কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ’ ২০১৮

যুক্ত করা হয়েছে
মোঃ নাঈম ইসলাম, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা। ভ্রমণবাজ। ঘুরে বেড়ানোই যার শখ ❤
লেখক পরিচিতি

জীবনে প্রথম বারের মতো কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ। এর আগে চট্টগ্রামও কখনো যাওয়া হয়নি। তিন বন্ধু মিলে ১০ তারিখ রাত ১০:৪৫ মিনিটে ভৈরববাজার স্টেশন থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্য মহানগর এক্সপেস ট্রেনে করে যাত্রা শুরু করলাম।

সময়কাল

১০-১২-১৮ইং থেকে ১৫-১২-১৮ইং

১ম দিন

পৌছালাম প্রায় ৫ টায়। তারপর স্টেশন থেকে বের হয়ে সিএনজি করে চলে গেলাম দামপাড়া। দামপাড়া থেকে ৬ টা বাজে সৌদিয়া বাসে করে কক্সবাজারের দিকে রওয়ানা হয়। বাসে সবচেয়ে সামনের সিটটা নিয়েছিলাম। সারা রাতের সজাগ থেকে জার্নি শরীলটা যেন একেবারে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো। বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম আমানত শাহ সেতুর উপর আছি। সেই সঙ্গে সূর্যমামা পূর্ব গগনে উকি দিয়ে উঠছে। সব মিলায়ে অস্থির একট ভিউ পেলাম। চলার পথে বাস যখন পাহাড়ের পাস ঘেসে চুটছে তখন মনযোগ দিয়ে আশে পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে লাগলাম। সবচেয়ে ভালো লাগলো যখন দেখি পাহাড়ী গ্রামগুলো থেকে স্কুল ড্রেস পড়া মেয়েরা প্রাইভেটে যাচ্ছে। একেকটা যেন কিউটের ডিব্বা। কক্সবাজার লিংক রোড আসার পর বাস একেবারে খালি হয়ে গেলো। আমরা সহ আরো দুই তিনজন যাত্রী ছিলো। কন্টাকটার বললো আমাদের কলাতলিতে নামাবে। বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পর অবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম বাস উচু থেকে নামছে আর সামনের অদুরে বিশাল সমুদ্র। তারপর ৯:৩০ মিনিটে বাস ডলফিন মোড়ে নামিয়ে দেয়।

অনেক রিক্সা ও অটোড্রাইভার ঘিরে দরলো হোটেলে নিয়ে আসার জন্যে। সেখান থেকে দূরে চলে এসে একটা রিক্সা নিয়ে চলে গেলাম হোটেল খুজতে। কয়েকটা দেখার পর ৯০০ টাকাতে একদিনের জন্যে ভে-ভিউতে ডাবল বেডের রুম নেই। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে হালকা নাস্তা করে চলে গেলাম কলাতলি মেইন বিচে। বিশাল সমুদ্র যেটা নাকি ফটোফ্রেম কিংবা টিভির পর্দায় এতোদিন ধরে দেখে আসছিলাম তা আজ চোখের সামনে ভাসমান। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে দেখতে খুবই ভালো লেগেছে। বিশাল বালুচর সারিবদ্ধ ছাতা বিছানো আর সামনে পানি। তারপর কিনার ধরে হাটতে হাটতে চলে গেলাম সুগন্ধা বিচে। সেখানে গিয়ে সমুদ্র জলে ঝাপাঝাপি শুরু করে দিলাম। অনেক মানুষের ভীরে নিজেও অনেক উপভোগ করতে লাগলাম। তারপর আবার হোটেলে ফিরে আসা এবং দুপুরের খাবার সেরে হালকা বিশ্রাম। তারপর এক অটো গাড়ি দিয়ে চলে গেলাম হিমছড়ি।

