আমার চীন ভ্রমণ

যুক্ত করা হয়েছে
লেখক একটি আর্ন্তজাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। ভ্রমন কাল : ২০০৫
লেখক পরিচিতি

বিগত একদশকে ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমনের সুযোগ পেয়েছি তারমধ্যে চীন ভ্রমনের অভিজ্ঞতা নানা দিক থেকে বৈচিত্র্যময় ও ঘটনা বহুল। জনসম্পদ, ভুখন্ড ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বর্তমান চীনের অবস্থান বিশ্ব পরিমন্ডলে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বায়নের এ যুগে দেশটি এখনও তার নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ বজায় রেখেছে। রাশিয়াতে কম্যুনিজমের পতন ঘটলেও এখনও চীন তার কম্যুনিজমের পতাকা শক্ত হাতেই ধরে রেখেছেন। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ চীনে বাস করেন। সমগ্র ইউরোপ ভূখন্ডের সমান চীন। চীন পৃথিবীর প্রাচীনতম জনপদের মধ্যে অন্যতম একটি। এসকল নানাদিক থেকে ইতিহাস সমৃদ্ধ এই দেশটি সফরের প্রস্তাব পেয়ে যারপরনায় খুশি হই। আমরা ছয়জনের একটি দল চায়না ইস্টার্ন এয়ারওয়েজে।

