কাশ্মীর – একটি স্বপ্নপূরণ (সোনমার্গ পর্ব)

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

পরদিন হল কাশ্মীরের অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মোড়া এক উপত্যকা আর একটি মিষ্টি ছেলেকে জানার দিন। উপত্যকার নাম সোনমার্গ, ছেলেটির নাম মঞ্জুর। ভবিষ্যতে আর কতবার এই স্বর্গীয় উপত্যকায় ফিরে আসব জানি না, তখন মঞ্জুরের সঙ্গ না পেলেও তাকে মনে পড়বে বারবার একথা হলফ করে বলা যায়। সোনমার্গ নামটি এসেছে সোনামার্গ থেকে, যার অর্থ সোনা মোড়া পথ। সত্যিই এ পথে আসা সকল ভাগ্যবানেরা যে সে সোনার টুকরো কুড়িয়ে আঁচল ভরে নিতে কখনও ভুলবে না, তা নিশ্চিত বলা যায়। সোনায় মোড়া পথ আর কাকে বলে ! দরকষাকষি শেষে ঘোড়ায় চাপার ভয় বুকে নিয়ে যখন চেপে বসলাম একটি ছোট্ট ঘোড়ার পিঠে, তখন এল একমুখ হাসিমাখা অভয়দানকারী সেই কিশোর, ‘আরে ম্যাডাম, ডরো মাত, ডর কে আগে জিত হ্যায়।’ সেই উঁচুনীচু পাহাড়ি পথে আমার মতো আনাড়িকে ভয় তাড়িয়ে একেবারে পোশ্‌পাথরি গ্লেসিয়ার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া মুখের কথা ছিল না, তা করে দেখাল মঞ্জুর, সাথে আমরাও তার সৌজন্যে সৌভাগ্য লাভ করলাম অনাস্বাদিতপূর্ব এক অপার ঐশ্বরিক সৌন্দর্য দর্শনের। বিস্মিত হয়ে অনুভব করলাম বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ের বিচিত্র রূপ দেখার সুযোগ পেলেও এর আগে এমন ঘন চোখ জুড়ানো বিস্তৃত সবুজ উপত্যকা, যাকে বুগিয়াল বলা হয়, তাকে অতিক্রম করে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের সেই অপূর্ব অতুলনীয় মনোহর রূপ আমি আগে কোথাও দেখিনি।

সোনমার্গ
সোনমার্গের বুগিয়াল। পেছনে নাঙ্গা পর্বত।

অনেকখানি উপরে উঠে জানতে পারলাম এই সেই স্থান যাকে জনপ্রিয় সিনেমা ‘বজ্‌রঙ্গি ভাইজান’-এর শেষ দৃশ্যে দেখে ভেবেছিলাম, আহা কোথায় এমন জায়গা আছে ! খালি চোখে সত্যি বিশ্বাস হচ্ছিল না, যে সেই জায়গায় এসে পড়েছি। দুচোখ ভরে দেখে আশা মেটে না সে জায়গা এতটাই সুন্দর। আর সঙ্গে মঞ্জুর ভাইয়ের ছবি তোলা, যেখানে সেখানে ঘোড়া দাঁড় করিয়ে নানা ভঙ্গিতে অক্লান্ত ছবি তুলে দেওয়া, আর সারাক্ষণ অজস্র গল্প করা। বিভিন্ন জায়গার নানা গল্প শুনলাম তার কাছে, আর কত কত সিনেমার শুটিং এখানে হয়, কত মানুষ আসে, হেঁটে হেঁটে উপরে ওঠে এইসব গল্প। কী ভীষণভাবে সুরজ আর মাধুরী নামধারী তার ঘোড়া দুটি তার বশীভূত দেখে অবাক হতে হয়। মালিকের ঘোড়া হলেও দীর্ঘদিন তার সঙ্গে থেকে, তার ভালোবাসায়, তার প্রভুত্ব বা বলা ভালো তার বন্ধুত্ব ঘোড়াদুটি এমনভাবে স্বীকার করে নিয়েছে যে তারা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তার বিশেষ শিষ দ্বারা। প্রথমে মনে হয়েছিল যে, এখানে সব ঘোড়াই হয়তো এমনি সহিসের বশ, কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম যে ব্যাপারটি অতটাও সহজ নয়। আসলে জগতে ভালোবাসাই বোধহয় এমন বস্তু যার কাছে সবাই সানন্দে নতিস্বীকার করে, যেমন সুরজ আর মাধুরী করেছে মঞ্জুরের মতো এমন হাসিখুশি সরল ছেলেটির কাছে।

