সুন্দরবন ভ্রমণ – নদী আর গহীন অরণ্যের মাঝে

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
24

ইচ্ছে ছিল এমন এক জায়গায় যাওয়ার যেখানে নদী আর গহীন অরণ্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়া যাবে! যেখানে বন্যপ্রাণী প্রতিনিয়ত সবুজ দুনিয়ায় খেলা করে, ভোরে পাখির কিচিরমিচির শব্দে প্রাণ জুড়িয়ে যাবে। যেখানে গেলে সাগর, নদী আর সবুজ বনানীর মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিতে একটুও আফশোস হবে না! সেই নীল আকাশ, নদী আর অরণ্যের মহামিলন দেখতেই সুন্দরবনে যাওয়া।

মংলা বন্দরে কর্মরত বন্ধু মাহফুজকে ফোন করতেই বলল, থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থা সে নিজেই করে দেবে। ঝলমলে শহরের গতে বাঁধা যান্ত্রিক নিয়মের গণ্ডি ছেড়ে, ছোট একটা ট্রলি-ব্যাগ নিয়ে এক রাতে চড়ে বসলাম বাসে। সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু। মংলায় আমাদের ঘাঁটি হল হোটেল রয়্যাল। সেখান থেকে যাওয়া হবে সুন্দরবন। মাহফুজের সঙ্গে পরামর্শ করার আগে একটা ‘ভ্রমণ-পরিকল্পনা’ করা হয়েছিল। সেই মতো পর দিন ভোরে নির্দিষ্ট ভ্রমণতরীতে গিয়ে উঠলাম। আমরা ছাড়া আরও অনেকেই ছিলেন এই যাত্রায়। একে একে সকলে এসে পৌঁছনোর পর গাইড বলে দিলেন কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

নদী আর সবুজ বনানীর মাঝে…

নীল কমলের পথে

আমাদের প্রথম ‘স্টপ’ ঢাংমারি ফরেস্ট স্টেশন। শান্ত পশুর নদী দিয়ে চলছে আমাদের লঞ্চ। নদীর দু’ধারে জেলেদের গ্রাম— বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ নদীতে বাগদা, গলদা, পোনা ধরছে। কঠিন জীবন ব্যবস্থা। এক এক করে আমতলি, বাণীশান্তা, ডাইনমারি পেরিয়ে পৌঁছলাম সুন্দরবনের দোরগোড়ায়। ঢাংমারি ফরেস্ট স্টেশন থেকে বনে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে চললাম শরণখোলা রেঞ্জের নীল কমলের উদ্দেশে। শান্ত-নীরব চারপাশ, শুধু লঞ্চের ইঞ্জিনের আওয়াজ। যে দিকে চোখ যায় সে দিকেই শুধু সবুজের হাতছানি। লঞ্চের পিছু পিছু ছুটে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে নাম না জানা পাখির ওড়াউড়ি আর পশুর নদীর রূপ দেখে বন্ধু মানিকের স্ত্রী, মনা ভাবি যেন কবি হয়ে গিয়েছেন। কখন যে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল তা কেউ টেরই পেলাম না। দুপুরের খাওয়া সারতে সারতে দূরে আবছা হয়ে ভেসে উঠল নীল কমল। তার আর এক নাম ‘হিরণ পয়েন্ট’। সবাই গিয়ে দাঁড়ালাম লঞ্চের একেবারে সামনের খোলা জায়গায়। আর কিছুটা এগিয়েই চোখে পড়ল ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের ফলক। আরও একটু এগিয়ে ফেলা হল নোঙর। আর আমরা ছোট নৌকোয় নিরাপত্তা কর্মী-সহ ঢুকে পড়লাম জঙ্গলের গভীরে।

জীবিকা…

হিরণ পয়েন্টের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ফলক বরাবর খালের উল্টো দিকে প্রায় এক কিলোমিটার গেলেই কেওড়াশুটি বন। শ্বাসমূলের উপর দিয়ে পায়ে চলার পথ তৈরি করে দিয়েছে বন বিভাগ। বনের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলেছি। গাছে বাঁদরের দল লাফালাফি করছে। এক জায়গায় দেখলাম বিশাল আকারের বেশ কয়েকটা বুনো কাক। এক সময় জঙ্গলের ভিতরে নড়াচড়া হওয়ায় ভাল করে দেখলাম একটা বিশাল গুইসাপ মৃত হরিণের মাংস খাচ্ছে। সম্ভবত কোনও বাঘ মেরেছিল এই হরিণটিকে।

ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছলাম হিরণ পয়েন্ট নজর মিনারে। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসের সামুদ্রিক ঝড় সিডারে সুন্দরবন অঞ্চলের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়, তার চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। টাওয়ারটির অবস্থা সে কারণেই বেশ খারাপ। পাঁচতলা বিশিষ্ট এই টাওয়ারে এক সঙ্গে পাঁচ জনের বেশি ওঠা যায় না। কেওড়াশুটির জঙ্গল দেখে আবার ফিরে এলাম লঞ্চে। ফেরার পথে এক জায়গায় খালের পাশে চোখে পড়ল এক মায়াবী হরিণ। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সে লুকিয়ে পড়ল বনের গভীরে। তার পরই দেখা পেলাম এক পাল বাঁদরের— নানা কসরত করছে খালের ধারে। দু’পারেই গাছের ডালে বসে আছে কত্ত নাম না জানা পাখি। হঠাত্ একটি বক খালের জলে ডুব দিয়ে ছোঁ মেরে মাছ তুলে নিয়ে উধাও হয়ে গেল!

লঞ্চের ছাদে বসে দেখলাম সূর্যাস্ত। সেই সঙ্গে জলে সিঁদুর রং মাখানো আকাশের প্রতিচ্ছবি— সব মিলিযে মোহনীয় রূপে প্রকৃতির সাজ। রাতে চারপাশে কেমন রহস্যময় সুন্দরের হাতছানি! একটা সময়ে ঝিঁঝির ডাক কানে এমন সয়ে গেল যে মনে হয় জঙ্গলের নীরবতায় একটুও চিড় ধরেনি। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছিল নানা ধরনের বন্য আওয়াজ। নিকষ আঁধারে জোনাকির মতো আকাশে জ্বলছিল অসংখ্য তারা। রাতে লঞ্চের কেবিনে জমে উঠেছিল মজার আড্ডা। সুন্দরবনের রাত। কেবিনে শুয়ে স্পষ্ট কানে আসছিল উড়ুক্কু মাছ লাফানোর শব্দ।

খালের পাশে… সোনার হরিণ

পর দিন আলো ফোটার আগেই লঞ্চের ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম— ভোর দেখার জন্য। তখনও ভোরের কুয়াশায় সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। আমরা বেরিয়ে পড়লাম আরও এক বার সুন্দরবনের অন্দরে, নদীর দিকে। বন্য শুয়োর, ভোঁদড় ছাড়াও আর নানা পাখির দেখা মিলল সকালের এই ভ্রমণে। প্রায় দু’ঘণ্টা মতো ঘুরে ফিরে এলাম। সকালের জলখাবার খাওয়ার পরই বিদায় জানালাম এই অভয়ারণ্যকে।

কটকার পথে

এ বার আমাদের গন্তব্য কটকা টাইগার পয়েন্ট। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের হাতছানি— গোলপাতা, সুন্দরী-সহ নাম না জানা অনেক গাছগাছালি। দুই তীরে গাছের ডালে অলস ভাবে বসে আছে বিভিন্ন জাতের বক ও নাম না জানা পাখিরা। নানা রঙের মাছরাঙাগুলোই কেবল ব্যস্ত সময় পার করছিল মাছ শিকার করে। আর খালের নীল জলে ছিল পানকৌড়ির মাতামাতি।

কটকা পৌঁছতে বিকেল হল। এ জায়গাটিতে সব চেয়ে বেশি কেওড়া গাছ। খুবই নরম প্রকৃতির গাছ। তাই সিডারের ধকল সইতে পারেনি। চারপাশে চোখে পড়ল প্রচুর ভাঙা গাছের গুঁড়ি। তবে কেওড়া খুবই দ্রুত বেড়ে ওঠে বলে কটকার আগের দৃশ্যে ফিরে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। কটকা সমুদ্র সৈকতে পৌঁছতে পৌঁছতেই সূর্য বিদায় নিতে প্রস্তুত। আকাশে রঙের খেলা আর লাল থালার মতো সূর্যের সমুদ্রজলে ডুব দেওয়ার দৃশ্য মনে এক বিচিত্র অনুভূতির সঞ্চার করে। অন্ধকার নামার আগেই সবাই ফিরে এলাম লঞ্চে। সন্ধ্যায় আরও এক প্রস্থ আড্ডা, তার পর রাতের খাওয়া সেরে নিঝুম রাতের নীরবতা উপভোগ করতে আবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। হঠাৎ কান ফাটানো আওয়াজ— বাঁদরের ডাক— ‘মাঙ্কি কল’। মানে কাছাকাছিই কোথাও আছে সে! নৈঃশব্দ্য তত ক্ষণে ভেঙে খান খান। কিন্তু সেই ডাক, যার জন্য কান পেতে লঞ্চের বারান্দায় বসে থাকা, সে ডাক তো এখনও শোনা গেল না! ভাবতে ভাবতেই হিম-হিম রাতে হাড় হিম করা হুঙ্কারটা এল— জঙ্গলের শ্রেষ্ঠ আওয়াজ— সুন্দরবনের রাজার হুঙ্কার! ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’ বলে কথা! সুন্দরবনে আসাটা সার্থক হল আমাদের।

