কাশ্মীর – একটি স্বপ্নপূরণ (শ্রীনগর পর্ব)

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

টুকটুকে লাল আপেল ভরা গাছ দেখব – এ ইচ্ছে আমার কোন বালিকাবেলায় তৈরি হয়েছিল জানিনা, কিন্তু মাঝে মাঝেই যেভাবে ইচ্ছেটা অস্থির করে তুলতো, তাতে মনে হতো আর বেশিদিন আমি থাকতে পারব না এই ইচ্ছেটা না মিটিয়ে। তাই এবার পুজোয় কিন্নর যাবার প্ল্যান করা হল, অগ্রিম টিকিট কাটার পর শুরু হল চার মাস পর কখন কাঙ্ক্ষিত দিন আসবে তার অপেক্ষা। কিন্তু তখন তো আর ভাবিনি দৈনন্দিনতা আর কাজের চাপ আমাদের এমন হাঁফিয়ে তুলবে যে তড়িঘড়ি টিকিট কেটে পুজোর আগেই চেপে বসব শ্রীনগরের ফ্লাইটে। আর বারবার তিনবার বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এত তাড়াহুড়োয় প্ল্যান করা কাশ্মীর ভ্রমণ আমাদের এভাবে সার্থক হয়ে উঠবে। জানিনা আর সবার মনে না-দেখা কাশ্মীর কেমন ধারণা নিয়ে বিরাজ করে। আমার মনে শুধু দাদুর মুখে গল্পে শোনা এক কাল্পনিক ছবি আঁকা ছিল, পৃথিবীর মধ্যেও আমাদের এক স্বর্গ আছে, যেখানে পাহাড় নদী ঝরনা ফুল পাখি সবকিছু স্বপ্নের মতো, তাই আমার স্বপ্নচারণ ছিল সেই কল্পনার রাজ্য নিয়ে। ছোটবেলায় ছবির বই বা ক্যলেন্ডারে কোনো সুন্দর পাহাড় উপত্যকা শোভিত প্রকৃতি দেখলেই কেন জানি আগে মনে হতো এটা কাশ্মীর। বিয়ের পর প্রথম ভ্রমণ শুরু আমার, ইতিমধ্যে পাহাড়, পর্বত, নদী, সমুদ্র সবাই আমায় দেখা দিয়ে কৃতার্থ করলেও মনের গহীনে আমার পরম আকাঙ্ক্ষিত কাশ্মীর এক অজানা শিহরণ নিয়ে গোপনে রয়ে গিয়েছিল। বারবার যাবার চেষ্টা করেও যখন নানা কারণে তা সফল হয়নি, তখন এটাই মনে হতো স্বর্গের দ্বারে পৌঁছানো কি অতই সহজ ! তাই এত আকস্মিক পরিকল্পনায় আমার অধরা স্বপ্নভূমি তার মোহময়ীরূপে, তার বিচিত্র বর্ণ গন্ধ সুষমা দিয়ে আমার এতদিনের ইচ্ছেকে পূর্ণ করবে, আমার হৃদয়পাত্রকে এভাবে মাধুর্যে ভরিয়ে দেবে আমি ভাবতে পারিনি। কাশ্মীর নিয়ে আমার এই আকূতি হয়তো কাশ্মীরের প্রকৃতিদেবী অনুভব করেছিলেন, তাই সূর্যের প্রেমে পূর্ণ প্রস্ফুটিত ওয়াটার লিলি, আপন সৌন্দর্যের মহিমায় স্পর্ধায় মাথা তোলা সজীব শতদল, ফলের ভারে (নাকি আমাদের স্বাগত জানাতে) নুইয়ে পরা গাছ ভরা সুগন্ধী লাল আপেল, এই সিজনের প্রথম তুষারপাত, সেই শুভ্র সতেজ তুষারাবৃত গম্ভীর পর্বতরাজি, সকাল-সন্ধ্যায় মায়াবী ডাল লেক আর সর্বোপরি হার্দিক আতিথেয়তায় উষ্ণ সেখানকার মানুষজন – সকল পটভূমি এভাবে সাজিয়ে রেখেছিলেন আমাদের মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেওয়ার জন্য।

