কুর্গ ভ্রমণ

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

‘অসম্ভব, কিছুতেই দেওয়া যাবে না! আপনারা পাগল হয়েছেন!’ – কন্নড় টানে কিছুটা হিন্দি আর কিছুটা ইংরেজি মিশিয়ে ম্যানেজারের প্রায় আতঙ্কে ভরা গলা শুনে আমরাও দমে গেলাম। কী এমন হাতি ঘোড়া চেয়ে বসেছি বুঝতে পারলাম না যে সেটা দেওয়া এমনই অসম্ভব ব্যাপার! আমরা যে রুমগুলোয় ছিলাম তার থেকে ওপরের দিকে একটা ঝর্ণা, আর ঝর্ণার পাশে বেশ কিছু বাহারি নামের কটেজ মত ছিল, ওগুলোতেই থাকতে চেয়েছিলাম আমরা পাঁচজন মিলে। তাতেই এত ভয় পেয়ে গেল কে জানে!

আসলে বুকিং আমাদের ওগুলোতে ছিল না, ছিল নিচের দিকের ঘরগুলোতেই, কিন্তু হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে জঙ্গলের এমন বন্য সুন্দর রূপ দেখে আমরা ভেবেছিলাম থাকতে হলে একদম গভীর জঙ্গল যেখানে সামনে থেকে দেখা যাবে, সেখানেই থাকব। কাজেই ওই কটেজগুলোর জন্য আমাদের হোটেলের ম্যানেজারকে ধরলাম। তাতেই ম্যানেজারের ওরকম অভিব্যক্তি।

কুর্গ

গতকাল ব্যাঙ্গালোর থেকে সন্ধ্যেবেলা রওয়ানা দিয়েছিলাম আমরা পাচজন মিলে ইন্ডিয়ান স্কটল্যাণ্ড কুর্গের (Coorg) উদ্দেশ্যে। সারা রাত বাস জার্নি করে ভোর বেলা পৌঁছেছিলাম মাদিকারিতে। সেখান থেকে আবার গাড়িতে পাহাড়ের চড়াই বেয়ে অসংখ্য বাঁক ঘুরে এসে পৌঁছালাম কুর্গে। পথে পড়েছিল নাম না জানা অসংখ্য গাছ। কিছুটা ওপরে উঠতেই নিচের দিকে দেখতে পেয়েছিলাম ফিতের মত সরু রাস্তা। বাঁক ঘুরে ঘুরে এসে পৌঁছেছিলাম আমাদের গন্তব্যে। যে হোটেল বুক করা ছিল সেখানে চেক ইন করে ফ্রেশ হয়ে পেটে কিছু ভরে নিয়ে বেরোলাম হোটেলের বাইরে। হোটেলটা অনেকটা রিসর্টের মত। বিশাল এলাকা জুড়ে এর পরিধি। পাশেই কফি প্ল্যান্টেশন। ধাপে ধাপে কফি গাছ নেমে গেছে আর কফির গন্ধে ম ম করছে চারিদিক। কফি ফুল দেখতে একদম বেল ফুলের মত। ওরকমই পুরো থোকা থোকা হয়ে থাকে আর কফির যে বীজ সেটা একদম গুলির মত দেখতে হয়। এগুলোও থোকা থোকা হয়। হোটেলের রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট করার সময়েই আমরা একট জলের কলকল আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। অনেকটা বৃষ্টি পড়ার মত। বুঝলাম আশেপাশেই কোথাও ঝর্ণা রয়েছে। তখনও তার রূপ যে এত ভয়ঙ্কর সুন্দর হবে সেটা বুঝতে পারি নি। বুঝলাম যখন হোটেল থেকে বাইরে বেরোলাম। হোটেলটা একটা পাহাড়ি ঢালের মধ্যে। যে ঘরগুলো আমাদের বুক করা ছিল সামনে দিয়ে সিঁড়ির ধাপ উঠে গেছে। মোটামুটি কুড়িটা ধাপ ওঠার পর হোটেলের রেস্টুরেন্ট, যেখানে আমরা ব্রেকফাস্ট করেছ। এবার সেই ধাপটাই আরো উঠে গেছে পাহাড়ের ওপর জঙ্গলের মধ্যে। সেখানে অবশ্য কোনো সিঁড়ি নেই। অনেকটা ওঠার পর ঝর্ণাটা পাওয়া যাবে। ওই চড়াই এর ধাপের পাশ দিয়েই ঝর্ণাটা বয়ে গেছে। জলের শব্দ শুনে শুনে আমরা ঝর্ণার কাছে চলে গিয়ে ওই কটেজগুলো দেখতে পেয়েছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ ঝর্ণার কাছে কাটিয়ে আবার আমরা নেমে এলাম হোটেলে। ইতিমধ্যে দুপুরবেলা মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় হয়ে গেছে। দুপুর বেলা খাওয়ার পরই ম্যানেজারকে গিয়ে ধরলাম ওই কটেজগুলোর জন্য। কিভাবে কোথা থেকে বুকিং করতে হয় সেসব জানতে চাইলাম। তখনই ম্যানেজারের ওই আর্তনাদ।

