বালি, ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ

যুক্ত করা হয়েছে

“সমুদ্র তো আমাদের দেশেই আছে, এতো টাকা খরচ করে বালি যাওয়ার কি দরকার?” এক বন্ধুর এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই মনে হলো আমার বালি ভ্রমনের উপর একটা ব্লগ লিখে ফেলা উচিত। যদিও বাস্তব অভিজ্ঞতা লিখে বোঝানো একেবারেই সম্ভাবনা। তাও এটা সত্যি যে, সব দেশের সমুদ্র সৈকত এক না আর বিদেশ যেতে খুব বেশি টাকাও লাগেনা। একটু বুদ্ধি, সাহস, অনলাইনে পড়াশোনা আর নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার মানসিকতা থাকলেই জনপ্রতি ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ করেই বালিতে মোটামুটি লাক্সারিয়াস ট্যুর দিয়ে আসা যায়।

বালি ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে কারন ছিলো কয়েকটি। প্রথমত, বালি এখন এশিয়ার সবচাইতে পপুলার ট্রাভেল ডেস্টিনেশন এবং কাপলদের জন্য খুবি রোমান্টিক; তার উপর আমি আর আমার স্ত্রী দুজনেই হচ্ছি পুরাই সমুদ্র পাগলা। অন্যান্য দেশের তুলনায় খুব অল্প খরচেই অনেক বেশি কিছু পাওয়া যায় বালিতে। এছাড়া বালিতে যেভাবে ভুমিকম্প আর সুনামি হওয়া শুরু হয়েছে তাতে আমার মনে হয়েছে এক্ষুনি ঘুরে না আসলে এই সুন্দর জায়গাগুলো খুব বেশিদিন আর থাকবেনা। তাই বালির এই শনির দশার তোয়াক্কা না করে এক সুন্দর রবিবার রাতে আমি আর আমার স্ত্রী রওনা দেই স্বপ্নের বালির উদ্দেশ্যে। মালিন্দ এয়ারের টিকেট কেটেছিলাম রাউন্ড ট্রিপ ২৬০০০ করে যাতে মালয়েশিয়া তে ট্রানজিট ছিলো। আগে থেকেই কোথায় কোথায় ঘুরবো সেটা বিভিন্ন ট্রাভেল ভ্লগ দেখে ঠিক করে ফেলেছিলাম এবং বুকিং ডট কমে হোটেল বুক করে ফেলেছিলাম। ও হ্যাঁ, প্লেনে ওঠার আগে আমার সেই বন্ধুটিকে মেসেজ করেছিলাম, “দেশের কতো বড় বড় কোম্পানি বিশ্বমানের সাবান উৎপাদন করছে, ওইগুলা না ব্যবহার করে প্রতিবার বিদেশ থেকে আসলে বিদেশী সাবান গিফট চাস কেন?” (বেচারা কোন রিপ্লাই দেয়নাই, তবে এবার বালি থেকে আসার পর আর বিদেশী সাবান চায় নাই)।

বালির নিগুরাহ রয় এয়ারপোর্টে নামলাম রাত দশটায়। বাংলাদেশীদের জন্য বালিতে ৩০ দিনের অন এরাইভাল ভিসা দেয় এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনে কোন খরচ ছাড়াই। জাস্ট ২-১ টা বেসিক প্রশ্ন করে যে দেশে কি করি, কতদিন থাকবো হোটেল বুকিং আছে কিনা, সাথে কে আছে এসব। ইমিগ্রেশন পুলিশরা খুবি ফ্রেন্ডলি। আমরা হানিমুনে গিয়েছি নাকি বেবিমুনে গিয়েছি এটা জিজ্ঞাসা করে সবাই মজা করছিলো। যাহোক ইমিগ্রেশনে একটু সময় লাগে কারণ অনেক লম্বা লাইন থাকে কিন্তু সবাই খুব সুশৃঙ্খলভাবে অপেক্ষা করে যেটা প্রশংসা করার মতো। ইমিগ্রেশন শেষে ৫০ ডলার ভাংগাই আর একটা সিম কিনি কারন এয়ারপোর্টে ডলার রেট কম আর সিমের দাম বেশি। ডলার এর সবচেয়ে ভালো রেট পাওয়া যায় কুটা এলাকার মানি এক্সচেঞ্জে। তবে একটু সাবধান থাকতে হবে ডলার ভাংগানোর সময়। কারন ১০০ ডলার ভাংগালে ১৪ লাখ ৫০ হাজার ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়া পাওয়া যায়। তাই প্রথম প্রথম টাকা গুনতে গিয়ে দুই একটা শুণ্য কম বেশি করে ফেললেই বিপদ। আর গলি ঘুপচির ভেতর কিছু মানি এক্সচেঞ্জ আছে যারা ডলারের রেট বেশি অফার করে কিন্তু হিসাবের এদিক ওদিক করে ঠকানোর সুযোগ নেয়। যাহোক, এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে ট্যাক্সি নিলাম কুটাতে বুক দেয়া হোটেলের উদ্দেশ্যে। ট্যাক্সি ভাড়া চায় ৪ লাখ রুপিয়া যেটা দামাদামি করে ১.৫ লাখ রুপিয়া করা হয়। বালিতে বেস্ট ট্যাক্সি কোম্পানি হচ্ছে ব্লুবার্ড। ওরা মিটারে যায় সব জায়গায়। মিটারের ভাড়া রিজনেবল এবং ব্লুবার্ড অ্যাপ ব্যবহার করে ট্যাক্সি ডাকা যায়। এই একটা জিনিস ছাড়া বালিতে সব কিছু কিনতে দামাদামি স্কিল থাকা লাগবে মারদাংগা।

