কুর্গ – কফি কুয়াশার দেশে

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

তখন বিকেল শেষের ডাক দিচ্ছে। ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রায় ছয় ঘন্টার সফর শেষে ঢুকে পড়েছি কুর্গ, কফি সাম্রাজ্য, কর্ণাটকের এক প্রান্তে। বেশ কিছুক্ষণ চক্কর কেটে অবশেষে মাথা গোঁজার ঠাঁই। একটা গেস্ট হাউস, আগে থেকেই এক সিনিয়র বুক করে দিয়েছিল। প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ। বাইরে থেকে শুধু না, পড়ন্ত বিকেলের শেষ আলো গেস্ট হাউসের জানলা দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল তখন তা এক পাতা কবিতা। গেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার জানালেন ১৮৬৯ তৈরি এই বাড়ি।

কুর্গ

জিনিস পত্র রেখেই চলে গেলাম শেষ বিকেলের সৌন্দর্য দেখতে, বিশাল ভ্যালিতে সন্ধ্যে নামল চুপ করে। হালকা শীতের চাদর উপস্থিত। কুর্গ কুজিনের নাম শুনেছিলাম, স্থানীয় খাবার পাওয়া যায়। রাতের খাবার সারার সাথে আরেকটা কাজ করতে হল, কুর্গের লোকাল ওয়াইন। কী নেব বুঝতেই পারছি না, বেশ কয়েকটা টেস্ট করে থামলাম ড্রাই ফ্রুট ওয়াইনে।

এখানে মোলায়েম রাত নামে, কোলাহল নেই। ভোরের কষ্টে ভাঙা ঘুম এবার ডাক দিচ্ছে। ওয়াইনের স্বাদ মিলিয়ে যাবার আগে ঘুম নামবে হয়ত। ভোরে উঠতে হবে মণ্ডলপট্টি (mandalpatti) যাবার জন্য ।

কুর্গ

আমাদের ভোরবেলা বেরোতে হল মন্ডলপট্টি যাবার জন্য। এই কদিন যে মূর্তির সাদা ডিজায়ার সঙ্গে ছিল তাতে মন্ডলপট্টি সম্ভব না, অনেকটা নাকি পাথুরে রাস্তা, তাই আগের রাতে একটা জিপের বন্দোবস্ত করা হল।

কুরগে এসে তেমন ঠান্ডা পাইনি। অকুতোভয় তাই গায়ে টি শার্টের উপর একটা হাফ সোয়েটার পরেই বেরিয়ে পড়েছি। এমনিতেই ভোরে ঘুম ভাঙা আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। তাই কোন রকমে অন্ধকারেই জিপে উঠে পড়লাম। শহর ছাড়তেই কিছুটা ঠান্ডা টের পেলাম। প্রায় আধঘন্টার রাস্তা পেরিয়ে অবশেষে মন্ডলপট্টি।

কি আছে মন্ডলপট্টিতে? একটা টেবিল টপ বলা যেতে পারে। আর চারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত কুয়াশা ঢাকা পাহাড়ের সংসার। আসতে আসতে আলো ফুটছে। আর এদিকে তুমুল ঠান্ডা হওয়া। হাফ সোয়েটার এখানে তুচ্ছ। তবু ওই কুয়াশা ঢাকা সবুজ পাহাড় সব ভুলিয়ে দিল। মোবাইল ক্যামেরাতে থাকল কিছু চেষ্টা, আপাতত এই থাক। মন্ডলপট্টির ওই প্রকৃতির সাম্রাজ্য থাকবে মনের অন্য কোথাও, সব কিছু মোবাইল পারে না।

কুর্গ

মণ্ডলপট্টি থেকে নামার সময় জিপের ড্রাইভার জানাল কাছেই আছে এক ঝর্ণা। কিছু টাকা বেশি পড়বে। রাজি হলাম এবং এক কথায় সঠিক সিদ্ধান্ত। কী অপরূপ এই ঝর্ণা, আর কত মাছ, এই মাছ কেউ ধরে না, পর্যটকরা দেখলাম বিস্কুট খাওয়াচ্ছে, আমরাও তাই করলাম।

ফিরে এসে একটু বিশ্রাম, বেরিয়ে গেলাম কাছেই দুটো দেখার জায়গা নিশ্বর্গধাম আর অ্যাবি ফলস। নিশ্বর্গধাম দেখলে বোঝা যায় পর্যটন নিয়ে এরা কতটা সিরিয়াস, নদীর ধারে বাঁশ বন, সেটাকেই সাজিয়ে পার্ক বানিয়েছে, বোটিং হয় নদীতে। পরের গন্তব্য অ্যাবি ফলস, বেশ জোরালো জলধারা।

কুর্গ

কুর্গের স্থানীয় মশলা বিখ্যাত, আগেই বলেছি কফি, ওয়াইনের কথা। কুর্গ মানেই পাকস্থলীর শপিং। কফির বাগান, স্থানীয় মশলার তো বেশ নাম। আগে থেকেই জেনে এসেছি। জানতাম লোকাল ফিল্টার কফি, হোমমেড চকলেট এসব জাস্ট মিস করা অসম্ভব। সাথে জুটল আককি রুটি আর স্থানীয় মশলা দিয়ে তৈরি মাংসের, বিশেষ করে দেশি মুরগির নানান রান্না। দিনে কত বার কফি পেটে গেছে বলতে পারব না, যেমনি কত রকমের চকলেট খেয়েছি তারও হিসেব নেই।

ফেরার পথে দেখলাম গোল্ডেন টেম্পল, বিশাল বৌদ্ধ মন্দির। কী অপূর্ব, আর কী পরিষ্কার।

কুর্গের পরিবেশ বেশ বেশ পরিষ্কার। প্লাস্টিক ব্যবহার হয় না। টুরিস্ট স্পট কিন্তু দালালের উৎপাত চোখে পড়েনি। রাস্তায় ভিক্ষুকও নেই আর দোকানের ব্যবহার বেশ বেশ ভাল।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।