নীলাকুরুঞ্জি অভিযান ২০১৮, মুন্নার

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

Golmal Returns আর Chennai Express এর শ‍্যুটিং স্পট দেখার পর থেকেই মুন্নার যাওয়ার ইচ্ছে ছিলই। সেপ্টেম্বর, ২০১৭ তে যখন তামিলনাড়ুর বিশেষ জায়গা গুলো ঘোরার প্ল্যান হচ্ছিল মুন্নারটা যোগ করতে গিয়ে হঠাৎই নজরে আসে, নীলকুরুঞ্জি (Nelakurinji) এর ব‍্যপারটা। আর এটাও নজরে আসে দীর্ঘ ১২ বছর পর ২০১৮ তে আগষ্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে সেই স্বর্গীয় ফুল ফের ফুটতে চলেছে। মুন্নারটা সেবারের মত বাদ দিয়ে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তে শুধুমাত্র কুরুঞ্জির টানে মুন্নার যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

চা বাগিচা
চা বাগিচা

জুন, ২০১৮ তে ট্রেনের টিকিট কাটা হয় সেপ্টেম্বর, ২০১৮ এর জন্য। আপডেট যা ছিল ডিন্ডিগুল থেকে মুন্নারের রাস্তা খুবই খারাপ তাই অ‍্যলুভা (০১/০৯/১৮) হয়ে যাওয়াটা ঠিক হয় আর ফেরাটা অ‍্যলেপ্পি(০৪/০৯/১৮) হয়ে। ত্রিচির বন্ধুর মাধ‍্যমে ওর কেরলের অফিস কলিগদের কাছ থেকে তথ‍্য নেওয়া চলতে থাকে। ই‍্যরাভিক‍্যুলাম পার্কের টিকিট নেওয়া হয় ০২/০৯/১৮ এর ১১টা থেকে ১২টার স্লটে www.eravikulamnationalpark.in থেকে। থাকার জন‍্য Poopara এর কাছে Mathikettan Shola National Park এর লগ হাউজ বুক করা হয়।

ঝর্ণা
ঝর ঝরিয়ে ঝর্ণা

যার জন‍্য এত কিছু তার সম্বন্ধে একটু জেনে নেওয়া যাক। কুরুঞ্জি বা নীলাকুরুঞ্জি একধরনের গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। উদ্ভিদটির উচ্চতা হয় ৩০-৬০ সেমি। এটি সাধারণতঃ নীলগিরি পর্বতে দেখা যায়। আসলে এই ফুলের জন‍্যই পর্বতটির এইরূপ নামকরন হয়েছে। ১৩০০ থেকে ২৪০০ মিটার উচ্চতায় মোটামুটি চীরসবুজ বনভূমিতে এদের পাওয়া যায়। বিঞ্জান সম্মত নাম- Strobilanthes Kunthianus. মোটামুটি আগষ্ট থেকে অক্টোবর এর মধ‍্যে এই ফুল ফোটে আর দেখতে ঈষৎ বেগুনি-নীল রঙের হয়।
নীলাকুরুঞ্জির বিশেষ বিশেষত্ব হল ১২ বছর পর এই ফুল ফোটে। শেষবার এর দেখা পাওয়া গেছিল ২০০৬ সালে। হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালেই ওনার ফের দেখা দেওয়ার কথা। বর্তমান তথ‍্য প্রযুক্তির জামানায় এটা একটা স্মরনীয় উৎসবে পরিনত হয়েছে। কোদাইকানালে “কোদাই কুরুঞ্জি উৎসব ২০১৮ নামে সরকারী ভাবে এটি পালিতও হচ্ছে।

নীলাকুরুঞ্জী
নীলাকুরুঞ্জী

জুলাই এর শেষ সপ্তাহে ত্রিচির বন্ধু মারফত খবর আসে কোদাইকানালে নীলাকুরুঞ্জি ফুটতে শুরু করেছে। একটা অজানা খুশিতে মনটা ভরে গেল। ও দিকে Eravikulam Park এর সাইট দেখাতে শুরু করলো ১৫ই আগষ্ট নাগাদ ফুল ফুটতে শুরু করবে। এক অপূর্ব স্বর্গীয় দৃশ‍্য দেখতে পাওয়ার খুব কাছে পৌঁছে গেছি।

নীলাকুরুঞ্জী at Carmelgiri Botanical Park, Munnar
নীলাকুরুঞ্জী at Carmelgiri Botanical Park, Munnar

