অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক – শীতকালীন অভিযানের প্রস্তুতি

জন
১১ মিনিটস

২০১৯ এর মাঝামাঝি স্থির সিদ্ধান্তে এলাম, অন্নপূর্ণা সার্কিট (Annapurna Circuit) শীতকালীন অভিযানে যাবো এবং তাও আবার গাইড পোর্টার ছাড়াই। কিন্তু জানুয়ারি মাসে অন্নপূর্ণা রিজিয়নে ৫৪১৭ মিঃ উচ্চতার থরং লা পাস, গাইড পোর্টার ছাড়া পার করা খুব একটা সহজ কাজ হবে না তা আগে থেকেই বুঝেছিলাম। আজকাল ইন্টারনেট এবং ব্লগিং এর যুগে, ঘরে বসেই থিসিস লিখে ফেলা যায়, যদি উপযুক্ত ধৈর্য থাকে। আমিও বসলাম ল্যাপটপ নিয়ে, নেট প্র্যাকটিসে। শ-খানেক ব্লগ পড়ে ফেললাম। সফলতার নয়, ব্যর্থতার রিপোর্ট গুলোই খুব ভালো করে পড়লাম। বাঙালিদের কাছে অসফলতা এখনও লজ্জাজনক, অভিযান ব্যর্থ হলে নীরব থাকেন বেশীরভাগ, কোনও রিপোর্টও পাওয়া যায়না পাবলিক ফোরামে। তাই বিদেশীদের উপরই বেশি ভরসা করতে হল। সফলতার হার বেশ কম, অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বা অতিরক্ত স্নো-ডিপসিট এর কারণে অনেককেই ফিরে আসতে হয়েছে।

বেশ কিছু আকর্ষণীয় তথ্য পেলাম, যেমন এই থরং লা তেই মৃত্যু হয়েছে চার জন বাঙ্গালীর। প্রবল তুষারপাতে আটকে পড়েছিলেন, আর্মির উদ্ধারকারী দল পৌঁছানো পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেননি। দেশ বিদেশ মিলিয়ে প্রায় ৪০ জন অভিযাত্রীর প্রাণ গিয়েছিল সেবার। শীতকালীন অভিযানে ব্যর্থতার কথা যারা লিখেছেন, তাদের কাছে সারাজীবনই কৃতজ্ঞ থাকব। তাদের লেখা থেকেই একটা ধারণা পেয়ে গেলাম, শীতকালীন অভিযানে কি কি প্রতিকূলতা বা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সে তালিকা চূড়ান্ত হলে নিজের সক্ষমতার মূল্যায়ন করলাম। নাহ, যথেষ্ট নয়, আগামী ছ-মাসে নিজের শরীরকে আরও বেশি করে প্রস্তুত করে নিতে হবে। ছ-মাস ধরে প্রত্যেকটি প্রতিকূলতা এবং কিভাবে অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক এর শীতকালীন অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিলাম।

১. উচ্চাকাঙ্খা, শারীরিক সক্ষমতা এবং নিজের সীমাবদ্ধতা

নিজের সীমাবদ্ধতা একটা ধারণা থাকা সবথেকে বেশি দরকার। খুব বেশি উচ্চাকাঙ্খা এবং সেই অনুপাতে শারীরিক সক্ষমতা না থাকা বারবার পর্বতারোহীদের বিপদ ডেকে এনেছে। ইতিহাস ঘাঁটলে এরকম অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়, যারা এর মূল্য দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে। পর্বতারোহণে শারীরিক সক্ষমতার বিকল্প আর কিছুই হয়না। তার সাথে দরকার আপনার পূর্ব অভিজ্ঞতা। নিজের বায়ো-ডাটা ঘেঁটে দেখলাম শেষ তিন বছরে ৭ বার ৫০০০ মিঃ উচ্চতা আরোহণ করেছি। তার মধ্যে ৫ বার ৫৫০০ মিঃ এর বেশি উচ্চতা এবং শেষ ৬ মাসের মধ্যে তিন বার ৫০০০ মিঃ উচ্চতা আরোহণ করেছি। উচ্চতা নিয়ে সমস্যা নেই, কিন্তু শীতকালীন অভিযানের অভিজ্ঞতা আমার নেই, আর গাইড ছাড়া অভিযানের অভিজ্ঞতাও নেই। তাই শারীরিক সক্ষমতা আরও বাড়ানো দরকার।