বালি, ইন্দোনেশিয়া

কুটাতে প্রথম ২ রাত ছিলাম আমরা ডায়ানা হোমস্টে তে। বাংলাদেশী মাত্র ১১০০ টাকায় ব্রেকফাস্ট সহ ৩ স্টার মানের রুম ছিলো খুবি ছিমছাম পরিবেশে। প্রথম দিন আমরা কুটাতেই একটু রিলাক্সভাবে ঘুরাঘুরি করি কারন আমাদের হাতে সময় ছিলো অনেক। কুটা বীচে এক গ্লাস জুস হাতে বসে সমুদ্রে মানুষের সারফিং করা দেখতে বেশ লাগে। আর নিজে সারফিং করতে চাইলে তো কথাই নেই। কিন্তু খুব ভালো সাতার না জানলে সারফিং না করাই ভালো। কি দরকার শুধু শুধু কয়েক সেকেন্ড সারফিং বোর্ডে কষ্ট করে দাঁড়ায় থেকে বাকি সময় সমুদ্রে আছাড় খেয়ে খাবি খাওয়ার! দুপুরের খাবার সারলাম কুটা বীচের পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে, যারা আমার খাওয়া বেস্ট নাসি গোরেং বানায়। নাসি গোরেং হচ্ছে আসলে ইন্দোনেশিয়ান স্টাইলের ফ্রাইড রাইস আর মিয়ে গোরেং হচ্ছে ফ্রাইড নুডলস। কিন্তু প্রিপারেশন আর প্রেজেন্টেশন এর কারনে খাবার গুলো অইখানকার এনভাইরনমেন্টে অসাধারণ লাগে। লাঞ্চ শেষ করে আশেপাশের ট্রাভেল এজেন্সির দোকানে খোঁজ করলাম আমাদের প্ল্যান অনুজায়ী বালি-নুসা পেনিদা-গিলি-উবুদ ফাস্টবোটে কিরকম খরচ পড়বে। ওরা পার পার্সন ১৫ হাজার টাকা করে চাইলো। ওদের সাথে কথা বলতে বলতেই জানলাম সব ফাস্টবোট ছাড়ে সানুর অথবা পাদাংবাই নামক দুটো যায়গা থেকে। আমি ওদেরকে বললাম দাম কমাতে, নাহলে সানুর গিয়ে ঠিক করবো। ওরা তখন ভয় দেখানো শুরু করলো যে সানুর থেকে সরাসরি বোট পাওয়া যায়না, ওদের মাধ্যমেই নিতে হবে ইত্যাদি। আমি বললাম “আরে ব্যাটা, বোট না পেলে সাঁতরায় যামুগা। ব্রজেন দাসের দেশের লোক আমি, এইটুকু সাতরানো তো ছেলেখেলা”। ওই লোক কি বুঝলো কে জানে কিন্তু আর জোড়াজুড়ি করেনাই ওদের থেকে টিকেট কাটার জন্য। তারপর আমরা ব্লুবার্ড ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম সানুর বীচ। ওইখানে দেখলাম একাজায়া আর স্কুট এই দুইটা সবচেয়ে বড় ফাস্টবোট কোম্পানী যাদের অফিস সানুর বীচের কাছেই আছে। কোন দালাল না ধরে মেইন অফিস থেকেই আমাদের প্ল্যান অনুজায়ী বালি-নুসা পেনিদা-গিলি-উবুদ ড্রপ সহ একবারে টিকেট কেটে ফেললাম জনপ্রতি মাত্র ২৫০০ টাকা করে যেখানে জনপ্রতি ১০-১৫ হাজারের কমে কোন ট্রাভেল এজেন্ট দিতেই চাচ্ছিলোনা। তারপর সানুর বীচটা একটু ঘুরে দেখে ট্যাক্সি নিয়ে গেলাম পটেটো হেড বীচ ক্লাবে। ক্লাবটি একেবারে বীচের পাড়ে এবং এখান থেকে সানসেট ভিউটা বেশ পাওয়া যায়। ক্লাবের সুইমিংপুলটা ফ্রি তে ব্যবহার করা যায় কিন্তু ড্রিনকস এর দাম গলাকাটা। ক্লাব থেকে ফিরে এসে কুটা বীচ ওয়াক শপিং মলে কিছুক্ষন ঘুরাফেরা করে ডিনার করলাম ফিস এন্ড কো তে।

পরদিন সকাল ৮ টায় একাজায়া কোম্পানির ড্রাইভার ফোন করে বললো ৫ মিনিটের মধ্যে সে আমাদের হোটেলের নিচে আসছে। আমরাও রেডী হয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম আর চলে গেলাম পাদাং বাই জেটিতে। ফাস্ট বোট তার নামকরণের সার্থকতা প্রমাণ করার জন্য এতো জোড়ে চলতে লাগলো যে আমাদের দাড়াতেই কস্ট হচ্ছিলো। তাও কস্ট করে বোটের ছাদে গিয়ে কিছুক্ষণ দাড়ালাম, খুবই রোমাঞ্চকর অনুভুতি হয় সমুদ্রের বুকে তীব্র বেগে ছুটে চলতে। একই সাথে নিজেকে অনেক ক্ষুদ্র মনে হয় সমুদ্রের এই বিশালতার কাছে।

