কম খরচে আমার ভারত ভ্রমণ ( কালকা মেইল পর্ব )

যুক্ত করা হয়েছে

আগের পর্ব

স্টেশনের প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের ডিজিটাল বোর্ডে প্রদর্শিত হয় ট্রেনের কোন বগি কোথায় দাঁড়াবে। আমার বগির নম্বর হচ্ছে s 10 সিট নম্বর ৪৯। সেদিকে যাবার চেষ্টা করতেই দেখি একটা জায়গায় ইয়া লম্বা লাইন। রেল পুলিশ মারধোর দিয়ে লাইনটা ঠিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আসলে হয়েছে কি প্রতিটি দূরপাল্লার ট্রেনে অসংরক্ষিত কিছু আসন থাকে, সেখানে যে আগে উঠতে পারবে সিটটা তার। আসন বিহীন যাত্রীরা আগে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি করে বলে পুলিশ একটা লাইন তৈরী করে দেয়।

কালকা মেইল

s 10 লেখা ডিসপ্লে বোর্ডের সামনে দাঁড়াতেই ট্রেন এসে গেল। উঠতে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ। কিছুক্ষণ পর ট্রেনের লোক এসে ভিতর থেকে দরজা খুলে দিলো। হুড়মুড় করে উঠে পড়লাম। নিজের সিটটা দখল করে বসে রইলাম। তখন সবে সন্ধ্যা সাতটা বাজে। ট্রেন ছাড়তে এখনো চল্লিশ মিনিট বাকি আছে। প্রচন্ড গরম লাগছে। আশেপাশের সিটের সহযাত্রীরা ততক্ষণে আসা শুরু করেছে। বুঝতে পারলাম মোটামুটি একটু নিম্নবিত্তের মানুষেরাই স্লিপার ক্লাসে ভ্রমণ করে।

কালকা মেইলে স্লিপার ক্লাস

ট্রেন ছাড়ার ঠিক মিনিট দশেক আগে দুটো রাজপুত্র উঠে এলো। বিলাসিতা তাদের শরীর আর লাগেজ দিয়ে ঝরে ঝরে পড়ছে। পুরো বগিতে যা সম্পূর্ণ বেমানান। খুব সন্দেহ হলো। কাছে এসেই প্রথমে তারা আমার নাম ধরে ডেকে উঠলেন। অবাক হলাম না, কারণ প্রতিটি যাত্রীর নাম-ঠিকানা ট্রেনের দরজার পাশে সাঁটানো থাকে। নিশ্চয় সেখান থেকে আমার নাম দেখে এসেছে। যেচে এসে তারা যখন আমার সাথে পরিচিত হলো তখন আমার সন্দেহ সম্পূর্ণরূপে সঠিক প্রমাণিত হলো। তারা দুজনেই বাংলাদেশী। সেতু আর নিয়ন। ফেয়ারলি প্লেসে টিকিট কেটে বের হবার সময় তারা নাকি আমাকে দেখেছে। অবশ্য তারা নাকি তখন আমাকে ইন্ডিয়ান মনে করেছিল।

পরিচিত হওয়া মাত্রই তাদের সাথে বকবক শুরু করে দিলাম। আমার উপরের সিটদুটি তাদের। সারাটা দিন ইন্ডিয়ানদের উদ্ভট বাংলা উচ্চারণ শুনে শুনে মাথায় যে যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল তা এক মিনিটেই কেটে গেল। আমার কথার যন্ত্রণায় নিয়ন ভাই কিছুটা দূরে সরে বসলেন, আর সেতু ভাই দূরে সরতে না পেরে অস্থির হয়ে গেলেন। কিন্ত আমি এসব গ্রাহ্যের মধ্যেই আনলাম না। আমার কথা চালিয়েই যেতে লাগলাম। নিজের ভাষায় বকবক করলে যে মাথা যন্ত্রণা সারতে পারে তা এই প্রথম জানলাম।

