সাজেক ভ্রমণ এবং কিছু পরামর্শ

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
1

সাজেক ভ্যালিতে (Sajek Valley) পৌছাতে বেশ দেরিই হয়ে গেল। রাত ১২ টায় ঢাকা হতে বের হয়ে পথে জ্যাম খেতে খেতে খাগড়াছড়ি পৌছালাম সকাল ১১টার দিকে। আমরা ছিলাম ২০ জন। তাড়াতাড়ি করে আগে থেকে ঠিক করে রাখা দুই চান্দের গাড়ীতে সবাই চেপে বসলাম। পলিটিকাল কানেকশনের জন্য বিজিবি কিছু উপদেশ দিয়ে আমাদের ছেড়ে দিল। তার ভিতরে একটা ছিল সাজেক না পৌছানো পর্যন্ত পথে একটা সেকেন্ডও দাঁড়ানো যাবে না। এক টানে সাজেক যেতে হবে। পানি কিনে যাওয়ার জন্যও বললো।

শুরু হল দীঘিনালা হতে ৩৪কিমি দূরত্বের সাজেকযাত্রা। প্রচন্ড ক্লান্ত ছিলাম কিন্তু চান্দের গাড়ীর পাহাড়ি পথের যাত্রা শুরু হতেই সেই ক্লান্তি কোথায় যেন উবে গেল। বিশ্বাস করেন সাজেকে যাওয়া আসার পথের সৌন্দর্যটুকুই আপনার পয়সা অর্ধেক উসুল করে দিবে। আর চান্দের গাড়ীর ড্রাইভার মামাদের ড্রাইভিং! আপনার শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের না উত্তেজনার পারদ উঠিয়ে দিবে। পুরা ফার্স্ট এন্ড ফিউরিয়াস জনারের ড্রাইভিং। আপনাকে উপভোগ করতেই হবে তাদের ড্রাইভিং। আর রাস্তায় যে সব ঢাল আছে, বাঁক আছে, খাড়া রাস্তা আছে সেই গুলা উপভোগের মাত্রা আরো একটু বাড়িয়ে দিবে। খাগড়াছড়ি হতে সাজেক আসতে তিন ঘন্টা লাগবে। আমরা পৌছালাম ৩টার পরে। এসেই হোটেলে ঢুকে খাবারের অর্ডার করা হয়ে গেল। ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষন। এক ঘন্টা পরে খাবার রেডি হয়ে গেল। ক্ষুধাও ছিল চরমে। মুরগির মাংস, সবজি আর ডাল গোগ্রাসে খেলাম।

চান্দের গাড়ি

খেয়ে আমি আর আমার ওয়াইফ চললাম কংলাক পাহাড় জয় করতে। অনেকে চান্দের গাড়ীতে করে পাহাড়ের কাছে গিয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমি আর ও হেঁটে হেঁটেই গেলাম। এই সব পথ গুলা গাড়ি বা বাইকে যাওয়া মানেই আপনি অনেক কিছু মিস করবেন। যাহোক ১০ টাকা দিয়ে লাঠি ভাড়া করে দুইজন কংলাক পাহাড়ে উঠা শুরু করলাম। ইচ্ছা ছিল পাহাড়ের চূড়া হতে সূর্যাস্ত দেখবো। কিন্তু ফাজিল সূর্যটা মাঝপথেই ডুবে গেল। কিন্তু ডুবে গেলেও আপনি চারপাশের ভিউ দেখে ভাববেন আহ, এই হচ্ছে সাজেক! এতো সুন্দর। যে পথ দিয়ে আপনি সাজেক এসেছেন সেটাও আপনি দেখতে পাবেন। আর চারিদিকে পাহাড় গুলা তো আছেই।

সাজেক ভ্যালি

শীতের প্রকোপে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। নেমে এই বার আমরা চান্দের গাড়ি তে করেই হোটেলে আসলাম। কিছুক্ষন বসে আবার বের হলাম। দুই জন গিয়ে এক হোটেলে ব্যাম্বু চিকেন অর্ডার করলাম। দেশী মুরগি ৭০০টাকা আর পোল্ট্রি মুরগি ৫০০ টাকা। ঠান্ডার ভিতরে ঝাল মশলা বেশি দিয়ে গরম গরম ব্যাম্বু চিকেন ভালোই লাগলো। ঝাল বেশি খেতে চাইলে বলে দিবেন আগে আগে। রাতে ১০টার দিকে খেয়ে চলে গেলাম হেলিপ্যাডে আকাশ আর তারা দেখতে। সাজেকের ওই আকাশের দিকে আপনি সারা রাত তাকিয়ে তাকতে পারবেন। অনেক গুলা গ্রুপ ফানুস ওড়াচ্ছিল, দারুন লাগে দেখতে। সকালে উঠতে হবে তাই ১২টার পরেই রুমে চলে আসলাম।

সাজেকের রিসোর্টের ব্যালকনিতে

সকালে ঠিক ৫টায় ঘুম হতে উঠলাম। তখনো আলো ফোটে নাই ঠিক মতন। কিন্তু তখনই বাইরের যে ভিউ আমি দেখলাম তা আমি ভাষায় বর্ননা করতে পারবো না। ৫.৩০ এর দিকে যখন আলো বের হয়ে গেল তখনকার ভিউ এর সাথে আপনার গতকাল বিকেলে দেখা সাজেকের মিল পাবেন না। এই সময়ে সাজেক আপনার সামনে তার আসল রূপ নিয়ে হাজির হবে। চারপাশে শুধু মেঘ আর মেঘ দেখবেন। চারপাশের পাহাড় গুলা মেঘের চাদরে ঢাকা থাকে। মনে হবে পাহাড়গুলার উপরে মেঘের চাদর বিছানো। সোজা হেলিপ্যাডে চলে গেলাম সূর্য উদয় দেখবো বলে।