বালি, ইন্দোনেশিয়া

নুসা পেনিদাতে আমরা পৌছালাম ১১টার দিকে। দ্বীপটা একটু গ্রাম টাইপ। রিজোর্টগুলো সুন্দর লাক্সারিয়াস কিন্তু একটু দূরে। আমাদের রিসোর্টের নাম ছিলো স্লুম্বুং রিসোর্ট, যাওয়ার রাস্তা একটু দূর্গম হলেও রিসোর্টের ভিউ দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। রিসোর্টে চেক ইন করার পর শুনি সাইট সিয়িং এর জন্য ওইদিন আর কোন গাড়ি নেই, সব বুকড। একটাই উপায় স্কুটি ভাড়া করে ইচ্ছামত ঘুরা। পড়লাম বিপদে। স্কুটি বা মোটর সাইকেল কোনদিন চালাইনি তবে অনেক ভালো সাইকেল চালাতে পারি। সেই ভরশায় নিয়ে নিলাম একটা স্কুটি, কয়েকবার ট্রাই করে শিখেও ফেললাম এবং আল্লাহর রহমতে এরপর পুরো বালি ট্যুর আমরা স্কুটি নিয়ে ঘুরেছিলাম বিন্দুমাত্র বিপদ ছাড়াই। এর কৃতিত্ব কিছুটা আমার সাহসী স্ত্রীরতো বটেই, কারন একজন নতুন বাইকারের পেছনে ঠান্ডা মাথায় বসে থাকা আসলেই সাহসের ব্যপার। কিন্তু আমি সাজেস্ট করবো খুব ভালো বাইক চালাতে না পারলে অন্তত নুসা পেনিদাতে স্কুটি না চালানো ভালো কারণ রাস্তাঘাট ভয়াবহ রকমের পাহাড়ি যেটা দেখলে আত্মা শুকিয়ে যায়। যাহোক, ওইদিন আমরা স্কুটি নিয়ে ঘুরলাম নুসা পেনিদার পাশের দ্বিপ, নুসা লেম্বোংগান। এখানে ড্রিম বীচ, ডেভিলস টিয়ার, ব্লু ল্যাগুন আমরা গিয়েছিলাম। তিনটা যায়গাই তিন রকম অসাধারণ। আরো কিছু স্পট ছিলো যেগুলো সময়ের অভাবে যাওয়া হয়নি। তবে ড্রিম বীচের ড্রিম ক্যাফের লাঞ্চ উইথ ভিউ, ডেভিলস টিয়ারে সত্যিকার অর্থে সমুদ্রের শয়তানি আর ব্লু ল্যাগুনের ভয়ংকর উচু পাহাড়ের কিনারায় বসে ছবি তুলেই আমাদের মনে হয়েছে বালি আসা সার্থক। নুসা পেনিদাতে ফিরে রিসোর্টে ফিরার পথে ক্রিস্টাল বে বীচে সানসেট দেখে এসেছিলাম। তিন বেলাই নাসি আর মিয়ে গোরেং এর উপর ছিলাম। কম দামে বেস্ট খাবার বালিতে।

পরদিন সকালে উঠে স্কুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নুসা পেনিদার পপুলার সাইট আতুহ বীচ, কেলিংক্লিং বীচ, ব্রোকেন বীচ আর এঞ্জেলস বিলাবং দেখতে। গুগল মামা রাস্তা দেখালো অনেক ঘুরে। মামার উপর মাতব্বরি করে আমরা নিলাম সোজা রাস্তা আর খেলাম ধরা। নুসা পেনিদা দ্বিপটা আসলে একটা পাহাড়। গুগল দেখিয়েছিলো পাহাড়ের সাইড দিয়ে সমতল রাস্তা যেটাতে স্কুটি চালানো সহজ। আমরা সোজা রাস্তা দেখে যেটায় গেলাম সেটা ছিলো একেবারে পাহাড়ের মাঝ বরাবর দিয়ে পাহাড় ডিঙানো রাস্তা। যাহোক ভালয় ভালয় স্কুটি চালিয়ে ভালো রকমের এ্যডভেঞ্চার করে পাহাড় জয় করে আতুহ বীচে পৌছালাম। অবর্ণনীয় সুন্দর একটা বীচ ঠিক পাহাড়ের কিনার ঘেশে নীচে। এতো কালারফুল আকাশ আর সমুদ্র যে আমাদের ছবি দেখে সবাই বলে ফটোশপড। বীচ পর্যন্ত নামতে ট্রেকিং করা লাগে যাতে বিদেশী বিশাল দেহী লোকজন পুরা কাইত হয়ে যায় পরিশ্রমে তাই আমরা আর সাহস করলাম না নামার। তারপর কেলিংক্লিং বীচে গিয়েও একি দশা। ডাইনোসরের মাথার মতো দেখতে পাহাড়টিকে উপর থেকেই দেখলাম মন ভরে। আমাদের রিক্সা চড়া স্ট্যামিনা আর কম সময়ে হাজার ফিট নিচে নেমে বীচ বিলাশ করার মতো তেল বাংলাদেশে নেই। তারপর গেলাম ব্রোকেন বীচ। সুন্দর একটা বীচকে মাদার নেচার ভেঙে ফেলে রাখসে, এই ভাঙা বীচের যে সৌন্দর্য তা দেখেই কিছুক্ষণ আক করে তাকায় ছিলাম। প্রকৃতি দেখতে দেখতে যে কখন সন্ধ্যা হয়ে গেলো টেরই পেলাম না। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় এঞ্জেলস বিলাবং দেখা বাদ দিলাম। কারণ সন্ধার পর ওই পাহাড়ি বাজে রাস্তা দিয়ে ফেরার সাহস হয়নি। আবারও বলছি খুব ভালো বাইক চালাতে না জানলে স্কুটি চালানোর দুঃসাহস করবেননা, বালির সব যায়গাতেই সাত থেকে দশ লাখ রুপিয়াতে সারাদিনের জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়।