ডাল লেকের প্রথম ঝলক
ডাল লেকের প্রথম ঝলক

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এক কুয়াশামাখা ভোরে দুরুদুরু বুকে রওনা দিলাম ভূস্বর্গের টিকিট হাতে নিয়ে, প্রতিবারের মতো যাত্রার প্রাকমূহুর্তে আরাধ্যা ঈশ্বরীর কাছে প্রার্থনা জানালাম ভ্রমণ যেন নির্বিঘ্ন হয়। শ্রীনগরে পৌঁছে গাড়িতে চেপে প্রথম থেকেই ইতিউতি আপেল গাছের সন্ধানে ফিরছে আমার চোখ। ডাল লেকের নয় নম্বর ঘাটে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হল, কারণ হাউসবোটে পৌঁছাতে গেলে চাপতে হবে শিকারায়। সেই ছবিতে দেখা, সিনেমায় দেখা শিকারায় চাপতে চলেছি। আমার বুকের লাবডুব আমিই শুনছি, বুঝতে পারছি শুরু হল সেই সময়, যখন একটি একটি করে আমার প্রার্থিত স্বপ্নেরা ঢুকে পড়বে আমার মুক্তাখচিত অভিজ্ঞতার ঝুলিতে, আর আমি মনের আবেগ উত্তেজনা আর খুশিগুলোকে সম্পূর্ণ চেপে রাখতে না পেরে চোখে মুখে তার রেশ নিয়ে তাদের সাদরে আত্মস্থ করব, চোখ খুলে, চোখ বন্ধ করে সামনের দিনগুলিতে একটু করে দেখব, অনুভব করব, পরিপূর্ণরূপে বিলীন হব প্রকৃতির এই মুক্তাঙ্গনে। পূর্ব-পরিচিতের মতো হাসিমুখে শিকারাচালক ইমতিয়াজ ভাইয়ের অভ্যর্থনায় তার শিকারায় বসে জল কেটে এগিয়ে যাওয়ার মৃদু মিষ্টি ধ্বনি, সারি সারি হাউসবোট, দুই পাশ দিয়ে অলস গতিতে বয়ে যাওয়া শিকারা, মাঝে মাঝে ফুটে থাকা ওয়াটার লিলি – কাশ্মীর তার কাশ্মীরোচিত ভঙ্গিতে আমাদের যে স্বাগত জানিয়ে দিল তা টের পেয়ে ধন্য হলাম। লেক ভিক্টোরিয়া হাউসবোটে পৌঁছে তার বারান্দা থেকে চতুর্দিকে পাহাড় পরিবেষ্ঠিত ডাল লেকের অপূর্ব সৌন্দর্য, হাউসবোটের অভিনব গঠনশৈলী, মূলত সিডার ও অন্যান্য গাছের কাঠ দিয়ে সজ্জিত আসবাব ও উপকরণ দেখে এককথায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। তাই পরিপাটি ঘরকে আমাদের ক্লান্তিরা অগোছালো করে তোলার আগেই অভিবাবুর ক্যামেরায় কিছু ছবি ধরা রইল।

নিশাত বাগ
নিশাত বাগ

পূর্বনির্দিষ্ট কথামতো দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম স্থানীয় শ্রীনগর ঘুরে দেখব বলে। একে একে দেখলাম শঙ্করাচার্য মন্দির, মুঘল গার্ডেন, শালিমার বাগ, নিশাত বাগ। অন্যের দেখে মনে মনে ট্রেক করার ইচ্ছে অল্পস্বল্প লালন করলেও সেটা যে আমার জন্য খুব সুখকর অভিজ্ঞতা হবে না তা বুঝলাম পাঁচ-সাতবার বিশ্রাম নিয়ে সমতল থেকে ৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত শঙ্করাচার্য মন্দিরের আড়াইশোটা সিঁড়ি ভাঙার পর। কিন্তু প্রতিটি কষ্টের পর যেমন আমাদের সবার ভাগ্যে ভগবান ভালো কিছু লিখে রাখেন, তেমনি ভালো লাগল উপরে পৌঁছে, বিশেষত মন্দিরের পাশে যেখানে তাঁর তপস্যার স্থান সেই জায়গাটি। ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এটি নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের বর্তমান ভবনটি খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দিতে নির্মিত। কথিত আছে, আদি শঙ্করাচার্য এখানে এসে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করলে এটি বৌদ্ধ মন্দির থেকে হিন্দু মন্দিরে পরিণত হয়। এরপর আমাদের প্রৌঢ় দক্ষ ড্রাইভার চাচাজির সঙ্গে যেতে যেতে নজর করলাম সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পপলার গাছগুলিকে। গাছের গঠনটি এমন সুদীর্ঘ ঋজু একক যে অনেকের সঙ্গে থেকেও তাদের একাকিত্ব কাটেনি। তবে এ একাকিত্ব মনে বিষাদ আনে না, আনে দৃঢ়তা। যেন একাকী মনের কাছে বার্তা পাঠায়, একা থাকার সহজ ছন্দ ও উল্লাসকে চিনিয়ে দেয়।