সেন্ট মার্টিন

যাওয়ার পথে মেরিন ড্রাইভ রাস্তা দেখে মুগ্ধ। এক পাশে বিশাল সমুদ্র আরেক পাশে অনেক উচু পাহাড় মাঝ দিয়ে রাস্তা। ৩০ টাকা টিকেট কেটে ঢুকে পরলাম হিমছড়ি পার্কে। পাহারের ভিতর রাস্তা দিয়ে চলে গেলাম ঝর্ণা দেখতে। তারপর সেখান থেকে এসে খাড়া সিড়ি বেয়ে উঠে গেলাম পাহারের চূরায়। পাহারের চূরা থেকে নিচে মেরিন ড্রাইভ ও সমুদ্র দেখতে কি যে অস্তির তা নিজের চোখে না দেখলে বুঝবেন না। তারপর প্লাস পয়েন্ট হিসেবে উপড় থেকে সূর্যাস্ত উপভোগ করলাম এবং আবার চলে গেলাম হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিয়ে আবার চলে গেলাম সুগন্ধা বিচে। রাতের আধারে বিচে অনেক ভালো লাগছিলো এবং ঢেউ গুলো যেন ভয়ানক গর্জন নিয়ে তীরে আচড়ে পড়তে লাগলো। সময় কম তাই আবার হোটেলে এসে ডিনার করে শুয়ে পরলাম।

২য় দিন

ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে হোটেল চেক আউট করি। চির কাঙ্ক্ষিত সেন্ট মার্টিনের যাত্রা শুরু। রাস্তায় আসতে দেখি সরাসরি টেকনাফ সার্ভিসের অনেক বাস টেকনাফের উদ্দেশ্য রিজার্ভ টুরিস্ট নিয়ে রওয়ানা দিচ্ছে। আগে থেকে বুকিং না দেওয়ায় সিট খালি নেই। তারপর জাহাজ ঘাটেও ৯ টার আগে পৌছাতে হবে তাই তারাতারি করে কন্টাকটারের সাথে আলাপ করে ইন্জিনের সিটে বসে রওয়ানা দিলাম জনপ্রতি ২৫০ টাকা করে। এবারও আমি একেবারে বাসের সামনের দিকে বসি। তাই রাস্তা ঘাট পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য খুব ভালো ভাবে দেখতে পারলাম। সবুজ পাহাড়ের আকাঁবাকা উচু নিচু রাস্তা দিয়ে বাস যেতে লাগলো। ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ফটো তুলা শুরু করি। হঠাৎ দেখি খুব বড় বড় পাহাড় কিন্তু সবুজের দেখা নেই। প্রতিটা পাহাড় যেন ছোট ছোট ঘরে আবৃত্ত। বুঝতে আর বাকি রইলো না এটা যেন রোহিঙ্গা ক্যাম্প। সকাল হওয়ায় রাস্তায় তেমন জাম নেই এবং রিজার্ভ হওয়াতে বাস ডাইরেক্ট দ্রুত গতিতে চলতে লাগলো। ৮ টা ৪৫ মিনিটে বাস কেয়ারি জাহাজ ঘাটে নামিয়ে দেয়।

তারপর আগে থেকে বুকিং না দেওয়ায় অনেক চেষ্টা করেও স্ট্যান্ডিং টিকিটও পেলাম না। হতাশ ও অনেকটা আশা নিয়ে চলে গেলাম অন্য জাহাজ ঘাটে। কি আর করা সেখানেও একই অবস্থা। তাহলে কি সেন্ট মার্টিন যাওয়া হবে না? মনে অনেকটা সাহস জোগাড় করে সাথের দুই বন্ধুকে নিয়ে অটোগাড়ি দিয়ে রওয়ানা হলাম টেকনাফ ট্রলার ঘাটে। ঘাটে গিয়ে ২৩০ টাকা টোল ফি সহ তিনটা টিকেট কাটলাম। ট্রলার নাকি জোয়ার আসলে ১১ টা ৩০ মিনিটে ছাড়বে। তারপর এক হোটেলে ঢুকে নাস্তা সেরে নিলাম। সময় হলে ট্রলারে উঠে দেখি মালপত্রে ভরপুর। অনেক গুলা বস্তা, তেলের কন্টেইনার, ডিমের কেইস, দরজা, পানির ট্যাংক সহ ইত্যাদি মালামাল। এসব দেখে ভয় আরো বাড়তে লাগলো। এই ট্রলারে এতো মাল আবার এতো মানুষ। হঠাৎ ট্রলার ছেড়ে দেয় আর সূর্যের কি তাপ অসহ্য লাগছিলো। একটু পর বিজিবি ক্যাম্পে ট্রলার ভিড়লো এবং হালকা চেকিং করলো এবং অন্যদের পরিচয়পত্র দেখলো। টুরিস্ট বলাতে আমাদের কোন চেকিং করলো না।

