পেয়ারা বাজার নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর

যুক্ত করা হয়েছে

থাইল্যান্ড এর ফ্লোটিং মার্কেট আমাদের কাছে অনেক পরিচিত। আমরা অনেক আগ্রহ নিয়ে দেখতে যাই ফ্লোটিং মার্কেট। যারা যেতে পারে না তাদের আক্ষেপ এর শেষ নাই। অথচ নদীমাতৃক এই দেশে যে একটা ফ্লোটিং মার্কেট (ভাসমান পেয়ারা বাজার) আছে সেটা অনেকের অজানা। ২ দেশের ফ্লোটিং মার্কেটের মধ্য তেমন কোন পার্থক্য মনে হয়নি আমার কাছে। যেটুকু পার্থক্য দেখলাম থাইল্যান্ড ট্যুরিজম এর জন্য ফ্লোটিং মার্কেট অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিধায় তারা এটাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে যেটা আমাদের দেশে হয়নি।

এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমাদের দেশে আবার ফ্লোটিং মার্কেট কোথায়?

এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম পেয়ারা বাজার গড়ে উঠেছে ঝালকাঠি, বরিশাল এবং পিরোজপুরের সিমান্তবর্তী এলাকায়। জেলাসমূহের ২৬ টি গ্রামের প্রায় ৩১০০০ একর জমির উপর গড়ে উঠেছে এই পেয়ারা বাগান। এসব যায়গার প্রায় ২০০০০ পরিবার পেয়ারা চাষের সঙ্গে জড়িত। ছোট ছোট নদীর পানির উপরেই গড়ে উঠেছে এই পেয়ারা বাজার, যেখানে প্রতিদিন পেয়ারার হাট বসে। নৌকায় করে শত শত মণ পেয়ারা আসে, আবার নৌকায় করেই কিনে নিয়ে যায় অনেকে। চমৎকার একটি নয়নাভিরাম দৃশ্য, লাইফ স্টাইল ক্যাটাগরির ছবির জন্য চমৎকার একটি জায়গা এটি, সেই সাথে ল্যান্ডস্কেপও পাওয়া যায় প্রচুর।

পেয়ারা এর ফ্লোটিং মার্কেট

এই ফ্লোটিং মার্কেট বা পেয়ারা বাগান নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে, এটা কোথায়? কিভাবে যাবেন? কি কি দেখবেন? কম খরচে কিভাবে যাওয়া যায়? আপনাদের মনের ভিতরে জমা এরকম নানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে। তথ্য সংগ্রহে কোন ভুল থাকলে সেটাও জানাবেন, সংশোধন করে দিব ইন শা আল্লাহ।

প্রশ্নঃ ০১ বরিশালে দেখার মত বা ঘুরার মত কি কি আছে?

উত্তরঃ

বরিশালে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে লঞ্চে যাওয়া আসা। তাই কারো নৌভ্রমণের ইচ্ছে সে সহজে ও কম খরচে এই রুটে লঞ্চে যাতায়ত করতে পারে। এতে অনেক তৃপ্তি পাওয়া যায়।

প্রশ্নঃ ০২
১। বরিশালের লঞ্চ ভ্রমণ কতটুকু নিরাপদ?
২। ঘুর্ণিঝড বা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় বরিশালের লঞ্চ কি ছাড়ে?
৩। পথিমধ্য লঞ্চ ঘুর্ণিঝড়ের কবলে পড়লে লঞ্চ ডুবার সম্ভাবনা আছে কি?

উত্তরঃ

বরিশালে যে কোন সময়েই লঞ্চ জার্নি নিরাপদ। যদি ভয়াবহ পরিবেশ হয় তবে প্রথমত লঞ্চই ছাড়বে না, দ্বিতীয়ত মাঝপথে আবহাওয়া খারাপ হলে তারা নিরাপদ স্থানে নোঙর ফেলবে।

প্রশ্নঃ ০৩
১। বরিশালে যাওয়ার জন্য কোন লঞ্চ বেস্ট?
২। অথবা কোন লঞ্চ নিরাপদ?

