সান্দাকফু – বাজেট ট্যুর প্ল্যান

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
1

প্রথমেই আমাদের ট্যুর এর রুটটা বলে নেইঃ ঢাকা – কোলকাতা – দার্জিলিং – সান্দাকফু – কোলকাতা – ঢাকা। সর্বমোট সময় = ৭ রাত ৬ দিন। তবে বিস্তারিত পড়ার আগে একটা জিনিস মাথায় রাখবেন – যারা অঢেল টাকা, সময় নিয়ে রিলাক্স ট্যুর করতে চান এই ট্যুর প্ল্যান তাদের জন্য নয়।

আমরা ৫ বন্ধু-বড় ভাই মিলে প্ল্যান অনুযায়ী ১১ অক্টোবর রাতে অারামবাগ থেকে রয়েল কোচে (৫০০ টাকা) রাত ৯.৩০ এ যাত্রা শুরু করে বেনাপোল পৌছাই সকাল ৯ টায়। বাস থেকে নেমে ইমিগ্রেশনের সমস্ত কাজ শেষ করে বর্ডার পার হই। টাকা রুপিতে কনভার্ট করে প্রথমে নাস্তা সেরে বনগা রেলস্টেশনে পৌছাই ১০.৩০ টার দিকে। বনগা থেকে ডাইরেক্ট ট্রেন অাছে শিয়ালদাহ স্টেশনের (বনগাহ লোকাল), ভাড়া ২০ রুপি। অামরা বনগা থেকে প্রথমে কল্যানী নেমে এক অাত্নীয়ের বাসায় গিয়ে গোসল সেরে খাওয়া দাওয়া সেরে রওনা হই শিয়ালদাহ। সন্ধ্যা ৬ টায় শিয়ালদাহ পৌছে শিয়ালদাহ টু নিউ জলপাইগুড়ি গামী দার্জিলিং মেইল এ ১৮৪ রুপির অাসনবিহীন টিকেট কেটে ৫৭২ কিমি. এর দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে নিলাম। ট্রেন ছাড়বে রাত ১০.১০ মি. তাই সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য সীম কেনার উদ্দেশ্যে বিগ বাজারের সামনে গেলাম। সীম কিনে (অামরা জিও সীম কিনেছিলাম ৩০০ রুপিতে) অাশেপাশে কিছু সময় ঘুরে নাস্তা সেরে ৮ টায় প্লাটফর্মে চলে এলাম। এসে অাসনবিহীন টিকেটের যাত্রীদের লাইনে দাড়ালাম, ভাগ্য ভাল হলে সিট পেয়েও যেতে পারি এই অাশায়।

সান্দাকফু

এসময় রাতের খাবারের জন্য হালকা রুটি কলা কিনে নিলাম। কপাল ভাল সিট পেয়েও গেলাম। সিট সিস্টেম দোতলা। দুজন নিচে, তিনজন উপরে বসে গেলাম। সকাল ৯ টায় জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌছালাম। নেমে নাস্তা সেরে এক ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে জলপাইগুড়ি টু দার্জিলিং জিপভাড়া+ দার্জিলিং এ এক রাতের থাকার হোটেল + পরের দিনের ১০ টি স্পট ঘোরার জিপভাড়া সহ ৬৫০০ রুপিতে ঠিক করলাম। মানে পার হেড ১৩০০ রুপি। এটা নাও করতে পারেন কিন্তু অামরা এখান থেকে এজেন্সির মাধ্যমে এটা ঠিক করায় অামাদের সময় + ঝামেলা অনেক কমে গিয়েছিল।

দুপুর ১.৩০ টার দিকে দার্জিলিং পৌছে হোটেলে চেক ইন করে গোসল করে খেতে বের হয়ে পরলাম । দার্জিলিং এ মেইন মসিজদ যেটা শহরের মাঝে কাউকে জিগ্যেস করলেই দেখিয়ে দিবে। তার পাশেই দুটো মুসলিম হোটেল অাছে। সেখানে খুব কম খরচে খেয়ে নিলাম। খাবারের স্বাদও ভালো, দামও কম।

