নরসিংদী থেকে ডে ট্রিপে সোনাংপেডেং

যুক্ত করা হয়েছে

যতবারই সিলেটের জাফলং গিয়েছি, ততবারই পিয়াইন নদীর তীরে বাংলাদেশ-ভারত সিমান্তে দাড়িঁয়ে ভাবতাম ওইপাড়ে যদি যেতে পারতাম। বিশেষ করে বেশি ইচ্ছে হতো ডাউকির ওই ব্রিজটায় দাড়িঁয়ে বাংলাদেশকে দেখতে। এবার সেই স্বপ্নটাকে পূরন করার মনস্থির করি। প্ল্যান করি একদিনের একটা বাজেট ট্যুরের যার মাধ্যমে সোনাংপেডেং (Shnongpdeng) এর উমংগট নদী এবং ডাউকির আসে পাশে ঘুরে আসবো। আমরা দুইজন ছিলাম। আমি এবং আমার বন্ধু সাগর। একদম সীমিত বাজেটে ঘুরে আসতে চেয়েছিলাম, করেছিও তাই। খরচের তালিকাটা একদম শেষে দিলাম।

রুট প্ল্যান

নরসিংদী – সিলেট – তামাবিল – ডাউকি – সোনাংপেডেং – ডাউকি ব্রিজ – তামাবিল – সিলেট – নরসিংদী

সোনাংপেডেং, মেঘালয়
সোনাংপেডেং এর স্বচ্ছ পানিতে ভাসমান নৌকা

ভিসা করা ছিলো আমাদের অনেকদিন আগেই। প্ল্যান অনুযায়ী ১৫-০১-২০১৯ তারিখ রাতে নরসিংদী থেকে ২২৫ টাকায় সিলেটের টিকেট করে রাত ১টায় যাত্রা শুরু করি। ভোর ৫টার দিকে এসে পৌছাই সিলেট বাসস্ট্যান্ড। ৮০ টাকায় সিএনজি নিয়ে চলে আসি নাইয়রপুল পয়েন্টে। এখান থেকেই তামাবিলের বাস ছেড়ে যায়। সকাল ৬ টার প্রথম ট্রিপের বাসে করে রওনা হই তামাবিলের উদ্দেশ্যে, ভাড়া নেয় ৬০ টাকা জনপ্রতি।

তামাবিল পৌছাই ৮ টার দিকে। লোকাল বাস হওয়ায় সময় একটু বেশি লেগে যায় বর্ডারে আসতে। তামাবিল নেমে অল্প একটু হাটলেই চেকপোস্ট। বাম পাশে কাস্টম অফিস এবং বাম পাশে ইমিগ্রেশন অফিস। কাস্টমসে গিয়ে জানতে পারলাম ৯ টায় বর্ডার খুলবে। ৪০ টাকায় নাস্তা সেরে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন নয়টা বাজে।

সোনাংপেডেং, মেঘালয়

ঠিক ৯ টায় কাস্টমসে গেলাম। আমরা ট্রাভেল ট্যাক্স আগে পরিশোধ করে যাই নি। আগের বার যখন বুড়িমারি ও আখাউড়া বর্ডার দিয়ে ভারত প্রবেশ করেছিলাম তখন বর্ডারেই ভ্রমন কর দিয়েছিলাম। কাস্টমসে ট্যাক্স নিয়ে ঝামেলায় শুরু করে। ৫০০ টাকার ট্যাক্স ৭০০ দিতে হবে। তাদের ভাষ্য হলো, তারা সিলেটে লোক পাঠিয়ে ট্যাক্স জমা দেয় তাই তাদের বেশি দিতে হবে, না হয় আমাদের সিলেটে গিয়ে দিয়ে আসতে হবে। পরে ৬৫০ টাকায় রফাদফা হয়। আগে থেকে দিয়ে গেলে এই বেশি টাকাটা লাগতো না।

কাস্টম ক্লিয়ারেন্স নিয়ে ইমিগ্রেশন করে ঢুকে পরি ভারত অংশে। সামান্য হেটে ডাউকি ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ করে যখন বের হই তখন সাড়ে ১০ টার মত বেজে যায়। আমরা যেদিন যাই সেদিন বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য শত শত পাথর বোঝাই ট্রাক অপেক্ষমান ছিলো যার কারনে পুরো রাস্তা ব্লক ছিলো। তাই হেটেই আমাদের ডাউকি বাজার যেতে হয় এবং সময় লাগে ২০ মিনিটের মত।

ডাউকিতে কোন মানি এক্সচেঞ্জ নেই তাই ডলার ভাঙ্গানো যায় না। ডাউকি বাজারের স্থানীয় দোকান থেকে টাকা রুপিতে পরিবর্তন করি। রেট পেয়েছিলাম ১০০ টাকায় ৮১ টাকা।

সোনাংপেডেং, মেঘালয়
সোনাংপেডেং সাসপেনশন ব্রিজ

ডাউকি বাজার থেকে সোনেংপেডেং যাওয়ার জন্য টাটা সুমো ঠিক করি ২৫০ রুপিতে।তারা ৩০০/৪০০ ভাড়া চায়। গাড়ী পাহাড়ী রাস্তা বেয়ে চলতে থাকে সোনেংপেডেং এর দিকে। জ্যামের কারনে পৌছাতে প্রায় ৫০ মিনিট লাগে। গ্রামের প্রবেশদ্বারে প্রতি গাড়ী ৩০ রুপি দিতে টুরিস্টদের জন্য।

