দার্জিলিং এ খাওয়া দাওয়া

এইবারে দার্জিলিং (Darjeeling) যাওয়া ঠিক হয় হঠাৎ করেই। একদম শেষ সময়ের প্ল্যান বলে, নো ট্রেন টিকিট। অগত্যা ভলভো করেই যাওয়া হলো শিলিগুড়ি, তারপরে একটা গাড়ি ভাড়া করে দার্জিলিং। তো এইবারে আমাদের মানে আমি আমার স্ত্রীর ইচ্ছাই ছিল, একটু পায়ে হেঁটে দার্জিলিং এর এইদিক ওইদিক ঘুরবো আর কিছু ভালো ভালো খাওয়ার জায়গায় ঢুঁ মারবো। ৯ই জুনে রাতে বেরিয়ে, ১০ তারিখ কার্শিয়াং ও ঘুমের জ্যাম পেরিয়ে দার্জিলিং ঢুকলাম দুপুর ২টো নাগাদ।

দার্জিলিং যাওয়ার পথে রোহিণী তে চিকেন মোমো

যাওয়ার পথেই শুরু হয়ে গিয়েছিল আমাদের খাওয়াদাওয়া। এখন বেশির ভাগ গাড়ি রোহিণী হয়ে ওঠে। তো সেখানেই সানি হোটেল বলে এক জায়গায় গাড়ি দাড়ালো একটু রিফ্রেশ হওয়ার জন্য। আমরা দোকানের ভিতর ঢুকে একটু দোনমনো করে দু প্লেট চিকেন মোমো অর্ডার করে ফেললাম, সাথে বেশ কড়া করে বানানো দুধ চা (১০/- per কাপ)। ৬০/- প্লেট, প্রতি প্লেটে আটটি করে বেশ ভালো আকারের গোল গোল মোমো, একদম ধোঁয়া ওঠা, গরমাগরম। ওহ্ তার কি টেস্ট, একদম তোফা। মন হলে গেল একদম খুশ। গাড়ি স্টার্ট দিল, আমরা পাহাড় দেখতে দেখতে দার্জিলিং এর দিকে চললাম। তারপরে হোটেলে পৌঁছে স্নান টান করে আমরা বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।

কেভেন্টার্স এর চিজ অমলেট

খিদে পেয়েছিল বেশ, প্রায় সাড়ে তিনটা বাজে। আমরা ঠিক করলাম কেভেন্টারস এই যাওয়া যাক। এই জায়গাটি আমাদের বড় প্রিয়। দোকানে ঢুকে উঠে গেলাম ওপরে, প্রথমে বৃষ্টি হচ্ছিল বলে ভিতরে বসতে দিচ্ছিল, তবে এইখানে এসে ছাদে না বসে ভিতরে বসতে আমাদের ভালো লাগে না। একটু অপেক্ষা করার পর বৃষ্টি কমলো, আমরাও ছাদে গিয়ে একটা টেবিল দখল করলাম। চট করে অর্ডার করে ফেললাম একটা হট চকলেট (৫৫/-), একটা চিজ অমলেট (৭৫/-), এক প্লেট চিকেন সালামি স্যান্ডউইচ (৬০/-) ও এক প্লেট এগ স্যান্ডউইচ (৯০/-)। চিকেন স্যান্ডউইচ বাদ দিয়ে বাকি সব খাবারই একদম জবরদস্ত। হালকা হালকা ঠান্ডা ও বৃষ্টি হবে হবে আবহাওয়া, সাথে কেভেন্টারস এর হট চকলেট আর খাবার, ওহ্ একটা দুর্দান্ত ব্যাপার।
ঐখান থেকে বেরিয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে চললাম ওপরে ম্যালের দিকে। ম্যালে একটু ঘোরাঘুরি করে আমরা চললাম নাথমুল এর দিকে। এটি ম্যাল এর ঠিক গায়েই অবস্থিত একটি টি লাউঞ্জ। এই রাস্তা ধরেই একটু নিচে গেলে আছে “Step Aside”, যেখানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস মারা যান। জায়গাটি পারলে দেখে আসবেন। তো এইবারে আসি টি লাউঞ্জের কথায়। এইখানে বসার জায়গাটি অপূর্ব, একদম পাহাড়ের গা ঘেঁষে, তাকালেই বিশাল খাদ দেখা যায়। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বসে, তারিয়ে তারিয়ে ভালো দার্জিলিং চা উপভোগ করার জন্য নাথমুল এর টি লাউঞ্জ অনবদ্য। আমরা নিলাম থার্বো চা (প্রায় ২০০/-), আর মেয়ের কোল্ড কফি। টি পটে চা আসলো, আর কাপের জায়গায় দুটি ছোট ওয়াইন গ্লাস। যারা একটু স্মোকি স্বাদের চা ভালোবাসেন তাদের বেশ লাগবে। চা আর খাদ, খাদ আর চা, সময় কেটে যায় অনেকটা।