সোনমার্গ
বজরঙ্গি ভাইজানের শ্যুটিং হয়েছিল এখানে।

পোশ্‌পাথরি পৌঁছানোর বেশ কিছুটা আগে থেকে রাস্তা আর নেই বললেই চলে। তার মধ্যে ঘোড়াকে পার হতে হল নদী। কিন্তু কী অসীম দক্ষতায় ঘোড়াদুটিকে নিয়ন্ত্রণ করে, নীচ থেকে একটানা সেই একই গতিতে ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে আমার ভয় দূর করে গ্লেসিয়ারে পৌঁছে দিল মঞ্জুর। সারা বছর নাকি এই গ্লেসিয়ারের বরফ গলে না। নীচ থেকে এর দিকে তাক করেই এতখানি এগিয়ে এলাম ভেবে খুব ভালো লাগছিল। এই প্রথম গ্লেসিয়ারের উপর চেপে দাঁড়ালাম। পা পিছল কাটছিল। তারপর নামার পালা। নামার সময় ঘোড়ার উপর বিশ্বাস করে নিজেকে ছেড়ে দিতে আরও ভয় লাগছিল। মনে হচ্ছিল মাধুরীর পা হড়কালেই আমি গেলাম। আর মঞ্জুর বারবার বলছিল নীচে না দেখে চারপাশে দেখতে। ওর কথায় চেষ্টা করলাম, সবুজের সমারোহের মাঝখান দিয়ে নীচে নামছি, মনের ভয় কাটিয়ে হৃদয় ভরে শুষে নিচ্ছি সোনমার্গের প্রতিটি বাঁক ও উপত্যকাকে, বুঝতে পারলাম এই শ্যামলিমার অন্যতম কারণ এই সময়, বর্ষার শেষে তুষার ধবল সাজে সজ্জিত হওয়ার আগে প্রকৃতিরানির এ আর এক মোহিনী রূপ, যা মন ভুলিয়ে অজানিতে আবার বারবার আসার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয় প্রেমিকের কাছে। খুব বড়ো প্রকৃতিপ্রেমিক না হলেও যে কোনো মানুষ এখানে এসে আনমনে তার প্রিয়জনের কথা, না-বলা প্রেমের কথা একবার ভাববেই।

সোনমার্গ
পাহাড়ের ঢালে ধানক্ষেত।

প্রেম, প্রিয়জনের কথা উঠল যখন, তখন এই পাহাড়ি উপত্যকা ঘেরা ছোট্ট একটি গ্রামের এক সাদাসিধা প্রেমিক আর তার সাহসী প্রেমিকার কথা না বললেই নয়। সে হল আমাদের এই মঞ্জুর আর তার বউ। প্রথমে তো এই ছোট্ট ছেলেটি বিবাহিত শুনে মজা লাগল, তারপর তার মুখেই শুনলাম তার প্রেমকাহিনি। জানিনা, সভ্যতার প্রতিযোগিতায় ফিরে এসে এই ছোট্ট প্রেম কতখানি আবেদন সৃষ্টি করবে, কিন্তু সোনমার্গের ওই সোনামাখা সবুজ ভ্যালিতে, বন্ধুর রাস্তায়, জনহীন আদিম সব পর্বতমালা, উঁচুতে দেখতে পাওয়া গ্লেসিয়ার, আর গ্লেসিয়ার নিঃসৃত কলকল ধারায় বয়ে চলা নদী, সবকিছুর মাঝে অপার মমতায় দুই ভ্রামণিককে নিজের দেশ ঘুরিয়ে দেখাতে ব্যস্ত কিশোরটির গল্পচ্ছলে বলা প্রেমকাহিনি দুটি প্রেমিক হৃদয়কে ভালোলাগায় অভিভূত করেছিল, তাই তাকে লেখার অক্ষরে মনে রাখার প্রচেষ্টা।

