নারায়ানা কার্ডিয়াক হসপিটাল

নারায়ানা কার্ডিয়াক হসপিটাল

Type তথ্যভান্ডার
Reading Time ৬ মিনিটস

হার্ট বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী শেঠি ২০০১ সালে ব্যাঙ্গালুরুতে ‘নারায়ণা হেলথ’ (এনএইচ) প্রতিষ্ঠা করেন। একটি ২২৫ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে যাত্রা শুরু করা নারায়ণা হেলথ এখন ২৩টি হাসপাতাল, ৭টি হার্ট সেন্টার ও ১৯টি প্রাথমিক সেবা কেন্দ্রের এক বিশাল নেটওয়ার্ক। এ হাসপাতালগুলোতে রয়েছে ছয় হাজারেরও অধিক শয্যা।

নারায়ণা হাসপাতাল থেকে কখনো কাউকে আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে ফিরে যেতে হয় না। তারা অনেক দরিদ্র মানুষকেই স্বল্পমূল্যে সেবা প্রদান করে থাকেন। তবে এটি কোনো দান হিসেবে করেন না তারা। এ ব্যয় বহন করতে তারা ‘ভর্তুকি মডেল’ অনুসরণ করেন। ধনী ব্যক্তিরা দরিদ্রদের জন্য ভর্তুকি দেন, ধনীরা এ জন্যে হয়তো বিলাসবহুল কক্ষ কিংবা এ ধরনের অতিরিক্ত কিছু সুবিধা পান। কিন্তু মূল চিকিৎসার মান সকলের জন্যই বিশ্বমানের।

এ পর্যন্ত নারায়ণা হাসপাতালে লক্ষাধিক অস্ত্রোপচার হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগীই ছিল দরিদ্র শ্রেণীর, যাদের কেউ স্বল্পমূল্যে, কেউ বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়েছেন। নারায়ণা হাসপাতাল দেড় লাখ থেকে খরচ তারা কমিয়ে এনেছেন নব্বই হাজার রুপিতে। ডলারের হিসেবে যা মাত্র ১৫০০ ডলার, যেখানে এ ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রে ১,৪৪,০০০, মেক্সিকোতে ২৭,০০০ ও কলাম্বিয়ায় ১৪,৮০০ ডলার। বিশ্বের বৃহত্তম হৃদরোগ হাসপাতাল ‘নারায়ণা ইন্সটিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়িন্সেস’ এ আছে ১০০০ শয্যা, ১০৭ জন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, ৫টি ক্যাথ ল্যাব, ১৫টি অপারেশন থিয়েটার এবং প্রতিদিন কমপক্ষে ৩৫জন ছোট -বড় রোগীর ওপেন হার্ট সার্জারী হয়।

নারায়ানা কার্ডিয়াক হাসপাতাল সম্পর্কিত তথ্য

আলাদা আলাদা রোগের জন্য ওখানে আলাদা আলাদা ইউনিট বা বিল্ডিং রয়েছে। কোন ডাক্তার দেখাবেন তা সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলে বাংলাদেশ কাউন্টার নামের ডেস্ক আছে সেখান থেকে সাহায্য নিতে পারেন। যেহেতু আপনি বিদেশি রোগী সেহেতু হাসপাতালে রেজিস্ট্রেশন ফর্ম পুরন করে পাসপোর্টের ফটোকপি দিতে হবে। তারপর ডাক্তারের এপোয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। ডাক্তারের ফিস ৬০০ থেকে ৮০০ রুপির মধ্যেই। ভাষাগত জটিলতা থাকলে আপনি দোভাষীর সাহায্য নিতে পারেন কারণ তারা বাংলা ঠিকমতো বুঝেন না। আর দোভাষীর ফিস খুবই অল্প। কোন রকম পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন হলে হাসপাতাল কম্পাউন্ডের মধ্যেই আপনি সব ব্যবস্থা পেয়ে যাবেন। আর খরচ বাংলাদেশের তুলনায় খুবই কম।

