চল যাই ভুটানে…

যুক্ত করা হয়েছে
মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক। চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বহু বছর নানান সাগর ঘুরে এখন অবসর নিয়েছেন। বেড়াতে ভালোবাসেন তেমনি ভালোবাসেন ছবি তুলতেও।
লেখক পরিচিতি

বেশ কিছুদিন ধরে কলকাতার দম বন্ধ করা গরম থেকে অন্তত কিছুদিনের জন্য পরিত্রাণ পাওয়ার জল্পনা কল্পনা চলছিল। অনেক চিন্তা ভাবনার পর ঠিক করা হয় যাবো আমরা ভুটান এ। এটি একটি স্বাধীন রাজ্য, আজও রাজা শাসন করে এই রাজ্যটিকে। এখানকার মানুষরা বেশির ভাগ “বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এরা সবাই মহাযান বুদ্ধের পূজারী। ভুটানের মোট লোক সংখ্যা ৭-লক্ষ। নিজেদের ভাষায় আর একটি নাম ওরা ব্যাবহার করে থাকে, সেটা হল ড্রুক্ রাজ্য। এর অর্থ করলে দাঁড়ায় “ড্রাগনের রাজ্য”।

ড্রুক্ এয়ার লাইন্সের বিমান
ড্রুক্ এয়ার লাইন্সের বিমান

আমাদের ভ্রমণ শুরু হল কলকাতার বিমান বন্দর থেকে, ড্রুক্ এয়ার লাইন্সের বিমানে চড়ে। ভুটানের একমাত্র অন্তর্জাতিক বিমান বন্দর পারো শহরে। বহুকাল আগে এই পারোই ছিল ভুটান রাজ্যের রাজধানী, পরে তা “থিম্পুতে” স্থানান্তরিত করা হয়।

পারো বিমান বন্দর
পারো বিমান বন্দর

কলকাতা থেকে আকাশ পথে পারো পৌঁছতে সময় লাগে ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট। পারো বিমান বন্দরে অবতরণের আগের প্রাকৃতিক দৃশ্য সত্যই সুন্দর। বিমানের জানলা দিয়ে দেখা যায় ডান দিকে পাহাড় মালা, যার মাথায় রয়েছে তুষারের শুভ্র মুকুট। মনে হয় পাহাড়গুলি বোধ হয় শীতের জন্য গায়ে মেঘের চাদর জড়িয়ে রোদে দাঁড়িয়ে আছে। পারোতে বিমান অবতরণের পর যে মুহূর্তে মাটিতে পা রাখলাম, নিশ্বাস নিলাম, মনে হল বাতাস এখানে কত নির্মল কতটা শুদ্ধ। যদিও আমরা তখন সমু্দ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৫০০ ফুট ওপরে। আবহাওয়া এক কথায় অপূর্ব । ভুটানে থাকার ছাড়পত্র পাওয়া গেল ১০ দিনের জন্য। ভুটানে প্রবেশ করার জন্য সঙ্গে নিতে হয় পাসপোর্ট বা ভারতের ভোটার পরিচয় পত্র। তা না হলে ওই দেশে থাকার ছাড়পত্র পাওয়া কষ্ট সাধ্য।

ওখানকার মানুষদের প্রথম দর্শনে মনে হল স্বচ্ছ ও অত্যন্ত ভদ্র স্বভাবের। সবাই কথা বলে হাসি মুখে, অত্যন্ত নম্র ভাবে। সরকারি কাজকর্ম মিটিয়ে বিমান বন্দরের বাইরে এলাম। জায়গাটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও সুনিপুণ ভাবে সাজান। আমাদের ভাড়া করা গাড়ী ও তার চালক অপেক্ষা করছিল আমাদের আগমনের। আমাদের গন্তব্য ছিল থিম্পু (Thimpu) যা হল ভুটানর রাজধানী।

থিম্পু
থিম্পু

তৈরি হয়ে শুরু হল আমাদের যাত্রা। থিম্পু শহরটি পারোর থেকে প্রায় ৫০০ ফুট নিচে, পাহাড়ের মালভূমিতে অবস্থিত। পথে আমরা পারো নদীর পাশে কিছুক্ষণ কাটালাম। ভারি সুন্দর এই পারো নদী। পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে পাহাড় থেকে নেমে আসা এই নদী যেন পাহাড়ি গান শুনিয়ে, নেচে-নেচে বয়ে চলেছে অন্য নদীর সাথে মিলিত হতে।

ভারি সুন্দর এই পারো নদী
ভারি সুন্দর এই পারো নদী

পারো থেকে থিম্পু পৌঁছলে সময় লাগল দেড় ঘণ্টা। সবার প্রথমে আগে থেকে ঠিক করা হোটেলে আমরা উঠলাম।