থার্বো চা, নাথমূল

এইখান থেকে বেরিয়ে আমরা ম্যাল এ একটা খালি বেঞ্চ পেয়ে একটু জিরোতে বসলাম। সামনেই ভুট্টা পোড়ানো হচ্ছিল, নিলাম কিনে একটা। আহা সে কি নরম, সুস্বাদু। বেশ লাগলো খেয়ে। তারপরে হাঁটা দিলাম ম্যাল এর থেকে ভানুভবন এর দিকে যাওয়ার রাস্তায়। যেতে যেতেই নজরে পড়লো বাঁদিকে I love Darjeeling এর চিন্হ। তারপরে গাঁধী রোড ধরে আমরা নামতে লাগলাম। একটু নামার পরেই বাঁদিকে একটি ছোট কেক পেস্ট্রির দোকান দেখে একবার দেখতে ঢুকলাম। একটা চকোলেট পেস্ট্রি (২০/-) খেয়ে দেখলাম অপূর্ব খেতে। স্ত্রী আর মেয়েও নিলো একটা তারপরে। তারপরে আবার হাঁটা।

বেশ খানিকটা হাঁটার পরে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় একটু জিরিয়ে নিতে আমরা ঢুকে পড়লাম নাওয়াং রেঁস্তোরাতে। জায়গাটি খুব ছোট, তবে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। এইখানে নিলাম চিকেন মোমো, ক্লিয়ার সুপ আর দুধ চা (১৫/-)। মোমো ও সুপ (৮০/- per প্লেট, ৮টা মোমো ও সুপ) দুটোই ভালো। দোকানে বসা কয়েকজন স্থানীয় লোকজন আমাদের সাথে বেশ আড্ডা জমিয়ে দিয়েছিল। যাক তাদের বিদায় জানিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। রাতে ডিনার এর সময় হয়ে আসছে দেখে আমরা চললাম আমাদের পরের গন্তব্যে।

গ্রিল্ড চিকেন, গ্লেনারিজ

ডিনার করবো বলে গেলাম আমাদের পছন্দের জায়গা গ্লেনারিস এ, তবে গিয়ে দেখলাম কোনো পার্সোনাল পার্টির জন্য সেদিন রাতে বন্ধ। কি করা যায়, চোখে পড়লো সাংগ্রীলা। ভিতরে ঢুকে দেখলাম ভিড় উপচে পড়ছে। আমরা নাম লেখালাম রিসেপশন এ সন্ধ্যা ৮টায়। বললো এক ঘন্টা লাগবেই। আমরা কি করবো ভেবে আবার ম্যাল এর দিকে হাঁটা লাগালাম। এই রাস্তায় দুদিকে নানা রকম স্ট্রিট ফুডের পসরা সাজিয়ে স্থানীয় লোকরা বসেন। আমিও লোভে পড়ে দু জায়গা থেকে শেফ্যালে (২০-৩০/-) কিনে বসলাম। মুখে দেওয়ার পরে আর পেটে গেলো না। এতটাই জঘন্য বানানো। অন্য কিছু আমরা আর চেখে দেখিনি, আশা করি সব খাবার বা সব দোকান খারাপ হবে না। আমাদের কপাল। যাক খানিক ঘুরে ফিরে আবার সাঙ্গ্রিলাতে এসে ঢুকলাম। অপেক্ষা করে করে শেষে রাত ১০টা নাগাদ বসার জায়গা পেলাম। খাবার মোটামুটি ঠিক করে রাখাই ছিল, চটপট অর্ডার করলাম ক্রিসপি হানি চিলি পটেটো, ফিশ সুইট অ্যান্ড সাওয়ার, হাক্কা চিকেন নুডলস্ আর আমেরিকান চপ সুই (১৪০০/- প্রায়)। আবারও হতাশ হলাম খাবার খেয়ে। এত নাম শুনে, ভালো ভালো রিভিউ দেখে, এতক্ষন অপেক্ষা করে যা পেলাম, তা এক কথায় অখাদ্য। নুডলস্ টা একমাত্র ভালো ছিল। বাকি সব খাবার খেয়েই মনে হল, একটা কমন বেসে একটু মশলাপাতি এইদিক ওইদিক করে বানানো। একদম বিস্বাদ, আর তারসাথে খাবারে ব্যবহার করা কোন ফুড কালার, আরো হতাশ করেছিল আমাদের। কোনো মতে খাবার শেষ করে বিলের জন্য বসলাম আরো খানিকক্ষণ। এত খারাপ আর ঢিমেতালে চলা রেস্তোরাঁ আমি কোনোদিন দেখিনি। যা টাকা খরচ করলাম, পুরোটাই জলে। হোটেলে ফিরে ক্লান্ত, অবসন্ন আমরা সবাই জলদি ঘুমিয়ে পড়ি। ভালো বিশ্রাম হলে না পরের দিন ভালো খানাপিনা করা যাবে কি করে।