কোন মহাভারত অশুদ্ধ করেছিলাম জানা নেই, তবে কারণ জিজ্ঞাসা করাতে ম্যানেজার যা বলল তাতে চক্ষু চড়কগাছ। ওই কটেজগুলো শুধুমাত্র যদি খুব বড় কোনো গ্রুপ আসে তাহলেই থাকতে দেওয়া হয়। তাও অনেক বিধি নিষেধের মধ্যে থেকে। এর কারণ হচ্ছে মাঝেমাঝেই ওই ঝর্ণার জলে বাঘ জল খেতে আসে। রাতের বেলা চারখানা বড় বড় গ্রে হাউন্ড ছাড়া থাকে ওই কটেজে যাতে বাঘ যদি ঢুকেও পড়ে প্রাথমিক ভাবে আটকানোর জন্য। আমাদের পাঁচজন মেয়েকে কিছুতেই একা ওখানে থাকতে দেওয়া যাবে না।

কুর্গ

ভাবলাম বড় গ্রুপে এলে হয়ত একটা অভিজ্ঞতা অর্জন করা যেত। আসি নি যখন তখন আর ভেবে লাভ নেই! দুপুরের খাবারের পর বেরোলাম আমরা স্থানীয় আদিবাসী গ্রামে। সেখানকার কিছু লোকজনের সাথে কথা হল। তাদের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামের গল্প শুনলাম।একরকমের গাছ দেখলাম যাতে হাতি শুর ঘষলে মত্ত হয়ে যায় এবং সঙ্গী বা সঙ্গিনীর খোঁজ করে। ওরাই দেখিয়ে দিল সেই গাছ। তারপর বাঘেদের গল্প বলল।বাঘ বুড়ো হয়ে গেলে প্রকৃতির নিয়মে তখন জোয়ান অন্য বাঘকে তার এলাকা ছেড়ে দিতে হয়। তখনই বুড়ো বাঘ হয়ে যায় মানুষখেকো নয়ত মানুষের পোষা জন্তু শিকার করে জীবনধারণ করে। কদিন আগেই ওদের এক পোষা কুকুরকে ধরে নিয়ে গেছে এরকমই কোনো বুড়ো বাঘ। জঙ্গলের নিয়ম বড় অদ্ভুত! যদিও এখন ওরা জঙ্গল থেকে অনেক নিচে রয়েছে। এর কারণ জেনেছিলাম পরে।

গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যে হয়ে এসেছিল। আমরাও ফিরে চললাম হোটেলের দিকে। রাতের ডিনারে ছিল রুটি আর চিকেন।খেতে খেতে যে ওয়েটার ছেলেটা সার্ভ করছিল সে আরেকটা হাড় হিম করা অভিজ্ঞতার গল্প শোনাল। ওয়েটার ছেলেটা সেখানকার স্থানীয় ছেলে। সরকার থেকে জঙ্গলের মানুষদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের জঙ্গলে থাকা বন্ধ করে দিয়েছে। এমনিতে জঙ্গলের ওরা আহার্য গ্রহণ থেকে চিকিৎসা সমস্তই কিছুতেই জঙ্গলের ওপর নির্ভরশীল। মাথা ব্যাথা হলে আছে ইউক্যালিপটাস গাছের তেল, রাতে ঘুম না এলে আছে বিশেষ কাছের একটা পাতা, প্রেশার বাড়লে রয়েছে আরেকটা বিশেষ গাছের পাতার রস, এমনকি ওরা সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্যও বাইরের কারো ওপর নির্ভরশীল নয়। তো সরকারের সেই সিদ্ধান্তে তারা বেশ অখুশিই ছিল। কিন্তু কিছু করার নেই। তো ওরা যখন জঙ্গলে ছিল সেরকমই একদিন ছেলেটা বাড়িতে বসে আছে রাতের বেলা, হঠাৎ জানালা দিয়ে দেখে গাছের ওপর দু খানা চোখ জ্বলছে। তাকিয়ে আছে ওদেরই ঘরের দিকে। বাইরে কুচকুচে অন্ধকার তখন। মাঝেমাঝে হাওয়ায় পাতা ওড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, আর সেই অন্ধকারের সাথে তাল মিলিয়ে জন্তুটার গায়ের রঙও মিশে রয়েছে। এমনিতে ওরা সব জন্তুই মোটামুটি চেনে, একেও চিনতে পারল, কিন্তু এনার দেখা খুব একটা পাওয়া যায় না। আমরা তখন অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় মশগুল।
জিজ্ঞাসা করলাম কী ছিল ওটা?
বলল ব্ল্যাক প্যান্থার।

