সিলেট ডায়েরি

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

আগস্ট মাস, সাল ২০১৮, তারিখ ৩১। আমি আমার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষিরাতে, সময় আনুমানিক ৬ টা হবে। হঠাৎ বন্ধু সুজনের ফোন কল পেলাম, ফোন রিসিভ করার সাথে সাথেই শুনতে পেলাম টিকেট কাটা শেষ কাল রাত ১০টা ৪৫ এ গাড়ি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বললো, রবিবার একদিনের ছুটি আছে সিলেট যাব তুই কালকেই চলে আয়।

পড়ে গেলাম মহা চিন্তায়, কোন প্লান নাই-পরিকল্পনা নাই, আমি বললাম কি বলিস মাথা ঠিক আছে তোর??? দুই জন যাওয়া যায় নাকি?? সাথে সাথে ও বলল চিন্তা করিস না বন্ধু মাছুদ আছে ওখানে আর ওই কলিগ মোট চার জন জাবো তুই চলে আয় না করবি না। কি আর করার পরের দিন সকালে ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হলাম। আলহামদুলিল্লাহ্‌ ৩ টার ভিতরে ঢাকা পোছে গেলাম, ফ্রেশ হয়ে খেয়ে দিলাম এক ঘুম রাত ৮ টায় উঠলাম। TOB Helpline এ একটি পোস্ট মেরে দিলাম, কেউ শেয়ার করতে চায় কিনা আমাদের সাথে।তারপরে রাতের খাবার খেয়ে বের হলাম মহাখালির উদ্দেশ্যে।

জাফলং, সিলেট

১০ টা ২০ এ পৌছে গেলাম। বাস যথা সময়ে ছাড়লো, আমরা উঠে পড়লাম। সাথে কিছু শুকনা খাবার আর পানি কিনে নিয়ে। আমাদের সিট ছিল A 3,4। এর মধ্যে টিওবি এর হেল্প লাইনে আমাদের পোষ্ট দেখে ৩ জনের একটি দল আমাদের সাথে যেতে রাজি হয়। উনারা আম্বর খানা থেকে আমাদের সাথে যুক্ত হবে। যাই হোক ভালই লাগছিল কখন ঘুমিয়ে গেলাম জানি না। বাস গিয়ে থামলো এক রেস্টুরেন্টের সামনে নামটা মনে নেই। বাস থেকে নেমে ফ্রেশ হয়ে দুই বন্ধু দুই কাপ কফি নিয়ে কফির কাপে চুমুক দিয়ে শরীরটা চাঙ্গা করে নিলাম। বাস আবারো চলা শুরু করলো।

ঘড়ির কাটার দিকে যখন নজর গেলো তখন ফজরের আজান দিচ্ছে ৪টা ৪৫ মিনিট বাজে। দুই বন্ধু গল্প করছি কতদিন ভোর হতে দেখি না, ভোর হতে দেখাটাও ভাগ্যের ব্যাপার। সকাল ৬ টায় কদমতলি নামলাম। তারপরে বন্ধুর রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করার সময় জানতে পারলাম বন্ধুর অফিসের সিনিয়র স্যার তাঁর প্রোজেক্ট ভিজিটে আসবে,তাই সে আমাদের সাথে যেতে পারবে না।মনটা খারাপ হয়ে গেল। কি আর করার গতরাতে যাদের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল, আমাদের সাথে যাবে বলেছিল তাদেরকে ফোন দিলাম।কিন্তু উনারা প্রথমে জাফলং তারপরে রাতারগুল যেতে চায় আর আমরা রাতারগুল তারপরে জাফলং তাই তাদের সাথে যুক্ত হওয়া হলো না।

বন্ধু মাছুদের কাছে ফিরতি টিকেট কাটার টাকা দিয়ে দুই জন কদমতলি থেকে বের সি এনজি করে আম্বরখানা গেলাম। সেখানে অন্য গ্রুপের সাথে এড হওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু আমাদের সব চেষ্টায় বৃথা গেল। পরে এক সিএনজি ড্রাইভার এসে বলে – মামা ৪০০ টাঁকা দিলে রেখে আসবো রাতারগুলে,আমরা রাজি হয়নি।