বিকাল এবং রাতে অামরা নিজেদের মত করে শহর চষে বেরালাম। রাতের দার্জিলিং (Darjeeling) সাথে টুকটাক কেনাকাটা। মল চত্তর এ অাড্ডাটা অনেক দিন মনে দাগ কাটবে। তারপর সেই মুসলিম হোটেলে অাবার সস্তায় রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। পরদিন সকালে ৪ টায় রিজার্ভ জিপে করে টাইগার হিলে যেতে হবে তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরলাম। সকাল ৪ টায় ঘুম থেকে উঠে টাইগার হিল ( সকালের প্রথম সূর্য কাঞ্চনজংঘার চূড়ায় পড়ায় যে কি অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল তা না দেখে উপলব্দি করা সম্ভব না) থেকে ঘুরে ( মাঝে সকালের নাস্তা সেরে নিয়েছিলাম) শহরের বাকী সব স্পট ঘুরে সকাল ১১ টার মধ্যে হোটেল চেক অাউট করে বের হলাম অামাদের অাসল গন্তব্য সান্দাকফু এর উদ্দেশ্যে।

সান্দাকফু

এখানে অামাদের খুব সময় স্বল্পতা ছিল কারন দুপুর ২ টার মধ্যে মানেভান্জন না পৌছাতে পারলে ঐ দিনে অার সান্দাকফু (Sandakphu) যাওয়া যাবে না। তাই খুব রিস্কের মধ্যে শেয়ার জিপে করে ৭০ রুপি পার হেড হিসেবে ১ টায় মানেভান্জন পৌছালাম। দ্রুত জিপ ( ল্যান্ড রোভার) ভাড়া করে সব ফরমালিটিস শেষ করে কিছু খাবার কিনে উঠে পরলাম জিপে। দীর্ঘ ৪/৫ ঘন্টার জার্নি বাট দূরত্ব মাত্র ৩১ কিমি। প্রচন্ড ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ী রাস্তা বলে এত সময় লাগে। মাঝে বেশকয়েকবার যাত্রাবিরতি ও চা কফি পানের মাধ্যমে সন্ধ্যা ৫ টায় অামরা স্বপ্নের সান্দাকফু পৌছালা।

যাবার পথে প্রতি পদে পদে রোমাঞ্চ যা ছবি কিংবা ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব। রাস্তার পাশের সারি সারি পাইন অার ওক গাছ যা পরিবেশকে অারো সুন্দর করে তুলেছে। মাঝেমাঝে দেখা মিলেছে পাহাড়ি গরু ও কুকুরের। ভয়ংকর দর্শন সেসব প্রানি অাসলে খুবই নিরীহ। উল্লেখ্য যে, জিপ ভাড়া ৪৮০০ রুপি ( অাসা যাওয়া)। ড্রাইভারকে ১০০ রুপি বকশিস দিয়ে কাল সকালে অামাদের ৯ টায় নিতে অাসার কথা বলে তাকে বিদায় দিলাম।

সান্দাকফু

হোটেল চেক ইন করে অামরা অাসেপাশে দেখার জন্য বের হয়েছিলাম কিন্তু তীব্র বাতাস অার ঠান্ডার প্রোকোপে টিকতে না পেরে হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে বিদ্যুত নেই, মোবাইলের নেট নেই, সব কিছুরই সংকট। তবে টাকা দিলে সবই মিলে। অামাদের হোটেল ভাড়া ছিল ১৪০০ রুপি, ৫ জন একই রুমে। রাতে অামদের হেটেলেই দেখা মিলল দেশি ভাইদের। মিরপুরের ৩ ভাই। সত্যিই তাদের সাথে রাতটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে অাজীবন। তুমুল অাড্ডাবাজিতে কেটেছে রাতটুকু। রাতে অামরা খাবারের অতি উচ্চমূল্যের কারনে নুডলস খেয়েই রাত কাটিয়েছিলাম।

পরদিন সকালে ভোর ৫ টায় উঠে সান্দাকফুর টপ ভিউ পয়েন্টে গেলাম। এখানে উঠে অামাদের এই কদিনের সব কস্ট, না খেয়ে থাকা সব দূর হয়ে গেল। অামরা কিছুসময় বাকরুদ্ধ হয়ে ছিলাম। অাল্লাহ কত সুন্দর প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন। কি অদ্ভুত সুন্দর তা না দেখলে জীবনই বৃথা। একপাশে হিমালয়ের ৫ টি সর্বোচ্চ চূড়া, অন্যপাশে মেঘের ভেলা। মানে এ এক স্বপ্ন, পাহাড়, মেঘ, সূর্য সব মিলেমিশে একাকার! স্বপ্ন সার্থক।