খুশিতে আশঙ্কার মেঘ ঘনাতেও খুব বেশী দেরি হল না। আগষ্টের প্রথম সপ্তাহেই খবর পেলাম ভাল মতই বৃষ্টি শুরু হয়েছে কেরালাতে। ৮ই আগষ্ট অ‍্যলেপ্পির এক পূর্ব পরিচিত বাসিন্দার সাথে দেখা হল। উনি বললেন গত কালই উনি ফিরেছেন আর তার মধ‍্যে মুন্নারেও গেছিলেন। ছবি দেখালেন ওনার পুরো পরিবারের। সবার কাছেই রেইন কোট বা ছাতা। আমিও যাচ্ছি শুনে বললেন, যাও তবে রেইন কোট মাষ্ট। ছাতা নিলে হবে কিনা জানতে চাইলে বললেন, ওখানে যা বৃষ্টি হয় শুধু ছাতায় হবেনা। ৯ তারিখ থেকেই জানা গেল বন‍্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সোস‍্যাল মিডিয়ার পাতা আর টেলিভিশনের খবরের চ‍্যানেল গুলোতে চোখ রেখে আতকে উঠলাম। একি অবস্থা ঈশ্বরের নিজের দেশের। সমগ্র কেরলই ভয়াবহ বন‍্যার করাল গ্রাসে। অসংখ‍্য মৃত। ঘুরতে গিয়েও অনেকে বন্দী। এর মাঝেই পার্কের ওয়েব পেজ দেখাতে লাগলো পার্ক এখন বন্ধ এবং ১লা সেপ্টেম্বর ফের খুলবে। সত‍্যি কথা বলতে ঘুরতে যাওয়ার কথা তখন আর মাথাতেই ছিল না। আর নীলাকুরুঞ্জী এবারের মত আর দেখা হবে না, এক প্রকার ধরেই নিলাম। কেরলের অবস্থা দেখে যা বোঝা গেল এ বছরের মত আর কেরালা ভ্রমণ সম্ভব নয়। অগত্যা কেরলের সব টিকিট ক‍্যানশেল করি ২৪/০৮/২০১৮ তে। যেহেতু কোদাইকানালে কুরুঞ্জী আগেই দেখা গেছে শেষমেষ ঠিক কোদাইকানালেই যাবো। আর কোদাইকানালে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হয়নি, তাই আর দেরি না করে কোদাই যাওয়াটাই ঠিক হল।

Look who's coming! (নীলগিরি থর)
Look who’s coming! (নীলগিরি থর)

২৯শে আগষ্ট কি মনে করে পার্ক কর্তৃপক্ষকে একটা ই-মেইল করি ০২/০৯/১৮ তে পার্কে যাওয়া যাবে কিনা জানতে, যেহেতু বন‍্যা পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে তখন। ৩০শে পার্কের ওয়ার্ডেনের মেইল আসে সেপ্টেম্বর এর দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে পার্ক খুলবে না। ডিন্ডিগুল-বাতলাগুন্ডি হয়ে কোদাইকানাল যাওয়া হবে, এই রকমই ঠিক হল। ১লা সেপ্টেম্বর যখন কোদাইকানালের উদ্দেশ্যে রওনা হবো হঠাৎ সোস‍্যাল মিডিয়ায় ভেসে এলো Eravikulam National Park খুলে গেছে। আরোও জানা গেল কেরালাতে যে ট‍্যুরিস্ট ব‍্যান ঘোষণা হয়েছিল বন‍্যার কারনে সেটাও ১ তারিখ থেকেই তুলে নেওয়া হয়েছে। পার্কের টিকিট গুলো সাথেই ছিল, মানে আর কোন বাধাই থাকলো না কুরুঞ্জির দর্শনে।

চা বাগান
হারাতে মন চায়

আগেই দেখে নেওয়া ছিল বাতলাগুন্ডি থেকে আরেকটু এগোলেই থেনি। আর থেনি থেকে মুন্নারের ইন্টার স্টেট বাস পাওয়া যায়। আর ঐ রুট খারাপ থাকলে থেনি থেকে পালানিরও বাস আছে, সেখান থেকে সহজেই Eravikulam Park এ যাওয়া যায়। থেনিতে (Theni) পৌঁছালাম রাত্রি ১০:৪০ এ। ১১:১০ এ মুন্নার যাওয়ার বাস ছাড়বে সেটা জানা গেল। নির্দিষ্ট স্থানে একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু দরজা জানলা সব বন্ধ। ডিনার সেরে অপেক্ষা কখন বাস আসে। কিছু লোকাল লোকজনই শুধু বসে আছে মুন্নার যাওয়ার জন‍্য। ১১:২০ নাগাদ একটা বাস এলো আর জানা গেল ওটাই মুন্নার যাবে।