লোকাল ভাবে যাওয়া যায় কিনা চেষ্টা করলাম কিন্তু প্রত্যেক সি এনজি ড্রাইভার এবং দোকানদাররা বলে, না মামা কোন লোকাল সি এনজি এখান থেকে যায় না। পরে এক দোকানদার আমাদের বলল এক কাজ করেন আপনারা ভেঙ্গে ভেঙ্গে যান খরচ কম হবে।

তখন আমরা আম্বরখানা থেকে গেলাম সাপ বাজারের লোকাল সি এনজি করে গেলাম সাপ বাজার। সেখান থেকে অটোতে করে যেতে হবে সোজা ঘাটের আধা মাইল আগ পর্যন্ত তারপরে হেটে। অটোতে ৮ জন না হলে আবার ছাড়বেনা। তাই আমরা যে সি এনজি করে সাপবাজারে গেছিলাম উনারে আরো কিছু টাঁকা বাড়িয়ে দিয়ে সোজা ঘাটে গিয়ে পৌছালাম।

এবার নৌকা ভাড়া করার সময়। নৌকা রেট করা ৭৫০ টাকা, প্রতি নৌকাতে ৫/৬ জন ও বসা যাই, তাই ভাবলাম এখান থেকে অন্ততপক্ষে একটা গ্রুপ ম্যানেজ করবো। যাতে নৌকা ভাড়াটা কমে, আমরা যাচ্ছি হঠাৎ সোহেল ভাই আর তানিয়া আপুর সাথে দেখা (সবে মাত্র পরিচয়) সোহেল ভাই বলে আপনারা কি দুইজন? আমি হ্যা, শেয়ার করবেন নৌকা আমাদের সাথে আমরা তো খুশিতে রাজি হয়ে গেলাম। ঘাটে গেলাম কিন্তু আমাদের কপাল খারাপ সোহেল ভাই আর তানিয়া আপু আগেই সেখানে যাওয়াতে তারা বুঝতে পারে আমরা শেয়ার করতে চাচ্ছি। তাই কেউ আমাদেরকে নৌকা দিতে চাইনা ১৫০০ টাকার নিচে। ৪ জন গেলেও ১৫০০ টাঁকা দুই জন গেলেও ১৫০০ টাঁকা। অনেক বোঝানোর পরে পরে না পেরে ২ টা নৌকা নিলাম।

সোহেল ভাই আর তানিয়া আপু আমাদের সাথে এড হওয়াতে আমরা ৪ জনের পরিবার এখন দুই নৌকায়। জীবনের প্রথম রাতারগুল ভ্রমণ পানিতে। টৈ-টুম্বর, সত্যি এক অন্য রকম অনুভূতি, যারা ভরাট পানিতে গিয়েছেন তারাই বলতে পারবে রাতার গুলের সৌন্দর্য। ঘুরতে ঘুরতে ৫ বছর আগে পরিচিত মামুন ভাই এর সাথে সাথে দেখা ভাই পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছে। বিষয়টা আরো ভালো লাগলো।

