নির্জন সুন্দর তিনচুলে

যুক্ত করা হয়েছে

দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। গরমের ছুটিতে পাহাড় অভিযান পর্বে সবচেয়ে ভাললাগার তালিকায় জোরপোখরি যদি সবার উপরে থাকে তাহলে তিনচুলের জায়গা ঠিক তার পরেই। মানুষের কোলাহল, যানবাহনের ক্যাকোফোণি এড়িয়ে যারা প্রকৃতির নির্জনতায় হারিয়ে যেতে চায় বা জীববৈচিত্র্য যাদের পছন্দ অথবা wildlife photography যাদের প্যাশন তিনচুলে তাদের জন্য আদর্শ। কি আছে এখানে? প্রকৃতি, প্রকৃতি আর প্রকৃতি।

তিনচুলে

রাস্তার দুপাশে ঘন রহস্যময়ী পাইন বন, যার মধ্যে দিনের বেলাও নেমে আসে গোধূলির বিষণ্নতা। সেই বনের মধ্যে দিয়ে কখনো উঠে গেছে সিঁড়ি আবার কখনো নিতান্ত অবহেলায় পায়ে পায়ে তৈরি হওয়া সুঁড়িপথ। লামাহাট্টায় দু’দিন থেকে সেখান থেকে তিনচুলে ঢোকার পথে প্রথমেই যে হোম স্টে পড়ে তা হল অবিরাজ হোম স্টে। চেক ইন টাইমের আগেই পৌঁছে যাওয়ায় বিব্রত মুখে হোম স্টের মালিক অবিরাজ জানালো আসেপাশে একটু ঘুরে আসতে। ব্যাস, এরপর সেইসব অতি অখ্যাত পাহাড়ি সুঁড়িপথ বেয়ে শুরু হল আমাদের অভিযান। পরবর্তী প্রায় পাঁচ ঘন্টায় জনমনুষ্যহীন পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে আর অচেনা অজানা পাখ-পাখালীর কনসার্ট শুনতে শুনতে কখনো আবিষ্কার করলাম পাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট হ্যামলেট তো কখনোও দেখা পেলাম গভীর বনের মধ্যে পাহাড়ি ঝোরার।

তিনচুলে

প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যেতে যেতে এরপর যার সাথে দেখা হল তিনি কুমার শেরপা। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী গভীর বনপথে পাহাড়ে উঠছিলেন কিছু গাছগাছড়া সংগ্রহ করতে। দুটি মেয়েকে বনের এত গভীরে এভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখে অবাক হবার পালা ওঁদের। বললেন এদিকে সাধারণত টুরিস্ট আসে না, তবে খুব মাঝে সাঝে আমাদের মতো কিছু পাগলের দেখা মেলে। পাহাড়ের একদম উপড়ে ওঠার লোভটা উনিই দেখালেন এবং পরবর্তী কিছুটা সময়ের জন্য স্বেচ্ছায় আমাদের গাইড হবার ভারটাও নিলেন।

এরপর দিনদুয়েক আগের বৃষ্টিস্নাত হয়ে থাকা স্যাঁতস্যাতে পথ বেয়ে নিতান্ত আনাড়ির মতো (ট্রেকিং করার কোনো সাজসজ্জা আমাদের ছিল না। শুধু ছিল মনের জোর আর প্রকৃতির মধ্যে মিশে যাবার একান্ত ইচ্ছা) মেঘ,পাহাড়,পাইন বন, আর কুয়াশার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে, প্রকৃতির একান্ত নিজস্ব বিচিত্র নানান শব্দ শুনতে শুনতে যে চূড়োটায় আমরা উঠলাম স্থানীয়রা তাকে বলে কার্গিল দাঁড়া। পাহাড়চূড়ায় উঠে সামান্য বিশ্রাম নেবার ও চারপাশের অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য মন ভরে উপভোগ করার ফাঁকের একান্ত আলাপচারিতায় কুমার শেরপা ও তাঁর স্ত্রী যখন শুনলেন যে আমরা এই দুই বন্ধুই এসেছি এবং আমাদের সাথে আর কেউ নেই অবাক হবার পালা ওঁদের। স্মিত হেসে যখন জানালাম যে আমরা একদম একা একাও মাঝে মধ্যেই বেড়িয়ে পড়ি তখন বিস্ময়ে বাক্যরহিত অবস্থা ওঁদের।