তারপর ট্রলার নাফ নদী দিয়ে চলা শুরু করলো। এক পাশে মায়ানমারের বড় বড় পাহাড় আরেক পাশে বাংলাদেশ। যতই সামনের দিকে যেতে লাগলো ততই ভালো লাগলো। এসব দেখতে দেখতে ট্রলার মূল সমুদ্রে প্রবেশ করলো। মাঝি ভাই লাইফ জ্যাকেট দিতে লাগলো। ময়লা থাকা স্বত্তেও একটা জ্যাকেট নিয়ে গায়ে দেই কেননা জীবনের মূল্য অনেক। কিছুটা ভয় আর কিছুটা উদ্দ্যম মনে বয়ে যেত লাগলো। সেই বহুল চির অপেক্ষিত নীল পানির দেখা পেয়ে মনটা নেচে উঠলো। জীবনে প্রথমবারের মত সমুদ্রে তাও আবার ট্রলারে করে অনেক এডভান্টেজ হয়েছিলো। আস্তে আস্তে বাংলাদেশ শেষ। তখন শুধু একপাশে মায়ানমারের পাহাড় অন্য পাশে বিশাল সমুদ্র। ট্রলারের মাঝে অন্য টুরিস্ট ভাইয়েরা দেখি কার্ড খেলা শুরু করে দিলো আর আমরা তিন জন আড্ডা সেলফি ও ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। হঠাৎ দুরে কিছু একটা রেখা ভেসে উঠে বড় হতে লাগলো। বুঝতে আর বাকি রইলো না এটা বুঝি স্বপ্নের দ্বীপ নারিকেল জিন্জিরা

সেন্ট মার্টিন

আস্তে আস্তে ট্রলার অগ্রসর হতে লাগলো আর নারিকেল জিন্জিরা কাছে আসতে লাগলো। এভাবে আমারা ৩ টায় পৌছে গেলাম স্বপ্নের দ্বীপে। জেটি ঘাটে অন্য জাহাজ গুলো নোঙ্গর করা। যখন জেটিতে এসে ট্রলার লাগলো ব্যাগ নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে লাগলাম আবার নাকি জেটির টোল ফি দিতে হবে। দিলাম ২০ টাকা প্রতিজন। জেটি দিয়ে হাটতে হাটতে বাজারে ঢুকলাম। এবার হোটেল খুজার পালা, দুইটা হোটেল দেখলাম। তারপর আমার এক সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় ফেসবুক ফেন্ডের সাথে ফোনে কথা বলালাম। সে এসে আমাদের বাজারের পাশে রুপসি বাংলা হোটেলে নিয়ে চলে। তার পরিচয় ও আমাদের দামাদামিতে মাত্র ৬০০ টাকায় ডাবল বেডের রুম পেয়ে যায় একদিনের জন্যে। হোটেলে ডুকে একজন ফ্রেশ হতে চলে গেল আর আমারা দুইজন ব্যাগ গুছাচ্ছি। হঠাৎ সারা শরীর কাপুনি দিয়ে শিউরে উঠলো। একটা হাত ব্যাগ মিসিং, সেই হাত ব্যাগে আমাদের DSLR ক্যামেরা। আমি যেন এখানেই হার্টফিল করবো এমন ভাব। তারপর সাথের বন্ধুকে জিগ্যেস করতে সে বলে মনে হয় অন্য হোটেলে রুম দেখতে গিয়ে ব্যাগটা রেখে এসেছে।

