শান্তির শান্তিনিকেতন ভ্রমণ

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

কলকাতায় গিয়ে সম্পূর্ণ একটা দিন বরাদ্ধ রেখেছিলাম শান্তিনিকেতন এর জন্য। প্রথমেই বলে নেই আমি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কম জানি,তাই “উল্টা সিদা” বলে দিলে ঠিক করে দিবেন।

আমার আগের প্ল্যান মোতাবেক আমি সকাল সকাল হাওড়া থেকে ট্রেনে বোলপুর যাব। ৬ টায় ট্রেন আছে, ৮ টায় আছে, ১০.১০ এও আছে। যেহেতু টিকেট এখনো নেই তাই ভাবলাম সকাল সকাল স্টেশনে চলে যাই আর যার টিকেট কাটা নেই তার ট্রেন মিস হবার কোন সুযোগও নেই। কিন্তু সেই মিথ্যে সান্ত্বনার সময়ে এক কলকাতার ফ্রেন্ড (মিজান ভাই) আমাকে ফেসবুকে নক দিয়ে বলে সে আমার জন্য বোলপুর এর যাওয়া আসার টিকেট কেটে রেখেছে। তাকে ধন্যবাদ দিতে দিতে ঘুমিয়ে গেলাম। আর সে জানিয়ে রাখল আমার ট্রেনের নাম শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস যেটা হাওড়া থেকে ছাড়বে সকাল ১০ টা ১০ মিনিটে।

আমি ৯.৩০ টায় হাওড়া ব্রিজ দেখতে দেখতে চলে গেলাম হাওড়া স্টেশনে। টিকেট এর প্রিন্ট এর দরকার নেই, মোবাইল থেকে অনলাইন কপি দেখালেই হয় কিন্তু হাওড়া স্টেশনে এত মানুষ, এত মানুষ যে আমি আমার দুই চোখ দিয়ে সবাইকে দেখতে পারছিনা আর পারছিনা ১২ নাম্বার প্লাটফর্ম খুজে বের করতে। যে প্লাটফর্মে দাড়িয়ে আছে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস। এক সময় পেয়ে গেলাম আর দেখি ট্রেনের বগিতে সব যাত্রীর নাম ঝুলানো আছে তাই খুজে পেতে সমস্যা হয় নি। ট্রেন ঠিক সময়ে ছেড়ে যাবে। মনে মনে বলছিলাম ৩০ মিনিট লেট হোক, আমি নাস্তাটা করে নেই। কিন্তু মনে মনে বললেই তো হয় না। ট্রেন ১০.১০ এই ছেড়ে যাচ্ছে। ছেড়ে যাচ্ছে বোলপুরের দিকে, শান্তিনিকেতন এর দিকে।

হাতে আনন্দবাজার পত্রিকা নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের পরিবেশ দেখছি আর শান্তিনিকেতন এর একটা আবহাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে ট্রেনের ভিতরেই। কেউ এসে রবীন্দ্র সংগীত গাইছে তো কেউ লালন এর গান। আমার পাশে বসে আছেন সন্তু দাদা (ট্রেনেই পরিচয়), যিনি বলছিলেন বাংলাদেশ ছাড়া ভারতববর্ষ কল্পনা করা যায় না আর আমি ফাকে জেনে নিচ্ছিলাম কিভাবে শান্তিনিকেতন ঘুরে দেখতে পাবো কয়েক ঘণ্টার জন্য। তিনি মনে মনে আমাকে বকা দিলেন। কয়েক ঘণ্টা মাত্র? তবু তিনি বললেন সেখানে গাইড পাওয়া যায়।৪০০/৫০০ রুপী দিলেই অনেক গাইড পাওয়া যাবে যারা ঘুরিয়ে দেখাবে সম্পূর্ণ শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

বর্ধমান পার হচ্ছি। ট্রেন এর গতি ঘণ্টা প্রতি ৯০ কিলোমিটার এর মত। আর হয়তো বেশিক্ষণ না। দরজার পাশে দাঁড়ালাম, ধানক্ষেত দেখতে দেখতে দেখলাম ট্রেন লাইন ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এক পাশ চলে যাচ্ছে দিল্লীতে। দিল্লী তো আমাকে টানছে না, আমাকে টানছে শান্তিনিকেতন। অতঃপর ১২.৪৫ এর দিকে আমি নামি বোলপুরে। গরম অনেক, আমার প্ল্যাস্টিক এর চশমাটা গলে গেলেও অবাক হবো না। বোলপুরে নামতেই রিকশা ট্যাক্সি সব এসে আমাকে ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে “অপু দশ বিশ” খেলে একজন কে ঠিক করলাম যে আমাকে শান্তিনিকেতন এর শুরুতে নামিয়ে দিবে ৫০ রুপীতে।