সেই দিনই ১০ কিঃমিঃ দৌড়ালাম নিজের অবস্থান বুঝতে, সময় লাগলো ৬৮ মিনিট। এবার নিজের জন্য নিজেই একটি লক্ষ্য স্থির করলাম- ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ১০ কিঃমিঃ দৌড় শেষ করব ৬০ মিনিট এর মধ্যে। পরদিন থেকে প্র্যাকটিস শুরু। এখন রানিং অ্যাপ এবং মোবাইল জি পি এস এর সাহায্যে খুব সহজেই নিজের রানিং ডাটা রেকর্ড করা সম্ভব। প্রতি সপ্তাহে নিজের পারফমান্স অ্যানালাইসিস করে পরের সপ্তাহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতাম। ধীরে ধীরে সময় কমতে শুরু করল। ১৫ই ডিসেম্বর, টাটা স্টিল কলকাতা ম্যারাথন, ১০ কিঃমিঃ এর ফিনিশ লাইন ক্রস করার কিছুক্ষণ পরেই মেসেজ পেলাম, প্রভিসানাল টাইম ৫৮ মিঃ ৫১ সেঃ। তার পরের সপ্তাহে একাল রান, শেষ করলাম ৫৯ মিঃ ১৩ সেঃ। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, লক্ষ্য পূরণ। উপরি পাওনা হিসাবে যেটা পেয়েছি তা হল ‘অ্যাথলিট ব্রাডিকারডিয়া’, অর্থাৎ রেস্টিং পালস রেট কমে নেমে এসেছে ৫৫ এ। চেক লিস্টে প্রথম টাস্কটা ক্রস করলাম।

অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক

২. সঙ্গী নির্বাচন

স্কুলে কোনদিন নিলডাউন হয়েছেন? ক্লাসরুমের বাইরে একা নিলডাউন হওয়া আর বেস্ট ফ্রেন্ড এর সাথে নিলডাউন হওয়ার মধ্যে অনেকটা পার্থক্য। পর্বতারোহণে একজন সঙ্গী থাকা অনেকটা সেরকমই। শরীর যখন একেবারেই ক্লান্ত, এক পা এক পা করে হাঁটু সমান তুষারের মধ্যে দিয়ে শরীরকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তখন সঙ্গে একজন কেউ থাকলে একটু মানসিক জোর পাওয়া যায়।

পাহাড়ে যারা যান তারা সাধারণত তিন ধরনের।

প্রথম

পাহাড়কে ভালবেসে পাহাড়ে যান। প্রচলিত রুটগুলিতে অভিযান করেন। ট্রাভেল ম্যাগাজিন, ট্রাভেল ব্লগ, ট্রাভেল গ্রুপ বা স্বদেশী এভারেস্টার এদের কে ফলো করেন। গ্রুপে পাহাড়ে যাওয়াই পছন্দ। ঘুরে এসে তথ্য দিয়ে অন্যদের উৎসাহিত করেন। অভিযানের আগে এক দু মাস এক্সারসাইস করেন।

দ্বিতীয়

পাহাড় এর উপর একটা ‘অবসেসান’ আছে, সাধারণত ডেয়ারডেভিল। নতুন রুট খুঁজে বার করা, আগে যা কেউ করেনি বা খুব কম লোকজন করেছে এরকম অভিযানই এদের পছন্দ। ভালো ব্লগ লেখেন, যা বাকিদের ইনফরমেসান দিয়ে খুব সাহায্য করে। বাইরের দেশের নামকরা পর্বতারোহীদের সব আপডেট এদের কাছে থাকে। সারাবছর রানিং সাইক্লিং এসব আক্টিভিটিস এর সাথে যুক্ত থাকেন। কেউ একা, কেউ এক জন বা দুজন সঙ্গীর সাথে পাহাড়ে যান।