সোনমার্গ
পোশপাথরি গ্লেসিয়ারের রাস্তা।

কেমন করে এক সুন্দরী কাশ্মীরি কিশোরী বাড়ির শাসন উপেক্ষা করে তার ঘরে এসে ওঠে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে, কেমন তখন বাইরে অবিরাম তুষারপাত, কাজের অভাবে ঘরে ছেলেটির অলস জীবন যাপন, কেমন তার হতচকিত হওয়া, মেয়ের বাড়ির লোক এসে বিয়ের কথা মেনে নিয়ে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া, দুজনের বিয়ে, সানন্দে সংসার শুরু। তারপর ছেলেটির কাজের চাপে বউকে সময় দিতে না পারা, বউয়ের মধুচন্দ্রিমার আবদার। যেমন করে ঘোড়ার পিঠে রসদ নিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে ট্রেকে সঙ্গ দেয় ছেলেটি, তেমনি করে তারা দশ দিনের জন্য রসদ বেঁধে নিয়ে হানিমুনে যায় দূরের নাঙ্গা পাহাড়ে। সেখানে এমনি পর্যটকেরা যেতে পায়না, খুব সুন্দর লেক আছে সেখানে, আর আহা বড়োই মনোরম সে জায়গা। যদি যাও তবেই জানতে পারবে। শুনিয়ে আর সে কী বোঝাবে। মনে হল, হয়তো গ্রেট লেক ট্রেক ওই পাহাড়েই হবে। কিন্তু চাইনা আমরা তাকে নামে বাঁধতে। থাক সে আমাদের অধরা হয়ে। থাক সে কেবল ওই সুন্দর কাশ্মীরি যুগলের এবং ওদের মতো আরও অসংখ্য স্থানীয় প্রেমিক-প্রেমিকার একান্ত নিজস্ব কুঞ্জস্থান হয়ে। ভালো থাক মঞ্জুর, ভালো থাক তার প্রিয় মানুষী, ভালো থাক এই আদিগন্তবিস্তারী সুন্দর শ্যামলিমাময় উপত্যকা, ভালো থাক সেই অজানা লেক, আর এই স্মৃতিতে সঞ্জীবিত হয়ে ভালো থাকি আমরা, আবার এই স্বর্গে আসার আগে এই স্মৃতির পাতা খুলে খুলে বাঁচিয়ে রাখি নিজেদের, জাগিয়ে তুলি আবার বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছেটাকে।

সোনমার্গ
নিখুঁত ক্যানভাস সর্বত্র।

ফেরার পথে আর একগুচ্ছ আনন্দ আমার জন্য অপেক্ষা করছিল তা জানতাম না। সেই আমার ছোট্টবেলার স্বপ্নে দেখা আপেল বাগানটা আলাদিনের জাদুকাঠির ছোঁয়ায় কখন রূপ নিয়ে সামনে চলে এসেছে। ওমা ! রাস্তার ধারে চাচাজি দেখালেন আপেল বাগান। একদৌড়ে পৌঁছে গেলাম। দশটাকা টিকিট নিয়ে ওরা যথেচ্ছ ঘুরে দেখার অনুমতি দিল। কিন্তু গাছ থেকে ফল ছেঁড়া যাবে না। তাতে আমার কোনো আপশোশ নেই। মনটা আমার কেমন করছিল সে আর কাকে বলব ! সত্যিই তাহলে আমি আজ গাছে ধরে থাকা আপেল চাক্ষুষ করলাম, তা স্পর্শ করলাম। ঈশ্বরকে কোটি কোটি ধন্যবাদ আমার স্বপ্নপূরণের জন্য।

