বাংলাদেশের বৃহত্তম দ্বীপজেলা ভোলায় বেড়াতে গেলে থাকার জায়গা নিয়ে আগে থেকে পরিকল্পনা না করলে বিপদে পড়তে পারেন। ভোলা সদর থেকে শুরু করে চরফ্যাশন, মনপুরা, চর কুকরি-মুকরি — প্রতিটি এলাকায় থাকার ব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন। কোথায় বিলাসবহুল হোটেল আছে, কোথায় শুধু ডাকবাংলো, আর কোথায় তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটাতে হবে — সব কিছু জেনে তারপর যাত্রা করলে ভ্রমণ হবে নিরাপদ ও আনন্দময়।
ভোলা সদর: সেরা হোটেলগুলোর পরিচয়
ভোলা সদর শহরে থাকার জন্য বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল রয়েছে। বেশিরভাগ পর্যটক ভোলা শহরে রাত কাটিয়ে সেখান থেকে দিনে দিনে বিভিন্ন স্থান ঘুরে আসেন।
দ্য প্যাপিলন হোটেল
ভোলা সদরের উকিলপাড়ায় জামান সেন্টারের (৪র্থ তলা) সদর রোডে অবস্থিত এই হোটেলটি ভোলার সেরা আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি। ১১৯টি সুসজ্জিত কক্ষে রয়েছে এসি, হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াইফাই, ২৪ ঘণ্টা রুম সার্ভিস ও জেনারেটর সুবিধা। পরিবার নিয়ে বা কর্পোরেট ভ্রমণে এটি আদর্শ পছন্দ। রুম ভাড়া প্রায় ৫,৯৮৯ থেকে ৭,০১৩ টাকা। যোগাযোগ: 01777-794773
হোটেল গ্র্যান্ড হলিডেস
মহাজন পট্টি বা সদর রোড এলাকায় অবস্থিত এই আধুনিক হোটেলটি আরামদায়ক পরিবেশ ও চমৎকার সেবার জন্য পরিচিত। স্ট্যান্ডার্ড রুম ২,০০০ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড টুইন ৩,৫০০ টাকা এবং ডিলাক্স রুম ৪,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। যোগাযোগ: 01819-000080
হোটেল বিজু ইন্টারন্যাশনাল
নতুন বাজার এলাকায় হাজি মতিউর রহমান কমপ্লেক্সে (৩য় ও ৪র্থ তলা) অবস্থিত এই হোটেলে রয়েছে ফ্রি ওয়াইফাই, ২৪ ঘণ্টা রুম সার্ভিস এবং নিজস্ব গাড়ি পার্কিং। সিঙ্গেল নন-এসি ৬০০ টাকা, সিঙ্গেল এসি ১,১০০ টাকা এবং ডাবল এসি ১,৮০০ টাকা। যোগাযোগ: 01760-379574
হোটেল এশিয়া ইন্টারন্যাশনাল
সেবা ও নিরাপত্তার মানের দিক থেকে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় এটি সবসময় উপরে থাকে। ভোলা সদরে বিভিন্ন অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্মে ফ্রি ক্যান্সেলেশনসহ এটি বুক করা যায়।
হোটেল জিএম ইন্টারন্যাশনাল
আর প্লাজায় (তালুকদার ভবন) অবস্থিত এই হোটেলে সিঙ্গেল, ডাবল ও ভিআইপি এসি ও নন-এসি রুম রয়েছে। পরিবার ও কর্পোরেট দলের জন্য এটি একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প।
হোটেল নূরজাহান
শহরের মেইন রোডে অবস্থিত এই হোটেলে আবাসন ও রেস্তোরাঁ একই ছাদের নিচে থাকায় এটি বেশ সুবিধাজনক। মানসম্মত দেশীয় খাবার ও সাশ্রয়ী থাকার ব্যবস্থার কারণে বাজেট ভ্রমণকারীদের মধ্যে এটি জনপ্রিয়।
ভোলা সদরের বাজেট হোটেলসমূহ
