আমার কাছে ভ্রমণের অর্থ জীবনের অক্সিজেন। বেঁচে থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। অনেকদিন হয় কুয়াকাটা (Kuakata) যাবো ভাবছি। সময় করে উঠতে পারছিলাম না। এ মাসের মাঝামাঝি একটা সময় বের করে নিয়েছিলাম আমরা। আমরা বলতে আমি, আমার কাজিন সোহাগ, আমাদের স্ত্রী আর আমার কলিগ জুবায়ের। সিদ্ধান্ত নিলাম লঞ্চে কুয়াকাটা যাব। ঢাকা থেকে পটুয়াখালী তারপর সেখান থেকে বাসে কুয়াকাটা। তাই আমরা লাগেজপত্র নিয়ে সন্ধ্যায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছলাম। লঞ্চে কেবিনের ভাড়া স্বাভাবিকই ছিল। সিঙ্গেল কেবিন ১,১০০ টাকা। তাই দেরি না করে কেবিন নিয়ে নিলাম। ৭টার দিকে লঞ্চ ছাড়লো। কেবিনে লাগেজ রেখে আমরা লঞ্চের ছাদে চড়লাম। অনেক বাতাস ছিল। আমরা প্রায় নয়টা পর্যন্ত ছাদে বসে রইলাম। আকাশে লক্ষ তারার মিছিল। সপ্তর্ষি, লঘু সপ্তর্ষি, কালপুরুষ মন্ডলগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মাঝ নদীতে নিজেকে সীমাহীন আকাশগঙ্গা ছায়াপথের তুলনায় ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর মনে হচ্ছিল। সৃষ্টিকর্তাকে এইসকল প্রাচুর্যপূর্ণ আয়োজনের জন্য বারংবার ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম আর মনে মনে গাইছিলাম কবি গুরুর সেই বিখ্যাত গান :
“আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ, জীবন নব নব।”
যাহোক, রাত দশটায় ডিনার সেরে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। এক ঘুমে রাত পার। ঘুমের রাণী মনে হয় আমাদের কমলাকান্ত’র আফিম খাইয়েছিল। নদীর মাঝে গভীর ঘুম যাকে বলে আরকি। সকাল সাড়ে ছয়টায় আমরা পটুয়াখালী লঞ্চঘাটে। তারপর পঞ্চাশ টাকায় সিএনজি রিজার্ভ করে কুয়াকাটা বাস টার্মিনালে পৌঁছাই। জনপ্রতি ১৪০ টাকায় কুয়াকাটা বাসের টিকিট কাটি। শেখ জামাল, শেখ কামাল আর শেখ রাসেল সেতুর উপর দিয়ে মাত্র আড়াই ঘণ্টায় সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। বাস থেকে নেমেই বিচ দেখতে পেলাম। যাহোক, ক্ষুধায় পেট চোচো করছিল। হোটেলে নাশতা সেরে নিলাম। ঢেউয়ের প্রবল আকর্ষণ উপেক্ষা করে এখন আমাদের প্রথম কাজ হোটেল বুকিং। বিচের মাত্র ৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে একটি হোটেল আছে। নাম হোটেল সী কুইন। পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। রুমপ্রতি ভাড়া ১,৫০০ টাকা। আমরা তিনটি কাপল রুম নিই। যদিও জুবায়ের বিবাহযোগ্য হওয়ার পরও সিঙ্গেল। তাই মনটা তার কিঞ্চিত খারাপ।