সেতু আর নিয়ন ইন্ডিয়া ঘুরতে এসেছেন। এখন যাবেন দিল্লিতে, সেখান থেকে আগ্রা, রাজস্থান এইসব দিকে। সিমলার দিকে যাবারও ইচ্ছা আছে। তাদের কাছে আমিও আমার ট্যুর প্লানের কথা শেয়ার করলাম। দিল্লীতে মেট্রোতে করে সাইট সিয়িং এর ব্যাপারে আমার একটা লেখা ছিলো। লেখাটার প্রিন্ট কপি বের করে তাদের দেখাতেই সেতু ভাই চাপনিছে সেটা গাপ করে দিলেন।

বকবকের ঠেলায় কখন যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে বুঝিনি। টের পেলাম গায়ে বাতাস লাগায়। আহ কি আরাম! শেকল দিয়ে লাগেজ বেঁধে থিতু হয়ে বসলাম। বকবকানি থামিয়ে টুকটাক কথা বলা শুরু করলাম। নিয়ন ভাই খুব চুপচাপ, কথা একেবারেই কম বলেন। ততোক্ষণে বেশ রাত হয়ে গেছে। সেতু ভাইরা খাবার জন্য এক বয়াম জেলি, এক প্যাকেট পাউরুটি আর কি কি যেন নিয়ে এসেছে। আমি আমার পাউরুটি আর মিষ্টি বের করলাম। আমার খাবারগুলোই ভাগাভাগি করে খাওয়া হলো। সারাদিন বেশ উত্তেজনা আর পরিশ্রম গেছে। খাওয়া-দাওয়া শেষে শুয়ে পড়লাম। প্রচন্ড বেগে ট্রেন ছুটছে। তাছাড়া চলন্ত ট্রেনের দুলুনিও আমার কাছে খুব ভালো লাগে। সহজেই ঘুমিয়ে গেলাম।

২০শে সেপ্টেম্বর’২০১৫

আমি সবসময়েই খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। ভারতে সবচেয়ে মজার দৃশ্য দেখা যায় ভোরবেলায়। এদেশের লোকজন ভোরবেলা ট্রেন রাস্তার দুপাশে উদোম হয়ে লাইন দিয়ে বসে পায়খানা করার জন্য। ট্রেনের যাত্রীরা যে তাদের এই খোলামেলা ভাবে পায়খানা করার দৃশ্যটি দেখছে এ ব্যাপারে তাদের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। কিছুক্ষন এই মজাদার দৃশ্য উপভোগ করলাম। তারপর ভীড় হবার আগেই টয়লেটের দিকে গেলাম। ইন্ডিয়ার ট্রেনের প্রতিটি বগিতে চারটে করে টয়লেট। তিনটিতে ভারতীয় রীতি আর একটিতে হাই কমোডের ব্যাবস্থা। কোনটিতেই বদনা অথবা মগ নেই, তবে কিছু বোতল রাখা আছে। প্রতিটি টয়লেটের ভেতরে ও বাইরে হাতমুখ ধোয়ার বেসিন রয়েছে। পরে দেখেছিলাম দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার এই টয়লেটগুলি পরিষ্কার করা হয়। শুধু তাই নয়, ট্রেনের প্রতিটি বগিই দিনে কয়েকবার করে ঝাড়ু দিয়ে ঝাঁট দেয়া হয়।

ঘণ্টা খানেক পর সেতু ভাই উঠলেন। একটা স্টেশনে ট্রেন থামা মাত্র আমি তাকে নিয়ে নিচে নামলাম। তিনি স্টেশনের কল থেকে হাতমুখ ধুলেন। তারপর আমরা এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম। দেখি নিয়ন ভাইও উঠে পড়েছেন। জানালা দিয়ে তিনি আমাদের ডাকাডাকি শুরু করলেন । কিন্তু আমরা কর্ণপাত করলাম না। বেশ কিছুক্ষণ পর আমরা যখন ট্রেনে উঠে আসলাম তখন দেখি নিয়ন ভাই ক্ষেপে ভোম হয়ে আছেন। আসলে তার জোর আকারে টয়লেট চেপেছে ,আর মালপত্র ফেলে রেখে তিনি টয়লেটেও যেতে পারছিলেন না। সেতুকে দেখতে পেয়ে গালাগাল দিতে দিতে টয়লেটের দিকে দৌড়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত যখন টয়লেট থেকে যখন বের হলেন ততোক্ষণে কিছুটা শান্ত হয়েছেন।