সেন্ট মার্টিন ট্যুর যেন এখানেই পরি সমাপ্তি। দৌড়ে গেলাম সেই হোটেলে। গিয়ে জিগ্যেস করায় সে বলে ব্যাগের ব্যাপারে কিছু জানে না। তখন রুম খুলতে বললাম এবং তারপর রুমের ভিতরে একটা ব্যাগ দেখে পরান পাখি ফিরে আসে। যথারীতি হোটেলের ভাইকে ধন্যাবাদ জানিয়ে ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে ফিরে আসলাম আমাদের হোটেলে এবং ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম নারিকেল জিন্জিরা রেস্টুরেন্ট এ খেতে। বেলা শেষ হওয়া শুধু ফ্লাই ফিশ মাছের ভর্তা পেলাম। অনেক স্বাদ ছিলো খেতে। খাওয়া শেষ করতে করতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসলো। তারপর জেটিঘাট থেকে পশ্চিম বীচ ধরে হেটে চলে গেলাম হোটেল প্যারাডাইসের সামনের বীচে। অনেক উপভোগ করতে লাগলাম প্রাকৃতিটাকে। অনেক্ষণ ঘুরে হোটেলে আসলাম। তারপর আবার রাতে চলে গেলাম জেটিতে আড্ডা দিতে। অসংখ্যা তারা দিয়ে ভর্তি আকাশের ছায়াপথ গুলো খুজতে লাগলাম জেটিতে বসে। হঠাৎ দেখলাম একদল তরুণের আগমণ। তাদের মাঝখানে চেনা চেনা এক মুখ – নুর ভাই ফেসবুকের মাধ্যমে চিনি। স্থানীয় গাইড সে। জেটিতে এসে গলা ছেড়ে গান ধরলো নুর ভাই। সাথে একটা নাম জানা ছোট বাদ্যযন্ত্র। অস্থির তার গানের গলা। শহরের পোলা হইলে এতোদিনে ভালো পজিশনে চলে যেত সে। এভাবে তার গান শুনতে শুনতে অনেকটা সময় পার করলাম। আমার সেই ফেসবুক ফেন্ড ট্রিট হিসেবে আমাদের জন্যে জেটিতে কফি নিয়ে আসলো। ভাইরে জেটিতে বসে কফি খাওয়ার মজায় আলাদা। এভাবে আড্ডা শেষ করে চলে গেলাম হোটেল রুমে। রাতে ডিনার পেটে খিদা না থাকায় আপেল আর কমলা ফল খেলাম এবং ঘুমিয়ে পরলাম।

৩য় দিন

সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে গেলাম এক হোটেলে নাস্তা খেতে। খাওয়ার পর গেলাম জেটি ঘাটে। সেখান থেকে ২০০ টাকা জনপ্রতি লাইফ বোটে উঠলাম ছেড়াদ্বীপ যাওয়ার জন্যে। যখন লাইফ বোট ছাড়লো সবুজাভাব নীল স্বচ্ছ জলের উপড় দিয়ে চলতে লাগল, বোট থেকে মাছ ধরার নৌকা ও বীচ উপভোগ করতে লাগলাম। এভাবে মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌছে গেলাম ছেড়া দ্বীপে। প্রথমে বোট থেকে ছোট ডিঙ্গি নৌকায় নামলাম এবং নৌকা দিয়ে প্রবালের উপড় ঝিলিক দেওয়া স্বচ্ছ পানি দেখতে দেখতে তীরে আসলাম। উফ যেন স্বর্গে এসে পা রাখলাম। চারিদিকে বিশাল বিশাল প্রবাল তারপর সাদা বালু চর আর মাঝখানে কেয়াবন এ নিয়ে স্বপ্নের ছেড়াদ্বীপ।