১৯ শে অক্টোবর বিকাল ৪টায় ঢাকা থেকে রওয়ানা করি। বিমানে দুই ঘন্টার জার্নি। চীনের কুনমিং বিমান বন্দরে পৌঁছি রাত ৮টায়। ঢাকার সাথে সময়ের ব্যবধান দুই ঘন্টার। কুনমিং (Kunming) এ ছিল আমাদের ১২ ঘন্টার যাত্রা বিরতী। আমাদের গন্তব্যস্থল ঝিয়াং শহরে। পরের দিন সকাল ৮টায় ডোমেষ্টিক ফ্লাইটে আবার দুই ঘন্টার জার্নি করতে হবে। ট্রানজিট যাত্রী হিসেবে এয়ারপোর্ট সংলগ্ন সাইট সিইং হোটেলে আমাদের রাত্রী যাপনের ব্যবস্থা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। কুনমিং এয়ারপোর্টের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রাত নয়টায় সাইট সিইং হোটেলে পেীঁছি। এয়ারপোর্ট থেকেই একটা বিষয় পরিষ্কার হলাম যে, চীনারা ইংরেজী ভাল জানে না তাছাড়া তাদের উচ্চারণ অনেকটা ম্যান্ডারিন প্রভাবিত বলে বুঝতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। হোটেলের রিসিপসনে আরো অনেক বাংগালীর সাথে দেখা হলো। যারা অনেকেই পরদিন সকালে বিভিন্ন এলাকার উদ্দেশে রওয়ানা হবে। আমরা হোটেলে উঠে ফ্রেশ হয়ে কিছু খাওয়ার জন্য নিচে নামলাম তখন একটা সমস্যায় পড়লাম। হোটেল থেকে জানালো – এখানে ডলারে কোন রকম পেমেন্ট করা যাবেনা। এটা শুনে আমরা তাড়াতাড়ি এয়ারপোর্টে ঢুকলাম ডলার চেন্জ করার জন্য। কিন্তু হায় কপাল! ইতোমধ্যে ডলার চেন্জ করার বুথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা খুব ক্ষুধার্থ ছিলাম। এক বোতল পানি কিনে খাব সে উপায়টুকুও পর্যন্ত নেই। কারো কাছে খাবার কিছু আছে কি না খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম আমাদের দলের একমাত্র মেয়ে তারান্নুম নাজের কাছে কিছু বিস্কুট আছে। সবাই মিলে তা খেয়ে কিছুটা ক্ষুধা নিবারণ করলাম। তারপর বড় সমস্যা হলো খাবার পানি নিয়ে। উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকের রুমে চা খাওয়ার জন্য যে পানি ছিল তা ঠান্ডা করে খেয়ে তৃষ্ণা মেটালাম। রাতে খুব ভাল ঘুম হলো না। একে তো নতুন জায়গা তার উপর ভাত না খেয়ে থাকা আমার কাছে অসহ্য ব্যাপার। ভাতে মাছে বাংগালী প্রবাদটির যথার্থতা ঘটনাচক্রে বেশ ভাল করে অনুধাবন করলাম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি করে ছুটলাম এয়ারপোর্টে। ডোমেস্টিক ফ্লাইট বলে লাগেজ বুকিং দিয়ে চেকইন হতে বেশী সময় লাগেনি। চেকইন করার পুর্বে ১৫ মিনিট ওয়েটিং লনে বসে একটা বিষয় চোখে পড়লো – বিমান বন্দরে যারা কাজ করছে তাদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০ জন মহিলা। এমনকি আমাদের সাথে যারা ডোমেস্টিক ফ্লাইটের যাত্রী তাদের অর্ধেকের বেশী হলো মহিলা। বিমান ঠিক ৮টায় টেক-অপ করলো। কুনমিং থেকে ঝিয়াং (Xi’an) দুই ঘন্টার জার্নি। ৩০ মিনিট পর আমাদের ব্রেকফার্স্ট দেওয়া হয়। খুব ক্ষুধার্থ ছিলাম ফলে যা দিল সব এক নিঃশ্বাসে সাবার করে ফেললাম। আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন ফলে বিমান বেশী বেশী বাম্পিং করছিল। এ অবস্থায় আমার খুব ঘুম পায় কিন্তু আমার পাশে বসা সহযাত্রী কুদ্দুছ ভাইয়ের খুব টেনশন বেড়ে যায়। তাই তাকে সংগ দিতে গল্প জুড়ে দিলাম। সকাল দশটায় ঝিয়াং বিমান বন্দরে পৌঁছি। ঝিয়াং হলো সানচী প্রদেশের রাজধানী। মোট ৩২টি প্রদেশ নিয়ে চীন প্রজাতন্ত্র। সানচী প্রদেশের আয়তন বাংলাদেশের চেয়েও বড়। বিমান বন্দরে লাগেজের জন্য আমাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। প্ল্যান চায়না অফিসের একজন প্রতিনিধি আমাদেরকে রিসিভ করার জন্য আগে থেকেই বিমান বন্দরে প্লেকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। বিমান বন্দর থেকে ঝিয়াং শহরের দুরত্ব এক ঘন্টার পথ। রাস্তা খুব প্রশস্ত। আমাদের দেশের হাইওয়ের দিগুণের চাইতেও বেশী। রাস্তার পাশের দালান কোঠা গত এক দেড় দশকের মধ্যেই নির্মিত মনে হলো। অনেক কিছু নির্মানাধীন। উন্নয়নের একটা সুস্পষ্ট ছবি যা চোখে পড়ার মতো। একটা প্রাদেশিক রাজধানী শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেখে বিস্মিত হলাম। ৪০/৫০ তলা উঁচু বিল্ডিং, অনেক ফ্লাইওভার, ট্রাফিক জ্যাম নেই, অনেক ৪/৫ তারকা হোটেল যা আমাদের দেশের মত রাজধানী শহরেও নেই। শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঝিয়াং সিটি ওয়াল। যা সত্যি একটি দেখার মত বিষয়। এর আয়তন ১৩.৯ বর্গ কি:মি:। বাহিরের শ্ত্রুর আক্রমণ থেকে শহর রক্ষার জন্য মিং ডাইনেস্টির যুগে তা নির্মাণ করা হয়। ঝিয়াং সিটির ঠিক মধ্যখানে একটি বেল টাওয়ার আছে। বেল টাওয়ারে বিশাল আয়তনের একটি লোহার তৈরি ঘন্টা আছে। প্রতিদিন সকালে এই ঘন্টা এখনও বাজানো হয়।

সকাল সোয়া ১১টায় আমরা পৌঁছলাম স্পোর্ট হোটেলে যেখানে আমাদের থাকার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। এলাকাটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টার সংলগ্ন। দুপুরের খাবারের জন্য একটি মুসলিম হোটেলে গেলাম। টেবিলে নানান ধরনের খাবার দেওয়া হয় কিন্তু কোনটাই দেখে খাওয়ার ইচ্ছা হলো না। কোনটায় মশলা নেই, কোনটায় লবণ কম, শুধূ সিদ্ধ করা বিভিন্ন ধরনের আইটেম তবে মশলা, লবণ ও বাটা মরিচ আলাদা করে দিয়েছে। কোন চামচ নেই। দুটো করে কাঠি দিল। প্রথমে চেষ্টা করলাম কাঠি দিয়ে খেতে কিন্তু আমাদের কাছে খুব কঠিন মনে হচ্ছিল। লবণ মরিচ মিশিয়ে কোন রকমে যেটা ভাল লাগে খেয়ে নিলাম। আমাদের সাথের নাজ, হাসান ও এমদাদ ভাইয়ের খুব অসুবিধা হচ্ছিল কারণ তারা এই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে এর পুর্বে পড়েনি। তাদের জন্য ডিম সিদ্ধ করিয়ে আনা হলো এবং তারা তাই খেয়ে পরিতৃপ্ত হলো।

