ভূটানের আমলনামা (প্রথম পর্ব)

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

প্রায় ঘন্টা খানেক হয়ে গেল জয়গাঁ (ইন্ডিয়া) থেকে মিনিবাসে থিমপুর (ভূটান) উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ভূটান গেট পার হয়ে দুশো গজ পর থেকেই চড়াই শুরু। শম্ভুক গতিতে চলছে ট্যুরিস্ট মিনিবাস। দরজার পেছনে বাম পাশের সিটে বসে আছি। পাহাড়ের গা বেয়ে সরপিল রাস্তায় একেবেকে উঠছি উপরের দিকে। মনে হচ্ছে আকাশের আরও কাছাকাছি হচ্ছি!! একদিকে খাড়া পাহাড় অন্য দিকে গভীর গীরিখাদ। রাতের পরিষ্কার আকাশ। অসংখ্য তারা মিটিমিটি জ্বলছে। যেন আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে বিশ্বয়ের এই ড্রাগনের রাজ্যে। আর হেঁসে হেঁসে যেন বলছে স্বাগতম।

আকাশ আর ভূমি দূর দিগন্তে এক সাথে মিশে আছে যেন। যদিও ফুন্টশোয়েলিং আর জয়গাঁর বিজলি বাতিগুলো ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কিন্ত এতই দ্বেদিপ্যমান যে, সেগুলো কেও তারার রাজ্য ভেবে ভ্রম হচ্ছে। সত্যিই যেন এক স্বর্গপূরী। ডায়মন্ড আর জোনাক দিয়ে সাজানো  সে ভূবন। চিত্তরঞ্জন এই ছবি গুলো খোদাই হয়ে যাচ্ছে অজন্তার গুহা চিত্রকর্মের মত স্থায়ী হয়ে। আমার কলমের এতকি সাধ্য? যে কাল কালিতে আঁকতে পারে সে রাজকীয় সৌন্দর্য!! মাঝে মাঝে নিজের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছি। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই কারণ এই দেশের সিম কার্ড কেনা হয়নি। ভাবছি কাজটা খারাপ হয় নি একেবারে। ফোন একটিভ থাকলে এই সুন্দর মূহুর্তগুলো উপভোগ হতে বঞ্চিত হত হৃদয়। প্রকৃতির এই বন্য, নগ্ন সৌন্দর্যের মদিরা পান করার সুযোগ হয়তো হতো না। ফেসবুক টুইটারে ব্যাস্ত থাকতাম। আমরা এখন অদ্ভুত যান্ত্রিক। বিশেষ করে মুঠো ফোন আমাদের একদম শেষ করে দিয়েছে। কল্পনার রাজ্যে এখন খুউব দূর্বল, দরিদ্র। চাঁদ কে দেখে মনে হয় আলো দেয়ার প্রাকৃতিক যন্ত্র। এখন আর চাঁদের মাঝে কেউ খুজিনা প্রিয়ার মুখ। বৈশাখী মেঘের মধ্যে খোজা হয় না প্রিয়ার কাল চুল। ঝরনার উচ্ছলতা দেখে স্বরন হয় না মনের রানীর। জোসৎনা রাতে গুবাক তরুর দোল খাওয়া দেখে দোলা দেয়না আমদের পাষান হিয়া!!

গাড়ি  চলছে। পাহাড়ি রাস্তায় চলার একটা উদ্দত ভাব আছে, কিন্তু গতি নেই। ড্রাইভার ভাবলেশহীন ভাবে দুলকি চালে গাড়ি চালাচ্ছে। যতোই উপরে উঠছি একটু একটু করে ঠান্ডা বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে নিজের বয়লারে জ্বালানি সংকট। পেট চো চো করছে। দুশ্চিন্তাও বাড়ছে সমান তালে পাল্লা দিয়ে। পাঁচ ঘন্টার দীর্ঘ পথ। রাতের দ্বিতীয় যামে যখন থিমপু পৌছবো, তখন কোন হাতেম তাই আমাদের জন্য খুলে রাখবে তার সরাই??? সারাদিন অর্ধ ভোজন শেষে রাতে কি অনাহারী?? এই চিন্তা মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। কারন বাঙ্গালী সব পেলেও খাবার (স্বাদ / পরিমাণ) না পেলে লঙ্কা কান্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারে। “ক্ষুধার রাজ্য পৃথিবী গদ্যময়। পূর্নিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি” কবিতার এই পংতি কি এটাই প্রমান করে না যে “ক্ষুধা লাগলে উপভোগ্য জিনিস উপভোগ না করে গলধোকরন করার সমূহ সম্ভাবনা আছে আমাদের দ্বারা। বাঙ্গালীর এই মহান পেট পূজার কথা চিন্তা করেই কিনা সৈয়দ মুজতবা আলী সাহেব বলতে বাধ্য হলেন “সবাই তাজমহল দেখে আহা আহা করে, কিন্ত আমি করি না। কারন তাজমহল চিবিয়ে খাওয়া যায় না। আর খাশ মুঘলাই রান্না পেলেই আমি খাই এবং খেয়ে জিন্দাবাদ বাবুর আকবর বলি।”