তিনচুলে

আসলে দোষ এই সরল মানুষগুলোর নয়, মেয়েরা যে কি কি পারে সেটা মানতে সমাজের যে আর কত দিন লাগবে কে জানে! মেয়েরা কয়েকজন মিলে একসাথে বা একা একা বেরলে অনিবার্যভাবেই দেখেছি প্রশ্নটা ওঠে সাথে গার্জেন আছে কিনা! আর নেই শুনলে শুরু হয় সাহসী বলে পিঠ চাপড়ানোর পালা। এবারও তার ব্যাতিক্রম না। এক ভদ্রলোক তো বলেই বসলেন যে তাহলে ‘মেল শভিনিজ্ম’ এর দিন শেষ! হা হা হা, নিজ ইচ্ছার অধীন হয়ে ঘোরাঘুরি প্রত্যেকের অধীকারের মধ্যে পড়ে, আর কে এই অধীকারের কতটা প্রয়োগ/অপপ্রয়োগ করবেন অথবা কে নিজের কতটা মুক্তি ঘটাবেন সেটা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর আবার মেল ফিমেল কি আর শভিনিজমই এর প্রসঙ্গই বা সবসময় এত প্রবল হয়ে ওঠে কেন সে প্রসঙ্গ যারা তোলেন তাঁরাই বোধহয় এর ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। সমাজ যে কবে সাবালক হবে কে জানে!

যাই হোক, কুমারজির কথায় জানতে পারলাম যে বনে বুনো শূকর, নেকড়ে ইত্যাদির দেখা মাঝে সাঝেই মেলে আর জায়গাটা যাকে বলে জোঁকের একদম স্বর্গরাজ্য। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে লামাহাট্টা থেকে জোরপোখরি এই সফরের কোথাও আমরা সেভাবে জোঁক বা অন্যান্য বন্য কোনো জীবজন্তুর মুখোমুখি হয়নি।

কুমার শেরপাজি আমাদের ফোন নম্বর নিলেন এবং বার বার বললেন পরের বার যেন ওঁর বাড়িতেই গিয়ে উঠি। তারপর উনি আর ওঁনার স্ত্রী আমাদের নেমে যাবার পথ দেখিয়ে নিজেদের কাজে চলে গেলেন। বিকেলে, আমরা যখন হোম স্টেতে ফিরে এসেছি তখন উনি ফোন করেছিলেন, আমরা ঠিকভাবে ফিরেছি কিনা জানার জন্য। পাহাড়ি এই সরল, সাধাসিধে, অমায়িক, কপটতাহীন আন্তরিক মানুষগুলি বার বার মুগ্ধ করে আমায়।

তিনচুলে

কুমারজির দেখানো জনমনুষ্যহীন পথে পাহাড় থেকে নেমে আমরা যখন হোম স্টেতে ফিরে এলাম তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। অবিরাজ রীতিমতো উদ্বিগ্নমুখে জানালো আমাদের নাকি ও খুঁজতেও বেরিয়ে পড়েছিল! দুপুরের খাওয়া শেষে হোম স্টের পেছনেই যে চা-বাগান নেমে গেছে আমরা সিঁড়ি বেয়ে সেখানে নামলাম। তারপর ওখান থেকে উঠে এসে আবার পাইন বীথি পেরিয়ে গুরুং লজের পাস দিয়ে যে সরু রাস্তা চলে গেছে তা ধরে বনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অখ্যাত ছোট্ট মনাস্ট্রীটায় গেলাম। তখন প্রায় বিকেল। মনাস্ট্রীর মধ্যে লোকজনের ভিড় কম। বৌদ্ধ সন্যাসীদের অনবরত পড়ে চলা মণ্ত্রধ্বনি পরিবেশে যোগ করেছে অনন্য মাত্রা। এখানেই গাছে দেখা মিলল oranged bellied Himalayan Squirrel এর। ফোনে ক্যামেরা রেডি করে ছবি নিতে যাবার আগেই বাবাজিরা গাছের মগডালে উঠে একদম হাওয়া!

তিনচুলে

এরপর সুঁড়িপথ ধরে আরেকটু এগিয়ে এক ভিউ পয়েন্ট। তখন সূয্যিমশাই প্রায় পাটে যান যান। মেঘ ফুঁড়ে নেমে আসছে সূর্যরশ্মি। সাক্ষী হয়ে রইলাম সেই অপার্থিব দৃশ্যের। এরপর ফিরে এলাম হোম স্টেতে। দূরে আঁধারের বুকে তখন একটা দুটো করে চমকাতে শুরু করেছে হীরককুচি। হোম স্টের খোলা ছাদে সন্ধ্যেবেলায় চিকেন পকোড়া সহযোগে ধোঁয়া ওঠা চায়ে ঠোঁট রেখে দূরের কালিম্পং শহরের সন্ধ্যে নামা দেখাও এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আর সেদিকে চোখ রেখেই আমরা ঠিক করলাম , না, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরা নয়, পাহাড়ের কোলে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটাতে হবে আরো কয়েকদিন। সেইমতো ঠিক হল পরেরদিন যাব লেপচাজগৎে

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।