রামপেয়ারি চায়ের অনেক নাম শুনেছিলাম। নেয়া হলো তিন কাপ। আর তারপর আমি সেতু ভাইদের পাউরুটিতে ভাগ বসালাম। ইন্ডিয়ান স্টাইলে সকালের নাস্তা হিসাবে পাউরুটি আর চা মন্দ হলো না। কলকাতা থেকে কাশ্মির পর্যন্ত পুরো ইন্ডিয়া সফরে চা নিয়ে একটা মজার বিষয় লক্ষ্য করেছি, তা হচ্ছে, সকালে চা না খেলে ইন্ডিয়ানরা পাগল হয়ে যায়। একেবারে মারা যাওয়ার মতো অবস্থা হয় তাদের। ট্রেনের মধ্যে দেখি অন্যান্য যাত্রীরা উন্মাদের মতো চা চা করছে। যাই হোক সকালের নাস্তা শেষ করে সুস্থির হয়ে জানালার পাশে বসলাম।

বসলামতো কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে অস্থির হয়ে গেলাম। ট্রেন বোধহয় ততোক্ষণে বিহারের মধ্যে দিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। প্রচন্ড গরম। দুপাশে সবুজ আছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো চোখ জুড়ানো সবুজ নয়। কেমন যেন রুক্ষ সবুজ। চোখের আরাম না হয়ে কেমন যেন যন্ত্রণা হয়। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে গরম বাড়তে লাগলো। অথচ তখন কেবল সকাল ন’টা বাজে। ভাবছি দুপুরে কি অবস্থা হবে! আমি তো দাঁতে দাঁত চেপে গরম সহ্য করছি, কিন্তু সেতু আর নিয়নের অবস্থা সুবিধার না। তারা প্রথমে টি-শার্ট খুলে ফেললো। তার কিছুক্ষণ পর প্যান্ট বদলে লুঙ্গি পড়লো। কিছুক্ষণ পর দেখি সেই লুঙ্গিও হাঁটুর বেশ অনেকখানি উপরে বিপদজ্জ্বনক জায়গায় উঠে গেছে। আর এদিকে কোন ঠান্ডা পানীয় বিক্রেতা গেলেই তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন জুসের বোতল কিনতে লাগলো। আমিও সেই জুসের ভাগ পেতে লাগলাম।

কলকাতা থেকে কালকা পর্যন্ত ১,৭১৩ কিঃমিঃ যাত্রাপথে হয়তো অনেক নদী ছিল, কিন্তু আমার চোখে পড়েছে মাত্র দু’টি। একটির কি নাম জানিনা। তবে অন্যটি হচ্ছে গঙ্গা, যমুনা আর সরস্বতি নদীর মিলনস্থল। এই জায়গাটার নাম হচ্ছে সঙ্গম। আমাদের দেশে ট্রেন ভ্রমণে যেমন কিছুদূর পরপর নদী পার হতে হয়, এখানে কোন নদী তো দূরে থাক ছোট নালাও পার হতে হয় না। নদী দেখতে না পেরে শরীরের মধ্যে কেমন যেন খাঁ খাঁ অনুভূত হচ্ছে। প্রচন্ড দ্রুত বেগে ট্রেন ছুটে চলেছে। পাশাপাশি কমপক্ষে দুটো লাইন। একটি যাবার অন্যটি আসার। কিছুক্ষণ পরপর প্রচন্ড বেগে অন্য ট্রেন পাশ কাটাচ্ছে। যাত্রাপথে ছোটছোট স্টেশনগুলিও এতো বিশাল বিশাল যে অবাক হতে হয়। এই যাত্রাপথে আসানশোল, ধানবাদ, গয়া, মোঘলসরাই, এলাহাবাদ, কানপুর, আলীগড় এইসব বিখ্যাত স্টেশন পড়ে। মাঝে মাঝে যে স্টেশনগুলোতে দাড়াচ্ছে দৌড়ে গিয়ে বোতল ভরে ঠান্ডা পানি নিয়ে আসছি। এসব স্টেশনে নর্মাল পানির পাশাপাশি ঠান্ডা পানিরও ব্যাবস্থা আছে।