বাঙ্গালীর পেট পূজার মহাৎতো বুঝেছিলাম ছোট বেলায় দাদুর এক গল্পে ”  আদম সৃষ্টির প্রাক্কালে সৃষ্টিকর্তা আজরাইল (আ:) কে বললেন, যাও পৃথিবী থেকে মাটি নিয়ে আস আদম সৃষ্টি করবো। ফেরেসতা সারা দুনিয়া পই পই করে ঘুরেও কোন মাটি জোগাড় করতে পারে না। কোন জায়গার মাটিই রাজি না আদম সৃজনে। সৃষ্টিকর্তার কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানাল আজরাইল (আ:)। আল্লাহ ফেরেসতাকে নতুন আদেশ করলেন। তাঁর আদেশ মোতাবেক ফেরেসতা দুনিয়াতে এসে পৃথিবীর সব সীমান্ত থেকে ঘুরে ঘুরে একটু একটু করে মাটি নিয়ে ফিরে গেল। সৃজন হলো আদম পরম যত্নে, সৃষ্টির সেরা করে সর্বোত্তম আকৃতিতে। কিন্তু দেখা গেল যে জায়গার মাটি দিয়ে যে অঙ্গ তৈরি হল পরবর্তিতে সেই স্থানের মানুষ সেই অঙ্গের ভালো ব্যাবহার শিখল। উদাহরন হিসেবে বলি, জাপান – জার্মানি – আমেরিকার মাটি দিয়ে তৈরি হয়েছিল ব্রেন, মাথা সহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ওরা হলো জ্ঞানী। আফ্রিকার মাটি দিয়ে হলো হাত পা, ওরা হলো বলবান। সব জায়গার মাটিই মোটামুটি কিছু না কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করল। কিন্ত দূরভাগ্য এই এই বাংলাদেশের। এই অভাগা দেশের মসৃণ পলিমাটি গিয়ে করল আদমের পেটের শ্রী বৃদ্ধী।” সেই দিন থেকে এই এক পেটের ক্ষুধা ভিন্ন অন্য কোন চাহিদাই নেই বাঙ্গালীর। পেট ঠান্ডা তো দুনিয়া ঠান্ডা। আমরা একটু খাবারের কাছেও বিক্রি হতে দ্বিধা বোধ করি না। এটা দিয়েই বন্ধু কে শত্রু আবার সাপে নেউলে গলাগলি হয়ে যায়!! পেট একটু খালি অবস্থায় যদি নাকে খাবারের মিস্টি গন্ধ পাই সঙ্গে সঙ্গে আমারা প্রত্যেকে এক এক জন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি হতে দেরী করি না। সুযোগ পেলেই লক্ষন সেনের মত চক্ষু লজ্জার মাথা খেতেও অপেক্ষা করতে অপারোগ!!

অনেকেই হয়তো বিরক্ত হচ্ছেন, বলছেন “আরে বাপু তুমি বসেছো ভূটানের গল্প বলার জন্য। কিন্তু কি মুশকিল, প্যাচাল শুরু করেছো বাঙ্গালীর খাবার নিয়ে !!! শুরুতেই তাদেরকে নিঃসংকোচে বলছি যারা আধুনিক ভ্রমন কাহিনী পড়ার জন্য বসে আছেন তারা দয়া করে আর সময় নষ্ট করবেন না। কারন আধুনিক লেখকেরা তাদের কাহিনীতে শুধু স্থান দেয় ” কোন জায়গা থেকে কোন জায়গার দূরত্ব কত, তাপমাত্রা কেমন, কোন রুটে / গাড়িতে ভাড়া কত, কোন কোন হোটেল প্রসিদ্ধ, কি কি সাথে নিবেন, সুবিধা – অসুবিধা কি কি, কি স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায়, সেল ফোন নেটওয়ার্ক কেমন, নাইট লাইফের বিস্তারিত তথ্য। আমি ঐ সকল মহৎ হৃদয়ের লেখকদের ছোট করছি না, আমার হৃদয়ের গহীনতম স্থানের শুভেচ্ছা জানাই তাদেরকে। কিন্ত ভাই, কি দরকার ছিলো আপনার এত কষ্টের!! মিঃ গুগোল থাকতে এই বৃথা পরিশ্রম কেন?

