ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স – ফুলের দেশে

যুক্ত করা হয়েছে

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স নামটার সাথে পরিচয় ২ বছর আগে, আমার এক বন্ধুর দৌলতে। সে ট্রেকিং এ অভ্যস্ত। কিন্তু জায়গাটার এতো সুনাম শোনা সত্বেও যাওয়ার দুঃ সাহস করতে পারি নি, কারণ আমি তো একটু চড়াই তে উঠতে গেলেই হাঁপাই। তবুও ঠিক করলাম একবার ট্রেক লাইফে করতেই হবে। Husband ছাড়া আমার আরেক ভ্রমণসঙ্গী Jayasree Paul হঠাৎ বললো চলো কোথাও ঘুরে আসি। আমার তো ঘোরার ব্যাপারে না করা পাপ। প্রথমে ঠিক হলো ভুটান, তারপর দরিংবারি। কিন্তু জুলাই মাস হিসেবে এগুলো ভালো অপশন নয়। অবশেষে google মামার সাহায্য নিলাম। দেখলাম, valley of flowers দারুন অপশন এই সময়ের জন্য। সাথে সাথে টিকিট কেটে নেওয়া হলো। ২ জন তাই নিজেরা যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে ট্রাভেলস এর সাথে যোগাযোগ করলাম।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স

১৩ই জুলাই যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমেই ট্রেন ২ ঘণ্টা পর ছাড়লো। শেষ পর্যন্ত সেটাই ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট এ দাঁড়ালো। আমার বন্ধুর খুব ইচ্ছে ছিলো সূর্যাস্ত দেখবে, কিন্তু ১০ মিনিট এর দেরি হওয়ার জন্য সেটা সম্ভব হলো না। যদিও ওখানে ৭-৩০ এ সূর্যাস্ত হল। আগে থেকে হোটেল বুকিং ছিলো না, তাই একটু খোঁজাখুঁজি করে স্টেশন থেকে প্রায় ১ কিমি দূরে হোটেল নিলাম। হোটেল পৌঁছে জিনিসপত্র রেখে গঙ্গার ঘাটে চল্লাম। ততক্ষনে যদিও সন্ধারতি হয়ে গেছে। গঙ্গার জলে কিছুক্ষন পা চুবিয়ে বসে রইলাম। ১০ টা নাগাদ খাওয়া দাওয়া সেরে হোটেলে ফিরলাম। পরের দিন সকালে গোবিন্দঘাট এর উদ্দেশ্যে বের হলাম। ৩০০ কিলোমিটার দূরত্ব। উফফ….সে যেনো রাস্তা আর ফুরোয় না।

দুপুরে জীবনের বাজেতম ভেজ বিরিয়ানি খেলাম, ভেবেছিলাম হয়ত পনির দেবে কিন্তু যা খেলাম সেটাকে কিছু সবজি দিয়ে আতপ চালের ভাত ভাজা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। একেবারে অখাদ্য। ৩০০ কিমি রাস্তা আমাদের ড্রাইভারের চরম ল্যাদ এ ১২ ঘণ্টায় পৌঁছলাম। ২ ঘণ্টা অন্তর ১৫- ২০ মিনিট দাড়ালে আর কি করা যাবে। এদিকে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত, আমি তো গাড়িতে বেশিক্ষণ গেলেই বমি করি, যদিও এবার আমার শরীর ভালো সার্ভিস দিল, শেষ ৫ কিমি আগে একবারই হলো। গোবিন্দঘাট জায়গাটা সত্যি সুন্দর। পাহাড়ের পাশেই হোটেল।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স

পরের দিন সকালে ৪ কিমি গাড়িতে গিয়ে পুলনা থেকে ট্রেকিং শুরু হলো। খুব ভয়ে ছিলাম। ভয়টাই সত্যি হলো। ১ কিলো চড়াই উঠতেই হাঁপানি শুরু হলো। কিছুতেই পারলাম না। ঘোড়ায় চড়ে বাকি ৯ কিলোমিটার উঠলাম। কিন্তু দারুন মজা লাগলো। ঘোড়াটি আমাকে কোনরকম ভয় না দেখিয়েই নিয়ে চলল। কিন্তু সেদিন রাতে এত বৃষ্টি হলো যে পরের দিন সকালে বেরিয়ে দেখি একটা ব্রিজ ভেসে চলে গেছে। একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা করে আমাদের পার করা হলো। খুব ভয়ংকর ছিলো পার হওয়াটা, একটু এদিক ওদিক হলেই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেদিন কিন্তু হাঁটতে আমার কোনো অসুবিধে হয় নি। ৪+৪=৮ কিলো হেঁটে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ঘুরলাম। অসাধারণ লাগলো। সেদিন আমার এত এনার্জি যে দৌড়ে উঠলাম নামলাম। মন ভরে গেলো জায়গাটা দেখে। পুরো যেনো সিনেমার সেট। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না যে অত উপরে একটা ফুলের উপত্যকা থাকতে পারে, প্রকৃতি যেনো ঢেলে সাজিয়েছে, যতদূর চোখ যায় শুধুই ফুল।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স