এর মাঝে কখন যে সেতুকে আর নিয়নকে আপনি থেকে তুই বলে ডাকা শুরু করেছি জানি না। তবে তাদের কাজকর্মগুলি খুব উদ্দীপক। প্রচন্ড গরমে তারা অস্থির হয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত তারা আর পারলো না। ছুটিতে বাড়ি যাওয়া এক বিএসএফ জওয়ানের কাছ থেকে একটা টিফিন বাটি চেয়ে নিয়ে টয়লেটে ঢুকে পড়লো। সেখানে অনেকক্ষণ ধরে গোসল করে বাইরে বের হয়ে এসে কিছুক্ষণ আরামে বসে থেকে আবারো গরমে অস্থির হয়ে পড়লো।

তাদের দেখাদেখি আমিও টয়লেটে গেলাম গোসল করতে। কিন্তু বিধি বাম! গায়ে কোনরকমে দু’বাটি পানি ঢালতেই পানি শেষ হয়ে গেল। অগত্যা ওই অবস্থায় গা মুছে বের হয়ে এলাম। টিফিন বাটি ফেরত দিতে যেতেই বিএসএফ সদস্য বাটি উল্টে সাবানের ফেনা দেখিয়ে দিলেন। তাড়াতাড়ি সেটা নিয়ে আরেকটি টয়লেট থেকে ধুয়ে ভালো করে মুছে তাকে ফেরত দিলাম। হু হু বাবা! এর নাম বিএসএফ! এরাই তো পাইকারি হারে মানুষ হত্যা করে।

আজ যেহেতু রবিবার এজন্য এই ট্রেনে লোকাল যাত্রীর সংখ্যা কম। অর্থাৎ অতিরিক্ত কোন লোক ওঠেনি। অন্যান্য দিন নাকি অফিস যাত্রীতে এই ট্রেন ভরে যায়। এছাড়া আমাদের সারিতে ৬টা সিটের একটা ফাঁকা। মনে হয় কোন যাত্রী ট্রেন মিস করেছে। এতো লম্বা একটা জার্নিতে ট্রেনের মধ্যে যে পরিমানে ভিক্ষুক থাকার কথা ছিল তা নেই।

এমনকি স্টেশনগুলোতেও আমি কোন ভিক্ষুক দেখিনি। তাই বলে যে ভিক্ষুক নেই তা বলছি না, হয়তো আমার চোখে পড়েনি। এছাড়া আমি ভেবেছিলাম আমাদের দেশে হিজড়ারা যেরকম উৎপাত করে, ভারতের ট্রেনেও বোধহয় করে। এজন্য কিছু খুচরা রুপি আলাদাভাবে প্রস্তুত রেখেছিলাম। কিন্তু আল্লাহর রহমতে এ ধরনের কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি।