সোনমার্গ
পোশপাথরি গ্লেসিয়ারের পথে।

যখন পাহাড় দেখিনি, খুব শখ ছিল একদিন আমিও বড়ো হয়ে পাহাড়, ঝরনা, সমুদ্র সব দেখব। একে একে যখন সাধ পূরণ হল, নিজেকে ধন্য মনে হল, মনে হল ইহজন্ম সার্থক আমার, আজও নতুন জায়গায় বেড়াতে গেলে প্রকৃতির ঈশ্বরীকে আমি তাঁর পূর্ণ রূপে দেখা দেওয়ার জন্য প্রার্থনা জানাই। আর প্রতিবার তিনি আমায় ফেরান না। কোনো না কোনোভাবে আমি তাঁর বিচিত্র রূপে সমৃদ্ধ হয়ে ফিরে আসি। তাই এখানেও আমার বাল্যকালের লালিত স্বপ্নকে প্রত্যক্ষ করে আমি তাঁর চরণে প্রণতি না জানিয়ে পারলাম না। হয়তো আমার এই আবেগ অতিমাত্রায় প্রকাশমান, কিন্তু আবেগতাড়িত মুহূর্তগুলি ছাড়া ভাবব্যাকুল মানুষের সঞ্চয়ই বা কী ! তাই আমি আমার জীবনে গাছ ভরা লাল আপেল দেখার এই ক্ষণটিকে আবেগাপ্লুত হয়ে আমার জীবনের একটি সেরা মুহূর্ত বলে স্বীকৃতি দিয়ে দিলাম। আর খুশিতে উচ্ছল হয়ে ডাল লেকের নয় নম্বর ঘাটের উল্টোদিকে বিখ্যাত লাসা রেস্টুরেন্টে সুস্বাদু কাশ্মীরি আলুর দম আর পোলাও খেয়ে হাউসবোটে ফিরলাম। হাউসবোটেও খাবারের ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু গেস্ট প্রায় না থাকায় অনেক আগে অর্ডার করতে হতো বলে আমরা সেদিনও বাইরে খেলাম। আর খাবারের মান এত ভালো যে তাতে কোনো অভিযোগও ছিল না। বাইরে ঠাণ্ডাটাও ছিল বেশ আরামদায়ক। ফিরে হাউসবোটে ওয়াইফাই থেকে বাড়িতে ভিডিও কল করে সন্ধ্যার ডাল লেক দেখানোর প্রাণপণ প্রয়াস চালালাম দুজনে। কারণ আমাদের ফোনদুটি পোস্টপেড না হওয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল।

সোনমার্গ
পাহাড়ের ঢালে ভেড়ার পাল।

খুব অল্প সময় নিয়ে বেরিয়ে আসায় নতুন সিম আনার ব্যবস্থাও করে ওঠা হয়নি। তাই দিনের শেষে ওই যোগাযোগ। যা কিছু সুন্দর, মনের আনন্দ, তা সবই ইচ্ছে করে প্রিয়জনের সঙ্গে ভাগ করে উপভোগ করতে, না পারলে মন একটু উদাস। দূরে পাহাড়ের শীর্ষে শঙ্করাচার্য মন্দিরের আলো দেখে আবার মনে পড়ল সিঁড়িগুলো। বিশ্রাম নিতে যে ক’টি ধাপে দাঁড়িয়েছিলাম ডাল লেক শোভিত শ্রীনগরকে সেখান থেকেই দেখতে অপূর্ব লাগছিল। আর আমাদের হাউসবোটের ব্যালকনিতে দাঁড়ালে মন্দিরটা তেমনি একটা বিন্দুর মতো দেখা যেত। আলো জ্বললে রাতে তার দিকে তাকিয়ে আমার মনকেমন করত। কাল গুলমার্গ যাব। তার আগে সকালে ইমতিয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে শিকারায় প্রাতভ্রমণে বের হব। ইচ্ছে কাশ্মীর ট্যুরিজমের বিজ্ঞাপনে দেখা প্রস্ফুটিত ওয়াটার লিলি দেখার। সেদিন অন্ধকারে যখন দেখেছিলাম ওরা ঘুমিয়েছিল। শুনলাম ওরা নাকি সূর্যমুখীর মতো সূর্যের একনিষ্ঠ প্রেমিকা, ভালো সৌরালোক পেলে তবেই লজ্জা ভেঙে পূর্ণরূপে ফোটে। যদিও আমাদের বলা হল অত সকালে ফুল ফুটবে না, তবু মনের মধ্যে তিরতিরে আশা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম, যদি দেখতে পাই ! আর সুবিখ্যাত ডাল লেকে সূর্যোদয় দেখার লোভ তো ছিলই।

<< আগের পর্বঃ কাশ্মীর – একটি স্বপ্নপূরণ (শ্রীনগর পর্ব)

পরের পর্বঃ কাশ্মীর – একটি স্বপ্নপূরণ (গুলমার্গ পর্ব) >>

  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।