যারা কম খরচে থাকতে চান তাদের জন্য ভোলা সদর রোড ও চকবাজার এলাকায় বেশ কিছু সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। হোটেল বে আইল্যান্ড, হোটেল জাহান (সদর রোড), রয়েল প্যালেস (মালেক ম্যানশন, চকবাজার), হোটেল আফরোজ (এফআই চৌধুরী প্লাজা, সদর রোড) এবং হোটেল রেইনবো (সদর রোড) — এই হোটেলগুলোতে নন-এসি রুম সাধারণত ৪০০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং এসি রুম ১,২০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় পাওয়া যায়।
চরফ্যাশন: জ্যাকব টাওয়ারের কাছে থাকুন
ভোলার চরফ্যাশনে জ্যাকব টাওয়ার ও চর কুকরি-মুকরি দেখতে গেলে এখানকার হোটেলগুলোতে থাকা সবচেয়ে সুবিধাজনক।
হোটেল মারুফ ইন্টারন্যাশনাল
চরফ্যাশনের সেরা আবাসন হিসেবে এটি ব্যাপক পরিচিত। হোটেলের বিশেষত্ব হলো নির্দিষ্ট কিছু রুম থেকে সরাসরি বিখ্যাত জ্যাকব টাওয়ার দেখা যায় এবং টাওয়ারটি হাঁটা দূরত্বে মাত্র ৫ মিনিটে পৌঁছানো যায়। এখানে রয়েছে রেস্তোরাঁ, কনফারেন্স রুম, কিডস প্লে জোন এবং ২৪ ঘণ্টা রুম সার্ভিস।
কুইন আইল্যান্ড রিসোর্ট
নামে রিসোর্ট হলেও এটি মূলত একটি প্রিমিয়াম আবাসিক হোটেল, যেখানে উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও শান্তিময় পরিবেশে থাকা যায়।
খামারবাড়ি রিসোর্ট
প্রাকৃতিক পরিবেশে নিরিবিলি সময় কাটাতে চাইলে এই রিসোর্টটি একটি চমৎকার বিকল্প। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে সবুজ পরিবেশে এটি অবস্থিত।
বোরহানউদ্দিন: উপজেলায় থাকার ব্যবস্থা
বোরহানউদ্দিন চৌধুরী বাড়ি বা উপজেলার অন্যান্য স্থান দেখতে গেলে বোরহানউদ্দিন সদরে থাকা যায়। এই এলাকায় সবচেয়ে পরিচিত আবাসিক হোটেলটি হলো হোটেল দ্বীপকন্যা, যেটি বোরহানউদ্দিন থানা সংলগ্ন উপজেলা রোডের আমতলায় অবস্থিত। তবে বোরহানউদ্দিনে থাকার সুবিধা সীমিত বলে অনেক পর্যটক ভোলা সদরে রাত কাটিয়ে দিনের বেলা বোরহানউদ্দিন ও সাচড়া ঘুরে ফিরে আসেন।
মনপুরা দ্বীপ: ডাকবাংলো থেকে হোমস্টে
মনপুরায় থাকার ব্যবস্থা অন্য এলাকাগুলোর তুলনায় বেশ ভিন্ন। এখানে আধুনিক হোটেলের বদলে ডাকবাংলো ও সাধারণ আবাসিক হোটেলই মূল ভরসা।
জেলা পরিষদ ডাকবাংলো
হাজিরহাট ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন জোড়া পুকুর পাড়ে অবস্থিত ৪ তলা এই ডাকবাংলোয় রয়েছে ১২টি এসি ডাবল বেডের বারান্দাসহ কক্ষ। এখানে থাকতে হলে আগে থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (UNO) অনুমতি নিতে হয়। কেয়ারটেকার যোগাযোগ: 01718-145583
প্রেস ক্লাব গেস্ট হাউস
হাজিরহাট বাজারে অবস্থিত এটি বুকিং করা তুলনামূলক সহজ এবং পর্যটকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়।
মনপুরার আবাসিক হোটেলসমূহ
হাজিরহাট ও রামনেওয়াজ বাজারে বেশ কিছু সাধারণ মানের বেসরকারি হোটেল রয়েছে। মনপুরা আবাসিক হোটেল (রামনেওয়াজ বাজার, যোগাযোগ: 01740-982479), ইবনে ওয়াসী আবাসিক হোটেল (হাজিরহাট বাজার, যোগাযোগ: 01720-226128), সিয়াম প্লাজা রেস্টহাউস (হাজিরহাট বাজার, যোগাযোগ: 01714-791630) এবং হানিফ আবাসিক হোটেল (হাজিরহাট, যোগাযোগ: 01790-164303) — এই হোটেলগুলোতে সাধারণত ৩০০ থেকে ১,০০০ টাকায় রাত কাটানো যায়।
হোমস্টে