আমার সামনের সিটে বসেছে শিভেন্দু আর তার সহকারি। আমি বললাম শিবেন্দু, সে বলে না শিভেন্দু। আচ্ছা তাই সই! শিভেন্দু হচ্ছে একজন গাইড, আর তার সহকারি লোকটি হচ্ছে একজন বাবুর্চি। তারা একপাল লোক নিয়ে হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় যাচ্ছে বেড়াতে। সেই একপাল লোক অবশ্য এসি বগিতে করে যাচ্ছে। শিভেন্দু মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে তাদের দেখে আসছে। বাবুর্চির বেতন দৈনিক ৫০০রুপি করে, গাইডের নিশ্চয় আরো বেশি।

মাসে আয় তো তাহলে কম না, কিন্তু এদের দেখলে মনে হয় এদের অবস্থা বুঝি খুবই খারাপ। সকালে তাদের খাবার হলো মুড়ি-চানাচুর কাচামরিচ দিয়ে একটা পলিথিনের মধ্যে মাখিয়ে তার সাথে একটা পেঁয়াজ থেতলে খাওয়া। আমি অন্যান্য যাত্রীদেরকেও এমনকি দিল্লি থেকে যখন কলকাতায় ফেরত আসি সেই ট্রেনেও সবাইকে এইভাবে খেতে দেখেছি। আসলে আমরা বাংলাদেশীরা টুকটাক নাস্তা হিসাবে খাবারের বিরতিতে যা খায় ইন্ডিয়ানরা তাই তাদের মুল আহার হিসাবে গ্রহণ করে।

তাদের এই খাদ্য গ্রহণ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি ভাবলাম দুপুরে ট্রেন যে স্টেশনে দাঁড়াবে সেখান থেকে কোন কম দামের খাবার কিনে খাবো। কিন্তু শিভেন্দু আমাকে বোঝাল যে ভ্রমণে বের হয়ে খাবারে কষ্ট করতে নেই। আমিও নির্দ্বিধায় তার কথা মেনে নিলাম। এজন্য ট্রেনের লোক যখন খাবারের অর্ডার নিতে আসলো তখন তাদের কাছে ডিম আর চাউলের অর্ডার দিলাম। ইন্ডিয়াতে বেশিরভাগ জায়গায় ভাতকে চাউল বলে।

বাইরে রুক্ষতা আরো বেড়েছে। ট্রেন মনে হয় উত্তর প্রদেশে ঢুকে পড়েছে। বাইরে মাঝে মাঝে ময়ুর দেখতে পাচ্ছি। আর গরম বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। দুপুর একটার দিকে খাবার দিয়ে গেল। মূল খাবারের সাথে এক্সট্রা রুটি অথবা ভাত দেয়, আমি রুটি না নিয়ে ভাত নিলাম। দুটো ডিম, দুই বাটি ভাত, একটা ভাজি, ডাল, চাটনি এক গ্লাস পানি আর এগুলো খাওয়ার জন্য প্লাস্টিকের একটা চামচ। একটা বিষয় আমার কাছে খুব অবাক লেগেছে, পুরো ইন্ডিয়াতে বোধহয় একজনের খাবারের জন্য দুটো করে ডিম বরাদ্দ। খুব সাবধানে এইসব খাবারের প্যাকেট খুলে খুলে খেতে হয়। নাহলে বাতাসের ধাক্কায় বর্ণিল ঝোলওয়ালা এইসব খাবার ছিটকে অন্য কারো গায়ে লাগতে পারে।

খেতে বসলে সেতু আমার আর নিয়নের খাবারে ভাগ তো বসালোই এমনকি আশেপাশের যাত্রীদের খাবার থেকেও তুলে তুলে খেতে লাগলো। আমি যতোই এই ছেলেটাকে দেখছি ততোই অবাক হচ্ছি। মানুষকে আপন করে নেবার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে সেতুর মধ্যে। অগ্রিম একটা কথা বলি, সিমলা পর্যন্ত পৌছানোর ৪৯ ঘন্টা সময়ের মধ্যে আমরা শুধু বন্ধু ছিলাম না, সে সব জায়গায় আমাকে তার কাজিন হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলো।

