যদি কেউ জিজ্ঞেস করে ২০২১ সালের সব থেকে বিতর্কিত ট্রেকিং ট্রেল কোনটা? চোখ বন্ধ করে কাশ্মীর গ্রেট লেকস ট্রেক (Kashmir Great Lakes Trek) বা KGL. কিন্তু বিতর্কটা ঠিক কি নিয়ে? এই বছরের মোস্ট-হাইপড ট্রেক হওয়ায়, ওখানে গাইডদের মিসবিহেভ, ফ্রডুলেন্ট অ্যাক্টিভিটি, ইত্যাদি নিয়ে এবং তা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েও গেছে। কাজেই এই লেখায় বিতর্কে না গিয়ে বরং জান্নাত এর একফালি অংশে পায়ে হেঁটে ঘুরে আসার একটা খরচ সমেত ছোট্ট বিবরণ রইলো।

আমরা কজন ছিলাম
আমি, আমার হাজব্যান্ড, কন্যা (বয়স ৮+) – আমরা তিনজন। আর ওখানে পৌঁছে, ভারতের নানা স্টেট থেকে আরো সদস্য মিলে মোট ২০-২১ জন।
কাশ্মীর গ্রেট লেকস ট্রেকের খরচ
এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করি তাহলে। কোভিড সংক্রান্ত ডিটেলে গেলাম না কারণ আমি অগাস্টে গেছিলাম। তারপর অনেক আপডেট এসে গেছে।
অগাস্টে ট্রেকে গেছি। জুনে ফ্লাইটের টিকিট কেটেছি। কানেকটিং ফ্লাইট ছিল। Kol-Delhi, Delhi-Srinagar & same way return, পার হেড ফ্লাইট ফেয়ার পড়েছিল 10,000₹ শ্রীনগরে নেমে, এয়ারপোর্টের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে একটা সুমো বুক করা হয়েছিল। এয়ারপোর্ট থেকে ড্রপ পয়েন্ট (TRC) অব্দি ভাড়া পড়েছিল 730₹। ফেরার সময় অটো তে এয়ারপোর্টের গেট অব্দি 300₹, তারপর এয়ারপোর্ট ক্যাবে পরহেড 50₹। ড্রপ পয়েন্ট থেকে ট্রেক শুরুর বেস পয়েন্ট (Shitkadi) অব্দি পৌঁছানোর গাড়ি ভাড়া ট্রেক এর প্যাকেজের সাথেই ধরা ছিল। রাস্তা গাড়িতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা।

ট্রেক স্টার্টিং পয়েন্ট (Shitkadi village, Sonamarg) থেকে ট্রেক এন্ডিং পয়েন্ট (Naranag), সেখানে দুপুরের লাঞ্চ, এবং তারপর সেখান থেকে শ্রীনগর ড্রপ, এই সবটাই ট্রেক প্যাকেজে ইনক্লুডেড ছিল। Shitkadi তে বিকেলের খাবার দিয়ে শুরু করে, Naranag এ এসে দুপুরের লাঞ্চ, 6 দিন হাটা+1 দিন বাফার ডে, পার হেড পড়েছিল 10,000₹।
আমরা তানভির আহমেদ এর সাথে ট্রেক করেছি। ভীষণ কোন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি বললে মিথ্যে বলা হবে। অন্তত আমাদের সেটা সমস্যা লাগেনি। পার্সোনালি, পূর্ব অভিজ্ঞতা মনে করলে, সমস্ত ব্যবস্থাপনায় এটা লাক্সারি ট্রেক ছিল। সাথে ২৪ ঘণ্টা গাইড ছিল না বলে অসুবিধেও হয়নি। থাকলে তাড়া দিত। কাজেই আমরা নিজেরা নিজেদের মতো হেঁটেছি। আর সত্যি কোথা বলতে, ওই রুটে এতো ট্রেকার ছিলেন, যে আপনি চাইলেও হারাতে পারবেন না। যেখানে মেয়েকে নিয়ে নদী ক্রস করতে বা বোল্ডার জোন ক্রস করতে অসুবিধা হয়েছে, দলের গাইড ঠিক চলে এসেছে।
স্যাক ক্যারি করতে পার ডে 200 করে, সাতদিনে মোট 1400₹ (এটা ওই রুটের নরমাল রেট; তবে মাঝ রাস্তায় স্যাক ক্যারি করলে চার্জ ওদের ইচ্ছেমতো দিতে হতে পারে)।