তৃতীয়

এরা কেন পাহাড়ে যান ঠিক জানা নেই। আধপাগল গোছের। বাইরের পর্বতারোহণ দুনিয়ার সাথে কোনও সম্পর্ক রাখেন না, নতুন টেকনোলজিতে বড়ই অনীহা থাকে। ব্লগ বা ম্যাগাজিন পড়াশোনা সেইভাবে করেন না। নিজের দুনিয়াতে নিজেই মশগুল থাকেন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েও অন্যকে উৎসাহিত সেভাবে করেন না। রানিং বা সাইক্লিং ইত্যাদিতেও এনাদের একটু অনীহা থাকে। সাধারনত এরা ফটোগ্রাফি করতে ভালবাসেন ও কেউ কেউ খুব ভালো ছবিও তোলেন।

তিনটি ক্যাটেগরির মধ্যে আমার দ্বিতীয় ক্যাটেগরির কাউকে দরকার ছিল। যার মধ্যে অভিযানের নেশা থাকবে, অ্যাডভেঞ্চার এর খিদে থাকবে। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ নিজের চাকরি, পরিবারের উপর দায়িত্ব এসব ম্যানেজ করেও প্রতিদিন কিছুটা সময় দিতে পারবে নিজের ফিটনেস এর জন্য। আগেই বলেছি এধরনের অভিযানে ফিটনেস সবথেকে বেশি দরকারি। তারসাথে আপনার এবং সঙ্গীর মধ্যে বন্ডিং থাকাটাও জরুরি। অর্থাৎ দুর্ঘটনা হলে বা অসুস্থ হয়ে পড়লে সে আপনাকে রেখে চলে যাবে না, রেস্কিউ এর যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। অসুস্থ সঙ্গীকে ফেলে রেখে চলে এসেছে বাকি সদস্যরা, উদ্ধারকারী দল গিয়ে পেয়েছে তার মৃতদেহ, এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে হিমালয়ের বুকে। অভিযানের সব সদস্যদের মধ্যে বন্ডিং বাড়াবার জন্য সাধারণত অভিযানের আগে কয়েকটি গ্রুপ আলোচনা এর আয়োজন করি, পরস্পর পরস্পরের সাথে যাতে একটা মানসিক বোঝাপড়া তৈরি হয়।

লিডারের হাতেই সব কিছু ছেড়ে না দিয়ে দায়িত্ব ভাগ করে দি টিম মেম্বার দের মধ্যে, তাতে একটা টিমগেম এর মানসিকতা তৈরি হয়।

সঙ্গী হতে হবে আপনার সমকক্ষ, আপনি হাঁটছেন সামনে আর সঙ্গী আপনার ২ কিঃমিঃ পিছনে, তাতে এই ধরণের অভিযান করা অসুবিধাজনক। যাদের সাথে আমি নিয়মিত পাহাড়ে যাই তাদের মধ্যে একজনই এই প্রস্তাবে রাজী হল, সুদীপ। বর্তমানে সে মেদিনীপুর মেডিকাল কলেজের মেডিসিন ডিপারমেন্ট এর পোস্ট গ্রাজুয়েট ট্রেনি। জিজ্ঞাসা করলাম হসপিটাল ডিউটি করেও নিজের ফিটনেস এর উপর সময় দিতে পারবি? বলেছিল হ্যাঁ পারব। কথা রেখেছিল, ১২ ঘণ্টা হসপিটাল ডিউটি করে এসেও রাত ১১ টায় কাছের একটা মাঠে যেত দৌড়াতে। প্রথম দিকে বাজে কিছু অভিপ্রায় আছে ভেবে নাইট গার্ড বার করে দিয়েছে মাঠ থেকে, এরকম ঘটনাও আছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সুদীপও পেস ৬ এর নিচে নামিয়ে আনে। যারা বলেন অফিস, পরিবার সামলে শরীরচর্চার সুযোগ হয়ে ওঠেনা, সুদীপ একটা উদাহরণ হতে পারে তাদের কাছে। ৫০০০ মিঃ এর বেশি উচ্চতা আরোহণ করেছে ২বার, সর্বোচ্চ ৫৭১৭ মিঃ, সব দিক থেকে যোগ্য সঙ্গী। দ্বিতীয় টাস্ক কমপ্লিট।

অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক
মানাং ভিলেজ থেকে ইয়াক খারকা যাওয়ার পথে তোলা।