উত্তরঃ

বরিশাল রুটের সব লঞ্চই নিরাপদ। তব্রকোন লঞ্চে উঠবেন সেটা নির্ভর করবে ঐদিনের লঞ্চ শিডিউলের উপরে।

প্রশ্নঃ ০৩
১। ভাসমান পেয়ারা বাজার দেখার জন্য উত্তম সময় কোনটা?
২। কোন মাসে গেলে পেয়ারা বাজার দেখতে পাব? বা কয়টা থেকে কয়টার মধ্য গেলে পেয়ারা বাজার দেখতে পাব?
৩। অনেকে বলতেছে সকাল ৮ টার পরে পেয়ারা বাজার ভেঙে যায়। কথাটা কতটুকু সত্য?
৪। শুনলাম ২-১ টা গ্রুপ গত সাপ্তাহে গিয়ে পেয়ারা বাজার দেখতে পায়নি। এর কারণ কি?

উত্তরঃ

ভাসমান পেয়ারা বাজার দেখার সবচেয়ে উত্তম সময় হচ্ছে জুলাই মাসের শেষ থেকে আগষ্ট মাস পর্যন্ত। সাধারণত ভোর ৫ঃ৩০ থেকে ২ টা পর্যন্ত থাকে এই বাজার। তবে যত সকালে বাজারে পৌছা যায় ততই ভাল। বাজারে পেয়ারা ভর্তি নৌকার ভিড় থাকে। সকাল ৯ টার পর থেকে বাজার সংকুচিত হয়ে যায়। মাঝিরা নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। ১২ টা বাজতে বাজতে একিবারে কমে আসে। এবারে পেয়ারা ফলন একটু দেরিতে আসায় হাটে পেয়ারা একটু কম আসতেছে আমিও শুনেছি। তবে আগস্ট মাস থেকে এই সমস্যা হওয়ার কথা না।

প্রশ্নঃ ০৪
ভাসমান পেয়ারা বাজার কোন জেলার কোন থানায় দেখতে পাওয়া যায়?

উত্তরঃ

ভিমরুলি ঝালাকাঠি সদর থানায়
আটঘর-কুড়িয়ানা (Atghar Kuriana) পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি তথা নেছারাবাদ থানায় আর পেয়ারা/সবজি এবং অন্যান্য বাগানের কিছু অংশ বরিশালের বানারিপারা থানায়।

প্রশ্নঃ ০৫
ভাসমান পেয়ারা বাজারের মধ্য কোন বাজারগুলো বেশি জনপ্রিয়?

উত্তরঃ

এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ভিমরুলি (Vimruli), আটঘর (Atghar), কুড়িয়ানা (Kuriana) বাজার।

প্রশ্নঃ ০৬
১। পেয়ারা বাজারে কিভাবে ঘুরা যায়?
২। বাজারে ঘুরার জন্য ট্রলার বা নৌকা? কোনটা বেস্ট?

উত্তরঃ

বাজারে ট্রলার আর নৌকা ২ টাতে ঘুরা যায়। তবে ট্রলার অনেক চিপা-চাপা জায়গায় ঢুকা যায় না, যেটা নৌকাতে খুব সহজে যাওয়া যায়। তাছাড়া নৌকাতে ঘুরতে মজা তবে সময় বেশি লাগে। ট্রলারে সময় কম লাগে৷

প্রশ্নঃ ০৭
১৷ পেয়ারা ছাড়া এখানে আর কোন কোন পণ্যের বাজার বসে?
২। পেয়ারা সিজন শেষ হয়ে গেলে এই বাজার কি হাটগুলো নিরব নিস্তব্দ হয়ে যায়?

