বাংলাদেশের পাহাড়ি ট্রেকিং রুটের মধ্যে ‘থানচি-রুমা সার্কিট’ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, বৈচিত্র্যময় ও চ্যালেঞ্জিং ট্রেইলগুলোর একটি। এই ট্রেইলে যেমন রয়েছে মেঘছোঁয়া পাহাড় চূড়া ও শান্ত পাহাড়ি পাড়া, তেমনই রয়েছে গভীর জঙ্গল ও বুনো সব ঝর্ণা। আমাদের এবারের আর্টিকেলে স্থানগুলোর বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়ে পুরো ট্রেইলটি কীভাবে সম্পন্ন করবেন, তার একটি সুসংগঠিত ও বাস্তবসম্মত রুট প্ল্যান নিচে উপস্থাপন করা হলো:
- রুট: বান্দরবান ➔ থানচি ➔ বাসিরাম ➔ নিশিপাড়া ➔ জগতং ➔ লাচিং ➔ বাক্তলাই ➔ থাইক্ষ্যং ➔ কপিতাল ➔ জাদিপাই ➔ কেওক্রাডং ➔ বগালেক ➔ রুমা ➔ বান্দরবান
- ট্রেকের ধরন: এক্সট্রিম / অ্যাডভান্সড লেভেল ট্রেকিং
- সময়কাল: ৫ রাত / ৬ দিন (বান্দরবান টু বান্দরবান)
- প্রধান আকর্ষণ: ৬টি ঝর্ণা, ১টি পর্বতচূড়া, ৬টি আদিবাসী পাড়া এবং পাহাড়ি রাস্তা।
থানচি-রুমা সার্কিট ট্রেকিং রুট ও ট্রেইল প্ল্যান
দিন ১: বান্দরবান ➔ থানচি (ডিম পাহাড় ও তমা তুঙ্গি) ➔ বাসিরাম পাড়া ➔ নিশিপাড়া ➔ জগতং পাড়া
যাত্রা ও ট্রেইল:
- বান্দরবান শহর থেকে সকালে চাঁদের গাড়িতে থানচির উদ্দেশে রওনা।
- পথে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু মোটরেবল সড়ক ডিম পাহাড় এবং থানচির কাছাকাছি ভিউপয়েন্ট তমা তুঙ্গি ঘুরে থানচি বাজারে পৌঁছানো।
- থানচি বাজারে গাইড নেওয়া, স্থানীয় প্রশাসনের এন্ট্রি ও প্রয়োজনীয় অনুমতি সম্পন্ন করা।
- থানচি থেকে মূল ট্রেকিং শুরু: থানচি ➔ বাসিরাম পাড়া ➔ নিশিপাড়া ➔ জগতং পাড়া।
হাঁটার সময়: আনুমানিক ৪–৫ ঘণ্টা।
রাত্রিযাপন: জগতং পাড়া।
দিন ২: জগতং পাড়া ➔ লাচিং পাড়া ➔ বাকলাই পাড়া ➔ বাকলাই ঝর্ণা
যাত্রা ও ট্রেইল:
- জগতং পাড়া থেকে সকালের নাস্তা সেরে খাড়া চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পৌঁছাবেন লাচিং পাড়া।
- লাচিং পাড়ায় কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে ট্রেইল ধরে এগিয়ে চলা বাকলাই পাড়ার দিকে।
- বাকলাই পাড়ায় ব্যাকপ্যাক রেখে হালকা হয়ে স্থানীয় ট্রেইল দিয়ে নেমে যাওয়া প্রায় ৩৮০ ফুট উঁচু সুবিশাল বাকলাই/বাক্তলাই ঝর্ণা এক্সপ্লোর করতে।