এই হাসপাতাল বাংলাদেশিদের কাছে ডাক্তার দেবী শেঠির জন্যই পরিচিত। এখানে বাংলাদেশিরা আসেন হৃদরোগের চিকিৎসা জনিত কারণেই। কিন্তু সবাই ওইখানে যাওয়ার পর যে ভুলটা করেন- ডাক্তার দেবী শেঠির অ্যাপোয়েন্টমেন্টের জন্য তারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন এবং তাকেই দেখান। দেখার পর যদি সার্জারি প্রবলেম হয়, উনি সার্জারির পরামর্শ দেন এবং রিলেটেড কোনো ডাক্তারকে রেফার করে দেন, অথবা ঔষধ দিয়ে কয়েক মাস পর আবার চেক আপ করতে বলেন। এতে অনেক দীর্ঘ সময় চলে যায়।

এই হাসপাতালে দেবী শেঠি ছাড়াও অনেক বিশেষজ্ঞ কার্ডিয়াক কনসালটেন্ট ও কার্ডিয়াক সার্জন আছেন। আর তাদেরকে দেবী শেঠি নিজেই অ্যাপয়েন্ট করেছেন ওই হাসপাতালে। অর্থাৎ, কনসালটেন্ট ডাক্তার যারা আছেন, তারা এইজন্যই আছেন যে, প্রাথমিক সবকিছুই সেসব ডাক্তার দেখবেন, এবং পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে সেগুলোর জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা দেবী শেঠির কাছে পাঠাবেন। আপনি যদি এখানে কোনো কার্ডিয়াক কনসালটেন্টকে দেখান, এরপর সব টেস্ট ও রিপোর্ট দেখার পর, প্রয়োজন হলে সেই ডাক্তারই আপনাকে পরামর্শ দিবে দেবী শেঠিকে দেখানোর জন্য।

এখানে সার্জারির সব কিছুই ডাক্তার দেবী শেঠির সিদ্ধান্তে হয়। এবং উনি যে ডাক্তারকে রেফার করবেন, শুধু তিনিই সার্জারি করবেন। তাই প্রথমে সবার উচিত, এসেই একজন কার্ডিয়াক কনসালটেন্টকে দেখানো। এতে আপনার চিকিৎসা প্রক্রিয়া সহজ হবে ও দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ হবে না।

বেশিরভাগ বাংলাদেশী এখানে আসার ক্ষেত্রে ভাষাটাকে সমস্যা মনে করেন। মজার ব্যাপার হলো এখানে বেশিরভাগ ডাক্তারই বাংলা বোঝেন ও বলতে পারেন। আর যদি তবুও আপনার প্রয়োজন হয়, হসপিটাল থেকেই দোভাষী নিতে পারেন যারা এখানে কর্মরত আছেন। ডাক্তারের অ্যাসিসট্যান্ট আপনাকে জিজ্ঞেস করবে, আপনার দোভাষীর প্রয়োজন আছে কিনা। অথবা আপনি নিজে থেকে বললে, তারাই ডেকে নিয়ে আসবে। এজন্য কোনো অতিরিক্ত ফি দিতে হবে না। এরপর যদি সার্জারির জন্য অ্যাডমিশন নেন, সেখানে বাংলাভাষী নার্স আছেন। আর বাংলা ভাষায় সাহায্যের জন্য প্রতি ওয়ার্ডে প্রয়োজনীয় নাম্বার দেওয়া আছে।

ওখানকার ডাক্তার এবং স্টাফদের ব্যাবহার অত্যন্ত ভালো। ডাক্তারদের ব্যাবহারে পেশেন্ট অর্ধেক সুস্থ হয়ে যায়।

