মেঘ রাজ্যে দিন কতক (তিনচুলে পর্ব)

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

দার্জিলিং পর্ব শেষ করে আমরা পাড়ি দিলাম তিনচুলের উদ্দেশ্যে। আজ আবার সকাল থেকে আকাশের মুখ গোমড়া। দিনের বেলায় যেন অযাচিত ভাবে সন্ধ্যা এসে হাজির। চারিদিক ঘন মেঘে আচ্ছন্ন। দু হাত দূরের জিনিসও দেখা এক প্রকার দুঃসাধ্য। যতই আমরা সাহসী হই না কেন এই গাঢ় মেঘের বুক চিরে পাহাড়ী পথের পাকদণ্ডী বেয়ে গাড়ি যখন ঝপাত ঝপাত করে নিচের দিকে নামতে লাগল তখন আমরাও কয়েক মুহূর্ত ইষ্টনাম জপতে লাগলাম। মাঝে মাঝে উল্টোদিক থেকে গাড়িগুলো বিদ্যুৎ গতিতে পাশ কাটিয়ে কালোমেঘের মধ্যে গা ঢাকা দিল। কিন্তু ভয়ই যদি পাব তাহলে তো আর ভরা বাদলে পাহাড় দেখতে এতদূর আসতাম না।

অকারণ ভয় দূর হতেই মন পাড়ি দিল মেঘের পাখনায় ভর করে কোনোএক কল্পলোকের রূপকথার রাজ্যে। দেখতে দেখতে বৃষ্টি এল, গাড়ির কাঁচ ঝাপসা হয়ে এল। ঝাপসা কাঁচের ফাক দিয়ে আবছা দেখা বৃষ্টি স্নাত গাছ, তাজা জলসিক্ত চা বাগান, নাম না জানা অজানা বুনো ফুলের বৃন্ত থেকে গড়িয়ে পড়া মুক্তোর মতো জলবিন্দু আর পাইন গাছের ফাঁকে-ফাঁকে কোথাও আটকে থাকা আবার কোথাও ধোঁয়ার মত উড়ন্ত মেঘ দেখতে দেখতে আমরা যেন বাস্তববোধশূন্য হয়ে পড়লাম। সঙ্গে গাড়িতে হাল্কা ভলিউমে চলা সফ্ট রোম্যান্টিক গান আমাদের এই মোহমুগ্ধ আবিষ্টতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

তিনচুলে যাবার পথে
তিনচুলে যাবার পথে

প্রথমে কোথায় যাব সেকথা মোহন ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করতে আমরা ভুলেই গেছিলাম কারণ আমরা বোধহয় চাইছিলাম এ যাত্রা অনন্ত অফুরন্ত হোক। হঠাৎ মোহন ভাইয়ার অঙ্গুলি নির্দেশে রাস্তার পাশের দিকে তাকিয়ে বিস্তীর্ণ জমি দেখতে পেলাম ,ভাইয়া বলল এই জমিতে নাকি ওর রিসর্ট বানানোর সখ। তাতে থাকবে জিম থেকে শুরু করে সুইমিং পুল অবধি সব আধুনিক বিলাসিতার বন্দোবস্ত, পাশাপাশি থাকবে সম্পূর্ণ অরগ্যানিক পদ্ধতিতে তৈরী চাষের ক্ষেত এমনকি পুকুর ও। ছিপ ফেলে মাছ ধরা যাবে, ইচ্ছেমত সব্জি তুলে মাছ ধরে নিজেদের খাবার রান্না করে নিতে হবে নিজেদের। এককথায় বলা যায় সেটি হবে গ্রাম্য প্রশান্তির সাথে শহুরে বিলাসিতার সুষম মেলবন্ধন। শুনে সেই প্রস্তাবে সাধুবাদ জানালেও মনে মনে একবার হলেও ভেবেছিলাম লোকটা নির্ঘাত ভাট বকছে নয়তো বা এসব করতে কত খরচ তার আন্দাজ নেই। দেখতে দেখতে গাড়ি এসে দাঁড়ালো একটা সুসজ্জিত বাগান ঘেরা পাহাড়ী বাড়ির সামনে।

মোহন ভাইয়ের বাগান এর গেট
মোহন ভাইয়ের বাগান এর গেট

ভাইয়া বলল এসে গেছে অরেঞ্জ গার্ডেন। আমরা ভাবলাম কোনো প্রাইভেট গার্ডেন হয়তো, তাই বাড়ির সামনে মুখে স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোকটির কাছ থেকে টিকিট কাটতে গেলাম। কিন্তু তিনি তো টিকিট নিলেন না বরং সাদরে ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন পূর্বপুরুষদের বীরত্বের স্মারক হিসেবে দেওয়ালে টাঙানো হরিণের মাথা, বাঘের ছাল। দেখলাম ভুটান রাজপরিবারের সঙ্গে এই পরিবারের ঘনিষ্ঠতার বেশ কিছু ছবি। এখানেই শেষ নয় ড্রইং রুমের শোকেসে রয়েছে ভারত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অসংখ্য পদক। সেগুলি কী কারণে পাওয়া জানতে চাইলে বিনয়ী এই ভদ্রলোক জানালেন এই পরিরারের বেশিরভাগ সদস্যই সেনাবাহিনীতে কর্মরত, তাই এগুলি তাদের দেশভক্তির পরিচয়চিহ্ন হিসেবে পাওয়া। যত দেখছি তত মুগ্ধ হচ্ছি আমরা, এ তো আস্ত একটা মিউজিয়াম বলা চলে।

