অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প ট্রেকিং

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

৬ অক্টোবর ২০১৪

ঘুম ভাঙল পৌনে ৬টায়। ৯টায় ফ্লাইট। ব্যাকপ্যাক রাতে রেডি করে রেখেছিলাম। শাহজালাল বিমানবন্দরে ১২ জন হাজিরা দিলাম। যাচ্ছি অন্নপূর্ণা বেইস ক্যাম্পে। কাঠমাণ্ডুর ত্রিবান্দ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতে দেড় ঘণ্টা লাগল। ছাড়পত্র নিয়ে সোজা চলে গেলাম থামেল। থামেলের রাস্তায় ঘুরলাম। ছোট শহর। অনেক ট্যুরিস্ট।

৭ অক্টোবর ২০১৪

ঘুম থেকে উঠলাম সাড়ে ৬টায়। রুট পারমিট নিতে গেলাম নেপাল ট্যুরিস্ট বোর্ডে। পারমিট ফি ৪০০ রুপি। ছবি দিতে হয় তিন কপি। ১১টার মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে গেল। এরপর রাকা আপুর সঙ্গে নেপালি পোশাক খুঁজতে গেলাম। নেপালে গিয়ে নেপালি না সাজলে কেমন হয়! দুপুরের খাবার খেয়ে ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম পাটান দরবার স্কয়ার। পরে ভক্তপুর দরবার স্কয়ারেও গিয়েছিলাম। দুটি জায়গাই অসাধারণ।

৮ অক্টোবর ২০১৪

পোখারার বাস ৭টায়। তড়িঘড়ি রেডি হলাম। ছয় ঘণ্টার পথ। পোখারা পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবারের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। বিকেলে ফিশ টেইলের (মাচ্ছেপুচ্ছরে) দারুণ শোভা দেখলাম। ফেওয়া লেকে গল্প করে রাত করে ফেললাম। রাতে মাছ-গোশত খেলাম। ট্রেইলে এগুলো বেশি পাওয়া যায় না। দামও মোটামুটি অনেক।

ফিস টেইল

৯ অক্টোবর ২০১৪

সকাল সাড়ে ৬টায় চড়লাম ট্যাক্সিতে। গন্তব্য নয়াপোল (১০৭০ মিটার)। চা খেয়ে সাড়ে ৮টায় ট্রেকিং শুরু করলাম। বিরেথান্তি পৌঁছে ট্যুরিস্ট অফিসে নাম লিখিয়ে নিলাম। সাড়ে তিন ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছলাম শেউলি বাজারে। দুপুরের খাবার সেরে বিশ্রাম নিলাম কিছুক্ষণ। দুপুর দেড়টায় রওনা হলাম গান্ধ্রুক। কয়েক হাজার সিঁড়ির আঁকাবাঁকা খাড়া পাথুরে পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। মেঘ করে আসার অল্প পরেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। কমার নাম নেই। ততক্ষণে ভিজে কাক। উইন্ডব্রেকার সব ঠেকাতে পারল না। লেগে গেল গান্ধ্রুক (১৯৪০ মিটার) পৌঁছাতে। পায়ের অবস্থা কাহিল। রাতের খাবার শেষ করে মাসল রিলাক্সেন্ট খেয়ে নিলাম। হঠাৎ টিমের একজন বাইরে থেকে ডাকল। কিন্তু বিছানা ছাড়তে মন চাইছিল না। জানতে চাইলাম, কী? উনি বললেন, কিছু না। তাতেই আগ্রহ বেড়ে গেল। বারান্দায় গিয়ে দেখি, চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে।