সাজেকে সকাল বেলা মেঘের সমুদ্র

এই খানে একটা ব্যাপার বলে দেই। সূর্য উঠার পর পরই হেলিপ্যাডে আর দেরি করবেন না। নিচে ঝাড়ভোজ পার্কে ঢুকে যাবেন ২০টাকা দিয়ে টিকিট কেটে। দেরি করলেও তো ঢুকতে পারবেন কিন্তু তখন ভীড় হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি গেলে ভালো করে ছবি তুলতে পারবেন। আর মেঘের অসাধারণ ভিউ তো আছেই। ভালো ভালো কটেজ গুলা সব এই দিকেই মুখ করে করা। তাই বুঝতেই পারছেন কেমন ভিউ পাবেন। এখানে কিছু সময় কাটিয়ে পুরা সাজেক টা ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন। ইচ্ছা হলে আবারও কংলাক পাহাড়ে উঠতে পারেন। পাহাড়ি তাজা ফরমালিনমুক্ত পেঁপে, কলা, আনারস খেতে পারেন। সকালে না উঠলে পরে কিন্তু ভাগ্য ভালো না থাকলে মেঘ দেখতে পাবেন না। তাই অবশ্যই সকাল সকাল উঠবেন।

নাস্তা শেষ করে ১০ টার পরেই আমরা সাজেক হতে বের হয়ে গেলাম। মন মতন ঘুরতে পারিনি তাই বের হওয়ার সময়ই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম যে সাজেক আবার আসবোই, আসতে হবেই। আর সেটা যাব বর্ষার সময়ে।

কিছু পরামর্শ যা আপনার ভ্রমণকে সুন্দর করতে পারে

  • কাপলরা যদি কোন গ্রুপের সাথে এড হোন তাহলে থাকার বিষয় টা ক্লিয়ার হয়ে নিবেন। মানে আপনারা আলাদা রুম নিবেন নাকি মেয়েরা এক রুমে আর ছেলেরা আর এক রুমে থাকবেন। আগে হতে ঠিক না করে গেলে পরে আবার এক্সট্রা টাকা দিয়ে আপনাকে আলাদা রুম নেওয়া লাগতে পারে।
  • সাজেকে নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছুই পাওয়া যায়। তবে দাম প্রায় ডাবল। তাই আপনার যা যা লাগবে সব আগে হতেই কিনে রাখা ভালো।
  • দীঘিনালা হতে পাহাড়িরা লোকালি চান্দের গাড়িতে যাতায়াত করে। সেটাতে সময় অনেক বেশি লাগে। এক দুই জন হলে ওই গাড়ি তে উঠতে পারেন। (এটা আমাকে আমাদের চান্দের গাড়ীর ড্রাইভার বলেছে)
  • সাজেকে খাবার আগে হতে অর্ডার করে রাখতে হয়। পছন্দমতন প্যাকেজ আগে হতে বলে রাখবেন। নাহলে সমস্যায় পড়বেন।
  • সন্ধ্যায় যে সব ব্যাম্বু চিকেন রোল বা চিকেন স্টিক বিক্রি করে এই গুলা না খাওয়াই ভালো। কারন অতিরিক্ত দাম দিয়ে কিনে ভিতরে যদি চিকেনের গন্ধও না পান বা স্টিকে মার্বেল সাইজের তিন পিস চিকেন পান তাহলে মেজাজটা খারাপ হয়ে যাবে।
  • পানি কিনে নিয়ে যাবেন। কারন ওই যে, সাজেকে দাম কিন্তু ডাবল।

সাজেকে সকাল বেলা মেঘের সমুদ্র

সাজেকে খরচ

  • ঢাকা হতে শান্তি পরিবহন দিঘীনালা যায়। ভাড়া ৫০০-৬০০ এর ভিতরে।
  • চান্দের গাড়ির এক দিনের ভাড়া ৭৫০০ (যে দিন নিচ্ছেন পরদিন সকাল বা বিকালের এসকোর্ট পর্যন্ত)
  • থাকার জন্য বিভিন্ন টাইপের কটেজ আছে। (১৫০০ হতে ৩/৪ হাজার পর্যন্ত)

সাজেকে সন্ধ্যার পরে কিছু হোটেলে উচ্চ শব্দে গান বাজায় আর কিছু বাইকয়ালা ফাত্রা পোলাপান বিনা কারনে বাইক নিয়ে এই মাথা ওই মাথা করে যা খুবই বিরক্তিকর। আমার মতে সাজেকের ভিতরে বাইক নিয়ে যে কোন ধরনের মুভমেন্ট নিষিদ্ধ করা উচিত। বাইক নিয়ে এক যায়গা তে রেখে দিবে, বাইক ছাড়া ঘোরাঘুরি করে আবার নিয়ে চলে আসবে।

সাজেক সুন্দর। পরিচ্ছন্নও আছে। আপনিও পরিস্কার রাখতে সাহায্য করুন। যত্রতত্র ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। হ্যাপী ট্রাভেলিং!

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।

লিডারবোর্ড এড