কচিখালির পথে

পর দিন ভোরবেলা— কুয়াশা চারপাশের পরিবেশ ধূসরতার চাদরে ঢেকে রেখেছে। আমাদের লঞ্চ এগিয়ে চলেছে কচিখালির দিকে। চারপাশে সুন্দরী, সিংড়া, বাইন, কাকড়া, গেঁওয়া, বলা, পশুর, গোলপাতার মতো নানা ধরনের গাছ। সিডারের আঘাতে এখানকার জেটিটার অবস্থা খুবই খারাপ। কোনও রকমে জেটিতে উঠে গাইডের সহায়তায় হাঁটতে শুরু করলাম কচিখালি সৈকতের দিকে। সঙ্গে থাকা এক নিরাপত্তা কর্মীর কথায় জানতে পারলাম এ পথে বাঘের অবাধ বিচরণ প্রায় সব সময়। সারিবদ্ধ গাছের মাঝ দিয়ে পায়ে হাঁটা পথ চলে গেছে বিচের দিকে। এখানে সমুদ্রের ঢেউ কক্সবাজারের মতো বিশাল নয়। তবে সাগর তার অপার মহিমা দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে ধরণীকে। সকলেই অপলক চোখে তাকিয়ে আছি, যেন এক মায়াপুরীতে এসে পড়েছি। কচিখালি সৈকত থেকে পাড়ি জমালাম পক্ষির চরে। নাম যাই হোক, দু’একটি ফিশিং ঈগল ছাড়া তেমন কোনও পাখির দেখা মিলল না এখানে।

এ বার ফেরার পালা। কচিখালি খালের ভেতরে এসে বোটের ইঞ্জিন বন্ধ করে বেশ খানিক ক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম সবাই— যত ক্ষণ অনুভব করা যায় এই নির্জনতা!

কিভাবে যাবেনঃ

  • ঢাকা থেকে সরাসরি খুলনা দূরপাল্লার পরিবহণ বাসে— খুলনা যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি আধুনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস আছে। এর পর মংলা বন্দর বা খুলনা নতুন বাজার লঞ্চঘাট থেকে সুন্দরবন যাওয়া যায়। সুন্দরবন যেতে প্রাইভেট লঞ্চ, স্পিট বোড, নৌ বা মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের যান ভাড়া করতে হয়।
  • মংলায় নিশিযাপন করতে হলে ট্রলার নিয়ে পশুর নদীর ওপারে যেতে হবে। ওপারে দু’টি আবাসিক হোটেল আছে— সিঙ্গাপুর ও ব্যাঙ্কক। রাতে হোটেলে থেকে পর দিন সকালে মংলা ঘাট থেকে ট্রলার ভাড়া করে সুন্দরবন যেতে পারেন।

আনুমানিক খরচ

  • সুন্দরবনের অন্দরে প্রবেশ করা যায় খুলনা কিংবা মংলা থেকে। মংলার অদূরেই ঢংমারিতে রয়েছে বন বিভাগের কার্যালয়। সেখান থেকে প্রবেশের আনুষাঙ্গিকতা সারতে হয়। ভাড়া আনুমানিক— পর্যটকদের জন প্রতি ৫০ টাকা, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৭০০ টাকা, প্রতি লঞ্চ ২৫০০ টাকা ও ছোট লঞ্চের জন্য একটু কম। সঙ্গে ভিডিও ক্যামেরা থাকলে অতিরিক্ত ১০০ টাকা বনবিভাগকে দিতে হয়।
  • যাঁরা দেশের বাইরে থাকেন তাঁরা ঢাকা ট্যুরিজম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সব রকম খবরাখবর পেয়ে যাবেন।

নীল আকাশ, নদী আর অরণ্যের মহামিলন দেখতেই সুন্দরবনে যাওয়া।

×

প্রতিটি জায়গা পরিদর্শনের পাশাপাশি সৌন্দর্য রক্ষা করাও প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। এক্ষেত্রে সকলকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

পেশায় সাংবাদিক। ছেলেবেলা কেটেছে ঢাকার মতিঝিল কলোনিতে। শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি থেকে এমবিএ। লেখালেখির পাশাপাশি ছবি তোলাও বেশ পছন্দের।

লেখক পরিচিতি