বালি, ইন্দোনেশিয়া

পরদিন ভোরে উঠে রওনা দিলাম স্বপ্নের গিলি আইল্যান্ডে। গিলি আইল্যান্ড আসলে তিনটা পাশাপাশি ছোট ছোট আইল্যান্ড নিয়ে গঠিত; গিলি ত্রাওয়াঙ্গান, গিলি মেনো আর গিলি এয়ার। এর মধ্যে গিলি ত্রাওয়াঙ্গান সবচেয়ে বড় আর পপুলার। এই দ্বিপে জনবসতি বেশি আর ফাস্টবোটগুলো এই দ্বিপেই যায়। মেনো আর এয়ারএও রিসোর্ট আছে অনেক সুন্দর আর নিরিবিলি। আমাদের এক রাত এয়ারে থাকার প্ল্যান ছিলো কিন্তু আমরা যাওয়ার আগেই মারাত্মক ভূমিকম্প হওয়ায় মেনো আর এয়ারের বেশিরভাগ রিসোর্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ ছিলো। আমরা গিলি ত্রাওয়াঙ্গানে গিয়েও অনেক ধবংসস্তুপ দেখলাম যেখানে অনেক মানুষ মারা গিয়েছে। কিছুক্ষণের জন্য মন খারাপ হয়ে যায় সেগুলো দেখে। অনেক হোটেল রিসোর্ট বন্ধ থাকায় ট্যুরিস্টও কম ছিলো। আমরা বাই সাইকেল ভাড়া করে পুরো দ্বিপ ঘুরে বেড়াই। গিলিতে কোন মোটর গাড়ি বা বাইক নেই। আছে বাইসাইকেল আর ট্রেডিশনাল ঘোড়ার গাড়ি। বাইসাইকেল চালিয়ে ঘুরতে অনেক মজা কিন্তু সাবধান! ঘোড়ার সাথে গুতা লাগলে কিন্তু কামড়ে দেবে। ও না, লাথি দিবে মনে হয়, অভিজ্ঞতা হয় নাই। গিলির বীচ গুলা দেখলেই নামতে ইচ্ছে করে। তার উপর আবার ব্যাটারা সমুদ্রের মধ্যে হাটু সমান গভীরতায় দোলনা আর হ্যামক বানায় রাখসে। ছবি তোলার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে। সন্ধ্যার পর শুরু হলো আরেক তামশা। বীচের সাইডের রেস্টুরেন্ট আর বার গুলোতে শুরু হলো পার্টি আর লাইভ মিউজিক। বালির লোকাল মিউজিশিয়ানরা ইংলিশ গান এতো ভালো গায় যে শুনে মাথা খারাপ হয়ে যায় অবিকল বব মারলি, ব্রায়ান অ্যাডামস কিংবা অ্যাডেল এর গানের কভার শুনে নিজের অজান্তেই বেশ কয়েকবার গেয়ে উঠেছি আর ওয়ান্স মোর বলে চিল্লিয়েছি। সিঙগাররাও উৎসাহ পেয়ে মজা করেছে আমাদের সাথে। এভাবে অনেক রাত পর্যন্ত চলে পার্টি। গিলির রিসোর্টগুলো বীচের কাছে এবং খুবই ছিমছাম। ওইখানকার মানুষগুলো অনেক ভালো। আমরা ছিলাম বীচের কাছেই কোকোনাট রিসোর্টে। অনেক কম খরচে (২৫০০ টাকা) ওয়ার্ল্ড ক্লাস ইকো রিসোর্ট ছিলো। সাথে সুন্দর একটা সুইমিং পুল আর কম্পলিমেন্টারি ব্রেকফাস্টও ছিলো।