বিকালে আমাদের কোন প্রোগ্রাম ছিল না তাই সকলে মিলে একটি সুপারমলে গেলাম উদ্দেশ্য ঘোরাফেরা করা এবং ছোট খাটো দরকারী জিনিষ কেনা। জিনিষের দাম খুব বেশী মনে হলো। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো দর কষাকষি করলে তা অর্ধেকে নেমে আসে। সমস্যা হচ্ছিল দোকানদাররা ইয়েস নো ইংরেজীও বুঝে না। হাতের ইশারা এবং ক্যালকুলেটর দিয়ে দরাদরির কাজটা করছিলাম ফলে তারা খুব মজা পাচ্ছিল। মোটামুটি ভাল শীত অনুভব হচ্ছিল তাই অনেকেই শীতের কাপড় কিনে নিল। সবাই একটি করে ছাতা কিনে নিলাম কারণ অবিরাম গুড়ি গুড়ি বৃািষ্ট হচ্ছিল। দোভাষী আমাদের জানাল আগামী দু’য়েক সপ্তাহ এই অবস্থা চলবে।

পরদিন সকাল সাড়ে নয়টায় চুনপো কাউন্টির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমাদের সাথে যোগ দিল প্ল্যান ফিলিপিনস থেকে আগত নয় সদস্যের আর একটি দল। আমদের উভয় দলের উদ্দেশ্য একই। অর্থাৎ প্ল্যান চায়নার মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম দেখা। ঝিয়াং থেকে চুনপোর দুরত্ব ৮০ কিলোামিটার। পুরোটাই পাহাড়ী এলাকা যা দেখতে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের মত। রাস্তা খুব মসৃণ কিন্তু আঁকাবাঁকা এবং উঁচু-নিচু হওয়ার ফলে গাড়ী খুব সাবধানে ড্রাইভ করতে হয়। পাহাড়ে প্রচুর আপেল বাগান। এলাকটি বেশ অনুন্নত এবং গরীব মনে হলো। অনেক গুহা বাড়ী দেখলাম। পাহাড়ের পাদদেশে গর্ত করে লোকজন বাড়ী বানিয়ে বসবাস করছে। লোকজনকে খুব কষ্ট সহিঞ্চু মনে হলো। শীত এবং গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেও লোকজন কাজ করছে। পাহাড়ের ঢালুতে মাঝে মধ্যে দু-একটা ঝিলের মত দেখলাম কিন্তু পানির রং একেবারে হলুদ যা ব্যবহার অনুপোযোগী। পানির রং হলুদ হওয়ার কারন হলো মাটির রং হলুদাভ এবং কাঁকর মেশানো। বারটায় আমরা চুনপোতে পৌঁছলাম। হোটেলে উঠে দুপুরের খাবার সেরে একটু বিশ্রাম নিলাম। বিকালে চুনপো প্রোগ্রাম ইউনিটের সবার সাথে পরিচিত হই এবং তাঁরা তাদের ইউনিটের কার্যক্রম আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন। যখন তাঁরা তাদের কার্যক্রম উপস্থাপন করছিল তখন একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম যে চীনা ভাষায় কোন বিদেশী শব্দের সংমিশ্রন নেই। আমাদের ভাষায় বিদেশী শব্দ এখন বাংলার মতই ব্যবহার হয় যেমন চেয়ার, টেবিল, ইউনির্ভাসিটি ,আলমারী, হাসপাতাল ইত্যাদি কিন্তু চীনা ভাষায় এরকম একটি শব্দ ও নেই। চীনারা অন্য দেশের নামকেও তাদের মত করে বলে যেমন বাংলাদেশ কে বলে মানজালা