ছেড়া দ্বীপ

অনেক পর্যটক ছিলো। হাটতে হাটতে চলে গেলাম ছেড়াদ্বীপের শেষ প্রান্তে। এটা শুধু ছেড়াদ্বীপ নয় বিশাল বাংলাদেশেরও একেবারে দক্ষিণের শেষ প্রান্ত। প্রবালের উপড় দাড়িয়ে থেকে পিছনে বাংলাদেশ আর সামনে বিশাল বঙ্গোপসাগর। অনেক জোশ। শুরু করলাম ছবি তোলা যদিও গোসলের পরিকল্পনা ছিলো না তবুও নিজেকে সামাল দিতে পারলাম না। দৌড়ে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়লাম দক্ষিণের শেষ প্রান্তে মানে সমুদ্র জলে। লাইফের প্রথমবারের মত ছেড়াদ্বীপের সৌন্দর্য দেখে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ ঝাপাঝাপি করে গোসল করে প্রাবলের উপড় হাটতে লাগলাম। তারপর পুরো ছেড়াদ্বীপ ঘুরে আবার লাইফবোটে করে সেন্ট মার্টিন ফিরে আসলাম। হোটেলে ঢুকতেই অবাক। সকাল ১১ টায় রুম চেক আউট টাইম। এসে দেখি ব্যাগসহ খাপড়-চোপড় বাহিরে টেবিলে রাখা. আর আমাদের রুমে অন্য গ্রুপ ঢুকেছে। ১৩ তারিখ ছিলো। ১৪,১৫,১৬ তারিখ বন্ধ থাকায় রুম অগ্রিম বুকিং ছিলো। কি আর করা অনেক কস্ট করে টিউবওয়েল চেপে কোনো রকম গোসল করি। তারপর ব্যাগ গুছিয়ে হোটেল অফিসে জমা রেখে চলে যাই রেস্টুরেন্টে খেতে। গিয়ে টুনা ও সালমন ফিশ ফ্রাই দিয়ে পেট পূজো করি। তারপর বেরিয়ে যাই হোটেল খুজতে।

খুজতে খুজতে সমস্ত সেন্ট মার্টিন ঘোরা হয়ে যায়, রুম আর পাই না। পেলেও ভাড়া কমপক্ষে ২০০০ টাকা। অনেকটা হতাশ হয়ে যাই। সিজন এবং ছুটির দিন হওয়ায় সব আগে থেকে বুকিং করা। ঘুরতে ঘুরতে দ্বীপের ভিতরের সবটুকু ঘুরে ফেলি। হঠাৎ করে রুপসী বাংলা হোটেল ম্যানেজার আক্তার ভাই ফোন দেয় এবং বলে সে নাকি নতুন তাবু সেট করেছে। অপর দুই বন্ধু দ্বীমত থাকলেও আমি আগ্রহের সাথে তাবু বুকিং করে ফেলি। একটি ভ্যানে করে হোটেলে ফিরে আসি। হোটেলে এসে দেখি অনেক সুন্দর তাবু, ভিতরে গোছানো বিছানা। তারপর সময় একেবারে কম তাই তারাতারি করে সাইকেল ভাড়া নিয়ে সরাসরি চলে যাই পশ্চিম বীচে। হুমায়ন আহমেদ স্যারের সমুদ্র বিলাস বাড়ি দেখি এবং খুব সুন্দর একটি সূর্যাস্ত উপভোগ করি।

সেন্ট মার্টিন

তারপর বীচের পাশ দিয়ে পুরো সেন্ট মার্টিন সাইকেল চালিয়েছি। সাথে দুই বন্ধু। এরপর আবার হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে চলে যাই হোটেল প্যারাডাইসের ঐ দিকে। পরেতো দেখি মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। হোটেলের আঙ্গিনায় এক বাউল গানের আসর আর সামনে এক ঝাক কিউটের ডিব্বা। কোন এক কলেজ থেকে ছাত্রীরা এসেছে শিক্ষা সফরে। তাদের সঙ্গে একসাথে বাউল গান উপভোগ করতে লাগলাম। অনেক সুন্দর একটা সময় পার করলাম। তারপর আবার বীচ ঘুরে চলে গেলাম বাজারের এক হোটেলে। গিয়ে ১৩০০ টাকায় একটা কালাচাঁদা মাছের বার-বি-কিউ অর্ডার দেই। মাছ বারবিকিউ করতে প্রায় দেড় ঘন্টা সময় লেগেছিলো। এই ফাকে আবার জেটিতে আড্ডা। পরে সেন্ট মার্টিনের বন্ধু সহ চারজনে মিলে ডিনার করলাম এবং হোটেলে তাবুতে চলে গেলাম। তাবুতে অনেক ইনজয় করলাম এবং ঘুমিয়ে গেলাম।