যাই হোক, খাওয়া দাওয়া শেষে আমরা আরো গরমে পড়লাম। মাথার উপরে ঘুরন্ত তিনটি ফ্যান যেন আগুনের হল্কা টেনে নিয়ে আসছে। মাঝে মাঝে যে স্টেশনগুলিতে ট্রেন থামে, দেখি সেতু খালিগায়ে শুধু লুঙ্গি পড়ে প্ল্যাটফর্মগুলোতে দৌড়াদৌড়ি করছে। নিয়নের অবস্থাও কাছাকাছি। একটা স্টেশনে আমিও নেমে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর দেখি একটা কুলিকে পরিচিত মনে হচ্ছে। তো কাছে গিয়ে দেখলাম স্টেশনের মালপত্রের উপর সেতু বসে আছে আর নিয়ন তার ছবি তুলে দিচ্ছে। সত্যি এরা এক আজব চীজ।

শেষ পর্যন্ত আর গরম সামলাতে না পেরে একদম উপরের বাংকে সেতুর সিটে উঠে জামা খুলে শুয়ে পড়লাম। অতিরিক্ত গরম কেমন যেন নেশার মতো তৈরি করে। কিছুক্ষণ ঝিমিয়ে নিলাম। আস্তে আস্তে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামা শুরু করেছে। গরমও একটু কমা শুরু করলো। কিন্তু ততোক্ষণে আমি গরমে সেদ্ধ আর পুড়ে কয়লা হয়ে গেছি।

বিকালে হকারদের আনাগোনা বেড়ে গেল। আর সেতু হয়ে উঠলো সেগুলোর এক আগ্রহী ক্রেতা। সে ইচ্ছেমতো খাবার দাবার কিনে নিয়নকে দেখিয়ে দিতে লাগলো। টাকা-পয়সার হিসাব বোধহয় নিয়নের কাছে থাকে। সে সব হকারের টাকা পরিশোধ করে একটা কাগজে সবকিছুর হিসাব রাখতে লাগলো। একসময় দেখলাম সেতু আর নিয়ন লুঙ্গি বদলে হাফপ্যান্ট পড়লো, তারপর আমার কাছ থেকে সরে গিয়ে কি যেন গুজুর গুজুর ফুসুর ফাসর করতে লাগলো।

সুন্দর লাল আলো ছড়িয়ে সন্ধ্যা নামলো। বিএসএফ লোকটা বেশ আগেই নেমে গেছে। ব্যাটার বাড়ি এলাহাবাদে। ট্রেন এখন অনেকটায় ফাঁকা। এটি প্রায় দু’ঘন্টা লেটে চলছে। হতেই পারে। এতো লম্বা একটা জার্নিতে দু’ঘন্টা লেট কিছুই না। আর এই ট্রেন জার্নি আমার কাছে একেবারেই বিরক্তিকর মনে হয়নি। আমাদের দেশে এতো লম্বা ট্রেন জার্নি নেই বলে অনেকে ভারতের দূরপাল্লার ট্রেনে উঠে অধৈর্য হয়ে পড়ে। তবে আমার কাছে ব্যাপারটি বেশ উপভোগ্যই মনে হয়েছে।

রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে দিলাম। এবার আমি ভেজ খানার অর্ডার দিয়েছি। ভেজ খাবারে ডিমের বদলে পনির রান্না করা থাকবে। তবে সুখবরটা পেলাম এসময়। সেতু আর নিয়ন এসে জানালো যে আমাকে তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। কথাটা শুধরে নিয়ে আবার বললো যে আমার ট্যুর প্ল্যানটা তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। তারা আমার সাথে যেতে আগ্রহী। তখন তাহলে এই নিয়েই তারা ফুসুর ফাসুর করছিলো।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেতু আর নিয়নের ট্রেনের টিকিট দিল্লী পর্যন্ত। দিল্লী ছাড়িয়ে কালকা যাবার জন্য তারা এখন কি করতে পারে? তদেরকে বললাম টিটির সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু টিটিগুলো সেতুদের কোন পরামর্শ দিতে পারলো না। কারণ এখনকার টিটিগুলো দিল্লী স্টেশনে নেমে যাবে, আর দিল্লী স্টেশন থেকে সব জনবল বদল হয়ে নতুন কর্মচারী উঠবে। আমরা বেশ চিন্তায় পড়লাম। সেসময় শিভেন্দু আমাদের বললো যে দিল্লী থেকে নতুন যে টিটি উঠবে তাকে টাকা দিলে সে জরিমানা কেটে রেখে দিল্লী থেকে কালকা পর্যন্ত নতুন টিকিট দিয়ে দেবে। তার এই পরামর্শ শুনে আমরা মোটামুটি আশ্বস্ত হলাম।