সকালে দু-দলে ভাগ হয়ে বেড়িয়ে পড়ি। আমাদের দলে ছিলাম তিনজন বাংলাদেশী আর চার জন ফিলিপিনো। আমরা প্রথমে একটি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে গেলাম। শিশু বিকাশ কেন্দ্রটি টিচারের বাড়িতেই বসে। টিচার একজন চল্লিশ উর্ধ্ব মহিলা। তার কলেজে পড়ূয়া মেয়ে তাকে সহযোগিতা করছেন। কেন্দ্রের শিশুদের বয়স ৪-৫। অভিভাবকরা শিশুদের সকাল ৮টায় দিয়ে যায় এবং বিকাল ৬টায় নিয়ে যায়। শিশুদের দুপুরের খাবার কেন্দ্রেই ব্যবস্থা করা হয়। বাড়ির উঠোনে খেলাধূলা করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা আছে। খেলাধূলা এবং চিত্ত বিনোদনের সবধরনের আয়োজন এবং উপকরণ আছে। এখানে সরকার কোন রকম সহায়তা করেন না। কমিউনিটির লোকেরা সব কিছুর ব্যবস্থা করেন। কমিউনিটির সব ছেলেমেয়ের জন্য এই ব্যবস্থা নিশ্চিত। ছেলেমেয়ের সংখ্যা তুলনামুলকভাবে কম কারণ গ্রামে একটার বেশী কেউ সন্তান নিতে পারবেন না এটা হলো সরকারী আইন। কেউ এর অন্যথা করলে তাকে দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার জন্য সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয় ফলে কেউ একটার বেশী সন্তান নেয় না। এরপর আমরা একটা প্রাইমারী স্কুলে যাই। প্রাইমারী হলো ১ম শ্রেণী থেকে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত এখানেও স্কুল সময়সূচী সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত। টিচারদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা রেস্টরুম আছে। যাদের বাড়ি দুরে তারা স্কুলেই রাত্রী যাপন করে। ফলে তারা একমাত্র পেশা হিসেবে নিয়েছে শিক্ষকতাকে। পড়াশুনা, খেলাধূলা এবং বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সারাদিন অতিবাহিত হয়। বাচ্চাদের হাতের লেখা খুবই সুন্দর এবং পরিচ্ছন্ন । শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ নিঃসন্দেহে শিশু বান্দব। টিচিং লানিংর পদ্ধতি অংশগ্রহণমূলক এবং সক্রিয়ধর্মী। শিক্ষার্থীদের পারফর্মেন্স ইস্পিত স্তরে আছে এবং টারগেট অনুযায়ী সব কয়টা কমপিটেন্সি অর্জন করতে পারছেন। কোন শিক্ষার্থী ফেল করেনা। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা আছে।

সব ধরনের আধুনিক মানের শিক্ষার আয়োজন বিদ্যালয়ে উপস্থিত। প্রত্যেক শ্রেণীকক্ষে পাঁচজন বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি আছে তাঁরা হলো – কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, লেলিন, মাওসেতুং ও সানইয়াৎ সেন। ইন্টারমেডিয়েট পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক। শিক্ষার সমস্ত খরচ সরকারের কিন্তু পরিচালনার দায়িত্ব কমিউনিটির। স্কুল পরিচালনা কমিটি খুবই সক্রিয়। প্রত্যেক স্কুলেই একটি ৩/৫ বৎসর মেয়াদী স্কুল উন্নয়ন পরিকল্পনা আছে। অভিভাবকরা নিয়মিত বাচ্চাদের অগ্রগতি নিয়ে টিচারদের সাথে মতবিনিময় করেন। স্কুলকে কেন্দ্র করে সামাজিক সমস্ত ক্রিয়া কর্ম আবর্তিত হয়। স্কুল সংলগ্ন গ্রাম উন্নয়ন কমিটির অফিস। গুণগতমানসম্পন্ন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়ে খুব ভাল লাগলো। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ল – বিদ্যা অর্জনের জন্য সুদুর চীন যাও। এখন বুঝতে পারলাম কেন ১৪০০ বছর পূর্বে এ কথা বলেছিলেন।