আমেরিকান চপ সুই

দ্বিতীয় দিন সকালে হোটেলেই ব্রেকফাস্ট সারলাম, ব্রেড টোস্ট, অমলেট, কফি। তারপরে বেরিয়ে পড়লাম টয় ট্রেন জয় রাইড এর জন্য। যাওয়ার পথে ক্লক টাওয়ার এর নিচে হল এ একটা হস্ত শিল্প মেলা হচ্ছিল, সেটাও একটু দেখে নিলাম, কিছু কেনাকাটাও হল। তারপরে স্টেশন এ গিয়ে ট্রেন এ চাপলাম। বাতাসিয়া লুপ এ এইদিক ওইদিক ঘোরাঘুরি ও ছবি তুলতে গিয়ে আমরা ট্রেনটা মিস করলাম। ব্যাস লেগে গেল স্বামী স্ত্রী তে ঝগড়া। কি আর করা যাবে একটা সেয়ার গাড়ি করে ফিরে আসলাম হোটেলের সামনে। একে রাগারাগি আর তার ওপরে পেটে ছুঁচো তে ডন দিচ্ছে, আমরা গিয়ে ঢুকলাম গ্লেনারিজ এ। বাইরে তখন চড়া রোদ, আমরা অগত্যা ভিতরেই একটা টেবিলে বসলাম। অর্ডার করা হল গ্রিলড চিকেন, চিকেন নুডলস্ আর জুস। খানিক পরেই সিজলার প্লেটে ধোঁয়া উড়িয়ে হাজির হল গ্রিলড চিকেন। দুটো বড় পিস চিকেন, নরম, গরম, আহা, সাথে কিছু গ্রিলড সবজি। স্বর্গীয় স্বাদ একেবারে। আগেরদিন রাতের খাওয়াদাওয়ার দুঃখ সব উধাও। এজন্য গ্লেনারিজ এর কোন তুলনা হয় না। বিকেলের দিকে আরো কিছু জায়গায় যাবার প্ল্যান ছিল, তাই হোটেলে ফিরলাম একটু গড়িয়ে নিতে।

বিকেলের দিকে হোটেল থেকে বেরিয়ে লাদেন লা রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম মমতা পিৎজা প্লেস এ। কারেন্ট অফ ছিল, তবুও খোলা যখন আমরা বসলাম। একটা মিডিয়াম চিকেন পিৎজা আর হট চকলেট অর্ডার করলাম। একজন মহিলা আমাদের সাথে গল্প করতে করতেই পিৎজা বানাতে শুরু করলেন, শুনলাম গ্যাস চালিত পিৎজা ওভেনে তৈরি হবে পিৎজা। ওনার মুখেই শুনলাম মমতা ওনার বোন, আর এই মমতার স্বামী একজন ফরাসি ভদ্রলোক। ওনার কাছেই এনারা পিৎজা বানানো শিখেছেন। গল্প করতে করতেই কিছু পরে পিৎজা চলে আসলো। একদম ফ্রেশ, থিন ক্রাস্ট পিৎজা, চিকেন ঠাসা আর ক্রীম ও চিজে ভরা। ফটাফট শেষ হয়ে গেল। আরো কিছু খাবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু অন্য কিছু খাবো বলে আমরা ছাড় দিয়ে বেরিয়ে পরলাম। হাঁটতে হাঁটতে সিধে আবার keventars এর ছাদে। আমার মেয়ে নিল সফটি আর আমরা একটা বিখ্যাত চিকেন platter (৩৫০/- per প্লেট)। চিকেন সসেজ, সালামি, পোচ আর চিকেন ব্রেড লোফে ছড়াছড়ি। গোধূলি সময়ের দার্জিলিং এর আকাশ দেখতে দেখতে আমরা খেতে লাগলাম। খাওয়া দাওয়ার পরে আবার একটু চৌক বাজারে ঘোরা ফেরা, ক্লক টাওয়ার এর সামনে বেঞ্চে বসে বসে লোকজন দেখে আরো কিছুটা সময় গেল। তারপরে সামনেই টিবেটান খাবারের দোকান কুঙ্গা দেখে গেলাম, কিন্তু শুনলাম বন্ধ, কবে খুলবে বলতে পারছে না কেউ।