মন মাতানো শালিমার বাগ
মন মাতানো শালিমার বাগ

এরপর পৌঁছালাম চশমেশাহী মুঘল গার্ডেন, ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দের এক বসন্তে মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দারা শুকোকে এই বাগান উপহার দেন। সুদীর্ঘ এলাকা জুড়ে পাহাড়ের কোলে বিস্তৃত মনোরম এই বাগানে প্রবেশ মাত্রই অনুভূত হয় কেন মুঘল সম্রাট এই স্থানটি নির্বাচন করেছিলেন প্রিয় পুত্রকে বাগান নির্মাণ করে দেবার জন্য। এখানকার জল যে খুব বিশুদ্ধ, রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে, চাচাজির কাছে তা শুনে সকলের মতো আমরাও খেলাম সেই জল। সবুজের সমারোহ, নানা ফুলের সমাবেশ, আরামদায়ক আবহাওয়ায় বিভিন্ন স্থানীয় স্কুল থেকে বেড়াতে আসা কচিকাঁচার দল, দূরে স্নেহমিশ্রিত দৃষ্টি ফেলে দাঁড়িয়ে থাকা উদার পর্বতরাজি, মনটা খুব ভালো হয়ে গেলো। সময় কম, ইচ্ছে না থাকলেও এগিয়ে যেতে হল পরবর্তী গন্তব্য শালিমার বাগের দিকে। কাকে ছেড়ে কার কথা যে বলব ! মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর প্রিয় পত্নী নূরজাহানের জন্য এই বাগান নির্মাণ করেছিলেন ১৬১৯ খ্রিস্টাব্দে। মুঘল যুগের স্থাপত্য শৈলীর অসামান্য নিদর্শন দেখা যাবে এই বাগানে পৌঁছালে। এছাড়া সবুজে সবুজে ভরা, জানা-অজানা বাহারি রঙিন ফুলে সেজে থাকা এই বাগানের অপূর্ব অবস্থান মনকে চমৎকৃত করে। বাড়তি ভালোলাগা এনে দেয় স্বচ্ছ বারিধারা। প্রবেশ পথ থেকে শুরু করে প্রায় পুরো বাগান জুড়ে বিস্তৃত প্রশস্ত বাঁধানো সেই জলরাশির শোভা মনকে মুগ্ধ করে। জানা গেল, ডাল লেকের জল হল এই জলের উৎস। ডাল লেকের উত্তর দিক থেকে চ্যানেলের মাধ্যমে এখানে জল আনার ব্যবস্থা হয়। উল্লেখযোগ্য ভাবে চোখে পড়ে সুপ্রাচীন চিনার বৃক্ষ। পাতা দেখেই চিনে গেছি এ আমাদের কৈশোরের ঝড় আনা ‘মহব্বতেঁ’র পাতা। শোনা যায় নূরজাহান সুদূর পারস্য দেশ থেকে এই গাছ এনে কাশ্মীরের শোভা বর্ধন করেছিলেন। তারপর সারা কাশ্মীরে ছেয়ে যায় এই গাছ। আমরা শুধু সবুজ ও গুটিকয়েক হলুদ পাতা দেখতে পেলাম।