৪র্থ দিন

সকালে খুব ভোরে উঠে জেটিঘাটে থেকে পূর্ববীচ ধরে হাটা শুরু করলাম। বড় বড় প্রবাল কেয়াবন দেখে চোখ জুরিয়ে গেল। এক ধরণের সোনালী প্রবালের দেখা পেলাম। হাটতে হাটতে চলে গেলাম গলাচিপায়। এখান থেকে দুই পাশ দিয়ে সমুদ্র দেখা যায়। তারপর নারিকেল জিন্জিরার ডাব খেলাম ও বীচ ঘুরতে লাগলাম। যদিও ছেড়াদ্বীপ পর্যন্ত টার্গেট ছিলো কিন্তু পেটে হাগু বেটার কলিং বেলে আর পারলাম না। আশে পাশে কোন টয়লেট খুজে পেলাম না। গিয়েছি স্থানীয় লোকের বাড়িতে তারা আমাকে নিরাশ করে দিয়ে বীচে বড় প্রবালের পিছনে গিয়ে কাজ সারতে পরামর্শ দেয়। কি আর করা আবার পিছনে ব্রেক করলাম। আসার পথে দুইটা মসজিদ পাইছি তবে টয়লেট থালা মারা। অনেক কস্টে হোটেল পর্যন্ত এসে টয়লেটে গেলাম। তারপর ফ্রেশ হয়ে হোটেলে গিয়ে ২.৫ কেজি ওজনের একটা ক্ষুরা (দেশী মুরগ) অর্ডার দিলাম ১২০০ টাকায়। তারপর আবার ঘুরাঘুরি শুরু করলাম।

সেন্ট মার্টিন

এই দিনটা ছিলো ১৪ই ডিসেম্বর। এতো মানুষ ছিলো যেন মনে হয় তাদের চাপে সেন্ট মার্টিন পানির নিচে তলিয়ে যাবে। ঐ দিন ৬ টা জাহাজ থেকে শুধু পর্যটক জেটি দিয়ে দ্বীপে প্রবেশ করতে আনুমানিক দেড় ঘন্টার মত লেগেছিলো। তাহলে বুঝেন কত কত মানুষ হবে? এভাবে ঘুরে ফিরে দুপুরের খাবার খেতে চলে যায় রেস্টুরেন্টে। সেন্ট মার্টিনের ক্ষুরা আসলেই অনেক সুস্বাদু। কিন্তু হঠাৎ চোখ ছানাবোড় হয়ে যায়। একি এত দাম দিয়ে অর্ডার করা খাবারের এক প্লেটে দেখি পোল্টি মুরগী মিক্স করা। সাথে সাথে ওয়েটারকে ডাকলে আবোল তাবোল কথা বলা শুরু করে। হ্যা এটা জেটির পাশে নারিকেল জিন্জিরা রেস্টুরেন্ট এর আপ্যায়ন। শালারা কত বড়ো ভেজালবাজ 🙁 দেশী মুরগীর সাথে পোল্টি মিক্স করতে বিবেকে বাজলো না? কি আর করা সবগুলো খাবার সাবার করে সম্মানের সহিত বিল দিয়ে হোটেলে চলে গেলাম।

