রাতারগুলের জলা বনে

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

বর্ষাকাল প্রায় শেষ। লম্বা ভ্রমণ বিরতির পর আবার অস্থির হয়ে উঠেছি। আকস্মিক পরিকল্পনায় রওনা হয়েছি সিলেট, উদ্দেশ্য রাতারগুল এর ভেজা বন দর্শন। শনিবার সকালে সিলেট থেকে একটা গাড়ী ভাড়া করেছি, গন্তব্য গোয়াইন ঘাট। আকাশ ফেটে রোদ পড়ছে, কিছু হালকা খাবার, ঠান্ডা পানি আর স্যালাইন নিয়েছি সাথে।

সিলেট-তামাবিল হাইওয়ে ধরে প্রায় ৪০ কি.মি. গেলাম। জৈন্তাপুরের কয়েক কি.মি. আগেই হাতের বায়ে গোয়াইন ঘাটের দিকে চলে গেছে ১৬ কি.মি. সরু পাকা রাস্তা। হাইওয়ে দিয়ে এগোনোর সময়ে চারদিকের যে অসাধারন দৃশ্য উপভোগ করেছি, এখানকার প্রাকৃতির কাছে তা ম্লান হয়ে গেছে। রাস্তার দুপাশে গাছের সারি, চারদিকে বাহারি সবুজ ধানের ক্ষেত, তার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া শান্ত ছোট্ট খাল, ডানদিকে দৃষ্টির সীমানা জুড়ে উঁচু পাহাড়ের সারিবদ্ধ দেয়াল, নীল আকাশে মেঘের বর্নিল খেলা, চারিদিকে শান্ত বাতাসের দোলা, সবকিছু মিলে অসাধারন সুন্দর পরিবেশ।

কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলাম গোয়াইন ঘাটে। রাতারগুল বন গোয়াইন ঘাট উপজেলার দক্ষিণ নগর গ্রামের অন্তর্গত। এখান থেকে রাতারগুল যাওয়ার জন্য ইঞ্জিন চালিত ছৈয়া (ছাউনি) নৌকা পাওয়া যায়। এগুলো মোটামুটি ১৫/১৬ জন যাত্রী অনায়াসে বহন করতে পারে, ভাড়া প্রায় ১২/১৩’শ টাকা। এরই একটা ভাড়া নিয়ে আমরা আটজন রওনা হলাম। কড়া রোদ দেখে নৌকার মধ্যে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি দুই আড়াই বছরের পিচ্চি এক শিশু বৈঠা হাতে নৌকা বাইছে আর তার বাবা মাছ ধরতে জাল ফেলছে নদীতে। এই দৃশ্য দেখে আর ভেতরে থাকতে পারলাম না, ছৈয়ের উপর এসে বসলাম। চারদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে পর্যবেক্ষণ করছিলাম এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা আর প্রকৃতির বৈচিত্র।

মাছ ধরার ছবি

এই নদীর নাম সারি নদী, ভারত থেকে লালা খাল (Lalakhal) বেয়ে এসেছে, বেশ শান্ত নদী। মাঝে মাঝে দুয়েকটা খাল এসে মিশেছে। বিস্তৃত শরতের নীল আকাশ, তার চত্তরে সাদা মেঘের প্রদর্শনী। চারপাশে লঘু জনবসতি, বেশ দূরত্বে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম, নদীর দুপাশে হলদে সবুজের কচি ধানের ক্ষেত, অতিদূরে পাহাড় আমাদের অনুসরণ করেই চলেছে। ছেলেবেলার “এসো ছবি আঁকি” বইয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্যের মতই এখানকার প্রকৃতির রূপ। হারিয়ে যাওয়ার মতোই। এখানকার মানুষেরা বোধ করি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। প্রকৃতির কাছ থেকে শেখা তাদের সরলতা। হঠাৎ দেখি একটা ভেলায় ভেসে নদী পাড়ি দিচ্ছে দুই শিশু, অসাধারন তাদের পারদর্শিতা।

ছবির মতো প্রাকৃতিক দৃশ্য

ঘন্টাখানেকেরও বেশি সময় ধরে চলার পর আমরা থামলাম “খইয়ার খাল”-এর মুখে। এখান থেকেই আমরা প্রবেশ করবো রাতারগুল (Ratargul Swamp Forest) বনে। বেশ ডালপালা-লতাপাতায় ঘেরা এই বন তাই বনের ভেতরে বড় নৌকা প্রবেশ করতে পারেনা। ছোট নৌকায় যেতে হয়, এগুলো সাধারনত মাছ ধরা নৌকা, ৪/৫ জনের বেশি চড়া যায়না। বহু দড়াদড়ি করে নৌকা প্রতি দুইশ টাকায় ভাড়া করে চললাম বনের মধ্যে। এটি মূলত বহুদূর বিস্তৃত নিচু জলাভূমি, বর্ষাকালে পানির উচ্চতা বাড়ে আর শীতকালে পানির স্তর ক্রমশ নিচে নামতে থাকে। স্থানভেদে পানির উচ্চতা মোটামুটি দুই থেকে দশ ফুট বা তারও বেশি হতে পারে। খাল ধরে কিছুদূর এগোতেই সামনে দেখলাম শিকড় জরানো এলোমেলো গাছের ঘন সারি। এগিয়ে গেলাম বনের ভেতর। লতাপাতার ঘন জাল, পোকামাকড়ের ছন্দময় ডাক, ছমছমে পরিবেশ, মনে হচ্ছিলো ডিসকভারি চ্যানেলের রিপর্টার হয়ে এসেছি আমাজনের গহিনে। মাঝে মাঝে আবার বনের ঘনত্ব একেবারেই কম। সেখানেও সৌন্দর্য্য কম নয়। বনে ঘেরা লেকের মধ্যে দিয়ে সজোরে নৌকা বেয়ে চলা, সত্যিই বর্ণনাতিত সেই অনুভূতি। এভাবে ঘন্টা দুয়েক ঘোরাঘুরি শেষে ফিরে এলাম বড় নৌকার কাছে।

বনের মধ্যে আমাদের যাত্রা

বনের ভেতর থেকে নেয়া ছবি
নীল আকাশ আর সাদা মেঘের খেলা

বহুদিন পর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য দেখেছি একেবারে কাছ থেকে, অনুভব করেছি বনের একাকীত্ব, চর্চা করেছি শিশুসুলভ সারল্যের, স্বাদ নিয়েছি লতা গুল্মের গন্ধের, অবিজ্ঞতা নিয়েছি বন বিচরনের, উপভোগ করেছি নির্মল আনন্দ। শহরের কোলাহল আর ব্যস্ততার বাইরে আমার এই দর্শন নিঃসন্দেহে আমাকে দিয়েছে দির্ঘায়ু, করেছে ঋণী। চির যৌবনা আমাদের এই দেশ, অনুপম তাঁর রূপ, তাইতো অতিসত্বর আবার বের হবো রূপের খোঁজে।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।