পরদিন সকালে উঠে আমরা গেলাম আগেরদিন ঠিক করে রাখা টু আইল্যান্ড স্নরকেলিং ট্রিপে (দেড় লাখ রুপিয়া জনপ্রতি)। বিশ পচিশজন বসা যায় এমন ইঞ্জিন বোটে করে নিয়ে যায় স্নরকেলিং ট্রিপে। বোটগুলোর তলা আবার কাচের। নিচে তাকালে সমুদ্র দেখা যায়, মাঝে মাঝে রঙিন সামুদ্রিক মাছও দেখা যায়। স্নরকেলিং সম্পর্কে যারা জানেননা তাদের বলছি, স্নরকেলিং একধরনের আন্ডার ওয়াটার ডাইভিং। ডুবুরিদের মাস্ক পরে সমুদ্রের একটু গভীরে দুব দিয়ে জলজ প্রাণী দেখাই মূল উদ্দেশ্য। স্কুবা ডাইভিং এর সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে এতে অক্সিজেন ট্যাংক নেয়া হয়না আর তিন চার ফিটের বেশি গভীরে যাওয়া যায়না কারণ মাস্কের সাথে লাগানো ছোট একটা পাইপ দিয়ে নিশ্বাস নিতে হয়। আমি সাতার কম জানি বলে আমাকে লাইফ জ্যাকেট দিয়েছিলো। কিন্তু প্রথমে বুঝিনি যে গিলির স্নরকেলিং প্রফেশনাল লেভেলের। এর আগে থাইল্যান্ড এ দেখেছি অল্প পানিতে করায় আর দড়ি বাধা থাকে বোটের সাথে। কিন্তু এখানে মাঝ সমুদ্রে নিয়ে ইন্সট্রাক্টর বলে “জাম্প এন্ড হ্যাভ ফান”। আমি বললাম “কস কি মমিন”। ব্যাটা বলে “ডোন্ট ওরি ইয়াং ইন্ডিয়ান ম্যান, জাস্ট জাম্প”। মেজাজটা হলো খারাপ, বললাম “আই এম ফ্রম বাংলাদেশ”। বলেই বীরের বেশে কিছু না চিন্তা করে আমার স্ত্রীকে চোখ বড় অবস্থায় বোটে রেখে দিলাম সমুদ্রে লাফ। এরপরতো আত্মা শুকানো অবস্থা। লাইফ জ্যাকেট গায়ে সুবিধা করতে পারছিলামনা শুরুতে, তার উপর বিশাল বিশাল ঢেউ। কিছুক্ষন খাবি খেয়ে শেষে বোটের সিড়ি ধরে ডুব দিলাম। তাতেই যা দেখলাম পুরাই মাথা নষ্ট। মনে হলো বিশাল এক একুরিয়ামে আমাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রঙ বেরঙের মাছ আমার চারপাশে ঘুরে বেরাচ্ছে, এক কথায় অসাধারণ। কিছুক্ষণ সমুদ্রে ডুবাডুবির পর আমাদের নিয়ে গেলো গিলি এয়ারে। ওইখানে লাঞ্চ আর একটু রেস্ট নিয়ে আবার বোটে উঠে গিলি ত্রাওয়াঙ্গানের দিকে রওনা দিলাম। আসার পথে আরেকবার স্নরকেলিং করা হলো আর ফেরার পথে সমুদ্র ছিলো মারাত্মক উত্তাল। বোটের পাইলট অনেক দক্ষতার সাথে ঢেউয়ের উপর দিয়ে, পাশ দিয়ে কাটিয়ে সেফলি নিয়ে এসেছিলো। কিন্তু প্রতিবার ঢেউয়ে বোট এমনভাবে কাত হয়ে যাচ্ছিলো যে মনে হচ্ছিলো এই বুঝি গেলাম। অবশেষে বিশাল এক এডভেঞ্চার করে এক বুক ভরা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে গিলি ত্রাওয়াঙ্গানে ফিরে এলাম। মনে হচ্ছিলো এখানকার মানুষগুলোর কত মজা, প্রতিদিন ওরা এমন অ্যাডভেঞ্চার করছে জীবিকার তাগিদে। আরো মজা বেত্তমিজ ফরেইনারগুলার যাদের লাইফের কোন মায়া বা রেস্পনন্সিবিলিটি নেই। বছরের পর বছর ঘুরে বেড়াচ্ছে আর অ্যাডভেঞ্চার করছে। ওইদিন সন্ধ্যা আর রাতও কাটিয়ে দিলাম বীচের পারে বসে বারবিকিউ খেয়ে আর লাইভ মিউজিক শুনে। পরদিন আবার গিলি ছেড়ে রওনা দিলাম বালির দিকে। সাথে নিয়ে এলাম একগাদা স্মৃতি আর গিলির প্রকৃতি, সমুদ্র আর সুন্দর মনের মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা।

ফাস্টবোট আমাদেরকে নামিয়ে দিলো পাদাং বাই জেটিতে। এখান থেকে গাড়িতে করে আমাদেরকে উবুদে ড্রপ করার কথা একাজায়া কোম্পানির। কিন্তু বোট থেকে নামতেই এক বাটপার মহিলা এসে বললো আমাদের গাড়ি দুই ঘন্টা পর ছাড়বে পরের বোট আসার পর। আমরা এখনি যেতে চাইলে চার লাখ রুপিয়া দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে যেতে হবে। প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও মনে হলো একজায়ার অফিসে একবার কথা বলে দেখি। গিয়ে দেখলাম জেটির পার্কিং লটে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে। ভাবলাম ফিরে গিয়ে ওই বাটপার বেটিকে ধাক্কা মেরে পানিতে ফেলে দেই। গাড়িতে আরো এক ইউরোপিয়ান কাপল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে দেখে আর গেলাম না। উঠে পড়লাম গাড়িতে। গাড়ি আমাদের নিয়ে গেলো উবুদ সিটি সেন্টারে। সিটি সেন্টারে ওই কাপল নেমে গেলো আর আমরা ওই ড্রাইভারকে নিয়েই এক্সট্রা পে করে আমাদের বুকিং দেয়া জাগি ভিলায় চলে গেলাম। জাগি ভিলাটি খুবই সুন্দর। প্রাইভেট পুলসহ পুরা একটা বিলাশবহুল বাংলো শুধু আমাদের জন্য তাও আবার মাত্র চার হাজার টাকায়। সমস্যা হচ্ছে শুধু একটু ভিতরের দিকে। গাড়ি থেকে নেমেও পনেরো মিনিটের মতো হেটে যেতে হয়, স্কুটি ভাড়া নিলে খুবই ইজি। আসার পথে ড্রাইভারের সাথে ভাব হয়ে গেলো। খুবই ভালো লোক। ওকেই আমরা পাঁচ লাখ রুপিয়ায় ঠিক করে ফেললাম পরদিন আমাদের উবুদের কয়েকটি স্পট দেখিয়ে, উলুয়াতু টেম্পল, ড্রিমল্যান্ড বীচ ঘুরিয়ে কুটাতে নামিয়ে দেয়ার জন্য।

