আলীকদমের গল্প-২ (মাতামুহুরী নদী, পোয়ামুহুরী ঝর্ণা, রুপমুহুরি ঝর্ণা)

যুক্ত করা হয়েছে

আগের পোস্টে বলেছিলাম আলীকদমের দামতুয়া আর ওয়াংপা ঝর্না নিয়ে। আজ আপনাদের নিয়ে যাব এক কল্পনার রাজ্যে। এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই, মানুষের কোলাহল নেই, যন্ত্রের বিরক্তিকর শব্দ নেই, ধুলাবালি নেই, শুধু ট্রলারের ইঞ্জিনের গর্জন আছে আর আছে চোখ ধাধানো সৌন্দর্য। বলছিলাম মাতামুহুরি নদীর কথা। দুইপারে পাহাড়ের সারি, মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা নদী।

মাতামুহুরিতে ঘোরার জন্য আগের দিন আলীকদম জেসিও থেকে পারমিশন নিতে হয়। এরজন্য সবার নাম, স্থায়ী জেলা, মোবাইল নাম্বার সব একটা কাগজে লিখে সাথে সবার ন্যাশনাল আইডির কপি জমা দিছিলাম। প্রায় ২ ঘন্টা পর পারমিশন মিলল। এরপর রাতে খেয়ে দেয়ে পরদিনের জন্য রেড়ি হলাম।

সকালে নাস্তা করে আলীকদম ব্রীজের গোড়ায় চলে গেলাম। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় দুরের পাহাড়গুলোকে আরো সুন্দর দেখাচ্ছিলো। ট্রলার রিজার্ভ করে যাত্রা শুরু হল। যতই ভিতরে যেতে থাকি ততই অবাক হতে থাকলাম। একেবেকে চলা পাহাড়ি নদীতে ট্রলারের গলুইতে চেপে সামনের সৌন্দর্য শুধুই মনের খাতায় তুলতে থাকলাম। এই সৌন্দর্য কোন ক্যামেরায় তোলা সম্ভব না।

আলীকদম মাতামুহুরি
আলীকদম ব্রিজের উপর থেকে তোলা। সামনে মাতামুহুরি নদী আর পিছনে পাহাড়ের সারি।

প্রায় ঘন্টাখানেক পর প্রথম আর্মি চেকপোস্ট জানালিপাড়া আর্মি ক্যাম্প। সেখান থেকে আলীকদম জেসিওতে ওরা কল করে আমাদের পারমিশনের ব্যাপারে কনফার্ম হয়ে নেয়। পারমিশন ছাড়া এই জানালিপাড়া পর্যন্ত যাওয়া যায়। আগেরদিন অনেক বোট এইখান থেকে ফেরত পাঠাইছে বলে ক্যাম্পেরই একজন জানালো।

পোয়ামুহুরী ঝর্না
পোয়ামুহুরী ঝর্না

তবে এই একঘন্টায় যা দেখছি সেটা সিকিভাগও ছিলোনা সেটা বুঝলাম আরো কিছুদূর গিয়ে। একেকটা বাক নেয়ার পর সৌন্দর্যের সঙ্গাটাই যেন বদলে যাচ্ছিলো। যতই আমরা যেতে থাকলাম পাহাড় ততই ঘন সন্নিবেশিত হতে থাকল। কিছু কিছু যায়গায় একেবারে নদীর পাড় দিয়েই কয়েকশ ফুট উচু পাহাড়। সবুজের চাদরে মোড়ানো সবকিছু।

জানালিপাড়া আর্মিক্যাম্প থেকে রউনা দেয়ার ঘন্টাখানেক পর পৌছালাম কুরুকপোতা আর্মি ক্যাম্পে। সেখানে না নামলেও হয়। শুধু চেকইন দিয়ে এগোতে থাকলাম অপার সৌন্দর্যের পানে। আমাদের ট্রলার এগোয় আর মনের মধ্যে বাজছে “এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বলতো”।

