বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য ও নগর সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায় পুরান ঢাকার সাকরাইন (Shakrain Festival) উৎসবে। প্রতি বছর শীতের আমেজে আকাশজুড়ে রঙিন ঘুড়ির মেলা, আতশবাজি আর ঢাকাইয়াদের উৎসবমুখর কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী প্রাচীন ঢাকা। ‘পৌষ সংক্রান্তি’ বা ‘ঘুড়ি ওড়ানো উৎসব’ নামেও এটি ব্যাপক পরিচিত।
সাকরাইন উৎসব কখন হয়?
বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী পৌষ মাসের শেষ দিনে (পৌষ সংক্রান্তি – Poush Sangkranti) এই উৎসব পালিত হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতি বছর ১৪ই জানুয়ারি (বা কখনো ১৫ই জানুয়ারি) সাকরাইন উদযাপিত হয়।
- সকালের সূচনা: পৌষ মাসের বিদায় ও মাঘ মাসের আগমনকে স্বাগত জানাতে সকাল থেকেই শুরু হয় ঘুড়ি ওড়ানোর প্রস্তুতি।
- সারা দিনের উৎসব: দিনভর চলে ঘুড়ি কাটাকাটি খেলা।
- সন্ধ্যার আকর্ষণ: সূর্য ডোবার সাথে সাথেই রূপ নেয় আলো, আতশবাজি ও লাইটিংয়ের এক দৃষ্টিনন্দন সন্ধ্যায়।
উৎসবটি কোথায় হয়?
সাকরাইন মূলত পুরান ঢাকাভিত্তিক একটি পৌরাণিক ও সামাজিক উৎসব। পুরান ঢাকার বাড়িগুলোর ছাদই এই উৎসবের প্রধান মঞ্চ।
উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু এলাকাগুলো হলো:
- শাঁখারীবাজার
- তাঁতীবাজার
- লক্ষ্মীবাজার
- সূত্রাপুর
- গণ্ডারিয়া
- ওয়ারী
- লালবাগ
- হাজারীবাগ ও ধূপখোলা মাঠ সংলগ্ন এলাকা।
সাকরাইন কেন উদযাপিত হয়? (ইতিহাস ও তাৎপর্য)
ধর্মীয় ও ঋতুভিত্তিক তাৎপর্য
সংস্কৃত শব্দ ‘সংক্রান্তি’ থেকে ‘সাকরাইন’ শব্দের উৎপত্তি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পৌষ সংক্রান্তি হলো সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে (মকর রাশি) সংক্রমণ বা স্থানান্তরের দিন, যা ‘মকর সংক্রান্তি’ নামেও পরিচিত। এটি শীতকালীন ফসল কাটার আনন্দ ও নতুন ঋতুকে বরণ করার এক উৎসব।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে মোগল আমলে ঢাকার নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের শাসনামলে পুরান ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন ঘটে। ধীরে ধীরে তা ঢাকাইয়া সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। কালক্রমে এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরান ঢাকার সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের এক সর্বজনীন লোকজ উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।
উৎসবে কী কী আয়োজন থাকে?
সাকরাইন মানেই দিনভর চোখ ধাঁধানো সব আয়োজন ও রসনাবিলাস:
- রঙিন ঘুড়ির আকাশ ও ঘুড়ি কাটাকাটি: সকালে ছাদগুলোতে শুরু হয় ঘুড়ি ওড়ানো। চিল, চশমা, পঙ্খী, রুমাল, গোয়াদার, প্রজাপতি ইত্যাদি হরেক নামের ও রঙের ঘুড়িতে ছেয়ে যায় আকাশ। এক সুতা দিয়ে অন্য সুতা কাটার রোমাঞ্চকর প্রতিযোগিতা চলে দিনভর।
- মুখরোচক খাবারের সমারোহ: ঢাকাইয়াদের যেকোনো উৎসব মানেই রসনাবিলাস। বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী শীতের পিঠা-পুলি (ভাপা, চিতই, পাতিশাপ্টা), বাকরখানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, তেহারি ও ফিরনি। ছাদেই চলে বারবিকিউ পার্টি।
- আগুন খেলা (Fire-spinning): সন্ধ্যার পর পুরান ঢাকার তরুণদের মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনে ফুঁ দিয়ে ‘ফায়ার ব্রিদিং’ কিংবা বিশেষ কৌশলে আগুন নিয়ে খেলা করার দৃশ্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
- শব্দ ও আলোর রোশনাই: সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে আকাশে ওড়ে শত শত ফানুস। পুরো পুরান ঢাকার আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে নানারঙা আতশবাজি ও লেজার শো-তে।
- ডিজে ও মিউজিক: আধুনিককালে যোগ হয়েছে উচ্চশব্দে গান, ডিজে মিউজিক এবং ফ্ল্যাশ লাইটিং। ছাদগুলোতে তরুণ-তরুণীদের নাচ-গান রাতভর উৎসবকে জাগিয়ে রাখে।
সাকরাইন দেখার জন্য কোথায় যাওয়া ভালো হবে?
যদি আপনি সাকরাইনের পূর্ণ আনন্দ ও আমেজ উপভোগ করতে চান, তবে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোতে যাওয়া সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হবে:
- শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজার: ঐতিহ্য ও উন্মাদনার দিক থেকে এটি সাকরাইনের মূল কেন্দ্র। সংকীর্ণ গলি এবং একটার সাথে আরেকটা লাগানো ছাদ হওয়ায় এখানকার আবহ অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে ভিন্ন।
- লক্ষ্মীবাজার ও সূত্রাপুর: এই এলাকাগুলোতে পারিবারিক পরিবেশের পাশাপাশি তরুণদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকে। ছাদগুলোতে ওঠার সুযোগ বেশি থাকে।
- ধূপখোলা মাঠ ও গণ্ডারিয়া: মাঠে দাঁড়িয়ে খোলা আকাশে হাজার হাজার ঘুড়ি দেখতে চাইলে ধূপখোলা মাঠের আশপাশ আদর্শ জায়গা।
- লালবাগ কেল্লা এলাকা: কেল্লার আশেপাশের উঁচু বিল্ডিংগুলোর ছাদ থেকে পুরো পুরান ঢাকার আতশবাজির দৃশ্য চমৎকারভাবে উপভোগ করা যায়।
সাকরাইন উপভোগ করার প্রয়োজনীয় টিপস
- পরিচিত কারও ছাদ নির্বাচন: পুরান ঢাকায় যদি আপনার বন্ধু বা পরিচিত কেউ থাকে, তবে তাদের ছাদই সাকরাইন দেখার সবচেয়ে সেরা ও নিরাপদ জায়গা।
- দুপুরের আগেই পৌঁছানো: সাকরাইনের দিন দুপুর ২টার পর থেকে পুরান ঢাকার গলিতে প্রচুর জটলা তৈরি হয় এবং যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। তাই সকাল বা দুপুরের আগেই কাঙ্ক্ষিত এলাকায় পৌঁছে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
- নিরাপত্তা সচেতনতা: ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়ানো বা আতশবাজি দেখার সময় সাবধানে থাকুন। বিশেষ করে শিশুদের ছাদে সাবধানে রাখা উচিত।
- কান ও চোখের সুরক্ষা: রাতে প্রচণ্ড শব্দে আতশবাজি ও ফটকা ফোটে, সে ব্যাপারে মানসিক প্রস্তুতি রাখুন।
আমাদের সবার ভ্রমণ নিরাপদ হোক, এটাই হোক আমাদের সকলের চাওয়া।