আফ্রিকা ভ্রমন (পর্ব ২) – লেক নাইভাসা

যুক্ত করা হয়েছে
ভালো লেগেছে
0

মাসাইমারা পর্ব শেষ করে এবার চলেছি লেক নাইভাসার উদ্দেশ্যে। এটা নাকি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম FRESH WATER LAKE. ২রা আগষ্ট সকাল সাড়ে আটটায় মাসাইমারাকে বিদায় জানিয়ে যাত্র শুরু করলাম লেক নাইভাসার উদ্দেশ্যে। যতদিন বেঁচে থাকব মাসাইমারা আর তার বাসিন্দাদের ভুলব না। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘন্টা পথ চলার পর এসে পৌঁছলাম লেক নাইভাসাতে। বেশ মনোরম আবহাওয়া। পথশ্রম জনিত ক্লান্তি একদমই নেই। আমরা উঠলাম এলসামেয়ার লজে। এই লজে থাকাটা আমাদের এক ঐতিহাসিক পাওনা। লজটা এককথায় অনবদ্য। লজের চারিদিকে বড় বড় গাছ, সামনে প্রশস্ত লন তাতে চেয়ার টেবিল পাতা আর তার পরেই টলটলে জল ভর্তি লেক নাইভাসা। একদম লেকের পারেই লজ।

লেক নাইভাসা

একটা ভয়ংকর অথচ মজার সতর্কীবার্তা লেখা আছে অন্ধকার হয়ে গেলে আর একা একা লনে ঘোরা যাবে না। লেকের জলে প্রচুর জলহস্তীর বাস, তারা রাতের অন্ধকারে এলসামেয়ারের লনে পায়চারী করতে আসে। আসলে সারাদিন জলে থেকে বাবুরা ক্লান্ত হয়ে রাতের বেলা লজের লনে পায়চারী করেন। আর সেই সময় যদি কোনো দুপেয়েকে সামনে পায় তো তাদের ছেড়ে কথা বলে না। এবার ঐতিহাসিক বিষয়টার প্রসঙ্গে আসি। বহুবছর আগে ১৯৬৬ সালে BORN FREE বলে একটা অসাধারন সিনেমা হয়েছিল। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিল একটা সিংহী। যার নাম ছিল এলসা। ওই এলসার পালক পিতা জর্জ অ্যাডামস ওই লজে বহুদিন থেকে সিনেমারটার শুটিং করেছিলেন। এলসা আর জর্জের অনেক সিন ওই লজে শুটিং হয়েছিল। সেই থেকে ওই লজের নাম এলসামেয়ার লজ।

BORN FREE সিনেমাটার শুটিংএর অনেক ছবি, অনেক স্মৃতি ওখানে আজও সযত্নে রক্ষিত আছে। কিন্তু পর্যটকদের সেইসব ছবি তোলার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি আছে।লজে ঢোকার পর কফি আর কুকিস দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানানো হল। বিকেল বেলা লনে বসলাম আমরা দুই বন্ধু। এখানে পর্যটকের সংখ্যা অনেকটাই কম। বিকেল গড়িয়ে ধীরে লেকের গায়ে পাহাড়ের ওপারে সূর্যাস্ত হোলো। সেই গোধূলী লগ্নের মায়াবী আলোয় আমরা দুই স্কুলের বন্ধু আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণায় মগ্ন হয়ে গেলাম।

লেক নাইভাসা
এলসামেয়ার লজ

৩রা আগষ্ট সকালে জনের গাড়িতে করে বের হলাম একটা crater walk এ। একটা মৃত আগ্নেয়গিরির ওপর লেক আর জঙ্গল। সেই জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে হরিণ, জিরাফ, জেব্রা আর ওয়াইল্ড বীস্টের দল। কিছুটা ট্রেকিং করতে হলো, তারপর জেব্রা, হরিনদের পেছন পেছন হাঁটলাম, মজা করে ওদের তাড়া করলাম, ওরা দৌড় লাগাল আর আমরা যেন নিজেদের শৈশবে ফিরে গেলাম।ঘন্টা তিনেক পরে লজে ফিরে লাঞ্চ করে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। বিকাল ৪ টের সময় গেলাম লেক নাইভাসাতে বোটিং করতে। বোটিং এর জায়গায় বেশ ভীড়। আমরা দুজন একটা বোটে সওয়ার হলাম। লেকটা বিশাল। প্রচুর পাখী আছে। জলের ধারে ধারে জলহস্তীর দল একবার ডুবছে একবার উঠছে। আর একটা অসাধারন দৃশ্য দেখলাম। ফিস ঈগলের মাছ শিকার। আমরা কয়েকটা মাছ কিনে নিয়েছিলাম। সেগুলো একটা করে জলে ফেলছি আর গাছের ওপর থেকে এক একটা ফিস ঈগল জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই মাছ মুখে করে নিয়ে চলে যাচ্ছে। সত্যি দেখার মতো দৃশ্য। প্রায় দেড় ঘন্টা বোটিং করে আমরা লজে ফিরে এলাম। সন্ধ্যেবেলা লজের মিনি সিনেমা রুমে বসে BORN FREE সিনেমাটা আবার দেখলাম। এই লজে আমরা প্রচুর পাখি দেখেছি আর দেখেছি এক বিশেষ প্রযাতির বানর – columbus monkey। খুব অদ্ভুত তাদের দেখতে। আচরনও বেশ অদ্ভুত।

লেক নাইভাসা

৪ঠা আগষ্ট সকালে গেলাম ক্রিসেন্ট আইল্যান্ড। এটা এই লেক নাইভাসার সেরা জায়গা বলেই মনে হোলো। পুরো জায়গাটা পায়ে হেঁটে ঘোরা। প্রচুর পেলিকান জলের ধারে বসে আছে গাছে গাছে নাম না জানা প্রচুর পাখী। একটা ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। জেব্রা, ভেড়া, জিরাফ, হরিনরা মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে। ঠিক যেন রামায়ন মহাভারতের যুগে কোনো বনে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি। এলসাামেয়ার লজে তিনটে দিন একদম স্বপ্নের মতো কেটে গেল। এই লজের আতিথেয়তা অসাধারন। খাওয়া দাওয়া ঘরদোর সত্যিই দুর্দান্ত। এরপর যাবো আমাদের সবার স্বপ্নের জায়গা “চাঁদের পাহাড়” দেখতে।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।