উত্তরঃ

মুলত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে পেয়ারা ও আমড়ার সিজন শুরু হয়। পেয়ারা-আমড়ার সিজনে সবচে জমজমাট থাকে এই বাজার। একটু কম হলেও বছরের অন্যান্য সময়ও ব্যস্ত থাকে এই হাট। ফল ছাড়াও এখানের প্রধান পণ্য বিভিন্ন রকম সবজি ও গাছের চারা। তাছাড়া বসে ছোট নৌকার হাট। এখানে পেয়ারা ও আমড়ার দাম অনেক কম, আপনারা চাইলে অত্যন্ত কম খরচে কিনতেও পারবেন।

প্রশ্নঃ ০৮
১। ঢাকা থেকে ভাসমান পেয়ারা বাগান কিভাবে যাব?
২। বরিশাল থেকে স্ব রুপ কাঠি কিভাবে যাব?
৩। চট্রগ্রাম থেকে কিভাবে যাব?
৪। খুলনা থেকে কিভাবে যাব?
৫। লঞ্চ নিরাপদ মনে না হওয়ায় লঞ্চ ছাড়া গাড়িতে যাওয়ার কোন উপায় আছে কি?

উত্তরঃ

ঢাকা থেকে সড়ক ও নৌ পথ দুই ভাবেই যাওয়া যায়।

নৌপথে প্ল্যান ১ঃ

নৌপথে ঢাকা সদরঘাট থেকে প্রতিদিন পিরোজপুর/বরিশাল এর লঞ্চ ও ষ্টীমার ছাড়ে বিকেল ৫ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত। ডেকের ভাড়া ১৫০/২৫০ টাকা আর কেবিন সিঙ্গেল ৭০০/১০০০ এবং ডাবল ১৫০০/২০০০ টাকা। সহজভাবে যাওয়ার জন্য আপনি পিরোজপুরের হুলারহাট গামী লঞ্চে রওনা দিয়ে পরের দিন সকালে স্বরুপকাঠী লঞ্চ ঘাটে নেমে পড়বেন। ডেকে জনপ্রতি ভাড়া ১৫০ টাকা।
এর পর স্বরুপকাঠি পৌছে সেখান থেকে কাছেই নৌকা/ট্রলার ঘাট পাবেন। ট্রলার নিলে ভাল হবে, কম সময়ে বেশি যায়গা ঘুরতে পারবেন। ট্রলার রিজার্ভ ভাড়া ১২০০-১৫০০ টাকা নিবে (সময় ৫/৬ ঘন্টার )।

নৌপথে প্ল্যান ২ঃ

সরাসরি হুলার হাট নেমে চলে যাবেন বানারিপারা। অথবা সরাসরি বানারিপাড়া ও নামতে পারেন লঞ্চে। বানারিপাড়া ট্রলার রিজার্ভ করে নিতে পারেন । ৫০০-৭০০ টাকা ভাড়া নিবে ছোট ট্রলারে আর বড় ট্রলার ১২০০-১৫০০ টাকা। অবশ্যই দামাদামী করে ভাড়া ঠিক করবেন। ট্রলার এখান থেকেই ভিমরুলি,আটঘর ,কুড়িয়ানা সহ আরো অনেক ছোট বাজার ও বাগান ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে।

অথবা নসিমনে ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে যাবেন কুড়িয়ানা। একটু হেটে একটা ব্রীজ পার় হয়ে আবার ইজি বাইকে করে ৫ টাকা ভাড়ায় চলে যেতে পারবেন আটঘর ও কুড়িয়ানা বাজারে।