মাতামুহুরী নদীর কোন একখানে।
মাতামুহুরী নদীর কোন একখানে।

যাই হোক আরো ঘন্টাখানেক পর আমরা পোয়ামুহুরি বাজারে নামলাম। সেখান থেকে ৫/১০ মিনিটের হাটা পথ পেরিয়ে পৌছালাম রুপমুহুরি ঝর্নায়। রুপমুহুরির রুপের শেষ নেই। কয়েকশ ফুট উচু থেকে তীব্রবেগে ধেয়ে আসছে পানি। নিচে বসে থাকাই দায়। প্রথমে যারা যাচ্ছিলো সবাই গিয়ে কান চেপে ধরতেছিলো। ঘটনা কি দেখতে নিজেই গেলাম। নিচে বসে ছোটবেলায় স্যারদের বেতের বাড়ির কথা মনে পড়তেছিলো। প্রচন্ড বেগে ধেয়ে আসা পানি বেতের মতই গায়ে বিধতেছিলো। কিছুক্ষন ঝাপাঝাপি করে পোয়ামুহুরি বাজারে ফিরে আসলাম। এইখানে একটা হোটেল মত আছে সেইখান থেকে দুপুরে খেয়ে নিলাম। এইখানে একটা আর্মি ক্যাম্প আছে। সবার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার লেখা আরেকটা কাগজ দিলাম ওইখানে। এইটাই সম্ভবত বাংলাদেশের শেষ আর্মি ক্যাম্প। এর ৭/৮ কিলমিটার পরেই মায়ানমার।

রুপমুহুরি ঝর্ণা
রুপমুহুরি ঝর্ণা

এবার ফেরার পালা। ফেরার পথে পোয়ামুহুরি বাজার থেকে ১০ মিনিট ট্রলারে করে এসে পোয়ামুহুরি ঝর্না পড়ে। এরপর হাটাপথ ১০ মিনিটের। মাতামুহুরির রুপে এত মজে ছিলাম যে নামার আর ইচ্ছা হলনা। এরপর শুধুই ফেরা। চারপাশে পাহাড়গুলোকে বিদায় জানাতে জানাতে আমরা ফিরে আসতে থাকলাম আলীকদমের দিকে। বিকালের দিকে আলীকদম ফিরে এবার ঘরে ফেরা শুরু হল চকোরিয়া হয়ে চট্টগ্রামের দিকে…

খরচাপাতি

সকালের নাস্তাঃ ১১০০ টাকা
দুপুরের খাবারঃ ৯০০ টাকা (জনপ্রতি ৯০ টাকা করে আমরা ৮ জন আর গাইড ও ট্রলার ড্রাইভার)
ট্রলার ভাড়াঃ ৫৫০০ টাকা
গাইডঃ ১২০০ (যদিও পারমিশন থাকলে গাইড লাগেনা, আমাদের পরিচিত এক ভাই ছিলেন যিনি এদিকে পরিচিত তাই নিয়ে গিয়েছিলাম আর ফিরে এসে উনাকে কিছু সম্মানী দিছি)
আলীকদম থেকে চকোরিয়া চান্দের গাড়িঃ ১০০০ টাকা
মোটঃ ৯৭০০ টাকা
জনপ্রতিঃ ১২১২ টাকা
চকোরিয়া থেকে চিটাগাং ১৮০ করে জনপ্রতি।
জনপ্রতি মোটঃ ১৩৯২ টাকা।
এর বাইরে আমাদের কিছু বিবিধ খরচ ছিলো যেগুলো গ্রুপ ভেদে আলাদা হবে। এইগুলোই মুল খরচ।

সতর্কতা

  • মাতামুহুরী নদীর যেখানে সেখানে নামবেন না। চোরাবালি আছে অনেক যায়গায়।
  • সম্ভব হলে সানস্কিন ক্রিম মেখে যাবেন বা ছাতা নিয়ে যাবেন। ট্রলারে থাকার সময় রোদে সানবার্ন হয়।
বিঃদ্রঃ যেখানে সেখানে পলিথিন, বিস্কুট, চিপস, চকলেটের প্যাকেট ফেলবেন না। পরিবেশ নোংরা করবেন না। পাহাড়িদের সাথে ভালো ব্যাবহার করুন।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।