শ্রীনগরে ঘোরা, কেনাকাটি, ভুরিভোজ এসবের খরচ উল্লেখ করলাম না। তবে কাশ্মীরি কুইজিন টেস্ট করতে Stream এবং Shamiyana যেতে পারেন (ডাললেকের গেট 1-3 এর মধ্যেই)। আইসক্রিম এবং শেকের জন্য Erina (লাল চক)।
শ্রীনগরে কোথায় ছিলাম
শ্রীনগরে আমাদের একরাত স্টে ছিল। উঠেছিলাম হাওড়া গেস্ট হাউসে। দলেরই একজন খোঁজ দিয়েছিল। বাঙালি হলে ডিসকাউন্ট পাওয়া যায় শুনেই যাওয়া। দুই ভাই ও তাদের পরিবার মিলে গেস্ট হাউসটি চালান। অল্প খরচে পরিষ্কার, স্পেসিয়াস, ব্যবহার খুবই ভালো, হেল্পফুল, আর কি চাই। একদম টপ ফ্লোরে ঘর নিয়েও, কেবল আমার পায়ে ব্যাথা, সিড়ি উঠতে কষ্ট হচ্ছে বলে অনায়াসেই নিচে ঘরের ব্যবস্থা হয়ে যায়। একদম মেন রোডের ধারে না। ল্যান্ডমার্ক – আকবর হোটেলের পাশের গলিতে। ভাড়া, একটা ডাবল বেডরুম একদিন 600₹।
যোগাযোগ: পারভেজ ভাই: 9419715293/7006308129

হাউসবোটে ছিলাম না কেন
ডাললেকে যেখানে হাউসবোটগুলো ছিল, বড্ড মশার উৎপাত। প্লাস, কোভিডের মধ্যে ওখানে থাকা নিরাপদও মনে হয়নি। এবং আমাদের হাতে শপিং করতে যাওয়া, খেতে যাওয়ার জন্য প্রতিবার মেন হাউসবোট থেকে শিকারা করে বারবার যাতায়াত করার মতো সময়ও ছিলনা।
কাশ্মীর গ্রেট লেকস ট্রেক ঠিক কতোটা সহজ/কঠিন
বেশ কিছু ট্রেকারকে ওখানে গিয়ে রাগ দেখিয়ে/আফশোস করে বলতে শুনেছি “আমরা তো জানতাম এটা সহজ ট্রেক” বা “আমাদেরকে বলা হয়েছিল এটা ইজি ট্রেক”। এবং অগত্যা তারা খচ্চর খুঁজে বেড়াচ্ছিল যার পিঠে চেপে বাকি ট্রেক কোনোমতে উৎরে দেবে বলে। প্রত্যেকের ফিটনেস লেভেল আলাদা, কারো কাছে KGL বেশ কঠিন, কারো কাছে হাল্কা চাপের। আমি নিজে শরীচর্চায় যুক্ত নই এবং KGL এর আগে Har-ki-Dun, ABC ট্রেক করেছি। তাতে কিন্তু আমার ABC ট্রেক KGL এর থেকে সহজ মনে হয়েছে।

ফ্ল্যাট plataeu দিয়ে হাটতে যতোটা ভালো লেগেছে, বোল্ডার জোন, ৩ টে পাস ক্রস করা, বরফ, বৃষ্টি এই পর্ব গুলোতে ভালো চাপ হয়েছে। রিয়ালাইজ হয়েছে নিজেদেরকে আরো কতো ফিট করে আসা উচিত ছিল। KGL ট্রেকে সবথেকে চাপের যেটা সেটা হলো এখানে রোজই অনেকটা করে রাস্তা কভার করতে হয়। যেটা অন্যান্য ট্রেকে একদিন কম, একদিন বেশী থাকে।
জলভাত ট্রেক ভেবে বা কেবল ছবি দেখে এই ট্রেকে বেরিয়ে পড়লে স্বর্গ দেখতে গিয়ে স্বর্গেও চলে যেতে পারেন! কাজেই, বুঝে।
আপনি KGL কেন যাবেন
সঠিক সময়ে যেতে পারলে, কাশ্মীর গ্রেট লেকস এর সাথেই বাঁকে বাঁকে নতুন নতুন ভ্যালি ওফ ফ্লাওয়ার্স দেখতে পেয়ে যাবেন। চোখ-মন-মাথা জুড়িয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্য প্রতি পদে পদে । লেক, পাস, ভ্যালি, পাহাড়, বোল্ডার, নদী সব নিয়ে সবুজ চাদরে ঢাকা বাস্তবের স্বর্গ এই KGL। আজ অব্দি যত ট্রেক করেছি, এতো নয়নাভিরাম দৃশ্য আগে দেখিনি।
“If there is ever a heaven on earth, it’s here, it’s here, it’s here.”
সকলের প্রতি অনুরোধ, এই বর্ষায় এডভেঞ্চার এর নেশায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকবেন। মনে রাখবেন, জীবন একটাই, আর একটা দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। তাই আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।