ভোর ৩:৩০ এ মুন্নার পৌঁছানো গেল। রাস্তা ভালই ছিল। চায়ের দোকানে কিছু সময় কাটিয়ে গেলাম চা বাগান আর টি মিউজিয়াম দেখতে। ১৫ মিনিটের পায়ে হেঁটেই পৌঁছলাম টি মিউজিয়ামে। মিউজিয়াম খোলা ছিলনা বলে ঘুরে দেখা হয়নি। তবে ভোরের চা বাগান খুব করে ঘুরে নিলাম।

সুপ্রভাত

Eravikulam Park বন্ধ আছে আর যাওয়ার রাস্তাটাও ব্রীজ ভেঙে যাওয়ায় বন্ধ। এ পর্যন্ত‍্য সব জায়গাতেই এক ভাঙা রেকর্ড চলছিল। টি মিউজিয়াম থেকে ফেরার পথে একজন বয়ষ্ক ভদ্রলোক জানালেন আপনারা পেরিয়াভরাই পর্যন্ত‍্য একটা অটোতে চলে যান, ওখান থেকে হেঁটে ভাঙা ব্রীজটা পার করলে আবার অটো পেয়ে যাবেন।

চা বাগিচা
প্রকৃতির ক‍্যানভাস্

মোট ১২কিমি রাস্তা ব্রীজ ভাঙার ফলে ৩+৯ হয়ে গেছে। যাক অবশেষে পৌঁছালাম Eravikulam Park এ সকাল ৯ টায়। আমাদের স্লট ছিল ১২-১টার। এ দিন পার্কে আমরাই প্রথম। কাউন্টারে যোগযোগ করাতে জানা গেল আমরা পার্কে এখনি যেতে পারি, কিন্তু আরো কিছু ট‍্যুরিস্ট আসার পরেই বাস ছাড়বে। ওদের ক‍্যান্টিনে ব্রেকফাস্ট সারতে যাবো এর মধ‍্যেই এক উত্তর ভারতীয় বয়স্ক কাপল্ হাজির হল। কাউন্টার টিকিট নিয়েই যেতে লেট হবে শুনে চিল্-চিৎকার জুড়ে দিল। আমরা চললাম প্রাতঃরাশ সারতে। পার্কের লাগোয়া ক‍্যান্টিন থেকে পার্কের চোখ জুড়ানো ভিউ দেখে মোহিত হতেই হল। নেমে এসে শুনলাম বাস রেডি, আমরা গেলেই ছাড়বে। খুবই কঠোর নিয়মের কারনে সাথের কেক আর বিস্কুট সিকিউরিটি কাউন্টারে রেখে যেতে হল। আমরা চারজন আর পার্কের দু-চারজন স্টাফ নিয়ে বাস ছুটে চললো সবুজ চা বাগানের বুক চিরে। এক অপার্থিব সুন্দর যাত্রাপথের সাক্ষী হয়ে রইলাম।

কোদাইকানালটা তোলা রইলো, পরে কোন দিন।

×

করোনা (COVID-19) ভাইরাস থেকে সতর্ক থাকতে যা করনীয়ঃ

  • সবসময় হাত পরিষ্কার রাখুন। সাবান দিয়ে অন্তত পক্ষে ২০ সেকেন্ড যাবত হাত ধুতে হবে।
  • সাবান না থাকলে হেক্সিসল ব্যবহার করুন। হেক্সিসল না থাকলে হ্যান্ড সেনিটাইজার ব্যবহার করুন।
  • আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকুন, যতটুকু সম্ভব ভীড় এড়িয়ে চলুন।
  • বাজারে কিছু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন, করলে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।
  • টাকা গোনা ও লেনদেনের পর হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
  • ওভার ব্রিজ ও সিড়ির রেলিং ধরে ওঠা থেকে বিরত থাকুন।
  • পাবলিক প্লেসে দরজার হাতল, পানির কল স্পর্শ করতে টিস্যু ব্যবহার করুন।
  • হাত মেলানো, কোলাকুলি থেকে বিরত থাকুন।
  • নাক, মুখ ও চোখ চুলকানো থেকে বিরত থাকুন।
  • হাঁচি কাশির সময় কনুই ব্যবহার করুন।
  • আপনি যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত না হয়ে থাকেন তবে মাস্ক ব্যবহার আবশ্যক নয় তবে আক্রান্ত হলে সংক্রমণ না ছড়াতে নিজে মাস্ক ব্যবহার করুন।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকুন। Stay Home, Stay Safe.