এই দুর্গম পাহাড়ের কোলে এমন সুন্দর করে বাড়িটি সাজানো কিভাবে সম্ভব সে কথাই আমাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল আর আমরা তখনও ভাবছিলাম যে ভাইয়া আমাদের এখানে আনল কেন? ট্যুর প্ল্যানে তো এরকম কিছু ছিল না। আর কমলালেবু বাগানই বা কোথায়? যা হোক এই উপরি পাওনা পেয়ে তো আমরা বেজায় খুশি। এবার ভাইয়া সঙ্গে করে আমাদের নিয়ে গেল কমলালেবু বাগান দেখাতে| কত্ত গাছ আর তাতে অসংখ্য কচি কচি লেবু ধরেছে, শুধুই কী লেবু গাছ? কী গাছ নেই সেখানে? বড়ো এলাচ, পাহাড়ী টমেটো, নানা প্রজাতির লঙ্কা, বিভিন্ন রকম অর্কিড আরও কত কী। ভাইয়া সব দেখিয়ে আর চিনিয়ে দিল, গাছ থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফল, ফুল হাতে ধরিয়ে দিল ইচ্ছেমতো। আমাদের খুশির আর সীমা নেই।

মোহন ভাইয়ের বাগান থেকে সংগ্রহ করা (বড় এলাচ, চা গাছ এর ফল, পাহাড়ি টমেটো, লংকা, কমলালেবু)

কিন্তু একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না যে কার বাড়িতে এলাম? কেনই বা এলাম? আমাদের শহুরে স্বার্থপর মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছিল নানান কু চিন্তা। ভাবছিলাম এর পিছনে কী কোনো উদ্দেশ্য আছে? এমন সময় ডাক পড়ল চা পানের। চায়ের টেবিলে বসে আসল রহস্য উদ্ঘাটন হল। এ যে মোহন ভাইয়ার নিজের বাড়ি। আর ওই সহাস্যবদন ভদ্রলোক হলেন মোহন ভাইয়ার পিতৃদেব। না ওনাদের কোনো কু উদ্দেশ্য নেই। আসলে আমাদের মতো লাভ লোকসান- অভিসন্ধি দুরভিসন্ধির হিসেব এই পাহাড়ী সরল মানুষগুলো আজও বুঝে ওঠেনি। মোহন ভাইয়া মাত্র একদিনের পরিচয়ে আমাদের নিজের পরিবারের সদস্য ভেবে আপন করে নিয়েছিল, আর আপন করে নিয়েছিল ভাইয়ার পুরো পরিবার ও। সত্যিকথা বলতে কি নিজেদের নীচ মনোবৃত্তির জন্য নিজের সাথে চোখ মেলাতে পারছিলাম না আমি। নিজেদের বাগানের চা পাতা দিয়ে ঘরোয়া পদ্ধতিতে বানানো সুগন্ধী গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমরা হারিয়ে গেলাম উষ্ণ অভ্যর্থনায়। মনে হল যেন আমাদেরই কোনো পরম আপনজন এরা।

মোহন ভাইয়ার বহুভাষী বাবা দিব্যি সাবলীল ভাবে ইংরেজী, বাংলা, হিন্দীতে নিজেদের জীবনের কাহিনী শুনিয়ে গেলেন। এই ভদ্রলোকটি কোনো পাহাড়ী অশিক্ষিত ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন কোনো এক কলেজের প্রিন্সিপাল অথচ কী অসাধারণ তার সাধারণত্ব। আমরা যেখানে প্রতিদিন সামান্য শিক্ষা, কিঞ্চিৎ অর্থের বলে বলীয়ান মানুষের উন্নাসিকতা দেখতে অভ্যস্ত সেখানে এই ভদ্রলোক আমাদের আরও একবার দেখিয়ে দিলেন প্রকৃত মানবিকতা আজও হারিয়ে যায়নি, লুকিয়ে আছে আমাদেরই কারো কারো হৃদি মাঝে। মনে মনে লজ্জিত হলাম মোহন ভাইয়ার রিসর্ট বানানোর পরিকল্পনাকে তার দুঃসাহস ভবেছিলাম বলে। দেখলাম এদের যে বিপুল পরিমান জমিজমা ও সম্পত্তি তাতে আমাদের মত চোদ্দ পুরুষকে বসিয়ে খাওয়ালেও বিন্দুমাত্র কমবেনা।

তিনচুলে যাবার পথে চা বাগান
তিনচুলে যাবার পথে চা বাগান

গল্পে আড্ডায় যে কতক্ষণ কেটেছিল খেয়াল করিনি। একসময় মন না চাইলেও আবার ফিরে এসে রাত্রিযাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই স্নেহময় পরিবারের থেকে বিদায় নিতেই হল। সঙ্গে রইল মোহন ভাইয়া, তাকে যে কী ভাষায় ধন্যবাদ জানাব বুঝে পেলাম না আমাদের এই অভাবনীয় অপ্রত্যাশিত অনন্যসাধারণ মুহূর্ত গুলো উপহার দেওয়ার জন্য যা এ জীবনে কোনোদিন ভুলতে পারব না।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।