একটি মাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শে সবাই বিশ্বাসী ফলে এখানে কোন রাজনৈতিক দলাদলী নেই। সকলে দেশের উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন। তারা মনে করেন দেশের উন্নয়ন মানেই নিজেদের উন্নয়ন। দেশপ্রেমবোধ জনগণকে সৎ এবং পরিশ্রমী করেছে ফলে দিন দিন দেশটি উন্নতির চরম শিখরে ধাবিত হচ্ছে। আমরা একটি গ্রামীণ স্ট্যাটিক ক্লিনিক দেখলাম। যেখানে সরকার নিয়োগ প্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়মিত আসেন। প্রাথমিক চিকিৎসার সব ধরনের ওষুধ এবং সরঞ্জাম আছে। জটিল এবং বড়ধরনের অসুস্থ রোগীকে তাৎক্ষনিকভাবে টাউনশিপ অথবা কাউন্টি হসিিপটালে প্রেরণ করা হয়। একটি আশ্রয়ণ প্রকল্প দেখলাম। যারা এখনও পাহাড়ের গুহায় বসবাস করছেন তাদেরকে পুণর্বাসন করার একটি সরকারী প্রকল্প। গুহায় বসবাসরত একটি পরিবারের সাথে কথা বলি। তারা জানাল – তাদের পানির খুব সংকট। কুয়া খুঁড়ে যে পানি পায় তা খুবই অপরিষ্কার। বৃষ্টি হলে তারা পানি সংগ্রহ করে রাখে। পরে এসকল পানি বিশেষ পদ্ধতিতে খাওয়ার উপযোগী করে তা দিয়ে খাবার এবং রান্না-বান্নার কাজ করেন। গ্রামের অনেকেই ২/৩ মাস পরপর গোসল করেন। গ্রামের মানুষ টয়লেট ব্যবহার করেন না। তারা পাহাড়ের ঝোপঝাড়ে মল ত্যাগ করে। পায়খানা ব্যবহারের পর পানি ব্যবহার করার পরিবর্তে ছেঁড়া কাপড় অথবা কাগজ ব্যববহার করে। পানির অভাবে তাদের হাইজিন অভ্যাস ভাল না। বর্তমানে সেনিটেশন বিষয়ে লোকজনকে সচেতন করা হচ্ছে।

একটি জুনিয়র হাইস্কুলে আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে স্কুলটি একটু ঘুরে দেখার সুযোগ হলো। মোট ছাত্র/ছাত্রী ৩০০। অধিকাংশ ছাত্র/ছাত্রী স্কুল বোর্ডিংয়ে থাকেন। যাদের বাড়ী দূরে তারাই শুধু বোর্ডিংয়ে থাকার সুযোগ পায়। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি সব কিছুর তত্বাবধান করেন।

বিকালে টাউনশিপ পরিদর্শনে গেলাম। কাঠামোগত দিক থেকে আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের মত। এখানে একজন টাউনশিপ অফিসার ও আরো চারজন কর্মচারী আছেন যারা সরকারীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। রাজিৈতকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন ডেপুটি লিডার আছেন যিনি মূলত পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ওমেনস ফেডারেশনের নেত্রীও টাউনশিপে বসেন। সারা চীনে ওমেনস ফেডারেশনের শাখা আছে।

আমরা মোট চার দিন চুনপো কাউন্টির বিভিন্ন এলাকা এবং কার্যক্রম দেখি। এলাকার লোকজন খুব পরিশ্রমী। পুরূষদের চেয়ে মেয়েদের বেশী পরিশ্রমী ও আন্তরিক মনে হলো। চাইল্ড লেবার চোখে পড়েনি। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন খুব ভালো। ধর্মীয় আবেগ নেই বললেই চলে। কাজকে তারা ধর্ম মনে করে। ছেলে মেয়েরা নিজেরা বিয়ে করে না। পরিবারের মাধ্যমে বিয়ে শাদী সম্পন্ন হয়। বিবাহ বিচ্ছেদ কম। ঘুষ, দূর্নীতি, চুরি নেই বললেই চলে তবে যদি সংগঠিত হয় এর জন্য বিচারের ব্যবস্থা খুব কঠিন এবং দ্রুত। লোকজন নিয়মিত সরকারকে কর দেয়। কারো কোন ব্যক্তিগত জমি নেই। সব জমি সরকারের কাছে। রাষ্ট্রের নিকট থেকে জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করতে হয়। রাজনৈতিক কোন দন্দ্ব চোখে পড়েনি। একটি মাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শে সবাই বিশ্বাসী। বড় বড় শহরে কিছু স্থানীয় রাজনৈতিক দল আছে কিন্তু কমিউনিষ্ট পার্টির সাথে কোন বিরোধ নেই।