- ঝর্ণা দেখে পুনরায় চড়াই ভেঙে বাক্তলাই পাড়ায় ফিরে আসা।
হাঁটার সময়: আনুমানিক ৫–৬ ঘণ্টা।
রাত্রিযাপন: বাক্তলাই পাড়া।
দিন ৩: বাক্তলাই পাড়া ➔ থাইক্ষ্যং পাড়া ➔ ডাবল ফলস (ত্লাবং) ও ফাইপি ঝর্ণা
যাত্রা ও ট্রেইল:
- বাক্তলাই পাড়া থেকে সকালের যাত্রা শুরু করে পৌঁছাবেন সার্কিটের মূল কেন্দ্রবিন্দু থাইক্ষ্যং পাড়া।
- থাইক্ষ্যং পাড়াকে ট্রানজিট/বেসক্যাম্প বানিয়ে গহীন ঝিরিপথ ও পাথুরে ট্রেইলে নামা ডাবল ফলস ঝর্ণা এবং বুনো ফাইপি ঝর্ণা দর্শনের জন্য।
- দীর্ঘ পিচ্ছিল ঝিরিপথ পার হয়ে দুটি ঝর্ণা দেখে বিকেলে থাইক্ষ্যং পাড়ায় ফিরে আসা।
হাঁটার সময়: আনুমানিক ৬–৭ ঘণ্টা।
রাত্রিযাপন: থাইক্ষ্যং পাড়া।
দিন ৪: থাইক্ষ্যং পাড়া ➔ তারতে ও তারপি ঝর্ণা ➔ কপিতাল চূড়া ➔ পাসিং পাড়া
যাত্রা ও ট্রেইল:
- ভোরে থাইক্ষ্যং পাড়া থেকে পার্শ্ববর্তী ট্রেইলে তারতে ঝর্ণা এবং তারপি ঝর্ণা এক্সপ্লোরেশন।
- ঝর্ণা দেখে এসে ব্যাকপ্যাক নিয়ে শুরু হবে খাড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে কপিতাল (Kapital Peak) সামিট।
- কপিতাল সামিটের পর পাহাড়ি রিজলাইন (Ridge) ধরে হেঁটে পৌঁছাবেন দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ গ্রাম পাসিং পাড়া।
হাঁটার সময়: আনুমানিক ৭–৮ ঘণ্টা।
রাত্রিযাপন: পাসিং পাড়া।
দিন ৫: পাসিং পাড়া ➔ জাদিপাই ঝর্ণা ➔ কেওক্রাডং ➔ বগালেক
যাত্রা ও ট্রেইল:
- খুব ভোরে পাসিং পাড়া থেকে নিচে নেমে অপরূপ জাদিপাই ঝর্ণার পাদদেশে পৌঁছানো।
- জাদিপাই উপভোগ করে খাড়া চড়াই বেয়ে ওঠা কেওক্রাডং চূড়ায়।
- কেওক্রাডং ও দার্জিলিং পাড়া পার হয়ে পাহাড়ি ট্রেইল ধরে নেমে আসা ঐতিহ্যবাহী বগালেক-এ।
হাঁটার সময়: আনুমানিক ৫–৬ ঘণ্টা।
রাত্রিযাপন: বগালেক।
দিন ৬: বগালেক ➔ রুমা বাজার ➔ বান্দরবান সদর
যাত্রা:
- বগালেকে সকাল কাটিয়ে চাঁদের গাড়িতে রুমা বাজারের উদ্দেশে যাত্রা।
- রুমা বাজারে গিয়ে গাইড ক্লোজ করা ও নিরাপত্তা বাহিনীর এন্ট্রি আউট করা।
- রুমা থেকে লোকাল বাস বা চাঁদের গাড়িতে বান্দরবান সদর হয়ে ঢাকার/গন্তব্যের বাস ধরা।
ট্রেকিং সারসংক্ষেপ এক নজরে
| দিন | শুরুর স্থান | ট্রেইল ও দর্শনীয় স্থান | সমাপ্তি / রাত | হাঁটার আনুমানিক সময় |
|---|---|---|---|---|