মনপুরায় এখন হোমস্টে সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। হাজিরহাট বাজারে নেমে স্থানীয়দের কাছে জিজ্ঞেস করলে তারা আন্তরিক পরিবারের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। এটি স্থানীয় জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার এক অনন্য সুযোগ।
ক্যাম্পিং
মনপুরা দ্বীপ ক্যাম্পিংয়ের জন্য দারুণ নিরাপদ ও উপযুক্ত। শীতকালে নদীর পাড়ে বা সী-বিচের কাছে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা অনেক ভ্রমণকারীর কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
চর কুকরি-মুকরি: বনের মাঝে রাত
চর কুকরি-মুকরি একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, তাই এখানে থাকার ব্যবস্থা সীমিত। তবে যারা রোমাঞ্চ ভালোবাসেন তাদের জন্য এখানকার থাকার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়।
বন বিভাগের রেস্টহাউস
চর কুকরি-মুকরিতে পর্যটকদের থাকার জন্য বন বিভাগের একটি রেস্টহাউস রয়েছে, যেখানে সাধারণ কক্ষের পাশাপাশি ভিআইপি স্যুটও আছে। এখানে থাকতে হলে আগে থেকে ভোলা বা চরফ্যাশনের বন বিভাগের অফিস থেকে অনুমতি নিতে হয়। রেস্টহাউসের কেয়ারটেকারকে আগেই জানালে তিনি তাজা মাছ ও দেশি মুরগি দিয়ে খাবারের ব্যবস্থাও করে দেন।
ক্যাম্পিং
চর কুকরি-মুকরি ও পাশের তারুয়া সমুদ্র সৈকতে ক্যাম্পিং করা ভোলার অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। শীতকালে (ডিসেম্বর থেকে মার্চ) এটি সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তবে ক্যাম্পিংয়ের আগে অবশ্যই স্থানীয় বন বিভাগ ও পুলিশ ফাঁড়িকে জানিয়ে রাখুন এবং একজন স্থানীয় গাইড সাথে নিন।
এলাকাভেদে থাকার সুবিধা অসুবিধা
ভোলা সদরে থাকলে জেলার কেন্দ্র থেকে সব দিকে যাতায়াত সহজ হয়। এখানে সবচেয়ে বেশি ও সেরা মানের হোটেল পাওয়া যায়।
চরফ্যাশনে থাকলে জ্যাকব টাওয়ার ও চর কুকরি-মুকরি যাওয়া সুবিধাজনক হয়।
বোরহানউদ্দিনে থাকলে চৌধুরী বাড়ি ও আশেপাশের স্থানগুলো সকাল-সকাল ঘুরে আসা যায়।
মনপুরায় থাকলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সেরা দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
চর কুকরি-মুকরিতে থাকলে ম্যানগ্রোভ বনের একেবারে ভেতরে রাত কাটানোর রোমাঞ্চ পাওয়া যায়।
ছুটির মৌসুম বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে ভোলার ভালো হোটেলগুলো দ্রুত বুক হয়ে যায়, তাই আগে থেকে ফোনে বা অনলাইনে বুকিং নিশ্চিত করে যাওয়া জরুরি। মনপুরা ও চর কুকরি-মুকরির ডাকবাংলো ও বন বিভাগের রেস্টহাউসে থাকতে হলে যথাক্রমে UNO অফিস ও বন বিভাগের অনুমতি আগেভাগে নিতে হবে। বর্ষাকালে চর কুকরি-মুকরির কিছু অংশ তলিয়ে যায় এবং ক্যাম্পিং অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তাই শীতকালকেই সেরা সময় হিসেবে বেছে নেওয়া উচিত। চর কুকরি-মুকরিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই বলে পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখা আবশ্যক।
আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক, এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।