রেশম পথে রামধুরা

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

সিল্ক রুট বা রেশম পথের প্রথম রাতটা অনেকেই ইচ্ছেগাঁও বা সিলেরী গাঁও তে কাটিয়ে থাকেন। দুটো জায়গাই স্থানমাহাত্বে পরিচিত। কালিম্পঙের আশেপাশে প্রকৃতির কোলে নিভৃতে ছোট ছোট যেসব পাহাড়ী গ্রাম অপার সৌন্দর্য্যের পশরা সাজিয়ে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে , তাদের মধ্যে রামধুরা (Ramdhura) অন্যতম।

গিয়েছিলাম এ বছর মে’র শেষ সপ্তাহে। গন্তব্য রেশম পথ। জ্বলে-পুড়ে তেতে ওঠা দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গে এসে দেখি,বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। এনজিপি থেকে চলেছি। সালুগড়া ছাড়িয়ে মহানন্দা অভয়ারণ্যে প্রবেশ করতেই দেখলাম, তরাই এর বর্ষা তার চিহ্ন রেখে দিয়েছে। দুপাশের অরণ্য যেন প্রথম বর্ষায় আরো ঘন, নিবিড় আর সবুজ। তিস্তাও জলে বেশ টইটম্বুর। কালিমপং ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের হই হট্টগোল আগের মতোই। একটা কথা বলা ভাল, কালিমপং থেকে এনজিপিতে নেমেই শুনেছিলাম গন্ডগোল শুরু হয়ে গেছে। সুতরাং, বলা ভালো, ভাগ্য বেশ ভালো ছিল কেননা এর পরই শুরু হয়ে গিয়েছিল একটানা বন্ধ।

রামধুরা
রামধুরা যাবার পথে মেঘাচ্ছন্ন রাস্তা

যা হোক, একটু চা পানের বিরতি নিয়েই আবার রওনা দিলাম আলাগারা-পেডং পথে। ১১ কিমি চড়াই পথে, গ্রাহমস হোমের পাশ দিয়ে, ডেলও কে বাঁ দিকে রেখে আরো কিছুটা এগোলেই রামধুরা। হালকা বৃষ্টি ভেজা রামধুরার যখন পৌঁছুলাম, বেশ বেলা হয়েছে। খালিঙ হোমষ্টের মালিক অরুন খালিঙ সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন। সদাই হাসিখুশি মিসেস খালিঙ এর মধ্যেই গরম চা নিয়ে হাজির। সঙ্গে দুটো পাহাড়ী স্পানিয়েল…যারা শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই ছিল।অবস্থানগত ভাবে দেখলে, ঠিক যেন ঝুলন্ত ব্যালকনির মতো করে তৈরী এই বাড়ি। মোট চারটি ৪-শয্যার ঘর। প্রতিটি ঘর থেকেই উন্মুক্ত মোহময়ী উপত্যকার মায়াবী রূপে মুগ্ধ হতেই হবে। অনেক নীচে দেখা যাবে তিস্তা আর রংগিতের মিলন…ঠিক যেমন সিলেরী থেকে দেখা যায়। আর দিগন্তরেখায় মৌন, ধ্যানগম্ভীর কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম বিস্তার। নিস্তব্ধতার মাঝে হিমালয় কে আরো নিবিড় করে পেতে হলে এখানে আসতে হবে।

রামধুরা
রামধুরার হোম স্টের বারান্দা থেকে

ভোরে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ুন বারান্দায়। কাঞ্চনজঙ্ঘায় তখন হয়তো ইন্দ্রজাল শুরু হয়ে গেছে। “হয়তো” এই কারণে বললাম, আকাশে মেঘ থাকায়, ওই অলৌকিক দৃশ্য আমার দেখা হয়ে ওঠেনি। তবু, অজস্র পাখির ডাকের মধ্যে নিচের উপত্যকার হালকা মেঘের ওপর পড়া প্রথম সূর্যকিরণ আলোকিত হয়ে জানান দেবে…ভোর হচ্ছে।নির্জন রাস্তা, কুয়াশা মাখা পাহাড়ি বাঁক… চেনা রোডোড্রেনড্রোন বা অচেনা সিঙ্কনা গাছের জঙ্গলে কিছুক্ষন না হয় হারিয়েই গেলেন। ভয় কি, ওই যে বললাম, দুজন গাইড আছে তো। মানে, স্পানিয়েল…ঠিক পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে। আবার, জোৎস্না রাতে হিমেল হাওয়াকে গায়ে মেখে আবার ওই ঝোলা বারান্দায় এসে বসুন। রাতের কালিমপং যেন হাজার আলোর বিন্দু জ্বেলে কোনো মায়াবী আলোকসজ্জার মতো লাগবে। অনাঘ্রাতা প্রকৃতি , অজস্র পাখি,আর দিগন্তবিস্তৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়া আর কিছু নেই এখানে। যারা প্রকৃতি আর বিনোদন একই সঙ্গে চান, তাদের জন্য রামধুরা নয়। উত্তুঙ্গ হিমালয়ের কোলে, নির্জন, কোলাহলহীন, শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশে একান্তে ও নিভৃতে একদিনের জন্য আবিষ্কার করতে পারেন অন্য কিছু অবিস্মরণীয় সুখস্মৃতি। কথা দিচ্ছি, কোলাহলবিমুখ প্রকৃতিপ্রেমকদের রামধুরা খুব হতাশ করবে না।

রামধুরা
রামধুরার হোম স্টের বারান্দা থেকে ভ্যালির ভিউ

পরের দিন বেলা দশটায় বেরিয়ে পড়লাম জুলুকের উদ্দেশ্যে।

কিভাবে যাবেন

কালিমপং থেকে সোজা গাড়িতে রামধুরা ২০ মিনিট। থাকার জন্য খালিঙ হোম স্টে (অরুন খালিঙ – 9933803187/8759192633) ছাড়াও আরো দু তিনটি হোম স্টে আছে। ওখান থেকে একবেলার কালিমপং সাইটসিন করে নেওয়া যায়। ডেলো খুব কাছে, মাত্র ১৫ মিনিট।সাইলেন্ট ভ্যালি আর রিশিখোলাও (১২ কিমি) ঘুরে আসা যায়। আর রামধুরা থেকে একটানা গেলে জুলুক প্রায় ৪ ঘন্টার মতো। মধ্যে রংলিতে পারমিটের জন্য মিনিট কুড়ি দেরি হতে পারে।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।