ট্রলারে নীল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন জয়ের রোমাঞ্চকর গল্প

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

বহু জল্পনা কল্পনার পর অবশেষে অফ-সিজনে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী পেরিয়ে ঘুড়ে আসলাম নীল সমুদ্রের কোলে অবস্থিত নারিকেল জিঞ্জিরা বা সেন্ট মার্টিন থেকে। আকাশের নীল আর সাগরের নীল যেখানে মিলে মিশে একাকার তীরে বাঁধা মাছ ধরার নৌকা, ট্রলার অসংখ্য নারিকেল ও কেয়া বনের সমাহার এবং শতশত প্রবালবেস্টিত এই স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন! ❤

সেন্টমার্টিন

শুরুতে ৩/৪ যাবার কথা থাকলেও তাদের ব্যক্তিগতসমস্যাজনিত কারনে ২ জন মিলেই শুরু করি এই দুঃসাহসিক এডভেঞ্চার! যথারীতি সায়েদাবাদ থেকে সন্ধ্যা ৭ঃ৩০ মিনিটে সৌদিয়া এক্স বাসে যাত্রা শুরু করি টেকনাফের উদ্দেশ্যে! ভোরের আলো না ফুটতেই কক্সবাজার ক্রস করে বাস ঘন কুয়াশার মধ্যে হেডলাইট জ্বালিয়ে বাস উখিয়া,নাইক্ষংছড়ি, হ্নীলা পেড়িয়ে পৌছে যায় টেকনাফ স্টেশনে৷ বলা বাহুল্য পথিমধ্যে কয়েকবার বিজিবি চেকপোস্ট রয়েছে। আপনি আপনার আইডি কার্ড সাথে রাখতে পারেন। সকাল ৭ঃ২০ মিনিটে আমরা নাস্তা সেড়ে হেঁটে হেঁটে চলে যায় ট্রলার ঘাটে। শুধু শুধু রিক্সা নেবার কোন প্রয়োজন নেই। যে কাউকে বলে দিলেই দেখিয়ে দিবে। ঘাটে গিয়ে ২২০ টাকা করে টিকেট নিলাম। যেহেতু ট্রলারে দুই আড়াই ঘন্টার জার্নি সেক্ষেত্রে পানি ও প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার নিয়েই ঊঠলাম। সকাল ৮ঃ৩০ মিনিটে বিজিবির পার্মিশনে ট্রলার ছেড়ে দিলো প্রবাল দ্বীপের উদ্দেশ্যে। যেহেতু অফ সিজন জাহাজ ও অফ সেক্ষেত্রে সমুদ্রে কিঞ্চিৎ ঝাঁকুনি আপনাকে পোহাতেই হবে। তাই লাইফ জ্যাকেটসাথে নিয়ে আসা ভালো। ট্রলারের লাইফ জ্যাকেট অনেক ময়লা এবং নাজুক অবস্থা। আস্তে আস্তে আঁকাবাঁকা পাহাড়ী খাল থেকে বেরিয়ে নাফ নদী পেড়িয়ে নীল সমুদ্রের দেখা পেয়েই যেন মনের সকল ব্যাথা নিমিষেই দূর হয়ে গেল। শাহপরীর দ্বীপের পাড় হবার পর ট্রলার অনেকটা দুলতে শুরু করলো। অভিজ্ঞ চালক মিয়ানমার বর্ডারের কোলঘেষে উত্তাল জায়গটা কোনমতে পেড়িয়ে যাওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলাম। বেলা ১১ঃ১৫ মিনিটে অসংখ্য নারিকেল গাছের সাড়ি দেখতে আর বুঝতে বাকি ছিলোনা যে চলে এলাম বাংলার ভূস্বর্গে! ❤

