হাওড়া থেকে যাত্রা শুরু করে তৃতীয় দিন ভোরবেলায় চন্ডীগড়৷ এখান থেকে মানালি হয়ে যাবো লাহুল-স্পিতির কয়েকটি জায়গায়৷ কাজা-নাকো-কল্পা-ছিটকুল৷ ফিরবো শিমলা হয়ে৷ চন্ডিগড় থেকে ভোরে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় এসে পৌছালাম মানালি৷ বিয়াস উপত্যকায় ছোট্ট শহর মানালি৷ সনাতন হিন্দু মুনি ‘মনু’-র নাম থেকেই মানালি নামের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়৷ এখানে হিড়িম্বা মন্দির ও বশিষ্ঠ মন্দির দেখার মত৷ এই শহর কে Gate Way of Lahul-Spiti ও বলা হয়৷

চারিদিকে আপেল গাছ, হিমালয় পরিবৃত এই শহরের সৌন্দর্য্য আলাদা মাত্রা এনে দেয়৷ খুব কাছেই সোলান ভ্যালী৷ হিমালয়ান ট্রেনিং ইন্সটিটিউশান ও এখানে৷ মানালি থেকে রওনা দিয়ে পরের গন্তব্য কাজা (১১,৯৮০ ফিট)৷ শহর থেকে বেরিয়ে রোটাং পাস (১৩,০৫৮ ফিট) পার হয়ে কেলং এর পথে খোকসার। রোটাং এর পথে বরফ এর নাম মাত্র নেই, সবে হাল্কা বরফ শুরু হয়েছে৷ আগে মে মাসে রাস্তার দুধারে যে উঁচু বরফের দেওয়াল দেখেছি তার পুরোটাই উধাও৷ খোকসার থেকে বাতাল-কাজা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলা৷ সঙ্গে চলেছে CHENAB RIVER, যা পাকিস্তান থেকে এসেছে৷

নদীকে সঙ্গী করে পৌঁছালাম বাতাল৷ রাস্তা বলতে গুড়ো পাথর, বোল্ডার ও মাটি মিশ্রিত রাস্তা৷ বাতাল থেকে অনেকটা এগিয়ে হাইওয়ে ছেড়ে চন্দ্রতাল রোড ধরে পৌছালাম চন্দ্রতাল (১৪,১০০ ফিট)৷ চন্দ্রতাল থেকেই চন্দ্র নদীর উৎস, যা পরে চেনাব নদীতে মিশেছে৷ ভীষণ সুন্দর এই চন্দ্রতাল৷ পাহাড়ের কোলে৷ গাড়ী যে পর্যন্ত্য যায়, সেখান থেকেও দেড় কিমি হাঁটা পথ৷ এখান থেকে কুনজুম পাস (১৫,০৬০ ফিট) পার হয়ে কাজা৷ কুনজুম পাস যখন পার হই তখন রাত নেমেছে৷ লোসার হয়ে যখন কাজা পৌছালাম রাত তখন অনেক গভীর৷ সাথে খুব ঠাণ্ডা৷ কাজার আবহাওয়া অনেকটাই লাদাখ এর মতো৷ COLD DESERT বলা যায়৷
পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে স্পিতি নদী৷ খুব ছোট্ট গ্রাম এই কাজা৷ SUB-DIVISIONAL HQ, লাহুল-স্পিতির৷ এখান থেকে ঘুরে নেওয়া যায় – ‘কি’ মনাস্ট্রী, কি ভিলেজ, কিবের ভিলেজ (১৪,২০০ ফিট), লাংজা ভিলেজ (১৪,৩০০ ফিট), লাংজা বুদ্ধ মুর্তি ( উচ্চতা ৩৫ ফিট), কমিক ভিলেজ(১৬,০০০ ফিট) [উচ্চতম Motorable Village] এবং উচ্চতম পোস্ট অফিস ‘হিকিম’ (১৪,৪০০ ফিট)৷ পুরো স্পিতি উপত্যকাটাই বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বেশী৷ হোটেল বা রেষ্টুরেন্টে “দলাই লামা” র ছবিতে ভর্তি৷ কিছু জায়গায় SAVE TIBET পোষ্টারও চোখে পড়েছে৷

কাজা থেকে রওনা দিয়ে ধানকার মনাষ্ট্রী দেখে টাবো হয়ে গিউ ভিলেজ৷ খুব সুন্দর গ্রাম এই গিউ৷ মনাষ্ট্রী টাতো ভীষন সুন্দর, ঝকঝকে৷ মনাষ্ট্রীর পাশেই ৫০০ বছরের পুরোনো এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মমি আছে যার সব দাঁত এখনও বর্তমান৷ এখান থেকে নাকো ভিলেজ (১২,০০০ ফিট)৷ নাকোর অন্যতম আকর্ষন নাকো লেক৷ পুরোটাই উইলো পপলার গাছে ছায়া৷ আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে হ্রদের জলে পাহাড়-আকাশের ছায়া মুগ্ধ করে৷ নাকো থেকে বেড়িয়ে খাব, পুহ হয়ে কল্পার পথে৷ এই খাবেই স্পিতি ও শতদ্রু মিলিত হয়ে পরে বাসপা নদীতে মিশেছে৷ পথেই পরে জেলা সদর রিকংপিও৷

কিন্নৌর উপত্যকার সুন্দর গ্রাম এই কল্পা৷ আপেল বাগনে ভর্ত্তি৷ পূর্বদিকে হিমালয়ের পর্বতমলা দৃশ্যমান৷ এখান থেকেই দেখা যায় কিন্নৌর কৈলাশের শৃঙ্গ৷ স্হানীয়রা সকালে কৈলাশকে প্রনাম করে তাদের দিন শুরু করে৷ কল্পা থেকে সলে বেড়িয়ে সাংলা, রকছাম হয়ে ছিটকুল৷ বাসপা নদীর কোল ঘেষে ভারত চীন সীমান্তের শেষ গ্রাম৷ গ্রামের পাশ দিয়ে কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে বাসপা নদী৷ এই পথেই কোন এক সময় ভারত-তীব্বত ব্যবসার রা্স্তা ছিল৷ ছিটুকুল থেকে সারাহান-রামপুর হয়ে শিমলা৷ সারাহানে আছে ভীমাকালি মন্দির৷ কাঠের তৈরী এই মন্দিরের কারুকার্য দেখার মত৷ একান্ন পীঠের একপীঠ এই ভীমাকালি। শিমলা থেকে কালকা হয়ে ফিরে যাওয়া কলকাতা৷
সকলের প্রতি অনুরোধ, এই বর্ষায় এডভেঞ্চার এর নেশায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকবেন। মনে রাখবেন, জীবন একটাই, আর একটা দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। তাই আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।