বিনসরের জঙ্গলে এবং চকৌরি এর পথে

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

নৈনিতাল থেকে চলেছি বিনসর (Binsar) এর পথে। আলমোড়া হয়ে যেতে হবে। হোটেল থেকে বলে দিয়েছিল, দাদা এখানে দুটো বিনসর আছে। রাণীক্ষেতের বিনসর মহাদেব আর আলমোড়া হয়ে বিনসরের জঙ্গল। বললাম আমরা যাবো বিনসরের জঙ্গলে। আমাদের ড্রাইভার রাজকুমার আগ্রার ছেলে, দিল্লিতে থাকে। নৈনিতালে আগেও এসেছে কিন্তু এইসব দিক চেনেনা। ওকে বললাম “ভাইয়া, আপ ঠিক তারাহ্ সে রাস্তা পাতা কর লিজিয়ে ইন লোঁগো সে!”

আলমোড়া, উত্তরাখান্ড

তা রাস্তায় খুব একটা অসুবিধা হয়নি। রাজকুমার খুব করিতকর্মা ছেলে। প্রায় চার ঘন্টা লাগল পৌঁছতে, পথে একবার থেমেছিলাম। আলমোড়া ঢোকার একটু আগেই দেখা গেল তুষারশুভ্র গিরিশৃঙ্গ, সম্ভবত নন্দাদেবী পর্বত। দু চোখ ভরে দেখলাম। আর পড়ল গোলু দেবতার মন্দির কিন্তু সেটি জঙ্গলের বেশ কিছুটা ভেতরে চড়াই উঠতে হয় বলে আর গেলাম না। পাশেই গঙ্গানাথ মন্দির প্রাঙ্গণ দর্শন করে চলে এলাম বিনসর।

আমাদের রিসর্টের নাম ছিল বিনসর ইকো ক্যাম্প। লোকেশন বিনসর ইকো ফরেস্ট জোনে। একটু বেশ খাড়া চড়াই উঠতে হয়, গাড়ি উঠে যায়। তারপর বেশ খানিকটা ভাঙ্গাচোরা কাঁচা রাস্তা। নাচতে নাচতে গাড়ি চলে এল বিনসর ইকো ক্যাম্পের সামনে। প্রবেশ করতেই উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন রিসর্টের হেড কুক কাম ম্যানেজার রমেশ জী রডোডেনড্রন ফুলের নির্যাস দিয়ে তৈরি ওয়েলকাম ড্রিঙ্ক দিয়ে। খুব ভাল আর শান্তশিষ্ট মানুষ। নৈনিতালের বাসিন্দা। ওনার শ্যালক চন্দন ও এখানেই কাজ করে ওনার সাথে।

ঘরে গিয়ে লাগেজ পত্র রেখে রমেশ জী’র সাথে পুরো ইকো ক্যাম্প ঘুরে ঘুরে দেখলাম। অনেকগুলি বিভিন্ন ডিজাইনের কটেজ।পুরো জায়গাটা খুব সুন্দর ভাবে সাজানো। চারিদিকে সুন্দর গাছপালা আর ফুলের সমারোহ। প্রচুর থাইম, মিন্ট আর রোজমেরি’র গাছ দেখালেন রমেশ জী, যেগুলি থেকে সরাসরি পাতা তুলে উনি হার্বাল টি বানিয়ে থাকেন (পরে উনি সন্ধ্যার সময় সেই চা আমাদের খাইয়েও ছিলেন)!

খুব জোর ক্ষিদে পেয়েছিল। রমেশ জী কে বলতে উনি বললেন – “স্যার জী, ডাইনিং রুম মে চলে আইয়ে ফ্রেশ হোকে।” এখানে রুম সার্ভিস নেই। ডাইনিং হলে দ্বিপ্রাহরিক আহারাদি সেরে উঠলাম। রমেশ জীর হাতের রান্না সত্যিই সুস্বাদু। খাওয়ার পর্ব সারার পরে আলাপ হল এই বিনসর ইকো ক্যাম্পের মালিক, সুদর্শন তরুন যুবক রবি মেহরার সাথে। রমেশ জী আলাপ করিয়ে দিলেন। খুব ভাল মানুষ এই রবি জী। এত বড় প্রপার্টির মালিক, এতটুকুও অহঙ্কার নেই। আমাদের সাথে অনেক গল্প করলেন। রবি জী বিদায় নিতে আমরা একটু রুমে চলে এলাম বিশ্রাম নিতে। কিন্তু রমেশ জী বলে রাখলেন যে বিকেল চারটে’র সময় তৈরি থাকতে। জঙ্গলের মধ্যে অল্প ট্রেক করে একটা ভিউ পয়েন্ট আছে, সেখান থেকে সানসেট দেখাবেন।