৩. সারভাইভাল

সহজ ভাষায় বলা যায়, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতি তে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা’। যতক্ষণ না আবহাওয়া অনুকূল হচ্ছে বা রেস্কিউ টিম এসে পৌছাচ্ছে। ২০১৪ সালের অক্টোবর মাস ছিল নিঃসন্দেহে অন্নপূর্ণা সার্কিট এর ইতিহাসে সবথেকে ভয়াবহ দিন। ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৪-৫ ফুট স্নো ডিপোজিসান হয়ে যায়, মৃত্যু হয়েছিল ৪০ জন অভিযাত্রীর। শীতকালীন অভিযানে এই ধরণের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা স্বাভাবিক ভাবেই বেশি। এই অভিযানে প্রথমেই দরকার নেভিগেসান এবং ম্যাপ, কারণ আমাদের এই অভিযানে কোনও গাইড থাকবেনা, বিপদ হলে সাহায্য করার কেউ থাকবেনা। সাহায্য নিলাম গুগল আর্থ, গুগল ম্যাপ (অফলাইন) এবং ‘ম্যাপস মি’ এর। গুগল আর্থ এর থ্রি ডি ম্যাপে যাত্রাপথ, উচ্চতা, টি হাউস গুলির পজিসান সব কিছুর ধারণা তৈরি হল। অফলাইন গুগুল ম্যাপে দরকারি মার্ক করে নিলাম। ম্যাপ মি তে ট্রেল গুলো খুব ভালো করে বুঝে নিলাম, কারণ এটি ইন্টারনেট এবং মোবাইল টাওয়ার ছাড়াও জি পি এস এর মাধ্যমে আপনার লোকেসান ম্যাপে দেখিয়ে দেবে। সামনে কোথায় টি হাউস পাবেন, কোন রাস্তা ধরলে সুবিধা হবে, ওয়াটার সোর্স, সব ম্যাপই বলে দেবে। ফোন এয়ারপ্লেন মোড এ রেখে কলকাতার অলি গলি ঘুরে একবার ট্রায়াল দিলাম, ইন্টারনেট এবং মোবাইল টাওয়ার ছাড়াও অফলাইন ম্যাপ কাজ করছে কিনা। সসম্মানে ম্যাপস মি সে পরীক্ষায় পাস করল।

আর একটি জিনিস নজরে এল, হাই ক্যাম্প থেকে থরং লা হয়ে মুক্তিনাথ পর্যন্ত রাস্তায় অনেকগুলি টেম্পোরারি শেলটার বানিয়েছে নেপাল গভর্নমেন্ট। স্যাটেলাইট ইমেজ আর ম্যাপস মি এর সাহায্যে প্রত্যেকটি শেলটার এর পজিসান মার্ক করলাম। বিপদে পড়লে ম্যাপ এর সাহায্যে তাড়াতাড়ি সবথেকে কাছের শেলটার এ মুভ করব, মাথায় ছাদ থাকলে প্রাণ তো বাঁচবে। বাঁচার জন্য আর প্রয়োজন খাদ্য জল ওষুধ। দুজনেরই পেশা ডাক্তারি, তাই ওষুধ নিয়ে সমস্যা নেই। ফার্স্ট এড নিয়েও সমস্যা নেই। ঠিক করলাম ব্যাগে থাকবে কিছু শুকনো খাবার, গ্লুকোস, যা দিয়ে একটা দিন চালিয়ে দেওয়া যাবে। আর থাকবে এক্সট্রা জলের বোতল, অবশ্যই স্লিপিং ব্যাগ – তাতে হাইপোথারমিয়া আটকানো যাবে। তুষার ঝড় এর মধ্যে ৫০০০ মিঃ বেশি উচ্চতায়ে যারা আটকা পড়ে যান, বেশীরভাগ মৃত্যু হয় হাইপোথারমিয়ায়। আপনি একা জানলে হবে না, সঙ্গীরও নলেজ চাই। ম্যাপ এর উপর দু একটা গ্রুপ ডিস্কাসান এর পর আশ্বস্ত হলাম, সুদীপের ম্যাপের নলেজ যথেষ্ট। এবার দরকার হার্ড কপি, হঠাৎ যদি মোবাইল হারিয়ে যায় তখন কি করবেন? ক্যাম্প গুলির নাম উচ্চতা, দূরত্ব, শেলটার, সমস্ত ডাটার প্রিন্ট আউট নিলাম। তৃতীয় টাস্ক মার্ক করলাম ডায়েরিতে।