| ১ম দিন | বান্দরবান সদর | ডিম পাহাড়, তমা তুঙ্গি, থানচি, বাসিরাম পাড়া, নিশিপাড়া | জগতং পাড়া | ৪–৫ ঘণ্টা (ট্রেক) |
| ২য় দিন | জগতং পাড়া | লাচিং পাড়া, বাকলাই পাড়া ও বাক্তলাই ঝর্ণা | বাক্তলাই পাড়া | ৫–৬ ঘণ্টা |
| ৩য় দিন | বাক্তলাই পাড়া | থাইক্ষ্যং পাড়া, ডাবল ফলস ও ফাইপি ঝর্ণা | থাইক্ষ্যং পাড়া | ৬–৭ ঘণ্টা |
| ৪র্থ দিন | থাইক্ষ্যং পাড়া | তারতে ঝর্ণা, তারপি ঝর্ণা, কপিতাল চূড়া | পাসিং পাড়া | ৭–৮ ঘণ্টা |
| ৫ম দিন | পাসিং পাড়া | জাদিপাই ঝর্ণা, কেওক্রাডং চূড়া, দার্জিলিং পাড়া | বগালেক | ৫–৬ ঘণ্টা |
| ৬ষ্ঠ দিন | বগালেক | ঝিরি/গাড়ি পথ, রুমা বাজার | বান্দরবান সদর | গাড়িতে যাতায়াত |
জনপ্রতি আনুমানিক মোট খরচ (ঢাকা টু ঢাকা)
থানচি-রুমা সার্কিট ট্রেকের মোট খরচ মূলত নির্ভর করে দলের সদস্য সংখ্যা এবং ব্যক্তিগত খরচের অভ্যাসের ওপর। যেহেতু চাঁদের গাড়ি ও গাইডের খরচ নির্দিষ্ট, তাই ৬ থেকে ৮ জনের দল হলে প্রতিজনের খরচ সবচেয়ে সাশ্রয়ী হয়। ঢাকা থেকে গিয়ে পুরো ট্রেক শেষ করে ঢাকা ফেরা পর্যন্ত (৫ রাত / ৬ দিন) সম্ভাব্য খরচের একটি বাস্তবসম্মত হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
- ৬–৮ জনের দল হলে: আনুমানিক ৳৮,৫০০ – ৳১০,৫০০ (জনপ্রতি)
- ৩–৪ জনের ছোট দল হলে: আনুমানিক ৳১১,৫০০ – ৳১৪,০০০ (জনপ্রতি)
- বান্দরবান টু বান্দরবান (ঢাকা-বান্দরবান বাস ভাড়া বাদে): আনুমানিক ৳৬,৫০০ – ৳৮,৫০০ (জনপ্রতি)
খরচের খাতভিত্তিক বিস্তারিত বিবরণ
১. মূল যাতায়াত (ঢাকা ⇄ বান্দরবান)
- নন-এসি বাস: ৳৮৫০ – ৳৯৫০ × ২ (যাওয়া-আসা) = ৳১,৭০০ – ৳১,৯০০
- (এসি বাসে যাতায়াত করলে খরচ প্রায় ৳৩,০০০ – ৳৩,৫০০ হবে)
২. অভ্যন্তরীণ জিপ / চাঁদের গাড়ি ভাড়া
- বান্দরবান ➔ ডিম পাহাড় ➔ তমা তুঙ্গি ➔ থানচি: রিজার্ভ চাঁদের গাড়ি প্রায় ৳৬,০০০ – ৳৭,৫০০
- বগালেক ➔ রুমা বাজার: রিজার্ভ চাঁদের গাড়ি প্রায় ৳২,৫০০ – ৳৩,০০০
- রুমা বাজার ➔ বান্দরবান সদর: লোকাল বাস (৳১৫০–২০০/জন) অথবা রিজার্ভ গাড়ি (৳৪,০০০ – ৳৪,৫০০)
- ৮ জনের দলে ভাগ করলে জনপ্রতি গাড়ি খরচ পড়বে: ৳১,৫০০ – ৳২,০০০
৩. গাইড ফি
- থানচি থেকে মূল সার্কিট গাইড: প্রতিদিন ৳১,২০০ – ৳১,৫০০ × ৫ দিন = ৳৬,০০০ – ৳৭,৫০০
- থাইক্ষ্যং পাড়ার লোকাল গাইড (ঝর্ণাগুলোর জন্য): ৳১,০০০ – ৳১,৫০০