সান্দাকফু

সকাল ৯ টার মধ্যে সব ভিউ দেখা শেষ করে নাস্তা করে রেডি হলাম। হোটেল চেক অাউট দিয়ে ড্রাইভার মামাকে নিয়া চলে অাসলাম গাড়িতে। পথে বিভিন্ন ভিউ পয়েন্টে বিরতির মাধ্যমে দুপুর ২ টায় এসে পৌছালাম মানেভান্জন। সেখান থেকে গন্তব্য শিলিগুরি। তাই রিজার্ভ জিপে করে অাসলাম প্রথমে সুখিয়া পোখারি, ২০০ রুপি, পার হেড ৪০ রুপি। সেখান থেকে ডাইরেক্ট শেয়ার জিপ অাছে শিলিগুরির বাট ওই জিপ না পাওয়ায় পাবলিক বাসে করে চলে যাই ২০ রুপি করে পার হেড ঘুম স্টেশনে। সেখান থেকে শেয়ার জিপে করে শিলিগুরি ১৫০ রুপি করে পার হেড। শিলিগুরি পৌছালাম সন্ধ্যা ৬.৩০ এ। ভাড়া চুকিয়ে চলে গেলাম বাস কাউন্টার।

শিলিগুরি থেকে অনেক বাস অাছে কলকাতার। অামরা অাতিয়ানা পরিবহনে স্লিপার এ ৫৫০ রুপি করে টিকেট কেটে চলে গেলাম সারাদিনের না খাওয়া পেটকে শান্ত করতে। পাশেই নরমাল একটা দোকানে গলা পর্যন্ত খেয়ে উঠে পরলাম বাসে। বাস ছিল পুরোটাই ফাঁকা,তাই নিজেদের মত বসে ঘুমিয়ে সকাল ১১ টায় এসে পৌছালাম ধর্মতলা, কলকাতা। বাস থেকে নেমে পাবলিক টয়লেটে ফ্রেশ হয়ে একটা হোটেলে সস্তা খাবার খেয়ে চলে গেলাম নিউমার্কেট, কলকাতা। সারাদিন যে যার মত কেনাকাটা করে সন্ধ্যায় হোটেলে চেক ইন করে গোসল/ ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে পরলাম রাতের কলকাতা দেখতে। মেট্রো, পার্ক স্ট্রীট, মহাত্বা গান্ধী রোডের মন্ডপ কোনটিই বাদ যায় নি। উৎসবের শহর কলকাতা, সারারাত কলকাতা শহর ঘুরে হোটেলে ফিরলাম রাত ৩ টা। একটু ঝিমিয়ে সকাল ৫ টায় চলে গেলাম হাওড়া ব্রীজ। গঙ্গায় জগন্নাথ ঘাটে হাতমুখ ধুয়ে হাওড়া স্টেশন হয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ইডেনগার্ডেন, ন্যাশনাল পার্ক সব ঘুরে হোটেলে ফিরলাম এবং নাস্তা করে নিলাম। তারপর একটু ফ্রেশ হয়ে ১২ টায় হোটেল চেক অাউট করলাম। হোটেল ভাড়া ছিল ১২০০ রুপি, ৫ জন, ১ রুম।

সান্দাকফু

হোটেল থেকে সোজা ট্যাক্সি করে শিয়ালদাহ স্টেশন। দুপুর ১.৫৫ মি. এ বনগা গামী ট্রেন বনগা লোকাল, ২০ রুপি করে ৭৬ কিমির পথ টিকেট কেটে উঠে পরলাম। বিকাল ৪ টায় পৌছালাম বনগা স্টেশন। দ্রুত সিনজিতে করে বেনাপোল বর্ডার চলে অাসলাম। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করে বাংলাদেশে ব্যাক করলাম। দেশে ঢুকেই এতদিনের নাখাভুখা পেটকে শান্ত করলাম। তারপর অাবার রয়েলে করে ৫০০ টাকার টিকেট কেটে ঢাকা চলে অাসলাম। স্বপ্নের ট্যুরের পরিসমাপ্তি হল।