বিনসার, উত্তরাখান্ড

নির্ধারিত সময়ে আমরা রমেশ জী’র সাথে চল্লাম জঙ্গলের ভেতর। হাল্কা চড়াই ভেঙ্গে উঠেই চলে এলাম পাইন ফরেস্টের ভেতর। আরো বেশ খানিকটা উঠতে হল। একটা ছোট্ট হাট বানানো রয়েছে। ওখান থেকেই সানসেট দেখা যাবে। জায়গাটা এত চমৎকার যে বলে বোঝানো যাবে না!! মেঘহীন আকাশে আদিগন্ত বিস্তৃত জুড়ে বিরাজ করছে হিমালয়ের শৃঙ্গরাজি। নন্দাদেবী, নন্দাঘুন্টি, চৌখাম্বা, ত্রিশূল, পঞ্চচুল্লী! সে এক দেখার মত দৃশ্য! ধীরে ধীরে সূর্য ডুবে যেতে থাকল আর তার রঙের ছটা পড়ে সোনারঙের হয়ে উঠল ওই তুষার শৃঙ্গ গুলি!! (পরে অবশ্য আরো কাছ থেকে এই দৃশ্য দেখেছি যথাক্রমে মুন্সিয়ারি এবং কৌশানি থেকে)

আমাদের সাথে ছিল চন্দন ও। ওর কাছে জানতে পারলাম ভিউ পয়েন্ট থেকে দূরের ঘন জঙ্গলে ওরা নিয়ে যায় জীপ সাফারিতেও। অনেক বিদেশী আসেন, তাদের ওরা জঙ্গল ট্রেকিং এও নিয়ে যায়। আরো বললো যে এই জঙ্গলে অনেক লেপার্ড আছে। আমায় ছবিও দেখাল ওর মোবাইল থেকে, নাইট সাফারির সময় তোলা। বলাই বাহুল্য এইসবের প্ল্যান আমার মত ভীতু মানুষের ছিল না!

অসাধারণ সূর্যাস্ত দেখে ধীরে ধীরে নেমে এলাম হোটেলে। সন্ধ্যার স্ন্যাক্স চলে এল, খেয়ে রুমে রিল্যাক্স করলাম বেশ কিছুক্ষণ। রবি জী বর্ন ফায়ারের বন্দোবস্ত করলেন। অন্যান্য টুরিস্টদের সাথে আমরাও খুব হৈ হুল্লোড় করলাম। এরপর রাতের খাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম তাড়াতাড়ি কারন আগামীকাল আমাদের গন্তব্য চকৌরি। বিনসর ছেড়ে চলে যেতে মন খারাপ লাগছিল কিন্তু কিছু করার নেই। বিদায় বিনসর!

চকৌরি

রমেশজী আর চন্দনকে বিদায় জানিয়ে সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়লাম বিনসর ইকো ক্যাম্প থেকে। আজকের গন্তব্য চকৌরি (Chaukori) ভায়া পাতাল ভুবনেশ্বর! সুদীর্ঘ পথ। মাঝেমধ্যে পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে এক একটা পথের বাঁক। যেখান থেকে শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গরাজি উঁকি মেরে যাচ্ছে আর আমাদের শিরায় শিরায় শক্তি সঞ্চার করে যাচ্ছে।

বিনসর, উত্তরাখান্ড
সকালের বিনসর

তবে প্রতিদিনের ক্লান্তিকর জার্নি আজ অল্প হলেও থাবা বসাচ্ছে আমাদের শরীরে। গাড়ি থামিয়ে মাঝে মাঝে মিসেসকে আর ছেলেকে চোখেমুখে জল দিয়ে আর ওষুধ খাইয়ে পরিচর্যা করতে হচ্ছে। আমি এখনো অবধি ঠিক আছি। ভগবানের আশীর্বাদে পাহাড়ি পথে আমি এখনো অবধি অতটা অসুস্থ হই নি।

যাই হোক, এইভাবে চলতে চলতে এসে পড়লাম পাতাল ভুবনেশ্বর! প্রবেশপথের বাইরে দোকান থেকে পুজোর উপাচার কিনে নিয়ে চললাম। আশেপাশে বেশ কিছু লজ, হোম স্টে’র দেখা মিলল। কুমায়ুনের যাত্রাপথে এটি একটি অন্যতম দ্রষ্টব্য স্থান! পুরাণ মতে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর বাস এই গুহা গর্ভে। কথিত আছে আদি শঙ্করাচার্য প্রথম এই গুহামন্দিরে পূজাপাঠ চালু করেন।

পূজার ডালি নিয়ে এগিয়ে চললাম পায়ে পায়ে। আমরা আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম যে গুহাগর্ভে প্রবেশ করব না! ছেলে আর মিসেসের শরীর ভাল ছিল না আর ওদের একা রেখে আমার পক্ষেও নীচে নামা অসম্ভব ছিল! গুহামন্দিরের প্রবেশপথ দেখলেও বুক শুকিয়ে যায়। খুব সঙ্কীর্ণ এবং মাথা নীচু করে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করতে হয়।

পাতাল ভুবেনশ্বর
পাতাল ভুবেনশ্বর

যাই হোক, বাইরের ছোট্ট মন্দিরে পূজারীজির কাছে পুজা দিয়ে আমরা ফিরে চললাম। পূজারীজি হাল্কা তিরস্কার করলেন – “আরে দাদা! কুছু হবে না।নীচে যান না!” প্রচুর বাঙ্গালী পর্যটকদের সংস্পর্শে এসে ওনার বাংলাটা কিন্তু জবরদস্ত হয়ে উঠেছে! আমরা হাসিমুখে আমাদের অক্ষমতার কথা জানিয়ে চলে এলাম।