প্রিয় চিনার
প্রিয় চিনার। কৈশোরের মহব্বতেঁ পাতা

আরও কিছু সময় পরে লাল, হলুদ বিচিত্র বর্ণের শোভায় কাশ্মীরকে সাজিয়ে তুলবে নূরজাহানের প্রিয় এই গাছেরা। মনে ভাবলাম আবার কখনও সেই সৌন্দর্যের পিপাসী হয়ে চলে আসব। পড়ন্ত বিকেলে আমাদের হালকা শীতবোধ হলেও স্থানীয় ছেলেদের দিব্যি দীর্ঘ সময় ধরে সুখস্নানে রত থাকতে দেখা গেল। বেশ কিছু ছবি তুলে, মনে ভালোলাগার আবেশ মেখে রওনা দিলাম নিশাত বাগের দিকে। আর মনে ভাবতে লাগলাম যে শ্রীনগর যদি এত সুন্দর তো বাকি কাশ্মীর না জানি আর কী খাজানা জমিয়ে রেখেছে আমাদের জন্য। নিশাত বাগ হল কাশ্মীরের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো মুঘল গার্ডেন। ‘নিশাত বাগ’ উর্দু শব্দবন্ধের অর্থ হল আনন্দের বাগান। আক্ষরিক অর্থেই যে এই নাম প্রযোজ্য তা বলাই বাহুল্য। যে কোনো বিষাদাচ্ছন্ন মনে এই বাগান তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গুণে উৎফুল্লতার সঞ্চার করতে সক্ষম, তা দাবি করা চলে। ইচ্ছে থাকলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করার উপায় আমাদের ছিল না। কারণ ইমতিয়াজ ভাইয়ের শিকারা চেপে সন্ধ্যার ডাললেকের অনুপম সৌন্দর্য দেখার কথা নির্দিষ্ট হয়ে রয়েছে।

ব্যালকনি থেকে অপূর্ব দৃশ্যপট
ব্যালকনি থেকে অপূর্ব দৃশ্যপট

একটি জায়গা ছেড়ে আসার মনখারাপ অবলীলায় ভুলিয়ে দেওয়ার নিরুচ্চার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ কাশ্মীরের প্রতিটি বাঁক, তা খুব শিগ্গিরি টের পেলাম আমরা, যখন দূরে সারি সারি আলো জ্বলা হাউসবোটকে চোখে রেখে শিকারায় চেপে যাত্রা করলাম ফ্লোটিং মার্কেটের দিকে। জানিনা আমি ভাষা দিয়ে আমার সে যাপিত সুমধুর অভিজ্ঞতার স্বাদ কতখানি ফুটিয়ে তুলতে পারব, মনোরম এক সন্ধ্যায় প্রিয় মানুষের সঙ্গে শিকারার দোলায় মৃদুমন্দ দোল খেয়ে ডাল লেকের বুকে অলস ছন্দে ভেসে চলায় কী যে মাদকতা, কী যে আবেশ, তা কি বলে বোঝানোর ! মনে সাধ হয়, আহা, এই নিরুদ্বেগ ভেসে চলা কেন চিরন্তন হয় না ! আদি অনন্তকাল ধরে সকল প্রেমিক যুগলকে এই ভেসে চলায় সামিল হবার একান্ত আমন্ত্রণ জানাতে সাধ হয়, যা নতুন করে অনুভব করায় নিজেকে, নিজেদের অন্তরে লুক্কায়িত প্রেমকে। জলের উপর সারি সারি ভাসমান দোকানের একটি থেকে কিনে খাওয়া হল চা-কফি। আর চলতে চলতে অযাচিতভাবে পাশে আসা শিকারা থেকে কিনে খাওয়া হল ট্রাউট মাছের কাবাব। কী সুস্বাদু খেতে ! একইভাবে লোভ সামলাতে পারলাম না কাশ্মীরি পোশাক পরে ছবি তোলার। শিকারার দাঁড় হাতে পোজ দিতে গিয়ে মনে মনে এক অদ্ভূত আনন্দ কাজ করছিল, কেন জানিনা নিজেকে রানির মতো লাগছিল, মনে হচ্ছিল এই সব আয়োজন শুধুই আমাদের জন্য। এই অসময়ে আসা তাহলে এতটুকুও ব্যর্থ হয়নি। সত্যি বলতে যে কোনো জায়গায় বেড়াতে গেলে ভিড় কম থাকলে একটু বেশি আনন্দ হয়। এখানেও এখন অফ সিজিন চলছে, তাই আমাদের খুশিও অপরিসীম। হৃদয় ভরা আবেশ নিয়ে হাউসবোটের আরামদায়ক বিছানায় এলিয়ে দিলাম নিজেদের। চোখ জুড়ে নেমে এল প্রকৃতি দেবীর ঘুমকাঠির পরশ।

পরের পর্বঃ কাশ্মীর – একটি স্বপ্নপূরণ (সোনমার্গ পর্ব) >>

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share