সম্পুর্ন ট্যুরের পার হেড খরচ

{৪ রাত গাড়িতে + ৩ রাত হোটেলে }

(১১ তারিখ রাত ) 
ঢাকা টু বেনাপোল টু বনগা টু শিয়ালদাহ = ৬০০ রুপি

(১২ তারিখ) 
সকালের নাস্তা + দুপুরের খাবার + রাতের খাবার = ২০০ রুপি
শিয়ালদাহ টু নিউ জলপাইগুড়ি বাই ট্রেন = ১৮২ রুপি

(১৩ তারিখ) 
সকালের নাস্তা + দুপুরের খাবার + রাতের খাবার = ২০০ রুপি
জলপাইগুরি টু দার্জিলিং = ৩০০ রুপি
হোটেল ভাড়া =৪০০ রুপি
জিপ ভাড়া ( দার্জিলিংয়ের ১০ স্পট) = ৬০০ রুপি

( ১৪ তারিখ ) 
দার্জিলিং টু মানেভান্জন জিপ ভাড়া = ৭০ রুপি
মানেভান্জন টু সান্দাকফু ল্যান্ড রোভার ( অাপডাউন ) এন্ট্রি ফি সহ = ১০০০ রুপি
সকালের নাস্তা + দুপুরের খাবার + রাতের খাবার = ৩০০ রুপি
হোটল ভাড়া = ৩০০ টাকা

( ১৫ তারিখ ) 
মানেভান্জন টু সুখিয়াপোখারা = ৪০ রুপি
সুখিয়া টু ঘুম = ২০ রুপি
ঘুম টু শিলিগুড়ি = ১৫০ রুপি
সকালের নাস্তা + দুপুরের খাবার + রাতের খাবার = ৩০০ রুপি
শিলিগুড়ি টু কোলকাতা বাই বাস = ৫৫০ রুপি

(১৬ তারিখ ) 
সকালের খাবার + দুপুরের খাবার + রাতের খাবার = ২৫০ রুপি
হোটেল ভাড়া = ২৫০ রুপি

( ১৭ তারিখ ) 
সকালের খাবার + দুপুরের খাবার + রাতের খাবার = ২০০ রুপি
কলকাতা টু শিয়ালদাহ বাই ট্যাক্সি = ৩০ রুপি
শিয়ালদাহ টু বনগাহ বাই ট্রেন = ২০ রুপি
বনগাহ টু বেনাপোল বাই সিএনজি = ৩০ রুপি
বেনাপোল টু ঢাকা বাই রয়েল কোচ = 450 রুপি

টোটাল খরচ = ৬৫০০ রুপি পার হেড।

দার্জিলিং গেলে অবশ্যই সান্দাকফু ঘুরে অাসবেন, না গেলে মিস করবেন।

×

করোনা (COVID-19) ভাইরাস থেকে সতর্ক থাকতে যা করনীয়ঃ

  • সবসময় হাত পরিষ্কার রাখুন। সাবান দিয়ে অন্তত পক্ষে ২০ সেকেন্ড যাবত হাত ধুতে হবে।
  • সাবান না থাকলে হেক্সিসল ব্যবহার করুন। হেক্সিসল না থাকলে হ্যান্ড সেনিটাইজার ব্যবহার করুন।
  • আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকুন, যতটুকু সম্ভব ভীড় এড়িয়ে চলুন।
  • বাজারে কিছু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন, করলে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।
  • টাকা গোনা ও লেনদেনের পর হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
  • ওভার ব্রিজ ও সিড়ির রেলিং ধরে ওঠা থেকে বিরত থাকুন।
  • পাবলিক প্লেসে দরজার হাতল, পানির কল স্পর্শ করতে টিস্যু ব্যবহার করুন।
  • হাত মেলানো, কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন।
  • নাক, মুখ ও চোখ চুলকানো থেকে বিরত থাকুন।
  • হাঁচি কাশির সময় কনুই ব্যবহার করুন।
  • আপনি যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত না হয়ে থাকেন তবে মাস্ক ব্যবহার আবশ্যক নয় তবে আক্রান্ত হলে সংক্রমণ না ছড়াতে নিজে মাস্ক ব্যবহার করুন।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকুন। Stay Home, Stay Safe.