আমাদের হোটেলের জানলা
আমাদের হোটেলের জানলা

দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখার ব্যবস্থা করা ছিল আগে থেকে। হোটেলে আমাদের সাথে আলাপ হল আমাদের গাইডের সাথে, অল্প বয়সী একটি ছেলে, কি নম্র ও ভদ্র তার ব্যাবহার। গাইড পাশাং-এর সাথে আমাদের থিম্পুর দ্রষ্টব্য স্থানগুলি নিয়ে আলোচনা করে ঠিক হল, সেদিন আমরা চোরথান্ জং, ঘড়ি ঘর, তারাচিহো জং, দেখতে যাব। এই দেশে দিনের আলো থাকে প্রায় ৭টা-সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। যদিও দেশের সময় ভারতীয় সময় থেকে আধ ঘণ্টা আগে চলে। দিনটি ছিল রোববার, মানে ছুটির দিন, তাই অন্যান্য দ্রষ্টব্য স্থানগুলি বন্ধ থাকাতে আগামীকালের জন্য সেগুলিকে তুলে রাখা হল।

জং-এর দ্বার-রক্ষী
জং-এর দ্বার-রক্ষী
মৃত রাজাদের স্মৃতিতে
মৃত রাজাদের স্মৃতিতে

পরের দিন প্রাতরাশের পর আবার বের হলাম থিম্পু দেখতে। সবার প্রথমে যাওয়া হল handicraft emporium এ।

আর্টস এন্ড ক্র্যাফটস বিল্ডিং
আর্টস এন্ড ক্র্যাফটস বিল্ডিং

সেখান থেকে Buddha point, এটি পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত, অপূর্ব একটি ধাতুর বুদ্ধ মূর্তি এখানে স্থাপিত হয়েছিল সাল ২০০৩ সালে।

ধাতুর বুদ্ধ মূর্তি
ধাতুর বুদ্ধ মূর্তি

পাহাড়ের চুড়া থেকে পুর থিম্পু শহরটিকে অপূর্ব লাগে, শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে থিম্পু নদী। চারি দিকে দাঁড়িয়ে আছে ঘন সবুজ রঙের পাহাড়, তাদের মনে হয় এই শহরটির অতন্দ্র প্রহরী। বুদ্ধ পয়েন্ট থেকে নেমে এলাম আমরা হাতে তৈরি কাগজের কারখানা দেখতে। এখানে বিশেষ ধরনের একটি গাছের বাকল কে জলে ভিজিয়ে ও নানা রকমের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তুলোট্ কাগজের মতন কাগজ তৈরি করা দেখলাম। তারপর গেলাম দুপুরের খাওয়া সারতে। ভুটানে আসার আগে অনেকের মুখে শুনেছিলাম, খাদ্যদ্রব্যের দাম নাকি সাংঘাতিক। কিন্তু রটনাটি যে কতটা ভ্রান্ত তা খাওয়া সমাপ্তির পরে দাম দিতে যেয়ে বুঝতে পারলাম। সুন্দর সুন্দর খাওয়ার জায়গা এখানে আছে যারা ভাল মানের থাই, চীনা, ভারতীয়, কন্টিনেন্টাল ও ভুটানী খাদ্য পরিবেশন করে। এদের নিজেদের ড্রুক লাগার বিয়ার অতি উপাদেয় ও সস্তা। আর্ট ও ক্রাফট মিউজিয়াম, নানান ধরনের ফুলের বাগান দেখে আমরা এলাম হস্ত শিল্প (Handy Craft market) বাজারে।

হস্ত শিল্প বাজার
হস্ত শিল্প বাজার

এই জায়গাটি স্থানীয় কারিগরদের তৈরি নানা দ্রষ্টব্য পাওয়া যায়, দাম বেশ চড়ার দিকে। শেষ জায়গা দেখলাম চাঙ্গলিমিথাঙ্গ স্টেডিয়াম (Changlimithang Stadium), এই দেশের জাতীয় ক্রীড়া তিরন্দাজী, সেই দিকটাও আমরা দেখলাম স্টেডিয়ামের ভেতরে। সন্ধ্যা নামাতে ক্লান্ত হয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। কাল আমরা যাত্রা করব পুনাখা (Punakha) এর উদ্দেশ্যে।

সকালে প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম পুনাখা এর পথে। পথে আমাদের পেরতে হল দোচুলা পাস (Dochula Pass)। জায়গাটি প্রায় ১০,০০০+ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এখানে বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থান হল Khams Yulley Namgyal Chorten, এটি ১০৮টি চোরতানের স্থান।

১০৮-টি স্তূপ-এর কয়েকটি
১০৮-টি স্তূপ-এর কয়েকটি

বৌদ্ধদের কাছে এটি একটি অতি পবিত্র তীর্থ স্থান। ওখানকার কাফেতে কফি খেয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম পুনাখার পথে। এবার সুধু নিচে নামা, পুনাখা অবস্থিত প্রায় ৪,৬০০ ফুটে। পৌঁছতে মোট সময় লাগল আড়াই ঘণ্টা। হোটেলের পথে, দেখে এলাম পুনাখা জং (Punakha Djong), অপূর্ব তার স্থাপত্য কলা। এটিও একটি বৌদ্ধদের পীঠস্থান। সেদিনের মতন আমাদের ভ্রমণের সমাপ্তি।

