স্বপ্নের সেন্টমার্টিন ভ্রমণ

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

কক্সবাজার গিয়েছি বেশ কয়েকবার কিন্তু যে কারনেই হোক সেন্টমার্টিন যাওয়া হয় নি। অনেক প্লান করে ঠিক করলাম সিজন ছাড়া নিরিবিলি সময় যাবো এবং সেটা ফুল মুন এর ভিতর। পূণিমা রাত আর সাগর উফ ভাবাই যায় না। প্ল্যান অনুযায়ী ডেট ঠিক করলাম ১৭ই ফেব্রুয়ারি। আমাদের প্ল্যান ছিলো ২ রাত সেন্টমার্টিন থাকবো। ১৭ তারিখ রাতে রওনা দিয়ে ১৮ এবং ১৯ তারিখ রাত থেকে ২০ তারিখ ব্যাক করবো। আমরা সেহেতু ছুটির ভিতর যাচ্ছি না বা সরকারি ছুটি ও নাই তাই আগে থেকে কোন কিছুর টিকেট বা রুম বুকড করবো না। হঠাৎ করে কি মনে করে ভাবলাম (১৬ তারিখ) বাসের টিকেটা কেটে রাখি। সেই ভেবে এক ফ্রেন্ড ঢাকা থাকে তাকে ফোন করে টিকেট কাটতে বললাম। একটু পর তার ফোন, ফোন করে বলল কয়েকটা বাস কাউন্টার এ ফোন করেছিলো ১৭ তারিখ রাতের নন এসি বাসের টিকেট নাই। শুনেই মন খারাপ হয়ে গেলো।

ভাবলাম তাহলে শীপের একটু খবর নিয়ে দেখি। কেয়ারী সিন্ধাবাদ এ ফোন দিয়ে বলতেই বলল তাদের ১৭ তারিখ থেকে ২৮ তারিখ পযন্ত সব টকেট বুকড। বলল কেয়ারী ক্রুজ এ টিকেট আছে ১৪০০ টাকা। এমনিতেই আমাদের বাজেট কম। অন্যান্য কয়েক শীপে ফোন করেও একই অবস্তা। মনটা আরো ভেঙ্গে গেলো। এর পর গ্রীল লাইন এ ফোন দেয়। ওরা বলল সীট আছে ৬৫০ টাকা। ৬৫০ টাকার কথা শুনে আমি সেন্টমার্টিন যাবার উত্তেজনায় আর কিছু শুনতেই একদম ভুলে যাই আর সাথে সাথে ৪ টা টিকেট বুকড করে নেই। এর ভিতর আমার এক ফ্রেন্ড শ্যামলী পরিবহন এ জব করে ওর মাধ্যমে শ্যমলীর এসি বাসে ১৩০০ টাকা করে ৪টা টিকেট বুকড করি। যদিও আমাদের এসি বাসে যাবার কোন প্লান ছিলো না।

সেন্টমার্টিন ভ্রমণ
সী গাল

এরপর শীপ এর টিকেট কাটার জন্য ফ্রেন্ড কে গ্রীল লাইন এর কাউন্টার এ পাঠাই। ফ্রেন্ড টিকেট কাটতে গেলে জানতে পারে যে এটা এসি শীপ আর ভাড়া ১৩০০ টাকা। ওয়ান ওয়ে হয়চ্ছে ৬৫০ টাকা। শুনে তো আমি বোকা বনে গেলাম। কি আর করার ১৩০০ টাকা করেই ৪ টা টিকেট কাটলাম।যাবার আগেই বাজেট থেকে ১০০০ টাকা বেশি খরচ হয়ে গেলো। যাই হোক টিকেট কাটার পালা শেষ। এতো কিছুর ভিতর রুম বুকড করার কথা বা সময় কোনটাই ছিলো না। রবিবার ৭‌.৩০ এ আমাদের বাস আরামবাগ থেকে ছাড়বে। রাত ৭.১৫ তে আমরা আরামবাগ কাউন্টার এ চলে আসলাম। বাস ও সময় মতো চলে আসলো। সব কাউন্টার টাস করে বাস ছাড়তে ছাড়তে ৮টা বেজে গেলো। ১০.৩০ ভিতর আমরা নুরজাহান হোটেলে এ চলে আসি।গরিবের কশাই হোটেলে ২০০ টাকার নিচে ভাত খাবার কোন ওয়েই নাই। ২০০ টাকা দিয়ে চিকেন খিচুড়ি খেয়ে বাসে উঠে এক ঘুম দিলাম। ঘুম যখন ভাজ্ঞলো তখন আমরা রামু লিংক রোডে।