জাগি ভিলা থেকে স্কুটি ভাড়া নিয়ে বের হলাম আসেপাসে একটু ঘুরে দেখে। গুগল মামার কথা না শুনে আবারো পথ হারালাম। ধান ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে স্কুটি চালিয়ে অনেক ঘুরে সিটি সেন্টারে আসলাম আর পণ করলাম বালিতে আর কোনদিন গুগল মামার অবাধ্য হবো না। উবুদ অনেকটা বাংলাদেশের গ্রামের মতো। ধান ক্ষেত, টিনের ঘর সবই আমাদের দেশের মতো কিন্তু অনেক পরিস্কার পরিছন্ন আর মানুষজন অনেক বেশী ট্যুরিস্ট ফ্রেন্ডলি। একারণেই বিভিন্ন দেশের ট্যুরিস্টদের কাছে যায়গাটা এতোটা পপুলার। পরদিন সকালে হোটেল চেক আউট করে গাড়ি নয়ে বের হোলাম সত্যি সত্যি ধানক্ষেত দেখতে। তেগাল্লালাং রাইস টেরেস নামের এই যায়গাটি ট্রিপ এডভাইসরে নাম্বার ওয়ান। আসলে কিছুইনা, খুবই সাজানো গুছানো একটা ধান ক্ষেত পাহারের স্তরে স্তরে করা হয়েছে। সাথে ছবি তোলার জন্য কতগুলো সুন্দর বুথ আর বিশাল বিশাল কতগুলো দোলনা বানিয়ে রেখেছে। দোলনায় চড়াটা অনেক এক্সাইটিং যদিও জনপ্রতি এক হাজার টাকার মতো নেয় দোলনা চড়াতে। ওইখান থেকে গেলাম লুয়াক কফি প্ল্যান্টেশন দেখতে। লুয়াক কফি এক ধরণের বিশেষ দামী কফি যার বানানোর প্রসেস শুনলে প্রথমবার সবাই একটা ধাক্কা খায়। লুয়াক আসলে বিড়াল প্রজাতির একটা প্রাণীর নাম। এই প্রাণীটিকে কফি বীন খাওয়ানো হয়। তারপর প্রানীটি যেই মল ত্যাগ করে সেটাই শুকিয়ে সেদ্ধ করে লুয়াক কফি বানানো হয় যেটা মানুষ অনেক দাম দিয়ে কিনে আয়েশ করে খায়। আমরাও সেই গু কফি টেস্ট করে দেখলাম। আসলেই স্বাদ ভালো ছিলো কফিটার। অনেক স্ট্রং ফ্লেভার কিন্তু কম ক্যাফেইন, এটাই এই কফির বৈশিষ্ট। সাথে আরো অনেকরকম চা-কফি ওরা টেস্ট করিয়েছিলো ফ্রি তে যেগুলোর বেশিরভাগই অখাদ্য ছিলো। লুয়াক কফি ওরফে গু কফি প্রতি কাপ পঞ্চাশ হাজার রুপয়া করে রাখে।

উবুদ, ইন্দোনেশিয়া

এরপর আমরা উবুদ দেখা শেষ করলাম কারন উবুদের অন্যান্য পপুলার স্পট যেমন তীর্থগঙ্গা, গল্ফ গারডেন অনেক দূরে। তাই ওইগুলা বাদ দিয়ে আমরা চলে গেলাম উলুয়াতু টেম্পল দেখতে। যায়গাটা অনেক দূরে এবং উঁচুতে। আবার একই সাথে সমুদ্রের পাড়ে তৈরি করা একটা মন্দির। তাই দৃষ্টি নন্দন প্লেস হিসেবে যায়গাটা ট্যুরিস্টদের কাছে পপুলার আর হিন্দুদের কাছে একটি উপাসনালয়। মন্দিরে হাফ প্যান্ট পড়ে ঢোকা যায়না। হাফ প্যান্ট পড়া থাকলে ওরা লুঙ্গির মতো এক টুকরো কাপড় পরিয়ে দেয় যেটা সারং নামে পরিচিত। সারং পড়ে মজার পোজ দিয়ে ছবিও তোলা যায়। উলুয়াতু টেম্পল থেকে কুটার দিকে আসার পথে পরে ড্রিমল্যান্ড বীচ। এটায় সবাই খুব একটা যায়না কিন্তু অনেক সুন্দর একটা বীচ। অনেক নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ফ্রি শাটল বাসে চড়ে বীচে যেতে হয়। সানসেট দেখার জন্য বীচটা পারফেক্ট আর বীচটা খুবই পরিস্কার। বীচ থেকে ফিরে গেলাম কুটাতে আমাদের সেই প্রথমদিনের ডায়ানা হোমস্টে তে। ডায়ানার মালিক মহা খুশি আমরা আবারো আসায়। ওইদিন আর কিছু করার এনার্জি ছিলোনা তাই ম্যাগডোনাল্ডসের একটা বিগ ম্যাক খেয়ে দিলাম ঘুম। ও আচ্ছা, বালির ম্যাকডোনাল্ডসের টেস্ট আশেপাশের অন্যান্য দেশের ম্যাকডোনাল্ডসের চেয়ে ভালো আমার মতে।