- ৮ জনের দলে ভাগ করলে জনপ্রতি গাইড খরচ পড়বে: ৳৯০০ – ৳১,২০০
৪. পাড়ায় থাকা ও খাওয়া (৫ রাত / ৬ দিন)
- পাড়ায় থাকা: আদিবাসী মাচাং ঘরে রাতপ্রতি ৳২০০ – ৳২৫০ × ৫ রাত = ৳১,০০০ – ৳১,২৫০
- খাবার (পাহাড়ে ৩ বেলা): দেশি মুরগি/ডিম, পাহাড়ি ডাল-ভাত মিলিয়ে দিনে ৳৪৫০ – ৳৫৫০ × ৫ দিন = ৳২,২০০ – ৳২,৮০০
- শুকনো খাবার ও ট্রেইল এনার্জি স্ন্যাকস: খেজুর, বাদাম, ওআরএস, গ্লুকোজ, চকলেট = ৳৫০০ – ৳৮০০
৫. অনুমতি, এন্ট্রি ফি ও বিবিধ
- বগালেক এন্ট্রি ফি, অনুমতিপত্রের ফটোকপি, টিপস ও জরুরি ফান্ড = ৳৫০০ – ৳৮০০
কিছু দরকারি বাজেট টিপস
- টিম সাইজ: চাঁদের গাড়িতে সাধারণত ৮–১০ জন আরামসে বসা যায়। তাই ৬–৮ জনের টিম বানালে জিপ ও গাইড খরচ অনেকটাই কমে আসে।
- নগদ টাকা (Cash): থানচি বাজারের পর পুরো ট্রেইলে কোনো এটিএম বা অনলাইন পেমেন্ট (বিকাশ/নগদ) নেটওয়ার্ক কাজ করবে না। তাই বান্দরবান সদর বা থানচি থেকেই প্রয়োজনীয় সম্পূর্ণ ক্যাশ টাকা সাথে রাখুন।
- শুকনো খাবার: থানচি বা বান্দরবান থেকেই ট্রেইলের শুকনা খাবার ও ওআরএস কিনে নিন; গহীন পাড়াগুলোতে এসবের দাম তুলনামূলক বেশি হতে পারে বা নাও পাওয়া যেতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ ট্রেইল টিপস
- গাইড নির্বাচন: থানচি থেকে এমন গাইড নিতে হবে যিনি রুমা পর্যন্ত পুরো সার্কিট এবং থাইক্ষ্যংয়ের বুনো ট্রেইলগুলোতে (তারতে/তারপি/ফাইপি) সম্পূর্ণ অভিজ্ঞ।
- জাতীয় পরিচয়পত্র ও অনুমতি: থানচি ও রুমা দুই উপজেলাতেই নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হয়। তাই প্রত্যেকের NID/পাসপোর্টের কমপক্ষে ৮–১০ কপি ফটোকপি সঙ্গে রাখুন।
- শারীরিক প্রস্তুতি: এই সার্কিটে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় চড়াই ও পিচ্ছিল ঝিরিপথে হাঁটতে হয়। ভালো গ্রিপযুক্ত ট্রেকিং জুতো, ট্র্যাকিং পোল, ওয়াটারপ্রুফ ব্যাকপ্যাক ও ওআরএস সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক।
সকলের প্রতি অনুরোধ, এই বর্ষায় এডভেঞ্চার এর নেশায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকবেন। মনে রাখবেন, জীবন একটাই, আর একটা দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। তাই আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।