দিল্লীতে ট্রেন পৌছানোর সঠিক সময় হচ্ছে রাত পৌনে ন’টা । কিন্তু সেই ট্রেন গিয়ে পৌছালো গিয়ে রাত এগারোটার পর। কালকা মেইল পুরানো দিল্লী স্টেশনে থামে। এখানে প্রায় ঘন্টাখানেকের বিরতি। দিল্লীর যাত্রীরা সব নেমে গেল। সেতু আর নিয়নও নামলো, যদি কোন টিকিটের ব্যাবস্থা করা যায় এই ভেবে। আমি তাদের মালপত্র পাহারা দিতে লাগলাম। নতুন যাত্রী উঠলো সেতু আর নিয়নের সিটে।

সময় পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেতু আর নিয়নের দেখা নেই। শেষ পর্যন্ত আমি প্ল্যাটফর্মে নামলাম। দেখি তারা দুজনে ফটোসেশন আর সেলফি তোলায় ব্যাস্ত। তো আমি তাদেরকে বলতে গেলাম যে তাদের ব্যাগগুলো একসাথে করে আমার ব্যাগের সাথে তালা মেরে রাখবো কিনা। এ প্রস্তাব দিতেই তারা কেমন যেন আমার উপর রেগে উঠলো।

কিছুই বুঝলাম না! আমারো হঠাৎ মাথা গরম হয়ে গেল। কারো সাথে মুখ কালাকালি করবো না বলেই খরচ বেশী হলেও আমি একা একা ট্যুর করি। তো একা একা ট্যুরে এসেও দেখি এসব যন্ত্রণা থেকে নিস্তার নেই। চলে এলাম সেখান থেকে। শুয়ে পড়লাম আমার সিটে।

রাত বারোটার পর। ২১শে সেপ্টেম্বর’১০১৫

ট্রেন ছাড়লে সেতু আর নিয়ন দৌড়ে এসে ট্রেনে উঠলো। তারা দুজনে ফাঁকা সিটটা দখল করে বসলো। কিন্তু রাতে যেহেতু মাঝখানের সিটে যাত্রী শুয়ে আছে এজন্য নিচের সিটে বসা যায়না। তবুও তারা দুজনে কোচড়া মোচড়া হয়ে বসে রইলো। আমি ঘুমিয়ে আছি ভেবে নিয়ন আমার বিরুদ্ধে বিষেদ্বাগার শুরু করলো। আমার নাকি কমনসেন্স নেই, এটা করা নাকি আমার উচিৎ হয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘুমের ভান করে চুপচাপ শুনতে লাগলাম। এসব শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি টের পায়নি।

ঘুম ভাঙলো রাত আড়াইটার দিকে। জেগে দেখি সেতু সিটে ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু নিয়ন এককোণে খুব কষ্ট করে কোন রকমে বসে আছে। দেখে খুব মায়া হলো। দুপক্ষের মনমালিন্য হলে মিটমাট করার জন্য কাউকে তো ছাড় দিতেই হবে। ছাড়টা আমিই দিলাম। আমার সিটটা ছেড়ে দিলাম নিয়নকে। একটা ধন্যবাদ দিয়ে আমার জায়গায় শুয়ে পড়লো নিয়ন। আর শোবার সাথে সাথে গভীর ঘুম।