১০ মিনিট চলতে চলতেই, ঐ যে বিশ্বভারতীর ম্যাপ দেখা যাচ্ছে। আমি তার ট্যাক্সি থামালাম। সে বলল “ইহা সে শুরু দাদা”। তখন তাকে অফার দিলাম, সে আমাকে ঘুরিয়ে দেখাবে কিনা। এই গরমে আমার গুগোল ম্যাপ ও হারিয়ে যাবে। সে ৪০০ রুপীতে রাজি হলো, সব ঘুরিয়ে দেখাবে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তার জ্ঞানও সেই লেভেলের। প্রথমে সে ট্যাক্সি চালানো শিখে পরে রবীন্দ্রনাথ শিখেছে। দুইটাই তার পেটের তাগিদে, এখানে বাংলা রবীন্দ্র প্রেমের কোন সম্পর্ক নেই। বা দিকে ছাতিমতলা, বট বৃক্ষ পার হয়ে আমাদের যান চলছে আর ড্রাইভার তার পেশাদারিত্বের জন্য ইতিহাস বলে যাচ্ছে। কিন্তু গেইট দিয়ে ঢুকতে দিচ্ছেনা। ভাবলাম এই গেলো! আমার এই পরিশ্রম গেলো। যদি ঢুকতে না পারি তবে এখানেই অনশনে বসে যাব। কিন্তু দারোয়ান বলে ২ টার পর ঢুকতে দিবে।ড্রাইভার বলল সামনে শ্রীজনী শিল্পগ্রামটা ঘুরে আসি এই ফাকে।

শান্তিনিকেতন

এটা আবার কি? যেহেতু সময় আছে যাই। সুন্দর সাজানো গুছানো একটা শিল্প গ্রাম। নানান দেশের ঐতিহ্য তুলে ধরা আর পুকুর পারে এক বাউল গান ধরেছে “আমার মনের মানুষেরও সনে…”। আহ লালন! তাকে ১০ রুপী দিলাম সে জয় গুরু বলে বিদায় দিল। আমি পুতুল ঘর থেকে ছোট ছোট জিনিষ দেখে দ্রুত আমার আসল গন্তব্যের দিকে রওনা হলাম।

শান্তিনিকেতন

এবার আর দারোয়ান আটকায় নি। হাটতে হাটতে দেখে যাচ্ছি নানা শিল্প কর্ম, খেলার মাঠ। কিন্তু আমার ড্রাইভার প্লাস গাইড মোবাইল দিয়ে ছবি তুলতে পারে না। মোবাইল হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকে। অগত্যা সেখানের এক চারুকলার ছাত্রের সাহায্য নিলাম। তিনি বুঝালেন পুজার কারণে ব্যস্থতা অনেক তার। তার শার্টে প্যান্টে রঙ কেন মেখে আছে তা বুঝাল। তাকে বললাম আমার পাঞ্জাবীতেও মেখে দাও। সে হেসে চলে গেলো। আমি হাটতে হাটতে আম্রকুঞ্জ হয়ে ছাতিমতলার গেলাম। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। যত দেখি মুগ্ধ হই। কাচের একটা ছোট মন্দির/ঘর। এখানে এসে দেখি অনেক অনেক গাইড। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ থেকেও তারা বেশি জানে। ছাতিমতলার পাশ দিয়ে হাটতে হাটতে আমি বের হয়ে যাচ্ছি মিউজিয়াম টার দিকে। টিকেট কেটে দ্রুত ঢুকে পরলাম।

মিউজিয়ামে রবি ঠাকুরের অনেক ছবি লেখা সুন্দর করে সাজানো। ছবি তোলা নিষেধ, লুকিয়ে তুললে সমস্যা নেই, আমি দুটো তুলেছিলাম। মিউজিয়াম থেকে বের হয়ে বা দিকে যেতে রবীন্দ্র ভবন। তার পাশেই রবি ঠাকুরের থাকার ঘর। আমি দ্রুত দেখে বের হয়ে গেলাম। দারোয়ান বলে “বাব্বা এত দ্রুত?”। বললাম দাদা ৪.১৫ তে ট্রেন ধরতে হবে যে দাদা। “আবার চলে এসো তবে দোল এর সময়”।

শান্তিনিকেতন

এবার আমি ঘুরছি বিশ্বভারতীর ভিতরে। মেয়েদের হোস্টেল, ছেলেদের হোস্টেল। শিক্ষকদের বাংলো থেকে শুরু করে অনেক সুন্দর সুন্দর নিদর্শন। ড্রাইভার আমার পিছনে তাকিয়ে বলল “এবার যাই স্টেশন?”

বিদায় রবি ঠাকুর বলে রওনা হতেই হলো। পিছন ফিরে আবার একটু দেখলাম। বোলপুর স্টেশন এর পাশে যখন চলে এলাম তখন আর পিছন ফিরেও কিছু দেখা যাচ্ছেনা। তবে স্টেশনে ঢুকে সুখবর আমার জন্য।আমার ট্রেন “কাঞ্চনজঙ্গা এক্সপ্রেস” মাত্র ৫ ঘণ্টা লেট।রাত ৯ টার পর আসবে। এখন কি করা? এ কি বিপদ? কিন্তু টিকেট কাউন্টারে যেতেই বললাম দাদা কথা বলা যাবে? তিনি বললেন “যত খুশি”। আমি শুধু একটা কথা বললাম “কলকাতা যাবো, কোন ট্রেনে যাবো?”

তিনি বললেন বর্ধমান চলে যাও লোকালে। সেখান থেকে আরেকটা লোকাল ধরে কল কল করে কলকাতা। আমি কথা শুনেছি। ১৫ রুপী দিয়ে বর্ধমান এসে আবার ৫ মিনিট পরেই অন্য এক লোকালে করে হাওড়া নেমে যাই রাত ৮ তার দিকে। পথে দেখা মিলে সূর্যের। সে ডিম এর মত ছোট হতে হতে ডুবে যাচ্ছিল। কিন্তু কাল সে আবার উঠবে। আমিও আবার শান্তিনিকেতন যাবো।

যারা যাবেন তার শীতের দিকটাতেই যাবেন আর দল বেধে গেলে গাইড এর দরকার আছে বলে মনে হয় না!

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।