পরদিন স্কুটি নিয়ে নিলাম একবারে তিন দিনের জন্য। আমাদের হাতে অনেক সময় ছিলো বলে আমরা কুটায় একটু বেশি সময় কাটাই। সকালে গেলাম নুসা দুয়ায়। নুসা দুয়াতে কিছু বীচ আছে সুন্দর, তবে নুসা দুয়া পপুলার ওয়াটার এক্টিভিটিসের জন্য। স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং, সি ওয়াকিং, প্যারাসেইলিং, বানানাবোট এবং আরো অনেক এক্সাইটিং ওয়াটার এক্টিভিটিস করা যায় অনেক কম টাকায়। তবে টিকেট অবশ্যই নুসা দুয়া গিয়ে কোম্পানি অফিস থেকে কাটা ভালো এবং প্রচুর দামাদামি করে নিতে হবে তাহলে কুটার ট্রাভেল এজেন্টদের চেয়ে এক তৃতীয়াংশ দামে পাওয়া যাবে। ওইদিন দেখলাম বালির পুলিশরা কি পরিমাণে হেল্পফুল। আমরা রাস্তা চিনতে পারছিলামনা দেখে এক পুলিশ অফিসার বাইক নিয়ে আমাকে রাস্তা দেখিয়ে চালাতে থাকলো প্রায় দুই কিলোমিটার। আমার বাঙালী মনে একটু সন্দেহ উকি দিলো যে ব্যাটার মতলব কি এতো কষ্ট করার পেছনে। কিন্তু দেখলাম আসলেই কোন মতলব নেই। উনি আমাদেরকে একটি ওয়াটার স্পোর্টস কোম্পানির অফিসে পৌছে দিয়ে, লোকজনকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করতে বলে, আমাদেরকে হ্যাভ এ নাইস ডে বলে হাসিমুখে বিদায় নিলো। ওয়াটার স্পোর্টসের মধ্যে স্কুবা ডাইভিং করতে ভালো সাতার জানা লাগে। এছাড়া বাকিগুলা সাতার না জানলেও করা যায়। আমরা সি ওয়াকিং আর প্যারাসেইলিং করলাম জনপ্রতি সাড়ে চার লাখ রুপিয়া করে। সাথে এক লাখ রুপয়া এক্সট্রা নিয়েছিলো সি ওয়াকিং এর সময় আন্ডার ওয়াটার ছবি ও ভিডিও করার জন্য। সি ওয়াকিং ব্যাপারটা মজার ছিলো। বোটে করে সমুদ্রের মাঝেনিয়ে একটা হেলমেট পরিয়ে পানির নীচে নামিয়ে দেয়। হেলমেটের সাথে পাইপ দিয়ে অক্সিজেন দেয়া হয় বোট থেকে যাতে করে একেবারে স্বাভাবিকভাবেই নিশ্বাস নেয়া যায়। সমুদ্রের নীচে গিয়ে সুন্দর সুন্দর রঙিন মাছ দেখা যায়, ওদেরকে পাউরুটি খেতে দেয়া যায়। একজন প্রোফেশনাল ডুবুরি সবসময় সাথে থাকে হেল্প করার জন্য আর ছবি তোলার জন্য। সি ওয়াকিং শেষে আমরা করি প্যারাসেইলিং। কক্সবাজারের প্যারাসেইলিং এর সাথে বালিরটার পার্থক্য হচ্ছে এটা মাঝ সমুদ্রে বোট থেকে আকাশে উঠায় আবার বোটেই ল্যান্ড করায় খুব স্মুথলি। তাছাড়া দুইজন একসাথে একই প্যারাস্যুটে প্যারাসেইলিং করা যায় তাই মজা করে দেখা যায় বউয়ের ভয় পেয়ে চেঁচানো।

ওয়াটার স্পোর্টস শেষ করে আমরা কুটা ফেরার পথে গেলাম কৃষ্ঞা মার্কেটে। এই মার্কেটে অনেক কম দামে দারুন দারুন লোকাল জিনিস আর হ্যান্ডিক্রাফটস পাওয়া যায় স্যুভেনির হিসেবে নিয়ে আসার জন্য। একগাদা শপিং করে ফেললাম। সেগুলো হোটেলে রেখে সানসেট দেখার জন্য গেলাম তানাহ লট। তানাহ লট হচ্ছে সমুদ্রের ঠিক মধ্যে তৈরি করা একটি মন্দির যেখানে খুব সুন্দর একটি সানসেট ভিউ পয়েন্ট আছে।

বালিতে এতো সস্তা হোটেল পেয়ে এক ছেলেমানুষী আইডিয়া মাথায় চাপলো। ঠিক করলাম বাকী দুইদিন দুটো ফাইভ স্টার হোটেলে থাকবো যেখানে খরচ পার নাইট মাত্র পঁচিশ শো টাকা। যেই ভাবা সেই কাজ, পরদিন উঠলাম কুটা বীচের একদম সামনে মারকিউরি হোটেল এ। ফাইভ স্টার মানের হোটেল যাদের রুফটপে আছে দারুন এক ইনফিনিটি পুল। সান সেটের সময় পুলে নেমে ইনফিনিটির শেষ মাথায় গিয়ে এক গ্লাস জুস খাওয়া, ওহ! শুধু ইংলিশ মুভি না, বাস্তবেও সম্ভব। ওই দিন রাতে বালির পিজ্জা হাট ট্রাই করেছিলাম। নতুন কিছু ফ্লেভারের পিজ্জা খেলাম, ভালো ছিলো। আরো রাতে গেলাম হারড রক ক্যাফেতে। আইকা এন্ড সউল ব্রাদার্স নামের একটা ব্যান্ড লাইভ পারফর্ম করছিলো। সব খাবারের গলাকাটা দাম তাই আমরা চুপা রুস্তমের মতো জাস্ট দুইটা লেমোনেড অর্ডার করে এক্কেবারে লাইভ মিউজিক স্টেজের সামনে বসে পরলাম। অসাধারণ গায় ওরা পপুলার ইংলিশ গানগুলো। প্রায় দুই ঘন্টা মজা করে গান শুনে বের হলাম। হালাল নাইট লাইফটাও বেশ ভালো বালিতে এবং অনেক রাতেও রাস্তাঘাট সেফ থাকে।