সেন্টমার্টিন

সেন্টমার্টিন এর মানুষ যদিও অনেক ধর্মপরায়ণ এবং সৎ তবুও জাহাজ ঘাটে কিছু দালাল থাকে এরা আপনাকে ভালো রিসোর্টের নাম বলে লো রেটিং কিছু রিসোর্টে নিয়ে চড়া বকশিস চাইবে। যেহেতু অফ সিজন জাহাজ অব সেক্ষেত্রে বুকিং না করে সরাসরি গিয়ে দরকষাকষি করেই রুম নিতে পারবেন। একেবারে বিচ ভিউ চাইলে আমার রিকোম্যান্ড হবে সি ভিউ রিসোর্ট এন্ড স্পোর্টস, সী প্রবাল, ব্লু লেগুন। যাইহোক সী প্রবালে গিয়ে ফ্রেস হয়েই চলে যাই সমুদ্রে। ঝাপাঝাপির পর জুম্মার নামাজ সেড়ে চলে যাই জাহাজঘাটে খাওয়ায় জন্য। মাছধরা বন্ধ থাকার দরুন একটা রেস্টুরেন্টে কোরাল মাছ পেয়েই গলাধঃকরণ করে ফেললাম। আপনারা কিন্তু অবশ্যই দাম জেনেই খাবেন। বিকেলে চলে গেলাম হুমায়ুন স্যারের রিসোর্টের ওখানে পশ্চিম বিচে। ওখানে অসংখ্য ডাব পাওয়া যায়। কচি ডাব দেখে মূল্য জেনে খাবেন। এই ট্রিপে মিনিমাম ২০ টির মত কচি ডাবের ফ্লেভার নিয়েছে। (প্রতিটি ২৫-৩০ টাকা)। যাইহোক বিকেলের এই সময়টা পশ্চিম বিচে কাঁটালে সরাসরি সুর্যাস্ত দেখতে পারবেন। সন্ধায় শুরু হলো সামুদ্রিক মাছ খোঁজার অভিযান। যেহেতু ২৭ তারিখ পর্যন্ত মাছ ধরা নিষেধ তাই অতিকষ্টে এক দোকান থেকে পূর্বে ধরা ২ টি বেশ বড় সাইজের কালোচান্দা সংগ্রহ করি। মসলা মাখিয়ে নিয়ে আসি রিসোর্টে। কিছু বকশিস দিলেই ওরা আপনাকে বার বি কিউ এর ব্যবস্থা করে দিবে। যাইহোক ওখানে যাবার পথে আরো দুটি গ্রুপের সাথে পরিচয় হয়। তাদের একজন Jawad Ibnan ছিল বিবিকিউ এক্সপার্ট। তাই খুব একটা ঝামেলা হয়নি৷ রাতে জোয়ারে রিসোর্টের গেট পর্যন্ত সমুদ্রের পানি চলে এসেছিল। চাঁদনী রাতে সমুদ্রের গর্জন, মৃদুমন্দ বাতাস, আবছা আলোয় পুরো দ্বীপ এবং বি বি কিউ এর ফ্লেভার! ভাবতে পারছেন মুহুর্তটি কেমন হতে পারে?

সেন্টমার্টিন

পরদিন ভোরেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ছেঁড়াদ্বীপের উদ্দেশ্যে। গায়ে শক্তি আর স্টেমিনা না থাকলে আপনি ট্রলারে যেতে পারেন। আর পুরো দ্বীপ দেখতে দেখতে যেতে চাইলে অবশ্যই হেঁটে বা সাইকেলে। প্রায় ঘন্টাখানেক পর পৌছে গেলাম ছেঁড়াদ্বীপে। ওখানে একটি মাত্র পরিবারের বসবাস। চারদিক নীল পানির সমারোহ, অসংখ্য প্রবাল আর কেয়াবনের মধুর মিতালী নিয়েই এ ছেড়াদ্বীপ। এককথায় সেন্টমার্টিনের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক জায়গা। আর আমরা এবার কেয়াবনের মধ্যে প্রবেশ করে আবিষ্কার করলাম মিঠার পানির সন্ধ্যান। যদিও ৯০% পর্যটক এখানে প্রবেশ করেনা। এটি ছেড়াদ্বীপের সৌন্দর্য বহুগুনে বাড়িয়েছে এবং বিশ্রামের পারফেক্ট জায়গা তো বটেই৷ ক্লান্ত হয়ে কচিডাবের শ্বাস খেয়ে ফিরতে ফিরতেই আবার বিকেল হয়ে গেল। রাতে দ্বীপটির বাকি অংশ দেখে নিলাম। ফেরার সময় আপনারা অবশ্যই ট্রলার ছাড়ার সময় জেনে নিবেন। টেকনাফ থেকে বাসে না এসে ১০০০ টাকা দিয়ে মেরিন ড্রাইভ হয়ে কক্সবাজারে আসুন। তারপর না হয় রাতের বাসে ঢাকা ফিরে যান যদি সময় থাকে। দেড় ঘন্টা লাগবে বড়জোর৷ মেরিন ড্রাইভে (চলো আরেকবার উড়ি চলো আরেকবার ভাসি) ফিল পাবেন৷ গ্যারান্টি। একপাশে সাগর একপাশে পাহাড় মাঝখানে দেশসেরা রাস্তা! 😍

সেন্টমার্টিন

প্রয়োজনীয় খরচের তালিকাঃ

* ঢাকা-টেকনাফ ৯০০/-
* টেকনাফ-সেন্টমার্টিন ২৩০/-
*টেকনাফ-কক্সবাজার সি এন জি (মেরিন ড্রাইভ) – ১০০০/-
* রিসোর্ট অবশ্যই দরদাম করে ৬০০/৭০০ এর মধ্যে নিবেন/-
* ফেরার সময় একই খরচ।

এই মৌসুমের পরই সেন্টমার্টিনে রাত্রি যাপন নিষেধ তাই এখন যাবার মোক্ষম সময়। যারা রিল্যাক্স ট্যুর এবং এডভেঞ্জার পছন্দ করেন তারা আজই বেরিয়ে পড়ুন এবং শান্তিতে দেখে নিন কোলাহলমুক্ত দ্বীপটি। যারা শীপে যাবেন তারা আগামী মাস থেকে যেতে পারবেন।

সেন্টমার্টিন আমাদের নিজস্ব সম্পদ। এটা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের। এমন কিছু করবেন না যেটা দৃষ্টিকটু। বীচে ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকুন আর প্রবাল কুড়িয়ে সাথে নিয়ে আসবেন না। সবার ভ্রমন হোক নিরাপদ সুন্দর ও আনন্দময়।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।