আমাদের রাতারগুল ভ্রমণ শেষ এবার জাফলং এর উদ্দেশ্যে বের হতে হবে। ইতিমধ্যে সোহেল ভাই আর তানিয়া আপুর সাথে আমাদের ভালো ভাব জমে গেছে। উনারা-আমরা নাকি একি বাসে করেই সিলেট এসেছিলাম, উনারা নাকি আমাদের বাসের ভিতরে দেখেছিলেন প্রথম সিটে, আমার গলার গামছা দেখে আন্দাজ করলেন, হুম প্রমান পেলাম উনারা আমরা একই বাসে করে এসেছি, আহা আগে থেকেই যদি পরিচয় হতো খরচটা অনেক কমতো। যাইহোক এবার আমার আর বন্ধু সুজনের লোকাল বাসে জাফলং জেতে হবে যেহেতু আমরা দুইজন খরচ ও কমাতে হবে, তখন সোহেল ভাই বলল উনারাও যাবে। কিন্তু উনাদের সিএনজি তো বিছানা কান্দি ঠিক পর্যন্ত করা ১০০০ টাকায়। পরে ড্রাইভারকে বললাম আরো ১০০০ টাঁকা বাড়িয়ে দেব জাফলং যাওয়ার জন্য রাতারগুল থেকে।উনি ১৩০০ টাকাতে সায় দিলেন, তারমানে মোট সিএনজি ভাড়া ২৩০০ টাঁকা।

ঘাট থেকে আমাদের সিএনজি চলা শুরু করলো জাফলং এর উদ্দেশ্য আনুমানি আমরা ১২.৪০ এর দিকে রহনা শুরু করি, রাস্তা ঘাটের অবস্থা খুবই করুন। যায়গায় যায়গায় খানা খন্দে পরিণত হয়েছে। মাঝে মাঝে খুব ভালো, আমরা লালা খালের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, লালাখালের পানি দেখে সত্যি অনেক অবাকই হইলাম,পানি একেবারে স্বচ্চ নীল। ড্রাইভারকে বললাম মামা ভাল হোটেলে রাইখেন একটু নাস্তা করবো। মামা তাঁর পরিচিত ভালো এক দোকানে রাখলো। আমরা ২ টা করে সিংগাড়া খেলাম এবং এক কাপ চা,সত্যি গরুর দুধের চা টা অসাধারণ ছিল।

আরও কিছু দূরে যাওয়ার পরে পাশে দেখতে পেলাম মেঘালয় এর পাহাড় বেয়ে ঝর্ণা নামছে। পাশা পাশি ৩/৪ টা এবং সেটা অনেক লম্বা। মেঘে পুরাটায় ঢাকা ছিল মনে হচ্ছিল মেঘের ভিতর থেকে ঝরনা নামছে। তারপর এক সময় আমরা জাফলং পৌছে গেলাম, তখন ঘড়ির কাটায় ২ টা ৩৪ এ পৌছেছি। ইচ্ছে ছিল আমরা দ্রুত জাফলং ঘুরে লালাখালে ঘুরবো, সেই মোতাবেক দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম জাফলং এর এক হোটেল থেকে, খাবারের দাম খাবার হিসেবে অনেক বেশিই ছিল।

আমরা এবার গেলাম জাফলং ০ পয়েন্ট এবং মায়াবি ঝর্ণা এর উদ্দেশ্যে। পানি এতটাই বেশি ছিল যে ০ পয়েন্ট তলিয়ে প্রায় ৮/১০ ফুট উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। আমরা একটা নৌকা করে চার জন পার হলাম ৩০ টাকা করে জন প্রতি, তারপরে বালির উপর দিয়ে প্রায় ১৫ মিনিট হেটে পৌছে গেলাম ঝরনায়। গিয়ে যা দেখলাম সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না, এতো মানুষ আমার জীবনে আমি অন্য কোন ঝরনায় দেখিনি, মানুষের জন্য কারো কোন সিংগেল ছবি নেওয়া যাচ্ছেনা, ঝরনার ছবি তো বাদ ই দিলাম, যাই হোক, গোসল করতে হবে কিন্তু এতো মানুষের ভিড়ে আমি গোসল করবোনা ভাবলাম, আমার আর তানিয়া আপুর কাছে ব্যাগ দিয়ে বন্ধু সুজন আর সোহেল ভাই নেমে পড়লেন গোসল দিতে তারা আর আসতেই চায় না। এদিকে সময় ও কমতে শুরু করেছে, লালা খালে যেতে হবে।