যাহোক, রুমে আমরা একটু বিশ্রাম নিয়ে সমুদ্রে নামবো বলে ঠিক করলাম। দুপুর সাড়ে বারোটায় সোজা বিচে। দেখার মতো বিচ। কক্সবাজারের মতো কোলাহলপূর্ণ নয় মোটেও। খুবই শান্ত আর কমার্শিয়াল নয়। সাদামাটা একটা ব্যাপার আছে এখানে। মাত্র একশ থেকে দুশ লোক সর্বোচ্চ নেমেছে গোসল করতে। সমুদ্রে বিশাল ঢেউ। এখানকার পানি সেন্ট মার্টিনের মতো নীল নয়, নোনতা তো নয়ই। বরং অনেকটাই ঘোলা আর স্বাদে মিঠা পানির মতো। আর ঢেউ? ওরে বাবা! সে কি ঢেউ! কক্সবাজারের ঢেউ-তো এর কাছে নস্যি। একেকটা ঢেউ মনে হচ্ছে আধা টন পানি নিয়ে আমাদের উপর পড়ছে আর আমরা ছিটকে পড়ছি প্রায় পাঁচ হাত দূরে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ডুবিয়ে আমরা হোটেলে ফিরি। তখন ঘড়ির কাটা দুইটা ছুঁই ছুঁই। রুমে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ করে সোজা রেস্তোরায়। উদ্দেশ্য দুপুরের খাবার। সাগরপাড়ের রেস্তোরাগুলোতে দুইভাবে খাবার অর্ডার করা যায়। প্রতি আইটেমের আলাদা আলাদা দাম দিয়ে খাওয়া যায়, আর এক পদ্ধতি হলো প্যাকেজ সিস্টেম। আমরা এখানে দুই পদ্ধতিতেই খেয়ে দেখেছি। বলে নেয়া ভাল, পছন্দমতো মাছ অর্ডার দেয়ার সুযোগ পাবেন এখানে। এখনকার খাবার পানির কথা না বললেই নয়। খোলা পানি পান করা আমার কাছে একটু কঠিন মনে হয়েছে। কারণ পানিতে প্রচুর আয়রন, তাই একটা বাজে গন্ধ থেকেই যায়।
আহার শেষে আমরা বিচের পাশেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার দেখতে গেলাম। এই বিহারের ভিতরেই রয়েছে সেই কুয়াটি যার নামানুসারে এই স্থানের নাম – কুয়াকাটা। ভিতরে ঢুকতে আপনাকে ২০ টাকা গুনতে হবে। বিহারের পাশেই রয়েছে প্রাচীন সমুদ্রগামী ছোট পাল তোলা জাহাজ (Schooner)। জাহাজটির নির্মাণ উপকরণ ছিল- কাঠ, লোহা আর তামার পাত আর এটি আনুমানিক ১৭ থেকে ১৮ শতকে নির্মিত। প্রাপ্তিস্থান – কুয়াকাটা সমুদ্রতট।
যাহোক, দেখতে দেখতে বিকেল। আবারো ফিরে গেলাম বিচে। বিচ ধরে সোজা পশ্চিম দিকে এলোমেলো হাঁটা দিলাম। কিছুক্ষণ সমুদ্র দেখি, তারপর ছবি তুলি, তারপর আবার অবিরাম হাঁটি। আদতে সমুদ্র মানুষকে ভাবতে শেখায়। শেখায় কিভাবে অনুধাবণ করতে হয় নিজের অস্তিত্বকে আর ভুলে থাকতে হয় কষ্টের অতীতকে। এগিয়ে যাবার প্রবল প্রেরণা পাওয়া যায় সাগরের বুক থেকে জেগে ওঠা নতুন সূর্যে। প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে বিচে ফিরে আসি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। সমুদ্রজলে সূর্যিমামা টুপ করে ডুব মারলো। বিচে প্রায় ৭/৮ টা ভ্রাম্যমাণ মাছের দোকান বসেছে। আছে ফুসকার দোকানও। মাছ দোকানগুলোর প্রতিটির পিছনে ছোট একটা রান্নাঘর আছে। যে মাছ আপনি পছন্দ করবেন সেই মাছটাই আপনার পছন্দমতো ফ্রাই, গ্রিল বা বার্বিকিউ করে পরিবেশন করা হবে। প্রথমদিন হিসেবে আজ আমরা টুনা মাছ গ্রিল আর কাঁকড়া ফ্রাই খেলাম। দু’টোই সুস্বাদু ছিল। তারপর পানির বদলে খেলাম ডাব। প্রতি ডাবের মূল্য ৪০ থেকে ৬০ টাকা।