ঢাকা থেকে সড়কপথে যেভাবে যাবেনঃ

সড়ক পথে ঢাকার গাবতলি থেকে বরিশাল এর বাস ছাড়ে ভাড়া ৪০০ টাকা। এছাড়া আপনি মাওয়া যেয়ে লঞ্চে বা স্পীড বোটে পদ্মা পাড়ি দিয়ে ওপাড়ে যেয়ে বিআরটিসি বাসে করে বরিশাল যেতে পারবেন। বরিশাল এর নতুল্লাবাদ থেকে বাসে অথবা সি এন জি করে যেতে হবে বানারিপাড়া। সি এন জি তে ভাড়া নিবে ৪০/৫০ টাকা। তারপর সেখান থেকে নসিমনে ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে যাবেন কুড়িয়ানা। একটু হেটে একটা ব্রীজ পাড় হয়ে আবার ইজি বাইকে করে ৫ টাকা ভাড়ায় চলে যেতে পারবেন আটঘর ও কুড়িয়ানা বাজারে। আর ভিমরুলি যেতে চাইলে বানারিপাড়া থেকে নৌকা বা ট্রলারে যাওয়াই ভালো।

স্বরুপকাঠি বাস স্ট্যান্ড থেকে বরিশাল গামী বাসে উঠে পড়ুন গুটিয়া মসজিদের উদ্দেশ্যে। ভাড়া ৩০ টাকা। গুটিয়া মসজিদ দেখা শেষ হলে মাহেন্দ্রায় ( ৮ থেকে ১০ জন বসা যায়) করে বরিশাল লঞ্চঘাট চলে আসুন। ভাড়া ২০-৩০ টাকা।

চট্রগ্রাম থেকে যেভাবে যাবেনঃ

চট্রগ্রাম থেকে ট্রেনে বা বাসে চাদপুর আসবেন৷ ট্রেনের ভাড়া ২১৫ টাকা আর বাস ভাড়া ৩৫০ টাকা। ট্রেন ছাড়ে বিকাল ৫ টায়, রাত ১১ টার দিকে চাদপুর পৌছাবে। রাত ১১ঃ৩০ টায় ঢাকা থেকে আসা চাদপুরগামী লঞ্চ ছেড়ে যায়।

খুলনা থেকে যেভাবে যাবেনঃ

খুলনা থেকে বরিশাল বাস ভাড়া ১৮০/২০০ টাকা! সকাল ৬/৭ টায় বাসে উঠলে আসতে আসতে ১/২ টা বাজে! বরিশাল বাস স্টান্ড থেকে স্বরূপকাঠি ভাড়া ৫০/৬০ টাকা! তারপর আপনি নৌকা নিয়ে পেয়ারা বাগান যেতে পারবেন!

প্রশ্নঃ ০৯
বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে গুটিয়া মসজিদ কিভাবে যাব?
লঞ্চঘাট থেকে দূর্গাসাগর কিভাবে যাব?
লঞ্চঘাট থেকে শেরে বাংলার বাড়ি ও জাদুঘর কিভাবে যাব?
লঞ্চঘাট থেকে স্বরুপ কাঠি কিভাবে যাব?
লঞ্চঘাট থেকে চানখা শেরে বাংলার বাড়ি ও জাদুঘর কিভাবে যাব?

উত্তরঃ

  • সদরঘাট থেকে অটো বা সিএনজি তে নথুল্লাবাদ বাস স্টেশন, ভাড়া ১০ টাকা।
  • নথুল্লাবাদ বাস স্টেশন থেকে দূর্গাসাগর ভাড়া ২০ টাকা।
  • নথুল্লাবাদ থেকে গুটিয়া মসজিদ ভাড়া ৩০ টাকা।
  • নথুল্লাবাদ থেকে স্বরুপ কাঠি ভাড়া ৩০-৪০ টাকা।
  • নথুল্লাবাদ থেকে গুয়াচিত্রা, ওখান থেকে রিকশা করে চাখার শের এ বাংলা এর বাড়ি ও জাদুঘর।

ঘুরতে যেয়ে পদচিহ্ন ছাড়া কিছু ফেলে আসবো না,
ছবি আর স্মৃতি ছাড়া কিছু নিয়ে আসবো না।।