পরদিন উঠলাম আরেক ফাইভ স্টার হোটেলে মাত্র তেইশশো টাকা ভাড়ায়। হোটেলটা এয়ারপোর্টের একেবারে কাছে তাই সিলেক্ট করা যেহেতু তার পর দিনই আমাদের ফিরতি ফ্লাইট। হোটেলটার নাম এইচ সোভেরিয়ান। সুন্দর আর আধুনিকভাবে সাজানো হোটেলটি। ছাদের উপর সুইমিংপুল আর ছাদ থেকে এয়ারপোর্টে প্লেন টেক অফ করা দেখা যায় খুব কাছে থেকে। বালির নিগুরাহ রয় এয়ারপোর্ট এশিয়ার ব্যস্ততম এয়ারপোর্ট গুলোর মধ্যে একটি কারন বিভিন্ন দেশের ফ্লাইট ট্যুরিস্ট নিয়ে আসে আর অস্ট্রেলিয়া যেতে ট্রানজিট নেয়। আমরা সুইমিং করতে করতে একের পর এক প্লেন টেক অফ করা দেখছিলাম, খুবই মজার একটা বেপার। ওইদিন রাতে গেলাম জিম্বারান বীচ নামের একটা বীচে সি ফুড ডিনার করতে। এই একটা মাত্র যায়গা আমার কাছে ওভার এক্সপেন্সিভ লাগলো। দুইজনের ডিনার করতেই প্রায় দশ লাখ রুপিয়া বের হয়ে যায়। জ্যান্ত মাছ, কাকড়া, স্কুইড, লবস্টার ইত্যাদি এ্যাকুরিয়ামে দেখে সিলেক্ট করে দিলে ওরা বারবিকিউ বা রান্না করে দেয়, কেজি হিসাবে দাম দিতে হয়। এতো বড় লবস্টার দেখে ভয়ই লাগলো, আমাদের দেশে কখনো দেখিনি। আমাদের দেশে একটু বড় চিংড়িকেই লবস্টার বলে বিক্রি করে কিন্তু লবস্টার আলাদা জিনিস। তো খেলাম সেই ঘোড়ার ডিমের সি ফুড এত্তগুলা টাকা ঢালার কষ্টের পাথর প্রথমে বুকে চাপা দিয়ে, পরে অবশ্য সমুদ্রের পারের বাতাসে টিস্যু পেপার উড়ে যাচ্ছিলো তাই ওইটা চাপা দিসিলাম। তারপর একটু ভালো লাগলো কিন্তু এমন আহামরি কোন স্বাদ না যেটা না খেলে মিস, কিন্তু ওই যায়গাটায় না গেলে আসলেই মিস। বীচের মধ্যে ক্যান্ডেল লাইটে রোমান্টিক ডিনার, লাইভ মিউজিক আর তারউপর ওইদিন ছিলো ফুলমুন। নিজেদেরকে হুমায়ুন আহমেদ এর কোন একটা ক্যারেক্টার ভেবে জোৎস্না গায়ে লাগিয়ে ভাজা মাছ উলটে খেতে খেতে মনে হলো মাঝে মাঝে এরকম বেশি খরচ করাটা মন্দ না। এরকম পরিবেশে ডিনার, লাইভ মিউজিক আর বিদেশী দের মাতলামি দেখতে দেখতে কিছু সময়ের জন্য জীবনের সব দুঃখ, দুশ্চিন্তা ভুলে গিয়ে জীবনের সুখের স্বাদটা উপভোগ করা যায়।

বালি, ইন্দোনেশিয়া

পরদিন হোটেলের এয়ারপোর্ট শাটল কারে করে এয়ারপোর্ট চলে এলাম। অনেকদিন পর বাড়ি ফেরার মজা আর ভালোবাসার বালি ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট একসাথে ফিল করলাম। তবে অন্যান্য দেশ আর বালি ঘুরে মনে হলো ট্যুরিস্ট প্লেস হিসেবে বালি খুবই পারফেক্ট আর এটাকে পারফেক্ট বানানোর পেছনে মূল কৃতিত্ব ওইখানকার মানুষের। ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাক্ট করার জন্য পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, অতিথিপরায়ণতা, সেফটি থেকে শুরু করে যা যা করা দরকার সবই ওরা করেছে। আমাদের দেশে কতো সুন্দর সমুদ্র, বীচ, পাহার, ম্যানগ্রোভ আছে কিন্তু আমরা নিজেদের কারনেই আমাদের দেশকে পর্যটন নগরী বানাতে পারিনা। তাই সবার কাছে অনুরোধ আমরা যেনো ট্যুরিজমকে সুস্থ আর সুন্দর রাখার চেস্টা করি সেটা দেশে বাইরে যেখানেই হোক না কেনো আর পরিবেশের ক্ষতি হয়, ময়লা হয় এমন কিছু না করি। ট্রাভেলিং কখনোই পয়সা নষ্ট বা বিলাশিতা নয়। ট্রাভেলিং আমাদেরকে সাহাজ্য করে নতুন দেশ সম্পর্কে জানতে, নতুন কিছু শিখতে অথবা নিজের মানসিকতার উন্নয়ন করতে। এখানেই শেষ করছি। আপনার ভ্রমণ আনন্দময় হোক।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।