আমরা পঞ্চম দিন পুচেন (Puchen) কাউন্টির উদ্দেশ্যে চুনপো ত্যাগ করলাম। দুরত্ব প্রায় ১৫০ কিঃ মিঃ। পুচেন হলো সমতল ভুমি। এলাকাটি চুনপোর চেয়ে অনেক উন্নত। এখানে প্রধান চাষাবাদ হলো গম এবং ভুট্টা। পিচ ফলও এখানে প্রচুর ফলে।
পুচেন কাউন্টির একটি ওহঃবৎহধঃরড়হধষ হোটেলে উঠি। সন্ধার সময় মোবাইলে কথা বলার জন্য হোটেলের বাইরে ঈযরহধ ঞবষবপড়স-এ যাই। সমস্যা হলো ঙঢ়বৎধঃড়ৎ কে বুঝাতে পারছিলাম না যে পার মিনিট কত দিতে হবে। ইংরেজী তো বুঝেই না এমন কি ইশারাতেও বুঝাতে ব্যর্থ হলাম ফলে মোবাইল না করে হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে চারদিন থাকতে হবে সুতরাং টেলিফোন করার জন্য অবশেষে আমরা যে হোটেলে উঠলাম সেখান থেকে কর্র্তৃপক্ষ ব্যবস্থা করে দিল। রাত ৯টায় বাড়ীর সাথে কথা বলে মনটা শান্ত হলো।

পরদিন সকালে একটি গ্রামে গেলাম। সেখানে একটি নতুন প্রোগ্রাম দেখলাম। গ্রামের ৬০ উর্ধ্ব বয়স্কদের নিয়ে একটি বৃদ্ধদের সংগঠন। বয়স্করা একটি নৃত্য দেখালো এবং বাদ্যের তালে তালে সকলে প্রাচীন পদ্ধতিতে সারিবদ্ধ ভাবে নৃত্য করলো। একটি কে জি স্কুলে গিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের যাদের বয়স ৩-৪ বৎসর তাদের নৃত্য পরিবেশন দেখে অভিভূত হলাম। ছোট বাচ্চারা বাজনার তালে তালে অকল্পনীয় নৃত্য দেখালো যা ছিল আমাদের চিন্তার অতীত। পরদিন সন্ধ্যা বেলায় একটি হাইস্কুলে নাটক দেখতে গেলাম। স্কুলের বাচ্চারা স্যানিটেশন বিষযে নাটক দেখালো। আধুনিক নাটকের সবধরনের গুণাবলী তাতে স্পষ্ট ছিল। গ্রামীন মানুষের স্যানিটেশন সচেতনতা বাড়ানোই নাটকের উদ্দেশ্য।

দশম দিনে আমরা পুচেন থেকে রওয়ানা হই আবার ঝিয়াং এর উদ্দেশ্য। পথে আমাদের সুযোগ হলো ঞবৎবশধঃধ অৎসু মিউজিয়াম (Mausoleum of the First Qin Emperor) দেখার। ২২০০ বৎসর পূর্বে রাজা চীনের ( তখনকার সময়ে এক রাজা ছিল যার নাম ছিল চীন। তিনি তখনকার সময়ের সব বিবদমান এলাকাগুলোকে একত্রিত করেন এবং পরে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তাঁর নামানুসারেই চীনের নামকরন হয়) রাজত্বকালের স্মৃতি বিজরীত প্রাচীন ঘটনাবলীর অনেক কিছু আবিষ্কার হয়েছে। প্রাচীনকালে মানুষের বিশ্বাস ছিল মানুষের মৃত্যুর পর আবার আত্মা ফিরে আসবে তাই তারা মৃত ব্যক্তির শবদেহকে মূর্তি করে রেখে দিতেন এই বিশ্বাসে যে পরজন্মে আত্মাটি তার দেহটি সহজে চিনতে পারবেন। ঞবৎবশধঃধ অৎসু মিউজিয়ামে ৩৭০ জন সৈন্যের মূর্তি পাওয়া গেছে যার অনেকগুলো এখনও অবিকৃত অবস্থায় আছে। মূর্তিগুলো বিশেষ ধরনের কাদা দিয়ে তেরী। একটা লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো কোন একটা মূর্তির চেহারার সাথে অন্যটির কোন মিল নেই। মূর্তিগুলো সব পাওয়া গেছে একটি পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় বিশ ফুট মাটির নীচ থেকে। এখানে যে মিউজিয়াম (ঞবৎবশধঃধ অৎসু) তৈরী করা হয়েছে তা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকাভুক্ত।