ছেড়া দ্বীপ

গিয়ে ম্যানেজার আক্তার ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায়ের পালা। অনেক হেল্পফুল ছিলেন আক্তার ভাই। পরে তাবুর ভারা জিগ্যেস করায় বলে খুশি হয়ে দিয়ে দিন। তারপর তাকে ৪০০ টাকা তাবু ভাড়া দিলাম। একই তাবু এই দিন ১৪ তারিখ রাতের জন্যে আমাদের সামনেই ১০০০ টাকা দিয়ে বুকিং নিয়েছে। এবার বিদায়ের পালা। হোটেল থেকে ব্যাগ নিয়ে চলে আসলাম জেটিতে। ৩টা বাজে জাহাজ ছাড়বে। স্থানীয় বন্ধুর সাহায্যে ৪০০ টাকা করে এম বি ফারহানের তিনটা টিকেট কাটলাম ব্লাকে। এর পর বিদায় নিয়ে যথাসময়ে জাহাজ ছেড়ে দিলো। ফিরে আসতে লাগলাম টেকনাফের দিকে। আস্তে আস্তে ছোট হতে লাগরো সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড। কিছুক্ষণ পর দেখি একঝাক সীগ্যাল জাহাজের পিছু নেয়া শুরু করলো। খুবই খারাপ লাগলো যখন দেখি মানুষ গুলো পাখিদের চিপস ছুড়ে মারছে খাওয়ার জন্যে। এটা পাখির সাস্থ্যের জন্য হুমকি। এভাবে দেখতে দেখতে টেকনাফ আসলাম। এত্তো ভীড় জাহাজ থেকে নামতে প্রায় ৪০ মিনিটের মত লাগছিলো। তারপর হানিফ বাসে করে আবার কক্সবাজারে রওয়ানা দেই। বাড়ির জন্যে বার্মিজ আচার, শুটকি কেনাকাটা শুরু করি। তিনজনে মিলে ১বস্তা সহ ২ বড় ব্যাগ পূরণ করে কেনাকাটাা করি। কেনাকাটা করতে করতে প্রায় রাত দুইটা বাজে। কি আর করা বাস না পেয়ে সুগন্ধা বিচে বসে থাকি এবং এক জন করে ব্যাগ ও বস্তার পাশে পালা করে বসে অন্যরা বীচে ঘুরে আসি। তখন রাতের নির্জন ভয়াল গর্জে উঠা ঢেউ গুলো অনেক ভালো লাগছিলো।

৫ম দিন

ভোর ৫ টায় মারসা বাসে করে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেই এবং বাস থেকে ৭ টা ৫০ মিনিটে নেমে তারাতারি সিএনজি করে স্টেশন এসে ৮ টা ১৫ মিনিটে চট্টলা এক্সপেস ধরে ভৈরব আসি বিকাল ৩টায়। ৪ টায় প্রিয় কুলিয়ারচরে নিজ এলাকায় এবং একটি সফল ভ্রমণের পপরিসমাপ্ত ঘটে।

কক্সবাজার সমন্ধে অনেকেরই ধারণা আছে তাই আর লিখলাম না। সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এই দ্বীপ আল্লাহর অশেষ রহমত বাংলাদেশের জন্যে। তিনদিকে বিশাল সমুদ্র এক দিকে দুরবর্তি মায়ানমারের পাহাড়, নীল জল কেয়াবন, প্রবাল, সব মিলিয়ে অস্থির যা কিনা লেখে প্রকাশ করা সম্ভব না। সারাজীবন মনে থাকবে দ্বীপের সৌন্দর্য। আর আল্লাহ রাজি থাকলে আবার যেতে চাই আরও আপন করে দেখতে। সেন্ট মার্টিনের মানুষ খুবই সহজ-সরল, ধর্মপরায়ণ।

রুপসী-বাংলা হোটেল, সেন্ট মার্টিন এর যোগাযোগ – [ আক্তার ভাই: 01878963736 ]

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ আমাদের অমূল্য সম্পদ, দ্বীপের পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের দ্বায়িত্ব। দিনে দিনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দ্বীপের পরিবেশ যা ভবিষ্যতের জন্যে হুমকি স্বরুপ। ছেড়াদ্বীপ সহ অনেক জায়গায় ময়লার ঝুড়ি বসানো আছে। আসুন আমরা নির্দিস্ট স্থানে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলি। এই দ্বীপ সহ আরো যত পর্যটন স্পট আছে আমরা সবাই মিলে ময়লা আবর্জনা না ফেলে বরং পরিষ্কার করার শপথ নেই। সবাইর প্রচেষ্টায় একসাথে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকবে আমাদের পর্যটন স্পট গুলি - এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।