৪. তাপমাত্রা

পাহাড়ে উচ্চতা জনিত কোন রোগে আক্রান্তর সংখ্যা সবথেকে বেশি? আসমুদ্র হিমাচল একটাই উত্তর দেবে, AMS বা Acute Mountain Sickness । আপনি রসগোল্লা পেলেন, সঠিক উত্তর ‘Hypothermia’। সহজভাবে বললে শরীর এর তাপমাত্রা স্বাভাবিক তাপমাত্রার থেকে নেমে যাওয়া, জ্বর হওয়ার উল্টোটা বলতে পারেন। AMS বড়ই সুবোধ বালক। হাইপোথারমিয়া, ডিহাইড্রেসান সব কিছুকে আমরা AMS এর নামে দোষ দিয়ে চালাই, আর সে নিরবে তা সহ্য করে। অনেকটা বাঙ্গালী তথা ভারতীয়দের এক্সপিডিসান এ ‘আবহাওয়া’ এবং ‘শেরপা’ এর মতো। যাই হোক না কেন, বিফলতার দোষ শেষ পর্যন্ত এদের ঘাড়ে গিয়েই পড়ে। এক্সপিডিসান রিপোর্ট যতটুকু ঘেঁটেছি তাতে আমি একপ্রকার নিশ্চিত যে আমাদের পর্বতারোহণে Inadequate Physical fitness বা Inadequate Planning বলে কিছু হয়না। হয় আবহাওয়া খারাপ হয়, না হলে শেরপারা অসহযোগিতা করে। যাইহোক এসব তাত্ত্বিক আলোচনাতে না যাওয়াই ভালো। দুঃখজনক ভাবে হাইপোথারমিয়া সম্বন্ধে এখনও সাধারণ পর্বতারোহীরা অতটা সচেতন হয়ে উঠতে পারেননি। অথচ পাহাড়ে এর থেকে নিঃশব্দ ঘাতক আর দুটি নেই।

একটি উদাহরণ দি, আমার জীবনের প্রথম হাই অল্টিটিউড ট্রেক। প্রথম দিন, সবে মাত্র সন্ধ্যে হয়েছে, একটা মোটা জ্যাকেট গায়ে চাপাতে যাব, বেশ ঠাণ্ডা লাগছে। এক দাদা হাঁ হাঁ করে দৌড়ে এলেন, ‘আরে করছিসটা কি। ট্রেক এর প্রথম দিন হাল্কা কিছু পরে থাক’।-‘কিন্তু ঠাণ্ডা লাগবে যে’।-‘প্রথম দিন কম কিছু পরে ঠাণ্ডাটা সয়ে নিতে হয়, আক্লিমাটাইজেসানে সাহায্য করে’।এসেই পড়াশোনা শুরু করলাম। ডাক্তারি পেশা হওয়ার সুবাদে অনেক স্টাডি মেটিরিয়াল ঘাঁটার সুযোগ পেলাম। কিন্তু যা তথ্য পেলাম- ‘কম গরম জামা কাপড় পরে ঠাণ্ডায় কাঁপার সাথে আক্লিমাটাজেসান এর কোনও সম্পর্ক নেই, উলটটা হতে পারে’। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। আপনি যদি ভাবেন ঠাণ্ডার দেশে গিয়ে টি-শার্ট পরে কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে আপনি তাতেই অভ্যস্ত হয়ে যাবেন, সেটি হবেনা- কিন্তু কখন যে অসুস্থ হয়ে পড়বেন, ধরতেই পারবেন না। অর্থাৎ এক্সারসাইস করলে আপনার মাসল বাড়বে, পাওয়ার বাড়বে, কিন্তু ঠাণ্ডার ক্ষেত্রে সেটি হবেনা। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট। এই তাপমাত্রায় শরীরের সব অঙ্গ প্রতঙ্গ সঠিক ভাবে কাজ করে। যতই জিরো পয়েন্ট এ গিয়ে গায়ের জামা খুলে কাঁপতে কাঁপতে বন্ধুদের সাথে হিরো হওয়ার ছবি তুলুন না কেন, শরীর এর থেকে কম তাপমাত্রায় নিজের সব অঙ্গ প্রতঙ্গকে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করানোর কাজটি কিছুতেই শিখতে পারবেনা।

অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেক
ইয়াক খারকা থেকে থরাং ফেডির পথে তোলা

Don’t be a gamma in a land of lama, অর্থাৎ ঠাণ্ডা লাগলে গরম জামা পরুন, অযথা হিরোগিরি দেখাবেন না। এতকিছু বলার কারণ তাপমাত্রা একটি বড় মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। জানুয়ারি মাসে অন্নপূর্ণা সার্কিট এর ওয়েদার ফোরকাস্ট এ দেখলাম উপরের ক্যাম্পগুলিতে দিনের বেলা ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ২-৩ ডিগ্রী। আর রাতের বেলা মাইনাস ২০-২৫ পর্যন্ত নামতে পারে। এই একটি জিনিসে আগে থেকে প্রস্তুত হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। নিজেদের ফেদার জ্যাকেটগুলো শুধু চেক করে নিলাম। জানুয়ারি মাসে থরং লা পাস পেরোতে গেলে ফেদার জ্যাকেট ছাড়া যাওয়ার সাহস না দেখানোই ভালো। ঠাণ্ডা কম লাগানোর অভ্যাস করানোর উপায় না থাকায় ভাবলাম নিজের শরীরকে দু একবার ভয় দেখালে মন্দ কি? ডিসেম্বর মাসের ঠাণ্ডায় একদিন কম্বল পাশের ঘরে রেখে এসে শুধু মাত্র বেড শিট গায়ে দিয়ে ঘুমালাম। যথারীতি মাঝরাতে কম্পনরত অবস্থায় ঘুম ভাঙল। কিন্তু আধো ঘুম এর মধ্যে পাশের ঘর থেকে কম্বল নিয়ে আসা অনেকটা চম্বল থেকে ডাকাত দস্যুকে ধরে আনার মতো শক্ত কাজ। আবার বেড শিট গায়ে ঘুমানোর চেষ্টা, শেষ পর্যন্ত ভোররাতে আর শীত সহ্য করতে না পেরে, শিট ফেলে পাশের ঘর থেকে কম্বল নিয়ে আসা। এরকম করেছি দু একদিন, কোনও মেডিকাল ভিত্তি নেই, আপন খেয়ালে করা। দয়া করে অনুকরন করতে যাবেন না, কম্বল নিয়ে আরামে ঘুমান। আর এক অদ্ভুত খেয়াল চাপল, শীত কালের বৃষ্টিকে কাজে লাগালে কেমন হয়। শেষ ডিসেম্বরে যতদিন বৃষ্টি হয়েছে রানিং ট্রাকসুট পড়ে রাত ১১ টায় দৌড়াতে বেরিয়েছি, শুরুটা কষ্ট হতো, কিন্তু শরীর গরম হতে শুরু করলে আর বিশেষ কষ্ট হতো না, দরকার মতো স্পীড বাড়িয়ে নিতাম। তারপর ভিজেবেড়াল হয়ে যখন এপার্টমেন্ট এর সামনে এসে রানিং স্টপ করতাম, আহা সে যে কি সুখানুভূতি। কাঁপতে কাঁপতে কোনও রকমে চাবি খুলে গা মুছে স্লিপিং ব্যাগ এর ভিতর। ফ্লাক্সে গরম স্যুপ আগে থেকে রেখে যেতাম। আবার বলছি এর থেকে কোনও উপকার পাবেন না কিন্তু, অসুস্থ হলে খামকা আমাকে খিস্তাবেন না। যাইহোক ঠাণ্ডার প্রস্তুতি শেষ, চতুর্থ টাস্কটি মার্ক।