১ম দিন

সোমবার সকাল ৭.৩০ এ আমরা টেকনাফ দমদমিয়া জাহাজ ঘাট এ পৌছালাম। বাস থেকে নেমে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিলাম। পরটা ১০টাকা পিচ, ডাল ভাজি ২০ টা বাটি, ডিম ২০ টাকা পিচ। ৬০টাকা জন প্রতি বিল হলো আমাদের। একটা কথা খাবার আগে অবশ্যই দামাদামি করে নিবেন। নাস্তা করে আশে পাশে হালকা ঘোরাঘুরি করে শীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। শীপ দেখেই তো আমাদের পছন্দ হয়ে গেলো। অন্যান্য জাহাজের যে অবস্তা আর অতিরিক্ত যাএী। আমাদের শীপ ছাড়ার আগে অন্যান্য শীপ গুলো ছেড়ে দিলো। আমাদের শীপ ছাড়ার কিছু সময় পর বুঝতে পারলাম কেন গ্রীন লাইন শীপ সবার থেকে বেষ্ট। আর যারা ওপেন ডেক ওপেন ডেক বলে চিন্তা করেন (যদিও আমিও করতাম 😂😂) তাদের জন্য বলি গ্রীল লাইনে ওপেন ডেক বলে কিছু জায়গা আছে আর সেটার অনুভূতি অন্যান্য শীপ গুলোর থেকে বেষ্ট বলেই আমি মনে করি। যাই হোক সব শীপ আমাদের আগেই ছেড়ে দিলো। কিছু সময় পর আমাদের শীপ ছেড়ে দিলো। নাফ নদীর কিছু দূর যেতেই আমাদের যাএা সংগী হলো গাংজ্ঞ চিল। গাংজ্ঞ চিল গুলোকে দেখলেই প্রানটা জুড়িয়ে যায়। ওদেরকে দেখলে আপনি চিপস না খাইয়ে পারবেন না, তবে এটা বিষয় খারাপ লাগলো চিপস শেষ হবার পর অনেকেই প্যাকেটা পানিতে ফেলে দেয়, কয়েক জনকে আমি নিষেধও করেছি।

যাই হোক সব শীপকে পিছনে ফেলে আমাদের শীপ ২ ঘন্টার ভিতর সেন্টমার্টিন জেটিতে পৌঁছে গেলো। শীপ থেকে নেমে আমাদের হোটেল খোঁজার অভিযান শুরু হলো। আমাদের ইচ্ছা ছিলো উওর বীচে থাকার সেই মোতাবেক হোটেল খুজতে থাকলাম। ৮/১০ টা হোটেল দেখলাম সবাই বলল বুকড তখন মনে অজানা আশংকা ভর করলো। সবাই যা বলেছিলো সেটাই কি তাহলে সত্যি হবে। আগে থেকে রুম বুকড করে আশা উচিত ছিলো। ভেবেছিলাম একটু নিরিবিলি আর কম খরচে থাকবো। ২/১ টা হোটেল যাও বা পেলাম সেগুলো আমাদের বাজেটের অতিরিক্ত ৩০০০/৪০০০ পার নাইট। অবশেষে সেন্টমার্টিন ডাক বাংলার পিছলে উওর বীচ থেকে ৫ মিনিট এর হাটা পথ, হোটেল সী গোল্ড এ রুম পেলাম অনেক দামাদামি করে ১৮০০ টাকা পার নাইটে ঠিক হলো।