১০ অক্টোবর ২০১৪

গন্তব্য চমরং (২১৭০ মিটার)। প্রথমে নামতে হবে, পরে আবার উঠতে হবে। সকাল ৮টায় রওনা হলাম। সাড়ে ১০টায় পৌঁছলাম কিমরংখোলার কাছাকাছি এক ঝরনায়। ঝরনার পানিতে পা ডুবিয়ে চুপচাপ শুনছিলাম পাথরে পানি আছড়ে পড়ার শব্দ। ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে আবার ট্রেকিং শুরু করলাম। ব্রিজ পার হয়ে পৌঁছে গেলাম কিমরংখোলা গাঁও। ফুলে ফুলে ভরা অসাধারণ জায়গাটি। সবজি, ডাল, ভাত অর্ডার করলাম। বাড়ির লোক বাগান থেকে সবজি তুলে এনে গরম পানিতে আধা সিদ্ধ করে পরিবেশন করল। কোনোরকম গিলে আবার রওনা হলাম। চমরং পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এলো। রাতের খাবারে ছিল নেপালি থালি।

১১ অক্টোবর ২০১৪

আজকের গন্তব্য দোভান (২৬০০ মিটার)। সকাল সকাল গুরুং ব্রেড, ডিম আর জেলি দিয়ে নাশতা সারলাম। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সিঁড়ির রাস্তা দৃষ্টির শেষ সীমাতক। ধীরে ধীরে নামতে থাকলাম। ব্রিজ পার হওয়ার পর ওঠার পালা। প্রায় ১২টায় পৌঁছে গেলাম সিনওয়া। পাহাড় আর পাহাড়ের গা বেয়ে আসা ঝরনা দেখতে বেশ লাগছিল!

লাঞ্চ শেষ করে রওনা দিলাম দেড়টা নাগাদ। শুরু হলো জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি রাস্তা পার হয়ে বিকেলে পৌঁছলাম ব্যামবো। জিনজার টি খেয়ে আবার চললাম। সন্ধ্যার ঠিক আগে যখন দোভানের কাছাকাছি, দেখি ফিশ টেইলের চূড়ায় সূর্যের শেষ আলো। বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইলাম।

ফিস টেইল

১২ অক্টোবর ২০১৪

সকাল ৭টা। যাচ্ছি মাচ্ছেপুচ্ছরে বেইস ক্যাম্প (৩৭০০ মিটার)। ১১০০ মিটার উঠতে হবে। নিয়ম হলো, তিন হাজার মিটারের পর ৫০০ মিটারের বেশি এক দিনে না ওঠা। আমাদের রিস্ক নিতেই হলো। কারণ সময় কম। সিদ্ধান্ত হলো অল্টিচ্যুড সিকনেস শুরু হলে নেমে আসব। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পৌঁছে গেলাম দেওরালি (৩২০০ মিটার)। কিছুক্ষণ বসতেই ঘামে ভেজা শরীরে ঠাণ্ডা বাতাসের কামড় অনুভব করলাম। সূর্য পাহাড় আর মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ল। দেওরালিতে কয়েকজন ইন্দোনেশিয়ান ট্রেকার পেলাম। বন্ধু বানিয়ে ফেললাম তাদের।

মাচ্ছেপুচ্ছরে বেইস ক্যাম্পে যাবার পথে

প্রচুর পানি খাচ্ছি আর ধীরে ধীরে এগোচ্ছি। রাস্তার পাশেই বিশাল ঝরনা, বড় বড় পাথরের মাথায় ছোট পাথর দিয়ে স্তূপ (বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের) সাজানো। এভাবে দুই ঘণ্টা এগোনোর পর বিকেল গড়িয়ে গেল। আমাদের বুকিং দেওয়া কটেজে পৌঁছাতে রাত হলো। প্রচণ্ড শীতে ঠকঠক করতে করতে ঘরে ঢুকলাম। কম্বলে ঢুকে ঠাণ্ডা ঠেকালাম। শীত মোকাবিলার জন্য চার স্তরে কাপড় পরতাম-প্রথমে সিনথেটিক ইনার, তারপর ফুল হাতা গেঞ্জি, তার ওপর ফ্লিসের সোয়েটার, সবার ওপরে উইন্ডব্রেকার। হাতে, পায়ে উলের মোজা। আর দিনের বেলায় পরতাম জার্সি। ব্যাকপ্যাক ছিল ডয়টার (৪০ লিটার) আর ট্রেকিং-শু ছিল বাটা কেডস।