আবার গাড়ি ছুটল। চকৌরি আরও প্রায় ৩৯ কিমি দূরে। আমাদের গন্তব্য হোটেল ওজস্বী। কে এম ভি এন এখানকার থাকার জায়গাগুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তবে এযাত্রা আমাদের ঠাঁই হতে চলেছে হোটেল ওজস্বীতে।

দেখতে দেখতে চলে এলাম হোটেলে। সুন্দর ছিমছাম হোটেল। দীর্ঘযাত্রা শেষ হতে সবাই বেশ খুশি হয়ে উঠেছিলাম। ছেলে আর মিসেস ও অল্পবিস্তর সুস্থ হয়ে উঠেছিল। ক্ষিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছিল সবার। ছেলের ইচ্ছে হল চাইনিজ খাওয়ার। সেইমত হোটেল রুমে লাঞ্চ আনিয়ে খেয়ে নেওয়া গেল। বাসন কোসন রুমের বাইরে নামিয়ে রেখে দিবানিদ্রার আয়োজন করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম সবাই। ওরা ঘুমিয়েও পড়ল। আমার ঘুম আসছিল না। সামনে বিরাট বাগান আর একটা প্রশস্ত বারান্দা মত সাজানো জায়গা। ভিউ পয়েন্ট গোছের। আমি ওইখানে দাঁড়িয়ে চারিদিকের দৃশ্যসুখ উপভোগ করছিলাম। চকৌরি কে বলা হয় কুমায়ূনের মাউন্টেন গ্যালারি। কিন্তু আজ আকাশ সাদা পেঁজা তুলোর মত কুন্ডলী পাকানো মেঘে ঢাকা। হিমালয় আজ অদৃশ্য!

হঠাৎ পেছনে বিকট আওয়াজ শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি, পর পর বেশ কয়েকটি রুমের বাইরে রাখা বাসনকোসন নিয়ে কাড়াকাড়ি খেলায় মেতেছে এক পাল বানরের দল। পাশেই ঘন জঙ্গল আর গাছপালার সমারোহ। ওনাদের আবির্ভাব ওখান থেকেই ঘটেছে বোধকরি! এমতাবস্থায় আর বাইরে থাকা উচিত না বুঝে আমি পা চালিয়ে আমার ঘরে ঢুকে পড়লাম। তখনও আমার ঘরের সামনে ওনারা নেমন্তন্ন খেতে হাজির হন নি!

চকৌরি, উত্তরাখান্ড
চকৌরি

এবারে ঘরে বিছানায় গা এলিয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়তেই হল। ঘন্টাখানেক বাদে যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন প্রায় সাড়ে চারটে বাজে। আস্তে আস্তে বেলা পড়ে আসছে। আমি বাইরে মুখ বাড়িয়ে আর তেনাদের দেখা পেলাম না। ছেলে আর ছেলের মা তখনও ঘুমে অচেতন। আমি ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে দরজা টেনে লক করে বেরিয়ে পড়লাম।

হোটেল রিসেপশনে জিজ্ঞেস করে জানলাম বাইরে বেরিয়ে ডানদিকে অল্প হাঁটলেই সানসেট পয়েন্ট পাওয়া যাবে। আর বাঁ দিকে গেলে পরমহংস আশ্রম।

ঠিক করলাম আশ্রমে কাল সকালে যাব। আপাতত সানসেট পয়েন্টে যাই! বাইরে বেরিয়ে রাজকুমারের সাথে দেখা, আমাদের সারথি! সব শুনে উনিও আমার সঙ্গী হলেন। দুজনে গল্প গল্প করতে চললাম অচেনা পথ ধরে। বেশ মিনিট আষ্টেক হেঁটে এলাম সানসেট পয়েন্টে। সূর্য্য তখন প্রায় ডুবু ডুবু!আমার ছবি তোলার নেশার ব্যাপারে এতদিনে রাজকুমার ওয়াকিবহাল। উনি আমাকে বেশ ক’টা ভাল জায়গা দেখিয়ে সেখান থেকে ছবি তুলতে বললেন। পশ্চিম আকাশে রাঙা কমলালেবুর মত সূর্য্যি মামা অস্ত গেলেন। আমি আর রাজকুমার হোটেলে ফিরে চললাম।

পরের দিন বেরিয়ে যাব মুন্সিয়ারি। তবে পরের দিন ভোরবেলা চকৌরি আমাদের নিরাশ করেনি! চকৌরির মাউন্টেন গ্যালারি নাম মাহাত্ম্যের প্রমাণ পেয়েছিলাম পরের দিন ভোরেই। সে গল্প না হয় হবে আর এক দিন! আজ এইটুকুই থাক!

লেখক কলকাতায় থাকেন। পেশায় নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন। ছবি তোলা তাঁর শখ।

লেখক পরিচিতি

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।