আমরা সন্ধ্যে বেলায় আবার সেই স্পোর্টস হোটেলে ফিরে এলাম। এখানে ডিনার হয় সন্ধ্যে সাতটার মধ্যে। ডিনার সেরে আমরা গেলাম বেল টাওয়ারে। বেল টাওয়ারের স্থাপত্যশৈলী খুবই চমৎকার। দেখতে অনেকটা প্যাগোডার মত। চারটি রাস্তার কেন্দ্রস্থলে ফলে দর্শনার্থীরা খুব সহজেই এটাকে দেখতে পারেন। আমরা বেল টাওয়ারের পাশে আন্ডারগ্রাউন্ডে অবস্থিত একটি ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে যাই। র্পথিবীর অধিকাংশ সেরা কোম্পানীগুলো এখনে তাদের শো-রুম করেছে। এখানে অনেক বিদেশীকে দেখতে পেলাম। জিনিষপত্রের দাম আমাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। একজোড়া জুতার দাম চাইলো ৩৫০০০ টাকা। ফরাসী একটা সেন্টের দাম হাকলো ১৬০০০ টাকা। ঘুরে ফেরে দেখে নয়ন সার্থক করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। মার্কেটে ঢুকার সামনের গেইটে বসে ফিলিপিনো কলিগদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় একটি মেয়ে এসে পরিষ্কার ইংরেজীতে বলল – তোমরা এখানে না বসে ভিতরে কোথাও বস। কারণ এখানে বসা কর্তৃপক্ষের নিষেধ আছে। আমি তার ইংরেজী শুনে খুব অবাক হলাম কারন চীনে এই প্রথম স্পষ্ট উচ্চারণে একটা মেয়ে ইংরেজী বললো। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম – তুমি কি ই্ংরেজী মিডিয়ামে পড়াশুনা করেছ? সে জানালো – না। সে বর্তমানে একজন ছাত্রী। একটা কলেজে গ্রাজুয়েশন করছে। এই মার্কেটে সে পার্টটাইম চাকুরী করছে। সে ইংরেজী শেখার চেষ্টা করছে। মেয়েটি খুবই লম্বা। উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি হবে। দেখতে অসম্ভব সুন্দরী যা সাধারনত চোখে পড়ে না। বুদ্ধিদীপ্ত নীল দুটো চোখ, বিনয়ী এবং চপল চাহনী যা তার সৌর্ন্দযকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। সে জানাল – তোমাদের সাথে কথা বলে আমার খুব ভাল লাগছে কারণ ইংরেজী বলার কোন সুযোগ পাই না। তাকে খুব আত্ম প্রত্যয়ী ও উচ্চাকাক্সক্ষী মনে হলো। সাব্বির ভাই মেয়েটিকে একটি চাবির তোড়া গিফট করলো এবং বলল আমরা তোমাকে আর্শীবাদ করছি – তুমি জীবনে অনেক বড় হবে। শুনে সে খুব খুশি হলো এবং বলল তোমাদের কথা আমার মনে থাকবে।

পরেরদিন ফিরে আসার পালা। বিমান বন্দরের দিকে যখন আসছিলাম তখন বেশ কনকনে রোদ উঠেছে। এই প্রথম রোদ্দোজ্জ্বল চীন দেখলাম। এখানে ছায়া সুনিবিড় শ্যামল পরিবেশ নেই। পরিবেশকে সতেজ এবং প্রানোজ্জ্বল মনে হয় না। নদী, পাহাড়, মাঠ, প্রান্তর সর্বত্রই যেন প্রান স্পন্দনের অভাব। মানুষগুলো ভিতরমূখী যেখানে সরব হতে তারা দ্বিধাগ্রস্থ হয় মুহূর্তে মুহূর্তে। তবে তারা পরিশ্রমী এটাই তাদের সৌভাগ্যের জীয়নকাটি। সকাল ১০টায় আমাদের ফ্লাইট। ঝিয়াং বিমান বন্দর থেকে যথাসময়ে যাত্রা শুরূ করি। কুনমিং এ আবার যাত্রা বিরতী প্রায় তিন ঘন্টার। চীনের সময় বিকাল ৪টায় ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা করি। দুই ঘন্টার জার্নির পর ঢাকাতে অবতরন করে দেখি এখানেও বিকাল ৪টা।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।