রুমে ব্যাগ রেখে ফ্রেশ হয়েই সাগরের দৌড়ে দিলাম। ২ ঘন্টা সাগরে ঝাপাঝাপি করলাম, ছবি তুললাম। এরপর হোটেলে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করে খেতে গেলাম। যে হোটেলে ছিলাম ওই হোটেলের একজনের কাছে শুনেছিলাম কোন হোটেলে অল্প টাকাই ভালো খাবার পাওয়া যাবে। ও বলল পৌষিতে যান,১২০ টাকা প্যাকেজে খাবেন। ওর কথা মতো ওই হোটেলে গিয়ে গেলাম। প্যাকেজের ভিতর খাবার মেনু হচ্ছে আনলিমিটেড ভাত, ডাল, ১টা আলু ভর্তা, যে কোন একটা মাছ। সেন্টমার্টিন এ যেখানেই খান দামাদামি না করে খেলেই বাঁশ মাষ্ট। যদিও পরে দেখলাম আমারাও ২০ টাকা করে বেশিতে খেয়েছি। খাবার শেষ করে রুমে এসে ছোট একটা ঘুম। ৫ টায় ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হাটতে হাটতে চলে গেলাম পশ্চিম বীচে। সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত ওখানেই থাকলাম। ৬.৩০ দিকে আবার হেটেই রুমে ফিরে আসলাম।

চা খেতে ৭টায় আবার চলে গেলাম উওর বীচে। পূণিমার রাত উফ কি দারুন দৃশ্য। রাত ১০ টা পর্যন্ত থাকলাম বীচে। তারপর হোটেলে এসে ফ্রেশ হবে ডিনার করতে চলে গেলাম। রাতে আবার সেই একই প্যাকেজে খেলাম শুধু মাছটা আলাদা। রুমে এসে কিছু সময় রেষ্ট নিয়ে রাত ১২টায় চলে গেলাম বীচে।সারা রাত বীচে কাটালাম। এই দিন বীচে আমারা ছাড়া আর তেমন কাউকেই দেখলাম না। রাতে আমাদের সাথে আরেক জন ছিলো যার কথা বলা হয় নি, সেন্টমার্টিন এর একজন ক্যামেরা ম্যান। জানি না কি ভাবে এতো অল্প সময়ের ভিতর তার সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেলো। তার ভালো নাম তাহের, ডাক নাম ব্যথা। সেন্টমার্টিন এ সবাই এক নামে চিনে। আযান দেবার সময় জেটি ঘাটের থেকে একটু ভিতরের দিকের একটা দোকান থেকে সবাই কফি খেলাম। কফি খেয়ে চলে আসলাম জেটি ঘাটে ওখানেই বসে সূর্য উদয় দেখলাম। সূর্য উদয় এর পর আবার হাটতে হাটতে উওর বীচে চলে আসলাম। রাতের সাগর আর সকালের সাগর না দেখলে সাগরের কাছে আসাটাই বৃথা।

২য় দিন

মঙ্গলবার। সকাল ৭.৩০টায় রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করতে গেলাম। পরোটা ১০ টা পিচ, ডাল ভাজি ২০ টাকা প্লেট, ডিম ২০ টাকা, ডিম খিচুড়ি ৮০ টাকা যে যেমন খায়। আমারা পরোটা খেয়েছিলাম। বিল জন প্রতি ৬০টাকা। নাস্তা করে হাটতে হাটতে চলে গেলাম জেটি ঘাটে ওখানেই ছেড়াদ্বীপ এর ট্রলার / স্পিডবোট ছাড়ে। ট্রলারে ২০০ টাকা আর স্পীড বোটে ৩০০ টাকা করে। আমরা ট্রলার এই গিয়েছিলাম। ৯.৩০ এ ট্রলার ছেড়ে ১০টায় পৌঁছে। ২ঘন্টা ছেড়াদ্বীপ এ থাকি তারপর আবার ১২.৩০টায় সেন্টমার্টিন এ ফিরে আসি।