৫. ইকুইপমেন্ট

জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানো বাঙ্গালীর চিরকালীন অভ্যাস। অর্থাৎ কোনও জিনিস নেই, বিকল্প দিয়ে কাজ চালাও হে। কিন্তু পাহাড়ে করেছেন কি মরেছেন, বিশেষত শীতকালীন অভিযানে। যাওয়ার আগে প্রত্যেকটি ইকুইপমেন্ট ভালভাবে চেক করুন, জুতোর ফিতে পর্যন্ত। জুতোর সুকতলাও একবার টেনে দেখে নিন, খুলে আসছে কিনা। বিশেষত যদি সে জুতোয় তিন চারটি ট্রেক হয়ে গিয়ে থাকে। এক্সট্রা জুতোর ফিতে সঙ্গে রাখুন, ফেবি কুইক সঙ্গে রাখুন। খুব সামান্য জিনিস কিন্তু খুব কাজের। স্লিপিং ব্যাগ, জ্যাকেট, গ্লাভস ভালো ভাবে নিশ্চিত হন যে মাইনাস ২০ ডিগ্রীতে তা কাজ করবে। আগের বছরই উপযুক্ত গ্লাভস নিয়ে না যাওয়ায় বাংলার একটি অভিযাত্রী দলের অনেকগুলি তরুণ সদস্যের তুষারক্ষতে হাতেরও পায়ের আঙ্গুল বাদ যায়, যা তাদেরকে সারা জীবনের মতো পঙ্গু করে দিয়েছিল। ফ্রস্টবাইট, এমন একটি জিনিস একবার হয়ে গেলে সারাজীবন এর মাসুল গুনতে হবে।

অনেকগুলি ব্লগ পড়লাম, কি কি জিনিস অত্যাবশ্যকীয় তা জানতে। যেমন এক ফ্রেঞ্চ দম্পতি শীতকালীন অভিযানে এসেছিলেন ক্রাম্পন ছাড়া। থরাং ফেডি থেকে তাদের মানাং পর্যন্ত ফিরে আসতে হয়েছিল ক্রাম্পন না থাকায়। মানাং এ ক্রাম্পন পেয়ে তারা আবার যাত্রা করেন পাসের দিকে। আরও পড়লাম, সাধারণ জলের বোতল যারা নিয়ে উঠেছিলেন পাস ক্রস করার সময় তারা প্রত্যেকেই পাসের উপর বোতল বার করে ভিতরে জমাট বাঁধা বরফ পেয়েছেন। ইকুইপমেন্ট লিস্টে ক্রাম্পন যুক্ত করলাম, তার সাথে থার্মাল ফ্লাক্স। এই প্রতিবেদনের শুরু তেই বলেছিলাম ব্যর্থতার রিপোর্ট পড়ুন। ভুল করেছিলেন তারা, সেই সুযোগে আমি নিজের ভুল শুধরে ফেললাম, যাত্রা করার আগেই। বাস্তবে ট্রেক শুরু করে বুঝেছিলাম, ক্রাম্পন নিয়ে না আসলে পিসাং থেকেই ফিরে আসতে হতো আমাদের। যাইহোক বারবার নিজের ইকুইপমেন্ট চেক করে পঞ্চম টাস্কটিতে মার্ক করলাম।

এই লেখাটি আর দীর্ঘায়িত করবো না। সবশেষে এটুকু বলব, যেখানে যাচ্ছেন সেই জায়গার কালচার, সেখানের মানুষদের সম্মন্ধে কিছু অন্তত জেনে যান, রাস্তায় অনেক বন্ধু বানাতে পারবেন। যে শহরে থাকবেন সেই শহর সম্মন্ধে জানুন। এক ট্রাভেল গ্রুপে পড়ছিলাম এক দম্পতির ট্রাভেল এজেন্ট তাদেরকে ভারতবর্ষের কোনও এক হোটেলে রেখে পালিয়ে যান। দম্পতি শহরের নামটাও ঠিক করে জানতেন না। লিখেছেন ‘কি করে ফিরেছি শুধু ভগবানই জানেন’। ট্রাভেল এজেন্টকে মোটা অঙ্কের চেক ধরিয়ে সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তার সাথে পর্বত অভিযানে গিয়েও এজেন্সির বিল মিটিয়ে ‘শেরপা সামিট করিয়ে দেবে’ এই ধারণা তৈরি করে আপনার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। পরিশ্রম করুন, করে নিজের উপর বিশ্বাস গড়ে তুলুন, পরনির্ভরশীল যতই কম হবেন ততই আপনার জন্য মঙ্গল। আপাতত এখানেই শেষ, অন্নপূর্ণা সার্কিট শীতকালীন অভিযানের বর্ণনা পরে লেখার ইচ্ছা আছে।