পুনাখা জং-এর দেয়ালে
পুনাখা জং-এর দেয়ালে

বলতে বাধা নেই; থিম্পু এবং পুনাখা এর হোটেলগুলো এক কথায় চমৎকার। পুনাখার হোটেলের সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী পুনাখা নদী, জলের গভীরতা বেশি নয় কিন্তু এত স্বচ্ছ সেই জল যে জলের তলায় বিছান পাথরগুলি ও পরিষ্কার ভাবে দেখা যায়। ভারি শান্ত সমাহিত এখানকার পরিবেশ। শহরের রোজকার ইঁদুর দৌড় থেকে পালিয়ে এসে কিছুদিন কাটাবার পক্ষে এ এক দারুণ জায়গা।

পরের দিন আবার সেই প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম ফোবজিখা (Phobjikha) এর উদ্দেশ্যে। এটি একটি অত্যন্ত সুন্দর দর্শনীয় স্থান। এখানে একটি হ্রদ আছে যেখানে অতিথি পাখিরা আসে শীত কাটাতে। সুদূর তিব্বত, সাইবেরিয়ার থেকে Black neck swans আসে এখানে। এরা থাকে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। আমরা মে মাসে আসায় তাদের দেখা পাইনি। এখানেও একটি জং আছে এবং আর কিছুটা ওপরে Gangtey Goenpa আছে, কথিত আছে সেই গুম্ফায় বৌদ্ধ সাধকেরা বসে সাধনা করতেন। এই জংটির তৈরির সময় ১৭খৃষ্টাব্দে। পুনাখার হোটেলে ফেরার পথে মজার একটি ঘটনা ঘটে। রাস্তায় ধস নামার জন্য আমাদের প্রায় ঘণ্টা চার আটকে থাকতে হয়, যতক্ষণে রাস্তা পরিষ্কার করে ভুটানী সড়ক দেখভাল করার বিভাগ। আজই পুঙ্খতে শেষ রাত, কাল আমরা চলে যাব ভুটানের রাজধানী পারোতে। ভুটানে থাকার দিন যত কমে আসছিল, মনটাও ততধিক বিষণ্ণ হয়ে পড়ছিল। সুন্দর, সরল, হাসিখুশি লোকদের আজকাল পৃথিবীতে খুব কমই দেখা মেলে। ভাবতে অবাক লাগে; যখন সমস্ত পৃথিবীর দেশ তাদের GDP নিয়ে আকচা আকচি করছে তখন এই দেশটি বিশেষ ভাবে চিন্তা করছে দেশের মানুষের HDP নিয়ে। মানে, মানুষ কতটা আনন্দে, সুখে-শান্তিতে আছে সেটা নিয়ে এই দেশের রাজা এবং তাঁর মন্ত্রীসভা সব সময়ে মাথা ঘামাচ্ছে। হায় হতভাগা অন্যান্য দেশ; তারাও যদি মানুষের সুখ-শান্তির কথা চিন্তা করত, তবে বোধ হয় পৃথিবীটা আজ অন্য রকমের হত!! সকালে প্রাতরাশ সেরে আবার বেরিয়ে পড়লাম পারোর পথে। ফেরার সময়ে আমরা আবার পার হলাম দোচুলা পাস, থিম্পু শহর, তারপর পৌঁছব আমাদের গন্তব্য পারোতে। থিম্পু শহরের সেরে নিলাম আমাদের মধ্যাহ্নের আহার। পারোতে পৌঁছলাম দুপুর আড়াইতে নাগাদ। দেখতে গেলাম Taksang monastery, Kichu LhakhangChoeten Lhakhang

Taksang monastery
Taksang monastery

সন্ধ্যার সময়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। পরের দিনে মানে ভুটানে শেষ দিনটি প্রাণ ভরে বেড়িয়ে নেবার জন্য। আবার সেই সকালের নাস্তা শেষে বেরিয়ে পড়া। দেখলাম Drugal Dzong, Rinpung Dzong, Ugyen Pelri Thang Palace, Tlnkin reserve( National animal)। রাজ প্রাসাদটি দুটি নদীর মাঝখানের অববাহিকায় তৈরি। একটি নদীর নাম মচু অন্যটি পচু; ভুটানী ভাষায় মচু হল পুরুষ আর পচু হল স্ত্রী। রাজপ্রাসাদ ছাড়িয়ে কিছুটা পরে দুটো মিলে মিশে একাকার হয়ে তৈরি হয়েছে পারো নদী। ভুটান ছেড়ে যেতে হবে, এই ভাবনায় আমাদের সকলের মন বেশ ভারাক্রান্ত হয়েছিল। বহুদিন মনে থাকবে এই ছোট্ট সুন্দর হিমালয় কন্যাটিকে। জানিনা আবার দেখা হবে কিনা এই সুন্দরীর সাথে। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে পরেরদিন সকালে বলতে হল – বিদায় সুন্দরী, তোমার প্রেম মনে বহন করে নিয়ে চলেছি তোমার থেকে অনেক অনেক দুরে!!