তারা যখন আসলো এবার ভাবলাম আমিও একটু যাই গিয়ে পানির ভিতরে ঝাপা ঝাপি করে আসি। আমি তখন বন্ধু সুজনের কাছে ব্যাগ ক্যামেরা দিয়ে গেলাম ঝরনায় আর আপু গেলো এক পাশে হাতে মুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হইতে। সারাদিনের ক্লান্তির পরে অবশেষে গায়ে পানি লাগাতে শরীরটা জানি কেমন ছেড়ে দিল। উঠতেই মন চায় না।  প্রায় ২৫ মিনিট মত সেখানে থাকার পরে বন্ধু সুজনের পিড়াপিড়িতে নেমে আসলাম। ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে দেখি ৫ টা ২৬,আর যাওয়া হয়েছে লালাখাল 🙁 আবার আমরা সিএনজি এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। বালির মধ্যে দিয়ে হাটার সময় এমন অবস্থা যে পা আর উঠতেই চায়না। বহু কষ্টে আসলাম নৌকার কাছে। আবার উঠে পড়লাম নৌকাতে, নৌকায় উঠে পানি দেখে আর পানিতে হাত দিয়ে শরীরটা আবার প্রাণ ফিরে পেল। সি এনজি এর কাছে এসে পাশের দোকান থেকে কিছু চকলেট নিয়ে নিলাম। আপু কয়েকটা চিপ্স এর প্যাকেট নিয়ে নিলো। আবার আম্বর খানার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। ৩০/৪০ মিনিট এর মত আসার পরে চারিদিকে অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। মেঘ এসে পাহাড়ে এবং সব গাছ গুলোকে ঢেকে ফেললো। ভিডিওটি দেখে নিবেন ফেরার এবং যাওয়ার দৃশ্য পাহাড়ের।

হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি এমন বৃষ্টি সেটা বলার বাহিরে। একে তো রাস্তা খারাপ তার ভিতরে বৃষ্টি নামায় রাস্তায় খানাখন্দ গুলো পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে একাকার হয়ে গেছে, বোঝার উপায় নাই কোন যায়গায় রাস্তা ভালো আর কোথায় খারাপ। আমরা সি এনজির ভিতরে ডান্স করা শুরু করলাম, ইচ্ছের বিরুদ্ধে রাস্তার বেহাল দশার কারনে ৮ টার দিকে আমরা ৫ ভাই রেস্টুরেন্ট এর কাছে এসে পৌছলাম। সেখানে রাত্রের খাবার খেলাম ৪ জনে মিলে। সিলেট ৫ ভাই রেস্টুরেন্ট এর কথা যেমন শুনেছি খাবার আসলে তেমন না তবে দামে ঢাকার থেকে অনেক কম। বিল সোহেল ভাই আমাদের দিতেই দিল না।

রাত্রের খাবার খেয়ে আপু আর ভাইকে বিদায় দিয়ে আমরা আবার কদমতলি বন্ধুর রুমের উদ্দেশ্যে বের হলাম। বন্ধুর রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিয়ে সোজা গেলাম কদম তলি বাস স্ট্যান্ডে। বন্ধু আমাদের জন্য অনেক শুকনা খাবার কিনে দিলো, বাসে উঠে আবার সোহেল ভাই আর আপুর সাথে দেখা ভাগ্য ক্রমে আবারও আমরা একি বাসে। যাই হোক বাসে উঠে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম, ঘুম যখন ভাংলো তখন আমরা এয়ারপোর্ট। ঘড়ির কাটাত তখন ৪ টা ৩৭ বাজে, কিছুপরে মহাখালি নেমে চলে গেলাম রুমে। শেষ হলো আমাদের ১ দিনের পরিকল্পনা বিহীন ট্যুর।

সব মিলে খরচ করলাম আমাদের দুই জনের ৪৮৯৪ টাঁকা খরচ হয়েছে। মানে ২৪৪৭ টাঁকা করে।

লেখাটি পুরাটায় আমাদের ট্যুর অভিজ্ঞতা থেকে।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।