নিয়নতো নাহয় আমার জায়গায় ঘুমালো কিন্তু আমি এখন কি করি? একবার বগির এপাশের বাথরুমে যায়, আরেকবার ওপাশের বাথরুমে। রাত্রে ট্রেনের দরজা আটকানো থাকে বলে দরজায় দাঁড়ানো যায় না। এইসব ট্রেনে টিকিট ছাড়া যাত্রী উঠলে তার খবর আছে। রাতে পুলিশ বারবার ট্রেনের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে।

যেই পুলিস আসছে আমি তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে বোতল বের করে পানি খাবার ভান করছি। আমার মুখে টর্চ মেরে পুলিশ আমাকে নিরীক্ষণ করছে। খুবই যন্ত্রণায় আছি। এদিকে ঘুমে শরীর ভেঙে আসছে। আমি রাত জাগতে পারি না। খুবই ছটফট করছি। এভাবে চারঘন্টা কাটলো। ক্লান্তিতে আমি পুরাই অস্থির।তবে আল্লাহর রহমতে কোন টিকিট চেকার আসেনি। আসলে সেতু আর নিয়নের কপাল খারাপ ছিলো।

আমার পুরো রাতের ক্লান্তি দূর করে ভোরে সূর্য উঠলো। চলন্ত ট্রেন থেকে দিনের জন্ম নেবার দৃশ্য সবসময়ই অসাধারণ। ভোর সাড়ে ছ’টার দিকে ট্রেন পাঞ্জাবের রাজধানী চন্ডিগড় এসে থামলো। এটি নাকি স্বাধীন ভারতের প্রথম সবচেয়ে পরিকল্পিত নগর। ট্রেন এখানে আধাঘন্টার বেশি সময় থামে। বেশিরভাগ যাত্রী এখানে নেমে গেল। শিভেন্দু তার দলবল সহ এখানে নামলো। এখান থেকে তারা গাড়িতে করে ধর্মশালা যাবে। সিমলা বা মানালি যেতে হলে চন্ডিগড় থেকে বাস বা জীপে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজ্বনক।

চন্ডিগড় স্টেশনটা খুব সুন্দর। সবুজ গাছপালা অনেক বেশি। ট্রেন থেকে নেমে বেশ কিছুদূর হাঁটাহাঁটি করলাম। স্টেশন থেকে যতোটা দূর দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে শহরটা সত্যিই খুব সুন্দর। এমনকি স্টেশন ভবনটিও অনেক দৃষ্টিনন্দন।

সাতটার পরপরই আবার ট্রেন ছাড়লো। এরপরের স্টেশনই কালকা। চণ্ডীগড় থেকেই ছোট ছোট পাহাড় শুরু হয়েছে। দুপাশের দৃশ্য এতো সুন্দর যে চোখ ফেরানো দায়। মাঝে মাঝে কিছু কলকারখানা চোখে পড়ছে। এসবকে পাশ কাটিয়ে ট্রেনটি পাহাড়ি পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছে। আজকের কালকা মেইল প্রায় চার ঘন্টা লেট। নামার জন্য অস্থির হয়ে গেছি। অবশেষে প্রায় সাড়ে আটটার দিকে ৩৮ ঘন্টা জার্নি শেষে এসে পৌছালাম আকাঙ্খিত কালকা স্টেশনে।

কালকা স্টেশন

খরচঃ

১। চা ( রামপেয়ারি চায়ের তিনজনের বিল আমি দিয়েছিলাম ) =৩০ রুপি
২। দুপুরের খাওয়া=১৩০ রুপি
৩। রাতের খাওয়া=১২০ রুপি

মোট = ২৮০ রুপি

১০০ টাকায় ৮২ রুপি হিসাবে এই পর্বের মোট খরচ =৩৪২ টাকা।

পরের পর্ব

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।