কক্সবাজারে দূর সমুদ্রে মাছ ধরা ট্রলার যেখানে খুব একটা চোখে পড়ে না, কুয়াকাটায় সেটা ডাল-ভাত। দূরে সমুদ্রগামী মাছধরা ট্রলারগুলোতে মিটিমিটি আলো জ্বলছে। এগুলোকে আকাশের তারা আর সমুদ্রকে সীমাহীন আকাশ ভেবে ভুল হবে। আকাশের তারা-ই বলি আর জোনাকির আলো-ই বলি, সৌন্দর্যটা বর্ণনাতীত। কুয়াকাটা ছাড়া এদৃশ্যেও দেখা আর কোথাও পাবেন না। ঘড়ির কাঁটা তখন ৯টা ছুঁইছুঁই। আমরা একটি রেস্তোরায় ডিনার সেরে রুমে এসে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ি। কারণ পরদিন ভোরে সূর্যোদয় দেখতে হবে।
পরদিন ভোরে আমরা বিচে যাই। কিন্তু নিরাশ করে বেরসিক মেঘ। সূর্যোদয়ের সময়টাতেই পূব আকাশে ঘন মেঘের আনাগোনা। ফলাফল- কুয়াকাটায় এসেও সূর্যোদয় দেখা থেকে বঞ্চিত আমরা। সমুদ্রতটে কিছুক্ষণ ইতস্তত: ঘোরাফেরার পর আমরা রেস্তোরায় সকালের নাস্তাটা সেরে ফেলি। তারপর প্ল্যান করি বোটানিক্যাল গার্ডেন যাওয়ার। বিচ থেকে মোটরসাইকেলে জনপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকায় বোটানিক্যাল গার্ডেন যাওয়া যায়। কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিই সমুদ্রের তীর ধরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে হেঁটেই চলে যাব। তাই আমরা বিচ ধরে পূর্বদিকে রওনা হলাম। মূলতঃ ঝড়, জলোচ্ছাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কুয়াকাটার জলবায়ুগত পরিবেশ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হওয়ায় এখানকার সমুদ্রতট ও আশপাশের পরিবেশ এখন হুমকির সম্মুখিন। সমুদ্র ধীরে ধীরে লোকালয়কে গ্রাস করছে। বড় বড় কাঁকড়া, ডলফিন সমুদ্রতটে মরে পড়ে থাকতে দেখেছি আমরা। ইঞ্জিনচালিত ছোট মাছ ধরার নৌকাগুলো তীর থেকে দুইটি চাকার মাধ্যমে বিশেষ কায়দায় পানিতে নামানো হচ্ছে। তারপর সেই নৌকা মাছ ধরতে হারিয়ে যাচ্ছে দূর সমুদ্রে। দেখতে দেখতে আমরা প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে বোটানিক্যাল গার্ডেন চলে আসি। লোকমুখে শুনেছি একযুগ আগেও নাকি এই বাগান সমুদ্রের আরো ভিতরে ছিল। এখন বাগানের অনেকটাই সমুদ্র গ্রাস করে নিয়েছে। প্রকৃতির খেলা বোঝা বড় দায়। এখন বাগানে কিছু ঝাউবন ছাড়া বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না।
বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে বিচে ফিরতে ফিরতে দুপুর দুইটা। দেরি না করে রেস্তোরায় লাঞ্চ সেরে রুমে গিয়ে সুখনিদ্রায় তলিয়ে গেলাম। ঘুম থেকে জেগে দেখি বিকেল হয়ে গেছে। আজকে আমরা আরো কিছু মাছ খাব, তাই সন্ধ্যার আগেই বিচে দৌড়। নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় দোকানগুলোতে। রূপচাঁদা, লইট্টা, ছুরি, শাপলা, ফাইং ফিস, কাঁকড়া, টুনা, লবষ্টার, কোরাল; কি নেই এখানে? আমরা লইট্টা মাছ আর ফাইং ফিস ফ্রাই অর্ডার করলাম। খেতে এক কথায় অপূর্ব লেগেছে। তারপর খেলাম ডাব। এবার করতে হবে কেনাকাটা। সাগরপাড়েই প্রচুর দোকান রয়েছে কেনাকাটার। কক্সবাজার বা সেন্ট মার্টিনের মতোই এখানেও বার্মিজ জিনিসপত্রের ছড়াছড়ি। পাশাপাশি সাধারণ কেনাকাটার দোকানতো রয়েছেই। রাত দশটার মধ্যে কেনাকাটা সেরে আমার কুয়াকাটার বিখ্যাত হাঁড়িরুটি আর কলিজা খাবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। তবে সমস্যা হলো, শুধুমাত্র দায়সারা গোছের দুইটি হোটেলেই এই হাঁড়িরুটি পাওয়া যায়। কি আর করা। কথায় আছে-
যস্মিন দেশে যদাচার
কাছা খুলে নদী পার।
সুতরাং বিসমিল্লাহ্ বলে ভাঙাচোরা একটি নোংরা হোটেলে আমরা ঢুকে পড়ি। রুটি আর হাঁড়ি দুইটি দর্শনের সৌভাগ্য হলো আমাদের। জ্বলন্ত লাকড়ির চুলার উপর প্রকান্ড একটি মাটির হাঁড়ি উপুড় করে রাখা। তার উপরে প্রমাণ সাইজের একটি বেলানো রুটি দিয়ে দেয়া হলো। দুই মিনিটের মধ্যেই একটি ঢালু রুটির উৎপত্তি। খারাপ না। প্রতি রুটি ১৫ টাকা। গরুর কলিজা দিয়ে তৃপ্তি মিটিয়ে খেলাম। কিন্তু দাম মেটানোর সময় আমি নিজের কলিজায় প্রবল চাপ অনুভব করলাম। নিতান্ত অল্পএকটু গরুর কলিজা ৬০টাকা! তাও এমন একটা হোটেলে! এতদিন শুনেছি, মানুষ আকাশ থেকে পড়ে। আমি মনে হয় আকাশেই ঝুলে আছি, পড়তে আর পারিনি। কি আর করা। দাম মিটিয়ে হোটেলে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে নাস্তা সেরে বিচে গেলাম। ঝকঝকে আবহাওয়া, মিহি ঠান্ডা বাতাস। প্রাণ জুড়িয়ে যায়। মন চাইছিল আরো দু’একটা দিন থেকে যাই। কিন্তু উপায় নেই গোলাম হোসেন। পেটের গোলামী করতে হলে ফিরতেই যে হবে। তাই সকাল সাড়ে এগারোটার বাসের টিকিট কিনে হোটেলে ফিরলাম। লাগেজপত্র গুছিয়ে নির্ধারিত সময়ে চেপে বসলাম বাসে। তারপর দুপুর দেড়টায় আমরা আমতলী লঞ্চঘাট বাসস্ট্যান্ডে নামলাম। সেখান থেকে অটোরিকশায় ৫০ টাকায় আমতলী লঞ্চঘাট। কেবিন নিয়ে পাশের একটি হোটেলে গিয়ে লাঞ্চটা সেরে নিলাম। বিকেল ৪টায় আমাদের লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়লো।
আর এভাবেই আমাদের কুয়াকাটা ভ্রমণটা শেষ হলো। আসলে শেষ হলো বললে ভুল হবে। কবি গুরুর ভাষায়- শেষ হয়েও হইলো না শেষ।
ঢাকা থেকে সড়কপথে কুয়াকাটার দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি বাস এখন সরাসরি কুয়াকাটা যায়। দ্রুতি পরিবহন, সাকুরা পরিবহনসহ একাধিক পরিবহনের বাসে গাবতলী কিংবা সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে কুয়াকাটায় যেতে পারবেন। এসব বাসে ভাড়া পড়বে ৫০০-৫৫০।
Leave a Comment