১৩ অক্টোবর ২০১৪

ঘুম ভাঙল সকাল ৭টার দিকে। বেইস ক্যাম্প থেকে শিখর দেখছিলাম। চারদিকে বরফের পাহাড় আর মাঝখানে ভ্যালিতে আমরা। প্রকৃতির সে সৌন্দর্য ভাষাতীত। সকাল ৯টার দিকে ব্যাগ গুছিয়ে আবার ট্রেকিং শুরু করলাম অন্নপূর্ণা বেইস ক্যাম্পের (৪১৩০ মিটার) পথে। রাস্তার একদিকে মাচ্ছেপুচ্ছেরে, অন্যদিকে অন্নপূর্ণা। ফুলে ভরা পাহাড়ি রাস্তা একের পর এক তাক লাগিয়ে যাচ্ছে। দুপুর ১২টায় পৌঁছলাম অন্নপূর্ণা বেইস ক্যাম্পে। নেপালি থালির দাম এখানে ৫৫০ রুপি, এক মগ জিনজার টি ২৫০ রুপি। থালির সঙ্গে সবজি আর ডাল আনলিমিটেড।

অন্নপূর্ণা ভ্রমণ
অন্নপূর্ণা বেইজ ক্যাম্পে আমি

খাওয়াদাওয়া শেষ করে একটু বিশ্রাম নিতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল সবার চিৎকারে। কেউ বলছে বৃষ্টি, কেউ বলছে তুষারপাত। বাইরে গিয়ে দেখি বৃষ্টির সঙ্গে তুষারপাত। অল্প সময়ে কিছু ছবি তুলে ফেললাম। সন্ধ্যা নেমে এলো, অন্যদিকে তুষারপাত বেড়েই চলছে।

১৪ অক্টোবর ২০১৪

সকাল ৯টা। আজ আমাদের নিচে নেমে যাওয়ার কথা। তুষারপাতে রাস্তা ঢেকে গেছে। এদিকে আমাদের বসে থাকার সময় নেই। ফ্লাইট তো মিস করা চলবে না। এ সময় তুষারপাত হয় না বলে প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি। আধা ঘণ্টা অপেক্ষার পর দেখলাম কিছু ট্যুরিস্ট নামছে। আমরা ওদের পিছু নিলাম। পাকে বরফের ঠাণ্ডা থেকে বাঁচানোর জন্য মোজার ওপর পলিথিন পরে তার ওপর জুতা পরে নিলাম। বরফের মধ্য দিয়ে খুব সতর্কভাবে পা রাখছি। ওদিকে হাতের গ্লাভস তুষারপাতে ভিজে হাত জমে যাচ্ছিল। অনুভূতি পাচ্ছিলাম না। এ অবস্থায় আড়াই ঘণ্টা ট্রেক করার পর পৌঁছলাম মাচ্ছেপুচ্ছরে বেইস ক্যাম্পে। এককাপ জিনজার টি খেয়ে আবারও রওনা হলাম। ততক্ষণে উইন্ডব্রেকার ছাড়া বাকি জামাকাপড় ভিজে একাকার। এখানে রাস্তার অবস্থা আরো খারাপ। বরফ আর কাদা-পানিতে মেশানো উঁচু-নিচু রাস্তা। একটু ভুল হলেই অনেক নিচে খাদে পড়ে যেতে হবে। আড়াই ঘণ্টা ট্রেক করার পর পৌঁছলাম দেউরালি।

১৫ অক্টোবর ২০১৪

সকালে উঠে দেখি আকাশ পরিষ্কার। আমাদের ভাগ্য সত্যিই ভালো ছিল। যত দ্রুত সম্ভব নেমে গেলাম।

খরচাপাতি

সব মিলিয়ে একজনের খরচ ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা।

কখন যাবেন

ভালো সময় মার্চ থেকে অক্টোবর।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।