মেঘ রাজ্যে দিন কতক (দার্জিলিং, মিরিক পর্ব)

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

বর্ষায় দার্জিলিং! অনেকের অনেক আপত্তিকে ফুৎকারে উড়িয়ে আমাদের অত্যুৎসাহী ছয় জনের দলটি সেপ্টেম্বরের ২ তারিখে রওনা হয়েছিলাম দার্জিলিং এর পথে। বর্ষায় যাচ্ছি বলে কথা, মনে তো ভয় ছিলই। যদি রাস্তায় ধস টস নেমে আটকে পড়ি! ঠাকুর ঠাকুর করে যদিও এ যাত্রায় সেরকম কোনো বিভ্রাটে আমরা পড়ি তো নিই বরং যে দুর্লভ জিনিস আমরা পেয়েছি তা আমাদের একেবারে কল্পনাতীত ছিল। তিনচুলেতে সেই দুর্লভ প্রাপ্তির কথা নয় পরের পর্বে বলব। আজ বলি প্রথম দুদিনের দার্জিলিং ভ্রমনের গল্প।

মেঘে ঢাকা মিরিক
মেঘে ঢাকা মিরিক

বর্ষার প্রকৃতি যে কি ভয়ঙ্কর সুন্দর হতে পারে তা চাক্ষুষ না করলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। পথের ধারে ধারে সারি সারি পাইন গাছে দু দন্ড শান্তির নীড় খুঁজে পেয়েছে পথক্লান্ত মেঘরাশি। যতদূর চোখ যায় গাঢ় সবুজ চায়ের ক্ষেতগুলি তো মেঘের আপন রাজ্য আর সবুজ চা বাগানের মাঝে সরু আঁকাবাঁকা রাস্তা গুলো যেন বসুধার ঘন কেশপাশের ফাঁক থেকে উঁকি দেওয়া সূক্ষ সিঁথি।

গোপালধারা চা বাগান
গোপালধারা চা বাগান

নাম না জানা অসংখ্য আজানা বুনো ফুল হাসিমুখে স্বাগত জানাচ্ছে আমাদের। মেঘ সরে গিয়ে কখনও বেরিয়ে পড়ছে ঝকঝকে নীল আকাশ আর সেই ক্যানভাসে রঙ তুলিতে আঁকা পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘ। এ সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। এইসব দেখতে দেখতে এন.জে.পি থেকে আমরা পৌঁছে গেলাম একে একে টিংলিং ভিউ পয়েন্ট, গোপালধারা টি গার্ডেন, মিরিক, সীমানা ভিউ পয়েন্ট হয়ে দার্জিলিং এ আমাদের অাগে থেকে বুক করে রাখা হোটেল মেফেয়ার এ। তবে স্টার রেটেড মেফেয়ার ভাববেন না যেন। অত টাকা বাপু আমাদের নেই তাই জালি মেফেয়ারেই কাজ চালাতে হয়। গাড়ি থেকে নেমেই তো আমাদর চক্ষু চড়কগাছ। লাগেজ নিয়ে অত সিঁড়ি উঠব কী করে। হোটেলে উঠে ভাবলাম এখান থেকে পালাতে পারলে হয়। রোজ রোজ এত সিঁড়ি কে চড়বে রে বাবা!

হোটেল মেফেয়ার থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা
হোটেল মেফেয়ার থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা

তবে সে সিদ্ধান্ত বদলাতে মাত্র রাতটুকু লেগেছিল আমাদের। সকালে উঠে বারান্দায় বেরিয়েই তো আমি এক্কেবারে হাঁ। সামনে তো পুরো হিমালয় হাজির, সেই দেখে আমার মা গত রত্রের সব রাগ ভুলে বলে বসল যতবার আসব ততবার এখানেই থাকব।

দার্জিলিং স্টেশন থেকে দার্জিলিং শহর
দার্জিলিং স্টেশন থেকে দার্জিলিং শহর

এইসব পর্ব পেরিয়ে রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট করে আমরা একটা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সাইটসিন এ। গাড়ির চালক মোহন ভাই তখনও আমাদের কাছে সাধারন একজন ড্রাইভার ই ছিলেন। তখনও বুঝিনি মাত্র দু দিনের পরিচয়েও মানুষ কত আপন হয়ে যেতে পারে। অন্তত শহরবাসী সংকীর্ণচেতা আমাদের মত মানুষের কাছে পাহাড়বাসীদের সহজ অনাবিল আতিথেয়তা স্বর্গীয় পাওনা বলেই মনে হয়। সে আতিথেয়তা যা আমাদের এ বারের ভ্রমণ কে সেরার সেরা করে দিয়েছে সেই গল্প পরের পর্বে শোনাব।

মেঘে ঢাকা পথ
দার্জিলিং এর মেঘে ঢাকা পথ

যাই হোক মোহন ভাইয়ার সঙ্গে আমরা পাড়ি দিলাম সাইটসিইং এ। রক গার্ডেন, হ্যাপি ভ্যালির চা কারখানা , চিড়িয়াখানা, জাপানীস টেম্পল আরও অনেক কিছুই দেখলাম। সবই ভালো লাগল তবে আমার যেন পথ চলাতেই আনন্দ। তাই লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেয়ে পথের দু ধারের দৃশ্য, রাস্তার বাঁক, বুনো ফুলের বাহার, মেঘ রৌদ্রের লুকোচুরিতেই আমার দার্জিলিং দর্শন সার্থক হল। গ্লেনারিসে নৈশভোজ যেন আলাদা একটা রয়্যাল ফিলিংসে মন ভরিয়ে দিলো।

মেঘ আলোর লুকোচুরি
মেঘ আলোর লুকোচুরি

সব মিলিয়ে অনবদ্য ছিল আমাদের বর্ষায় দার্জিলিং ভ্রমণের প্রথম অধ্যায়|

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।