কেভেন্তার্স এর চিকেন প্ল্যাটার

কি আর করবো, মেয়ে আর স্ত্রী গেল বাজারে একটু কেনাকাটা করতে, আমি চললাম একটু নিচে রিংক মলের সামনে জোইস পাব এ। খুব সুন্দর ছোট একটি জায়গা। ছোট ছোট টেবিল ও বেঞ্চ, ইংরেজি গান বাজছে, টিভিতে ফুটবল চলছে। বিভিন্ন টেবিলে লোক বসে মৃদু স্বরে গল্প করছে, গান গাইছে। বেশ পরিবেশ। আমি একটা বাডওয়েইসার নিয়ে বসে পরলাম। সাথে ফ্রীতে বাদাম দিল। আধাঘন্টা কেমন ভাবে যেন কেটে গেল। স্ত্রীর ফোনে খেয়াল করলাম প্রায় সাড়ে আটটা বাজে, ডিনার করতে যেতে হবে গ্লেনারিজ। আজ আমাদের দার্জিলিং এ শেষ রাত, তাই গ্লেনারিজ যাওয়াই ঠিক মনে করেছিলাম। ম্যাডাম নাম লিখিয়ে রেখেছিল, গিয়ে জলদি একটা বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। আমাদের সামনেই একজন গায়ক বসে গিটার বাজিয়ে গান শোনাচ্ছেন। উফ্ সেই পরিবেশ, এইসবের জন্যই এইখানে ফিরে ফিরে আসতে হয়। আমরা প্রথমে দুজনে নিলাম এক পেগ করে জিম বিম, মেয়ের জন্য একদম প্লেন চিকেন নুডলস্, আর আমাদের জন্য ফিশ অগ্রাতিন। গ্রিলড ভেটকি মাছ তার ওপরে অনেকতো চিজের লেয়ার, এ স্বাদ না খেলে বোঝানো যাবে না। তেমনি ভালো ছিল নুডলস্। সুস্বাদু খাওয়া, সুন্দর গান আর গ্লেনারিজ এর জানলা দিয়ে রাতের দার্জিলিং এর বিন্দু বিন্দু আলো, এই তো জীবন। হোটেলে ফিরে ব্যাগ পত্র গুছিয়ে ফেললাম, আগামীকাল দার্জিলিং ছেড়ে আমরা চটকপুর যাবো। রাতে স্ত্রী বললো, আরে গ্লেনারিজ এর খোলা ছাদে বসে দার্জিলিং টি বাদ পড়লো যে আর নানানরকম কেক আর চকোলেট। তো আমি ওকে বললাম, সকাল সকাল চলে গিয়ে সেই ইচ্ছেটা নাহয় পূরণ করা যাবে। এখন ঘুম ছাড়া আর কিছু না।

পরের দিন সকালে ম্যাডাম নিজেই গিয়ে চা খেয়ে এলেন, আমার জন্য আনলেন চায়ের ছবি ও মেয়ের জন্য চকলেট। হোটেলেই ব্রেকফাস্ট করে আমরা আরেকবার গেলাম কুংগা তে, কিন্তু দেখলাম দুপুর ১টায় খুলবে। কী আর করা যাবে, অনেক জায়গাই তো বাকি থেকে গেল, আবার নাহয় আসবো দার্জিলিং। এখন চলি চটকপুর।

এই ছিল এইবারে দার্জিলিং এ আমাদের খাদ্যভ্রমণ। অনেক আনন্দ করলাম, অনেক কিছু খেলাম, অনেক জায়গা বাকি থেকে গেল, স্মৃতিতে থাকলো বৃষ্টি স্নাত মোহময়ী দার্জিলিং এর সৌন্দর্য। মনে মনে কথা দিলাম দার্জিলিং কে যে আবার আসবো, এইবারে এইটুকুই থাক।

Leave a Comment
Share