ব্যাঙ্গালোর যাওয়ার উপায়

প্লেন

ঢাকা/চট্টগ্রাম থেকে ব্যাঙ্গালোর সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। কম খরচে অনেক কানেক্টিং ফ্লাইট আছে, যেগুলো কলকাতাতে ট্রানজিট দিয়ে থাকে। আপনি আপনার সুবিধা মতো যে কোনোটি নিতে পারবেন। বাই এয়ারে আসলে আপনি ব্যাঙ্গালোর এয়ারপোর্টে নামবেন। সেখানে থেকে হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ৬০ কি. মি.। তাই এয়ারপোর্ট থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত আসার জন্য এয়ারপোর্ট ট্যাক্সি অথবা কম খরচে ওলা বা উবার রাইড সেবা নিতে পারেন।
উবার/ওলা: ৮০০-১২০০ রুপি।
এয়ারপোর্ট টেক্সি: ১৪০০-১৮০০ রুপি।

ট্রেন

ঢাকা থেকে কলকাতা ট্রেনে, বাসে এবং এয়ারে সব ভাবেই যাওয়া যাবে। কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর ট্রেনে যেতে চাইলে কলকাতা-ব্যাঙ্গালুরু এসি এক্সপ্রেসে চেপে বসতে পারেন। ছাড়ার সময়: সকাল ১০:৫৫ মিনিটে, পৌঁছাবে পরদিন বিকেল ৪ টায়, সময় লাগবে: ২৯ ঘণ্টা ৫ মিনিট।

ভাড়ার তালিকা:
এসি ওয়ান-এ: ৪৮৯৫ রুপি
এসি টু-এ: ২৮৪০ রুপি
এসি থ্রি-এ : ১৯৪৫ রুপি

যদি জেনারেলে এ পাওয়া যায় তাহলে প্রতি টিকিটের এই মূল্য, কিন্তু না পাওয়া গেলে ট্যাটকালের মাধ্যমে কিনতে হবে, সেক্ষেত্রে টিকিটের ধরন অনুযায়ী কিছু মূল্য বেশি দিতে হবে। ব্যাঙ্গালোর ট্রেন স্টেশন থেকে হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ৩০ কি: মি:।

থাকার হোটেল বা লজ

হাসপাতালের আশেপাশেই থাকার জন্য অনেক হোটেল বা লজ আছে। রুমের ধরন, সুযোগ সুবিধা ও অবস্থান ভেদে খরচ একেক রকম। আপনি আপনার বাজেট অনুযায়ী ৫০০-১০০০ রুপির মধ্যেই রান্না সুবিধা সহ ননএসি এবং এসি রুম পাবেন। আমি ছিলাম চেতান গেস্ট হাউজে। আমার হোটেল থেকে নারায়াণা হসপিটালে হেটেই যাওয়া যেতো।

খাওয়া-দাওয়া

প্রায় প্রত্যেক হোটেল বা লজে রান্নার সুবিধা রয়েছে। তার মধ্যে সব ধরনের বাসন, ফ্রিজ এবং গ্যাসের চুলা থাকে। বাজার করার জন্য হোটেলের আশেপাশে মুদি, শাক-সবজি, মাছ, মুরগি ইত্যাদি দোকান আছে। তাই সহজেই বাজার করে নিজেরাই রান্না করে খেতে পারবেন। এছাড়া বড় বাজারে যেতে চাইলে চন্দ্রপুরা বা হেব্বাগুডিতে যেতে পারেন। সেখানে কিছু বাঙালি খাবার হোটেল রয়েছে। তাদের পার্সেল সার্ভিসও রয়েছে৷ আপনি পার্সেল অর্ডার করলে হোটেলে এসে দিয়ে যাবে। কিন্তু খাবারে মান ও স্বাদের তুলনায় খরচ অনেক বেশি। এছাড়া কিছু হোটেল/লজ এর নিজস্ব খাবার সার্ভিস আছে, তবে সবদিক বিবেচনায় নিজেরাই রান্না করে খাওয়া ভালো। ওখানে D-Mart নামে একটা সুপার সপ আছে। সবকিছু অনেক ডিসকাউন্টে পাওয়া যায়।