আমরা ১২ টার দিকে উমংগট নদীর তীরে সুন্দর গ্রাম সোনাংপেডেং এ নামি। গাড়ী থেকে নেমে আমরা সোজা চলে যাই উমংগট নদীর উপর নির্মিত সাসপেনশন ব্রিজে। দুই পাহাড়ের মধ্যে লোহার ক্যাবল দিয়ে তৈরী ঝুলন্ত ব্রিজ থেকে নদীতে ভাসমান নৌকা গুলোকে মনে হচ্ছিলো যেন শুন্যে ভাসছে। নদীর পানি এতোটাই স্বচ্ছ যে নদীর তলদেশের প্রত্যােকটি পাথর দেখা যাচ্ছিলো। ব্রিজে কিছুক্ষন থেকে আমরা নেমে যাই নদীর তীরে। ৫০ রুপিতে লাইফ জ্যাকেট ভাড়া নিয়ে নদীতে নামি সুইমিং করতে। উমংগট নদীর স্বচ্ছ জলে নেমে টের পাই যে পানি বরফ থেকে একটু কম ঠান্ডা। ঠান্ডা পানির কারনে বেশিক্ষন নদীতে থাকতে পারিনি।

সোনাংপেডেং, মেঘালয়
সোনাংপেডেং এর ঊমংগট নদীতে গোসল

নদীতে নৌকা ও কায়াকিং বোট পাওয়া যায় ৫০০ রুপিতে। নদীর তীরে ক্যাম্পিং করার জন্যও অনেক তাবু ভাড়ায় পাওয়া যায়। দুই জনের জন্য প্রতিটি তাবুর ভাড়া নেয় প্রতিরাত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। অনেক হোমস্টেও আছে রাত্রি যাপনের জন্য।

যেহেতু আমরা ডে ট্রিপে এসেছি তাই এই দিকে বেশি নজর দেইনি। বিকাল ৩ টার দিকে আমরা সোনাংপেডেংকে বিদায় জানিয়ে এবার ডাউকি ব্রিজ যাওয়ার জন্য গাড়ী রিজার্ভ করি ৩০০ রুপিতে। ২৫ মিনিটেই পৌছে যাই ডাউকি ব্রিজে। এখান থেকে জাফলং দেখা যায়। পিয়াইন নদীর ভারত অংশ দেখে আমাদের পিয়াইনের সাথে তুলনা করে মনটা অনেক খারাপ হয়ে যায়। আমাদের অংশটা পাথর তুলে ধ্বংশ করে ফেলা হয়েছে অথচ ১০০ মিটার দূরের ভারতের নদীটা কতো সুন্দর।

এবার আমাদের ফেরার পালা কারন আমাদের এক দিনের সফর এখানেই শেষ করতে হবে। ৬ টার পর ইমিগ্রেশন বন্ধ হয়ে যায়। আবারো হেটেই রওনা হই ইমিগ্রেশন পর্যন্ত। সব কিছু শেষ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করি ৫ টায়। এখানের কাজও দ্রুতই হয়ে যায়। আমরা দুপুরের খাবার খাইনি কারন সেখানকার খাবার আমাদের ভালো লাগেনি। কেক, বিস্কুট আর পানি খেয়েই থেকেছি। বাংলাদেশে প্রবেশ করে দ্রুত তামাবিল রোডে চলে আসি সিলেটের বাস ধরতে কারন আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো সিলেট পৌছে পানসিতে খাবো।
বাসও পেয়ে যাই সাথে সাথে। সিলেট পৌছাই সাড়ে ৭ টার দিকে। বাস থেকে চলে যাই পানসিতে। খাওয়া শেষ করে কদমতলী বাস টার্মিনাল থেকে ৩০০ টাকায় নরসিংদীর টিকেট করি। রাত ৯ টায় বাস ছাড়ে। সাড়ে ১২ টায় নরসিংদী পৌছে যাই এবং আমাদের সংক্ষিপ্ত ট্যুরের সমাপ্ত হয়।

ডাউকি, মেঘালয়
ডাউকি ব্রিজ থেকে

খরচ সমূহ জনপ্রতি

  • নরসিংদী-সিলেট-নরসিংদী ২২৫+৩০০=৫২৫ 
  • সিএনজি ৮০+৮০÷২=৮০
  • সিলেট-তামাবিল-সিলেট ৬০+৬০=১২০
  • নাস্তা =৪০
  • ট্রাভেল টেক্স=৬৫০
  • ডাউকি-সোনেংপেডেং-ডাউকি ২৫০+৩০+৩০০÷২৯০*১.২৪=৩৬০
  • লাইফ জ্যাকেট ৫০*১.২৪=৬২
  • হালকা খাবার ৫০
  • রিক্সা ভাড়া ৩০
  • রাতের খাবার ১৬০
  • অন্যান্য ১৫০

সর্বমোট খরচ – ২২২৭ টাকা

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।