কুর্গ

ভারতবর্ষে খুব কম পাওয়া গেলেও সাধারণত দক্ষিণের ট্রপিকাল রেন ফরেস্ট আর আসামে এই জন্তুর দেখা মেলে। ছেলেটা খুব আস্তে করে উঠে জানালাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। তা নাহলে যে কোনো সময়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতো।

রাত নামার সাথে সাথেই জঙ্গলের রূপও পালটে যাচ্ছিল। রাতের খাবার খেয়ে ঘরে ফেরার পথে এক ঝলক সেই ভয়াল জঙ্গলের অতি ভয়াল রূপ প্রত্যক্ষ করলাম। চাঁদের আলোয় রহস্যময় প্রকৃতি যেন তার অপার রহস্য উজার করে দিয়েছে আমাদের সামনে। কুড়িয়ে নেওয়ার অপেক্ষা শুধু। কোন একটা ভাবের ঘোরে ওইটুকু রাস্তা আমরা অতিক্রম করে ফিরলাম নিজেদের ঘরে।

পরদিন আমাদের গন্তব্য প্রথমে তলাকাবেরি। কাবেরি নদীর উৎসস্থল। দক্ষিণে কাবেরি নদী খুব পবিত্র। উত্তরের গঙ্গা নদীর মতই। কাজেই কাবেরির উৎসস্থলও পবিত্র হবে বলাই বাহুল্য। তলাকাবেরি দেখে আমরা এগোলাম আরো আট কিমি দূরে ভাগামণ্ডলার দিকে। এখানে পুজো দিয়ে লাঞ্চ করে গেলাম অ্যাবি ফলস দেখতে। কাবেরির গতিপথে এই ফলস এক অপরূপ মনোরম জায়গা। চারিদিকে কফি গাছের মাঝে এই ফলস। এর পর রাজা’স সিট পয়েন্ট। আগেকার দিনে রাজা রাজরারা এই পয়েন্টে বসে সূর্যাস্ত দেখতেন। বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের আলোতে পাহাড়ি জঙ্গলের সে অন্য আরেক রূপ।

অ্যাবি ফলস, কুর্গ
অ্যাবি ফলস

কুর্গ জায়গাটা হোমমেড চকলেট আর মশলার জন্য বিখ্যাত। স্থানীয় বাজার থেকে বাক্স ভর্তি চকলেট আর মশলা কিনে রওনা দিলাম হোটেলের পথে।সন্ধ্যে হয়ে এসেছে তখন। ফেরার সময়ে ঘটঘুটে অন্ধকার পথে আমাদের গাড়ি জঙ্গল কেটে ছুটে চলেছে। যেটুকু গাড়ির হেডলাইট পড়ছে, শুধু সেটুকুই আলোকিত, বাকি সব অরণ্যের আদিম অন্ধকারে ঢাকা। আন্দাজে বুঝতে পারছি দু পাশের লম্বা লম্বা গাছ আমাদের গাড়ির সাথে সাথে ছুটে চলেছে।ছুটছে তো ছুটছেই।

হোটেলে পৌছে রাতের খাবার খেয়ে সোজা ঘুম। প্রত্যেকেই খুব ক্লান্ত ছিলাম সারাদিনের ঘোরাঘুরির ফলে, কাজেই বিছানায় পড়তেই আর ঘুম আসতে দেরি করে নি। পরদিন সকালে উঠে আমাদের সেদিনের গন্তব্য নিসর্গধামার। এখানে মাহুতরা টিকিট কেটে হাতিকে স্নান করায়। সেই হাতির স্নান আমরা দেখতে যাব। ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম নিসর্গধামারের উদ্দেশ্যে। ওখানে আরেকটা চমক ছিল আমাদের জন্য। হাতির গা ঘষে ঘষে মাহুতদের স্নান করানো দেখে ওই স্রোতের জলে আমরা রিভার র‍্যাফটিং করলাম। বন্য পাহাড়ি নদী তার গতিপথে এগিয়ে চলেছে তীব্র বেগে। সেই নদীতেই রিভার র‍্যাফটিং। এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফিরলাম। ফেরার পথে নামড্রোলিং বলে একটা জায়গায় একটা বৌদ্ধ মনাস্ট্রি রয়েছে।মনাস্ট্রি দেখে হোটেলে ফিরেই বেরিয়ে পড়তে হল মাদিকারির উদ্দেশ্যে। স্কটল্যান্ডকে বিদায় জানিয়ে মাদিকারি থেকে পাঁচ ঘন্টার জার্নি করে ফিরলাম ব্যাঙ্গালোর।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।