটা দিব্যি ঘুমাচ্ছে… তাকে ডাকাতে সে বলে দাদাবাবু হাওয়া না উঠলে উপরে গিয়ে লাভ নাই, চারিদিকে মেঘে ঢাকা.. উপরে গিয়ে কিছুই দেখা যাবে না.. মনটা ভেঙ্গে গেলো। আবার কিছুক্ষন পর অন্য জায়গার উদ্দেশ্যে বেড়োতে হবে কিন্তু এ দৃশ্য মিস হচ্ছে সেটাও মেনে নিতে পারছি না। তাই কাঞ্চনজঙ্ঘাকে চোখের সামনে দেখার জন্য আরো একদিন থেকে গেলাম ফালুটে। সেদিনটা এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড় ঘুরে বেড়ালাম পায়ে হেটে। বিকেলের দিকে একটু ওয়েদার ঠিক হলো তাই সবাই হেটে উঠে গেলাম ফালুট টপে। সমস্ত পাহাড় নিচে, ৩৬০ ডিগ্রি খোলা ভিউ। অপূর্ব দৃশ্য, সামনে বরফের পাহাড়টা ৩য় উচ্চতম পাহাড় কাঞ্চনজঙ্ঘা।

আস্তে আস্তে নেমে এলাম নিচে আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ার জন্য। পরদিন বেরোতেই হবে গোরখের জন্য। সকাল হতে না হতেই বেরিয়ে পরলাম। রাস্তাটা পুরোটাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। ১৫ কিমি ট্রেক। এবার আকাশটা মনে হচ্ছে আমাদের উপর একটু দয়া করতে শুরু করেছে। সুন্দর ওয়েদার, চারিদিকে বিভিন্ন রকমের ফুল ফুটে আছে। রডোডেনড্রন যেন পায়ের নিচে মকমলের চাদর বানিয়ে দিয়েছে। ধীরেধীরে রাস্তা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। এতটাও যে সোজা রাস্তা না সেটা বুঝলাম। কয়েক ঘন্টা যাওয়ার পর চোখের সামনে দুটি পাহাড়ি গ্রাম দেখলাম। চোখে না দেখলে এ দৃশ্য মুখে বলে বোঝানো যাবে না। ছোট্ট একটা গ্রাম, পাস দিয়ে একটা ঝড়না বয়ে যাচ্ছে। ভ্যালিটা ফুলে ঢাকা। এই জায়গাটা থেকে ২ টো গ্রাম একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে. একটি পাহাড়ের উপরে আর একটি নিচে। উপরের পাহাড়ি গ্রামটির নাম সাবারডেন আর নিচেরটির নাম গোরখে, অপর নাম হিডেন প্যারাডাইস।

ঠান্ডার প্রোকোপ অনেকটাই কম এখানে। ইচ্ছে হলো ওই ঠান্ডা জলে স্নান করার কারন শেষ ২ দিন স্নান করা হয়নি এত ঠান্ডায়। তাই একটা ঘর নিয়ে জিনিসপত্র রেখে সোজা স্নান সেরে নিলাম। দুপুরের লাঞ্চ সেরে আমরা সোজা উপরের গ্রামটাই উঠে গেলাম হেটে, মানে সাবারডেন নামের ওই গ্রামটায়। অনেক খানি সমান জায়গা নিয়ে এই পাহাড়ি গ্রামটি, মাত্র ৩/৪ টে বাড়ি। হাতে গোনা কয়েকটা লোক। সন্ধ্যে নামতেই পাহাড় বেয়ে আবার নিচে নেমে এলাম। এখানেও ৫/৬ টা বাড়ি নিয়ে একটা গ্রাম, রাত্রে পাহাড়ি মুরগি করার আরজি জানালাম পেম ডিকি দিদি কে। অপরুপ সে টেস্ট, এইরকম টেস্টের চিকেন আগে কোনোদিন খাইনি।

রাতে যেন ঝরনার আওয়াজ বেড়েই চলেছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকে গোটা গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। আকাশে মেঘের মাঝ দিয়ে তারাদের উকিঝুকি, মাঝে মাঝে কাঠের উনানের কাছে গিয়ে একটু হাত তাতিয়ে নেওয়া। সবমিলিয়ে এ যেন স্বর্গের থেকে কম কিছু না। নেই কোনো ভেদাভেদ, নেই কোনো কাজের চাপ, সংসার থেকে অনেক দূর, অনেক দূর। মোবাইলের টাওয়ার নাই তাই যাবতীয় ফেক ওয়াল্ড থেকে অনেক দূরে। পিছু টান না থাকলে বছরের পর বছর এখানে কাটানো যেতে পারে।

পরদিনটা এখানে কাটিয়ে আবার ট্রেক শুরু করলাম ভারেং এর উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে গাড়িতে করে নিউ জলপাইগুড়ি।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।