রুমে এসে ড্রেস চেঞ্জ করে চলে যায় গোছল করতে। ২.৩০ এ রুমে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করে লাঞ্চ করতে যায় আবার সেই প্যাকেজ। খাবার খেতে রুমে এসে ঘন্টা ঘানেক রেষ্ট নিয়ে ৪.৩০ এর দিকে বের হলাম। বের হয়ে ২ ঘন্টার জন্য ৮০টাকা দিয়ে সাইকেল ভাড়া নিলাম। জেটি ঘাট থেকে পশ্চিম বীচ পর্যন্ত সাইকেল চালালাম। এই দিন ছিলো ফুল মুন। সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত সাইকেল চালাই। তারপর সাইকেল ফেরত দিয়ে এসে বীচে এসে রাত ১০টা পর্যন্ত বসে থাকি। ১০ টায় ডিনার করতে যায়।আজ ডিনার করি কোরাল মাছ এর বার বি কিউ দিয়ে।ডিনারে জন প্রতি ২৫০ টাকা বিল হয়। ডিনার করে সোজা চলে আসি বীচে। আজ ১টা পর্যন্ত অনেক লোক ছিলো বীচে আর সারা রাত আমরা সহ অন্য গ্রুপের ৬ জন ছিলো। আমারা সারারাত বীচের চেয়ারে শুয়ে কাটালাম, কখনো পানিতে পা ভেজালাম।

৩য় দিন

বুধবার। সকাল ৬টায় রুমে এসে ৩ ঘন্টার একটা ঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে সোজা গোছল করতে চলে গেলাম। ১ঘন্টা সাগরে কাটিয়ে ১০.৩০টায় রুমে চলে আসলাম। ১১টায় চেক আউট। ব্যাগ গুছিয়ে হোটেলে থেকে চেক আউট করে ব্যাগ হোটেলে রেখে আবার সাগর পাড়ে।১.৩০ টায় দিকে শেষ বারের মতো সাগরকে বিদায় জানিয়ে লাঞ্চ করতে চলে আসি। আবারো সেই প্যাকেজ খাওয়া। লাঞ্চ সেরে ২.১৫ দিকে জাহাজ এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। শীপ ছাড়বে ৩টার সময়। সেন্টমার্টিন এ এখন মোট ৭টা শীপ ছাড়ে। শীপ এ উঠবার সময় আরো ভালো ভাবে বুঝতে পারলাম গ্রীন লাইনে এ এসে কি ভালো কাজ করেছি। গ্রীন লাইনের জন্য আলাদা জেটি। এছাড়া আর যেকোন ২টা শীপ জেটিতে দাড়াতে পারবে আর অন্য শীপ গুলো সেই ২টা শীপের পাশে দাঁড়াবে। এভাবে এক শীপ থেকে অন্য শীপে যেতে হবে যাদের শীপ ৩ নাম্বার সিরিয়ালে তাদের কষ্ট আরো মারাত্বক। সবার পক্ষে যা সম্ভব না বিশেষ করে বাচ্চা বা মেয়েদের। যাই হোক শীপ ছাড়লো ৩টার সময়।

সেন্টমার্টিন ভ্রমণ
সেন্টমার্টিন জেটি

স্বপের সেন্টমার্টিন কে বিদায় জানাতে কষ্ট হচ্ছে তবুও ফিরতে হবে। যথারিতি সবার আগে আমাদের শীপ টেকনাফ এসে পৌঁছে গেলো। ৬.৩০টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে বাস ছাড়লো। নূরজাহানে আবার ডিনার বিরতি। ডিনার সেরে ঘুম।ঘুম ভাজ্ঞলো যান্তিক শহরে তার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেলো আমাদের স্বপ্নের ট্যুরের।

খরচ

  • ঢাকা টু টেকনাফ আসা যাওয়া >১৩০০×২=২৬০০
  • শীপ ভাড়া=১৩০০
  • হোটেল ভাড়া>৪৫০×২=৯০০
  • খাবার >রবিবার রাতে ২০০+সোমবার, ৬০+১২০+১২০, মঙ্গলবার, ৬০+১২০+২৫০, বুধবার, ৬০+১২০+২০০=১৩১০
  • ট্রলার ভাড়া=২০০
  • সাইকেল ভাড়া=৮০
  • অন্যান্য =১১০

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।