যাক এত প্যাচাল। যেটা বলছিলাম প্রকৃতির মাঝে হারাতে হারাতে, ঠান্ডার ভেতর একটু উষনতা পেয়ে কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম টেরই পাইনি। কিন্ত আমার একটা বদ অভ্যাস আছে গাড়ি থামলেই ঘুম ভেঙে যায়। অবচেতন মনে কেন যেন মনে হলো গাড়ি থেমে গেছে। চোখ কচলে চারিদিকে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখি সবাই নেমে যাচ্ছে গাড়ি থেকে। আমিও নামলাম। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা, হাত পা শক্ত হয়ে যাবে দু’চার মিনিটে। চারপাশে তাকাচছি, সামনে বিশালদেহী দুই কুকুর আমাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। হাত নেড়ে মুখে চুক চুক শব্দ করতেই ওরা চলে আসলো আমার কাছে। মাথা গলায় হাত বুলিয়ে দিলাম। ওরাও আমার শরীরে মুখ ঘসে, লেজ নেড়ে নেড়ে আমার প্রভূত্যের স্বীকৃতি দিলো। আসলে ঘটনা হচ্ছে হ্যারি (গাইড) আমাদের পেটের অবস্থা অনুধাবন করতে পেরে মাঝ পথেই খাবারের ব্যবস্থা করেছে। যাক এ যাত্রায় বোধ হয় জীবনটা রক্ষা পেল হ্যারির বদান্যতায়। ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে খুব সুন্দর ব্যবস্থা। প্রত্যেক টেবিলের নিচে রুম হিটারের গরম তাপে শরীরের বহিরাঙগন উষন করার সাথে সাথে টেবিলের উপর উষন খাবার যা আপনার অন্দরটা করে দেবে শিতল!! টেবিলে একটু বসলাম। গরম খুব ভালো লাগছে। ওদিকে একজন করে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। রুম হিটারের ভালোবাসার মায়ার জালে বন্ধী হয় ছোট বেলায় শেখা প্রবাদ (খাওয়ার আগ আর দরবারের শেষ) কখন ভূলে গেলাম বুঝিনি তখন। বুঝলাম যখন খাবার নিতে গেলাম!!! খাবার বুফে সিস্টেম। আটার রুটি, লাল চালের ভাত, সবজি, মুরগি, ডাল, পাপর ভাজি, চাটনি সহ আরো দুই একটা আইটেম। সবাই বীর বিক্রমে পানি পথের যুদ্ধে যেভাবে অবতীর্ণ ফলাফলটা শুধু অনুমান করুন। গিয়ে দেখি একটু সবজিও নেই। যাহোক এ যাত্রা হোটেল মালিকের হোম মিনিসটারের বদান্যতায় মান হেফাজত হল। কিন্ত মনে মনে এও স্বীকার করলাম ভবিষ্যতে সতর্ক না হলে আদমের ঐ পেটের দোষেই ভিন দেশে এই পিতৃদতত মানও আমার সাথে বেইমানই করতে পারে।

হোম মেড ফুড। বেশ সুস্বাদু। খাবারের চেয়ে ওদের আতিথেয়তা মুগ্ধকর। মালিকে জিজ্ঞেস করলাম এই সুস্বাদু খাবারের রন্ধন শিল্পী কে? হালকা হাসির সহিত জবাব দিল “স্বয়ং তার স্ত্রী!!” মুগ্ধ হলাম ওদের আন্তরিকতায়। এই প্রথম মনে হলো সত্যিই কোন সভ্য জনারন্যে চলে এসেছি । আমাদের সোনার বাংলায় কখনো দেখেছেন? হোটেল মালিক আপনার খাবার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আপনার সাথে পূর্ন আন্তরিকতার সহিত গল্প করে? খোজ খবর নেয়, আর কিছু লাগবে কি? রান্না ভালো হয়েছে? সব ঠিক আছে তো? পরিতৃপ্ত হলেন তো? এমন বন্ধুবৎসল বিরল। সত্যিই অতুলনীয়। যাক খাওয়া শেষ করে বের হলাম (Hotel Name :TASHI GONGPHEL, CELL :7740251) রেস্টুরেন্ট থেকে। তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে বাইরে একটু হাটাহাটি করছি। কিন্তু দু এক মিনিটের মধ্যেই শিত বুড়ির আক্রমনে জ্যা থেকে তীর ➡ যেমন ছুটে যায় তেমন ছুটে গিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বাসের মধ্যে আশ্রয় নিলাম।

TASHI GONGPHEL

এখন মনে হচ্ছে খাবারে এটা হলে ভালো হতো, বেগুন ভর্তা হলে আরো এক প্লেট টাইপের হাজার চিন্তা। আমাদের বাঙ্গালীদের ওই আলু পোড়া, বেগুন পোড়া ছাড়া তৃপ্ত না হওয়ায় কারণেই কিনা সুকুমার রায় বড় দূকখো পেয়ে বলেছিলেন

“এত খেয়ে তবু যদি নাহি ওঠে মনটা
খাও তবে কচু পোড়া, খাও তবে ঘন্টা”

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।

লিডারবোর্ড এড