ফিরতেই ইচ্ছে করছিল না, গাইড বকেঝকে ফেরালো। কপালের জোর ছিলো তাই সুন্দর আবহাওয়ায় ভালো করে ঘুরলাম, ফেরার সময় জোর বৃষ্টি নামলো। সাথে বর্ষাতি থাকলেও অল্প ভিজলাম। কিন্তু সেদিন ফেরার পর খুব ক্লান্ত লাগছিল। বুঝতে পারছিলাম না পরের দিন হেমকুন্ড sahib আদৌ যেতে পারবো কিনা। কিন্তু পরের দিন সকালে উঠে দেখলাম শরীর ফিট। বেরিয়ে পরলাম, যদিও ঘোড়ায় গেলাম, হেঁটে ফিরলাম। খুব সুন্দর ছবির মত জায়গা। পাহাড়ের কোলে স্বচ্ছ হ্রদ। পাঞ্জাবিরা ওখানে বরফ ঠান্ডা জলে স্নান করছে। আমি শুধু পা ডোবানোরই সাহস করলাম।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স

যাওয়া আসার সময় বেশ কিছু ব্রহ্মকমল দেখলাম। লঙ্গরে খিচুড়ি খেলাম। ফেরার সময় বৃষ্টি আবারও আমাদের সঙ্গী হলো। কিছুক্ষন দাড়িয়ে দাড়িয়ে হেঁটে ফিরলাম। ওখানে তো আর ছাউনী নেই, তাই ছাতা মাথায় অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। পরেরদিন ghangaria থেকে গোবিন্দঘাট ফিরলাম হেঁটে ১০ কিলোমিটার। কিন্তু কোনো অসুবিধে মনে হলো না। প্রথম ৫ কিমি ১ ঘণ্টায় নামলাম, বাকি ৫ কিমি ল্যাদ খেয়ে ২ঘণ্টায়।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স

কিন্তু ফেরার সময় শুনলাম পরের দিন উত্তরাখণ্ড এ ট্রান্সপোর্ট ধর্মঘট। সত্যি চাপ নিয়েছিলাম, কারণ পরের দিন আমাদের হরিদ্বার থেকে ট্রেন। তাই ঠিক করলাম ওই দিনই হরিদ্বারে পৌঁছতে হবে, কাজটা কঠিন ছিলো, দুপুর তখন ১২ টা বেজে ৩০ মিনিট, ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা। আমাদের গ্রুপে আমরা দুজন মেয়ে, সাথে আর কেউ নেই। গাইড মশাই গোবিন্দঘাট অবধি আসবেন, তাই তার কাজ শেষ। কিন্তু হঠাৎই একটা বাস পেয়ে গেলাম। কিছু না ভেবে দৌড়ে উঠে পড়লাম।

রাত ১২ টায় হরিদ্বার পৌঁছলাম। কিন্তু সারাদিন খাওয়া জুটলো না। ১০ কিমি ট্রেক করে ৩০০ কিমি বাস এ এসে সারাদিন এ খাওয়ার মধ্যে ২টা লুচি, ১টা ফ্রুটি (১০টাকার প্যাকেট), ১ টা মজা (১০টাকার প্যাকেট), একটা চিপস এর প্যাকেট খেলাম। ১২ টায় এসে হোটেল নিলাম। ব্যাগ রেখে বেরিয়ে সামনের হোটেল এ ম্যাগি খেলাম, যেটি আর ৫ মিনিট পর বন্ধ হছিলো। রাত ১ টা পার করে শুলাম। পরের দিন সারাদিন ল্যাদ খেয়ে সন্ধেবেলায় আরতি দেখে রাত ১১-৫০ এর ট্রেন ধরলাম। হাওরা পৌঁছানোর সময় ছিল রাত ৩টা বেজে ১৫ মিনিট। যাওয়ার দিনের মতই আশা ছিলো এদিনও দেরি করবে, মাঝরাতে পৌঁছানোর দুঃখ পেতে হবে না, কিন্তু কপাল খারাপ, এই ট্রেন আবার ৪৫ মিনিট আগেই হাওরা পৌঁছালো। রাত ২টা বেজে ৩০ মিনিটে। কিছুক্ষন বসে সকাল ৫ঃ২০ তে বাড়ি ফিরলাম। জীবনের প্রথম ট্রেক সমাপ্ত হলো কিন্তু মনের মধ্যে একটা ছাপ রেখে গেল, এই হ্যাংওভার সহজে কাটবে না।