পোড়াবাড়ীয়া মেলা

পোড়াবাড়ীয়া মেলা

০
জন
ধরন ইভেন্ট
পড়ার সময় ৬ মিনিটস
তারিখ বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৭ – মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৭
অবস্থা আসন্ন
আয়োজনস্থল পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য লোকজ উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী মেলা, যেগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের সংস্কৃতি, আবেগ এবং শিকড়ের সাথে গেঁথে আছে। এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা হলো কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার নারান্দী ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত পোড়াবাড়ীয়া বৈশাখী মেলা (Porabaria Boishakhi Mela)। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে এই মেলা বসে আসছে এবং এটি আজও স্থানীয় মানুষের কাছে কেবল একটি মেলা নয়, এটি তাদের পরিচয়, তাদের উৎসবের প্রাণ।

কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলা একটি ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ জনপদ। ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই অঞ্চলের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম বীরপুরুষ মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁর ঐতিহাসিক স্মৃতি। এখানকার ‘এগারসিন্দুর’ দুর্গ ও বন্দর একসময় ছিল মোগল ও স্থানীয় শাসকদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নীরব সাক্ষী। মোগল আমলের টেরাকোটা স্থাপত্যে সমৃদ্ধ শাহ মাহমুদ মসজিদ ও সাদী মসজিদ আজও পাকুন্দিয়ার প্রাচীন গৌরবের সাক্ষ্য বহন করে। এমন ইতিহাস-সমৃদ্ধ মাটিতেই পাকুন্দিয়ার নারান্দী ইউনিয়নের পোড়াবাড়ীয়া গ্রামে শত বছর ধরে বেঁচে আছে এই অসাধারণ বৈশাখী মেলা।

মেলার উৎপত্তি: চিল পূজার কিংবদন্তি

পোড়াবাড়ীয়া মেলার ইতিহাস খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় এক মনোমুগ্ধকর লোকজ কিংবদন্তি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মধ্যযুগে এই এলাকার হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ‘চিল পাখি’কে দেবতার মর্যাদা দিতেন। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে পোড়াবাড়ী নামক এই স্থানে তারা ‘চিল পূজা’ আয়োজন করতেন। পূজাকে কেন্দ্র করে আশেপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামত সেই স্থানে। ধীরে ধীরে এই বিপুল জনসমাগমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে পণ্য বেচাকেনার আসর, মানুষের আনন্দ-উৎসবের জায়গা — যা একসময় পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রামীণ মেলার রূপ নেয়।

কালের আবর্তে চিল পূজার প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু সেই পূজাকে ঘিরে জন্ম নেওয়া মেলাটি থেমে থাকেনি। বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার জোরে মেলার কলেবর ক্রমশ বেড়েছে। ধর্মীয় আচারের গণ্ডি পেরিয়ে এটি পরিণত হয়েছে এক সর্বজনীন, অসাম্প্রদায়িক উৎসবে, যেখানে হিন্দু-মুসলিম সকলে একই আনন্দে মেতে ওঠেন।

‘পর্বী’ প্রথা

পোড়াবাড়ীয়া মেলাকে অন্য সব মেলার চেয়ে আলাদা এবং বিশেষ করে তোলে একটি অনন্য পারিবারিক ঐতিহ্য, যা স্থানীয় ভাষায় পরিচিত ‘পর্বী’ বা ‘পরবী’ নামে। মেলা শুরুর আগেই এই অঞ্চলের বিবাহিত মেয়েরা তাঁদের স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। মেলার দিন শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে জামাইয়ের হাতে মেলার খরচের জন্য বিশেষভাবে টাকা তুলে দেওয়া হয় — এই টাকাকেই বলা হয় ‘পর্বী’। জামাই সেই পর্বীর টাকা নিয়ে মেলায় যান, কেনাকাটা করেন, পরিবারের সবার জন্য মিষ্টি-খাবার ও খেলনা নিয়ে আসেন এবং আনন্দ-উৎসবে মাতেন।

এই প্রথাটি কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়; এটি একটি পারিবারিক উষ্ণতার প্রতীক। শ্বশুর-জামাইয়ের সম্পর্ককে আরও গভীর ও আন্তরিক করে তোলার এই লোকজ রীতি পোড়াবাড়ীয়া মেলার সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনাই করা যায় না। প্রতিটি পরিবারে মেলাকে ঘিরে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়, তার পেছনে এই ‘পর্বী’ প্রথার অবদান অনস্বীকার্য।

মেলার পসরা: গ্রামীণ জীবনের বর্ণিল প্রদর্শনী

পোড়াবাড়ীয়া মেলার মাঠে পা রাখলে চোখে পড়ে গ্রামীণ বাংলার এক বর্ণিল জীবনচিত্র। একদিকে সারি সারি মাটির হাঁড়ি-পাতিল, রঙিন মাটির পুতুল ও শিশুদের মাটির খেলনার দোকান; অন্যদিকে বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী। কাঠের তৈরি আসবাবপত্র থেকে শুরু করে কসমেটিকস, পোশাক-পরিচ্ছদ, কৃষি উপকরণ — সব মিলিয়ে মেলাটি হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ বাজার।

মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণের একটি হলো ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মিষ্টান্ন ও খাবারের সমাহার। বিশাল কড়াইয়ে ভাজা মচমচে জিলাপি, মোয়া, কদমা, বাতাসা, নিমকি — এসব খাবারের সুবাস মেলার পরিবেশকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত। স্থানীয় কারিগরদের হাতে তৈরি নানা পণ্য মেলায় বিক্রি হওয়ার কারণে এটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিনোদনের আসর: লোকজ সংস্কৃতির মেলবন্ধন

পোড়াবাড়ীয়া মেলা কেবল কেনাকাটার জায়গা নয়, এটি গ্রামীণ বিনোদনের এক প্রাণবন্ত কেন্দ্রও বটে। মেলায় স্থাপিত চরকি বা নাগরদোলায় শিশু-কিশোরদের উৎসাহী ভিড় মেলাকে দেয় একটি উৎসবমুখর রূপ। সন্ধ্যা নামলেই মেলার এক প্রান্তে বসে বাউল গানের জমজমাট আসর। একতারার সুর আর বাউলের কণ্ঠে গ্রামীণ বাংলার দর্শনচর্চার সেই গান শুনতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন সংগীতপ্রেমীরা। পালাগান ও লোকগীতির আসরও মেলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ।

এই বিনোদনের আসরগুলো কেবল আনন্দের উপকরণ নয়; এগুলো বাংলার শতবর্ষী লোকজ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি অকৃত্রিম প্রচেষ্টাও। আধুনিক বিনোদন মাধ্যমের ঢেউ এসে লাগলেও পোড়াবাড়ীয়া মেলার মাঠে বাউল গানের আসরে মানুষের ভিড় এখনো বলে দেয়, গ্রামের মানুষ তার শিকড়কে ভোলেনি।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

পোড়াবাড়ীয়া মেলার সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই মেলা যে কেবল পণ্য বেচাকেনার সুযোগ তৈরি করে তা নয়; এটি হিন্দু-মুসলিম সকল ধর্মের মানুষের এক অসাম্প্রদায়িক মিলনস্থলে পরিণত হয়। বছরের পর বছর ধরে এই মেলা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও ধর্মের মানুষকে একই ছাদের নিচে এনে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ববোধকে সুদৃঢ় করে আসছে। মেলাকে ঘিরে যে পর্বীর প্রথা চালু আছে, তা পারিবারিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে এবং নতুন প্রজন্মকে তাদের পূর্বপুরুষের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

স্থানীয় কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্পীদের জন্য পোড়াবাড়ীয়া মেলা বছরের অন্যতম সেরা আয়ের সুযোগ। মাটির পুতুল তৈরির কারিগর থেকে শুরু করে বাঁশ-বেতের শিল্পী পর্যন্ত — সকলেই এই মেলার অপেক্ষায় থাকেন। ফলে মেলাটি কেবল সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, এলাকার ক্ষুদ্র অর্থনীতির একটি সজীব ধমনীও বটে।

পোড়াবাড়ীয়া মেলা কখন অনুষ্ঠিত হয়?

প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ, অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন (সাধারণত ১৪ই এপ্রিল) থেকে এই মেলা শুরু হয় এবং প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত চলে। মেলা শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই পোড়াবাড়ীয়া ও আশেপাশের গ্রামগুলোয় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। দোকানদাররা তাঁদের পসরা নিয়ে আসতে শুরু করেন, আর মানুষের মনে জমতে থাকে প্রতীক্ষার আনন্দ।

বর্তমানে এই মেলা শুধু পাকুন্দিয়া বা কিশোরগঞ্জ জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পার্শ্ববর্তী নরসিংদী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলা থেকেও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই মেলায় অংশ নিতে আসেন। বৈশাখের উত্তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের এই ছুটে আসা প্রমাণ করে যে, পোড়াবাড়ীয়া মেলা এখন শুধু একটি স্থানীয় উৎসব নয়, এটি গোটা অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ের উৎসব।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাংলাদেশের অনেক গ্রামীণ মেলা আজ হারিয়ে গেছে বা তার মূল চরিত্র হারিয়েছে। কিন্তু পোড়াবাড়ীয়া মেলা সেই স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এখনো তার লোকজ সত্তা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে এই মেলার মাঠে মানুষের ঢল, পর্বীর টাকা হাতে জামাইয়ের হাসি মুখ, বাউলের গান আর শিশুর নাগরদোলায় ওঠার আনন্দ মিলিয়ে যে চিত্রটি তৈরি হয়, তা যেন বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ জীবনেরই একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

মেলার এই ধারাবাহিকতা রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, সংস্কৃতিকর্মী এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। পোড়াবাড়ীয়া মেলা যেন শুধু একটি মেলা হিসেবে না থেকে, একটি সজীব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায় — এটাই এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা। চিল পূজার সেই প্রাচীন ঐতিহ্য থেকে শুরু হয়ে শত বছরের পথ পাড়ি দিয়ে পোড়াবাড়ীয়া মেলা আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা সত্যিই গ্রামীণ বাংলার সংস্কৃতির এক অহংকারের স্থান।

গন্তব্য

Porabaria, মেলা বাজার, Pakundia, বাংলাদেশ

পথ ও দিকনির্দেশ দেখতে ম্যাপ খুলুন।

গুগল ম্যাপে দেখুন

ADAR BEPARI / TRAVEL WEAR

ভ্রমণের গল্প থাকুক পোশাকেও।

সব টি-শার্ট দেখুন